Home বিশেষ প্রতিবেদন আইন ও মানবাধিকার

আইন ও মানবাধিকার

করোনাকালে তথ্য আড়ালের এই প্রাণান্ত চেষ্টা কেন?

মতামত

করোনাকালে তথ্য আড়ালের এই প্রাণান্ত চেষ্টা কেন?

কামাল আহমেদ | প্রথম আলো ০৯ মে ২০২০ মহামারির সঙ্গে স্বাভাবিক সময়ের তুলনা চলে না। বিশেষ করে, যে মহামারিতে শত্রু অদৃশ্য, রোগটা অতিছোঁয়াচে এবং ‍মৃত্যুঝুঁকি হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। আমাদের আইনে মহামারির সময়ে সংক্রমণের ঝুঁকির তথ্য গোপন নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে আইনে সরকারি কর্মচারী ও সাধারণ নাগরিকের মধ্যে কোনো পার্থক্যও করা হয়নি। অথচ এখন সেই তথ্য আড়ালের প্রাণান্তকর চেষ্টারই প্রতিফলন ঘটছে। ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্যসংবলিত কোনো পোস্ট দেওয়া ও সে ধরনের পোস্টে লাইক বা শেয়ার করা থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরত থাকার এক নোটিশ জারি করা হয়েছে ৭ মে। কেউ তা না মানলে আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই নোটিশ জারি করা হলো এমন দিনে, যে দিনে ফেসবুকে সরকার অথবা কোনো ব্যক্তিবিশেষ বা তাদের কাজের সমালোচনা এবং ভিন্নমত প্রকাশের দায়ে এক দিনে ঢাকায় ১১ জন এবং অন্যান্য জায়গায় আরও অন্তত ৪ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তার আইনে মামলার বিষয়টি শহরে সবার মধ্যে আলোচিত হচ্ছিল। এসব আলোচনা বেশির ভাগই সামাজিক মাধ্যমে, কিছুটা টেলিফোনে আর কিছুটা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। মামলা দেওয়ার আগে কোনো ধরনের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া লেখক, কার্টুনিস্ট, ব্যবসায়ীসহ কয়েকজনকে সাদা পোশাকের লোকজন বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ায় অনেকের মধ্যে গুমের আতঙ্কও দেখা দেয়। যদিও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার না করার বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশ রয়েছে। টেলিভিশনের কথিত ব্রেকিং নিউজের স্ক্রলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংবাদভিত্তিক অনলাইন পোর্টালগুলোতেও এই হুঁশিয়ারির কথা প্রচার হতে থাকে। কিন্তু হুঁশিয়ারিটি যে শুধু সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য, সেটা অনেকেরই নজর এড়িয়ে যায়। হয়তো উদ্দেশ্যটাই এমন ছিল। লকডাউনে থাকা সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত যখন করোনার চিকিৎসার অব্যবস্থা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বেহাল এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়ে অস্থিরতায় ভুগছেন, তখন ফেসবুকে সরকারের সমালোচনা-নিন্দা-প্রতিবাদ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। সুতরাং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার লক্ষ্যে এ ধরনের হুঁশিয়ারি মোক্ষম বলে বিবেচিত হয়ে থাকতে পারে। তা না হলে, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এ রকম নির্দেশনা জারি করতে হবে কেন? সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিবিধিতে অনেক ধরনের বিধিনিষেধ আছে। তাঁরা সাধারণত সরকারবিরোধী মতামত এড়িয়ে চলেন। তা ছাড়া ফেসবুক ব্যবহারের বিষয়ে ২০১৫ সালের ২৮ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিল। পরে তা আবার হালনাগাদও করা হয়েছে। তবে যথারীতি সরকারের বাইরেও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে তাঁদের অনেকে নানা সময়ে মন্তব্য করলেও কখনো কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে শুনিনি। সরকারবিরোধী কোনো মতামত তাঁরা কখনো করেছেন, এমনটি চোখে পড়েনি। বিরল এ রকম কিছু হলে, তা এত ব্যাপকভাবে আলোচিত হওয়ার কথা যে সে ধরনের কিছু গণমাধ্যমের চোখের আড়ালে থাকত না। তাহলে হঠাৎ কেন সরকার আবারও এই হুঁশিয়ারির কথা স্মরণ করানো জরুরি মনে করল? এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে একটি ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি। গণ-সমালেচনা বন্ধের জন্য জনমানসে আতঙ্ক সৃষ্টির কৌশল হিসেবে এটি বেশ কার্যকর হতে পারে। অন্য আর যে সম্ভাবনাগুলো থাকে, তা হচ্ছে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের মুখ বন্ধ করা, যাঁদের ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিবিধির কড়াকড়ি প্রয়োগ তেমন একটা ছিল না। বিশেষত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অনুসারী চিকিৎসকেরা রাজনৈতিক কর্মীর মতো আচার-আচরণ করলেও অতীতে তা কখনোই শৃঙ্খলাবিধির ব্যত্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়নি। কিন্তু ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী পিপিই এবং এন-৯৫ মাস্ক নিয়ে যে অবিশ্বাস্য কেলেঙ্কারি ঘটেছে, তার খেসারত যেহেতু চিকিৎসকদের জীবন দিয়ে দিতে হতে পারে, সে কারণে তাঁদের ক্ষোভের বিষয়টি সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কাছে অপ্রত্যাশিত নয়। এ বিষয়ে যথাযথ সরকারি বিধি মেনে যাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন, তাঁদের পরিণতি কী ঘটেছে, তা আমরা সবাই জানি। অথচ দেশের প্রচলিত জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ সুরক্ষা প্রদান আইন ২০১১ অনুসারে তাঁদের সুরক্ষা পাওয়ার কথা। অতএব এই হুঁশিয়ারি চিকিৎসক ও চিকিৎসাসেবীদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বন্ধের চেষ্টায় হয়ে থাকতে পারে। তা ছাড়া রোগের বিস্তৃতি বাড়তে থাকা এবং হাসপাতালগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে অন্য সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে সরকার তাঁদেরও সাবধান করতে চাইছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠতে পারে। বলে রাখা ভালো, আগেকার নির্দেশনাগুলো থেকে নতুন পরিপত্রের একটা পার্থক্য আছে। তা হলো এবারই আলাদা করে কোনো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বর্পূণ ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্যের কথা বলা হয়েছে। যদিও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বর্পূণ ব্যক্তির আইনগত সংজ্ঞা কী বা কোন আইনে আছে, তার কোনো উল্লেখ পরিপত্রে নেই। দেশে খুব গুরুত্বর্পূণ ব্যক্তি বা ভিআইপি এবং ভিভিআইপিদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু কারা ভিআইপি, তা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। আর প্রচলিত ভিআইপিমাত্রই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বর্পূণ ব্যক্তি হবেন, বিষয়টি এমন হওয়ার কথা নয়। অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে জনমনে অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে, এমন কোনো লেখা, অডিও, ভিডিও ইত্যাদি প্রকাশ বা শেয়ার করা যাবে না বলেও এতে বলা হয়েছে। পরিপত্রের এই নির্দেশনাতেই সরকারের আসল উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হলে, তা নিশ্চয়ই অযৌক্তিক হবে না। সরকারি চাকরিবিধির বাইরে আলাদা করে এ ধরনের নির্দেশনা স্বাভাবিক সময়ে জারি করা হলেও তা নিয়ে প্রশ্ন উঠত। এখন মহামারির অস্বাভাবিক সময়ে তাই এমন নির্দেশনা জারিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে গণ্য করা যাচ্ছে না। সংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮‘য় বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে, এমন তথ্য গোপন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ওই আইনের ২৪-এর ১ উপধারায় বলা হচ্ছে: যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক জীবাণুর বিস্তার ঘটান বা বিস্তার ঘটাতে সহায়তা করেন, বা জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও অপর কোনো ব্যক্তি সংক্রমিত ব্যক্তি বা স্থাপনার সংস্পর্শে আসিবার সময় সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি তাহার নিকট গোপন করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ। ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনেই এই অপরাধের তদন্ত ও বিচার হওয়ার কথা বলা আছে আইনে। খুনের অপরাধে যেমন সরকারি কর্মকর্তা আর সাধারণ নাগরিককে আলাদা করা দেখা হয় না, এ ক্ষেত্রেও তেমনই হওয়ার কথা। সুতরাং চিকিৎসক, নার্স, আয়া, শুচিকর্মী কিংবা প্রশাসক—সবারই সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়ে তথ্য প্রকাশের দায়িত্ব আছে। জনস্বাস্থ্যের তথ্য শুধু ঊর্ধ্বতন কর্তাকেই জানানোর বিষয় নয়, ঝুঁকিতে থাকা সবাইকে জানানোর বিষয়। আর সে ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিম্নমানের পিপিই, মাস্ক কিংবা অন্য যেকোনো সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়ে সহকর্মী, পরিবার ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সজাগ করার মতো তথ্য ও মতামত প্রকাশ নিষিদ্ধ হবে কেন? আবার এই আইনেই আরেকটি ধারা, ২৬ (১) বলছে: যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা ভুল তথ্য প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ। তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত যে ধরনের লুকোচুরিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন, তাতে প্রশ্ন তোলাই যায়, তাঁরা আইন লঙ্ঘন করছেন কি না? কামাল আহমেদ: সাংবাদিক

প্রশ্নবাণে জর্জরিত ভিকটিম: ধর্ষক গ্রেফতার

প্রাইভেসির বালাই নেই ওসিসিতে, প্রশ্নবাণে জর্জরিত ভিকটিম

 জানুয়ারি ৮, ২০২০ | জান্নাতুল ফেরদৌসী
ঢাকা: রাত তখন ১১টা বেজে ৫০ মিনিট। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ভাড়ায় আসা একটি প্রাইভেট কার থেকে হুইল চেয়ারে করে নামানো হলো মেয়েটিকে। তার সঙ্গে থাকা দুই বান্ধবী উদ্ভ্রান্ত। কিন্তু স্থির ছিল মেয়েটি। তার গালে-ঘাড়ে ক্ষত আর কালশিটে দাগ। ধর্ষকের হাত থেকে কৌশলে পালিয়ে আসা ২২ বছরের তরুণীটির চেহারায় ছিল দৃঢ়তা। তিনি টলেননি। সাহসের সঙ্গেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরও নিজের চেষ্টাতেই পালিয়ে এসেছেন ঘটনাস্থল থেকে। ওই তরুণীর সঙ্গে থাকা এক শুভাকাঙ্ক্ষী পরে সারাবাংলাকে এভাবেই বর্ণনা করছিলেন। মেয়েটিকে হাসপাতালে ভর্তি করার সময় যেসব প্রক্রিয়া ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়েছে, তাও জানালেন তিনি। সে রাতে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) পর্যন্ত যেতে কত ধরনের প্রশ্ন, ভোগান্তি আর অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মখোমুখি হতে হয় তাদের, দফায় দফায় পূরণ করতে হয় ফরম— এসব তথ্য উঠে এলো তার সঙ্গে আলাপে। তিনি জানালেন, নিচ তলার ডানদিকের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের রুমের সামনে সেই মধ্যরাতেও ছিল অনেক রোগী আর তাদের স্বজনদের ভিড়। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলে প্রথমেই ভিকটিমের কাছে নাম-পরিচয় জানতে চেয়ে একটি ভর্তি ফরম ধরিয়ে দেওয়া হয়। সে ফরম পূরণ করে দেওয়া হলে এরপর যেতে বলা হল দেতলায় ২১২ নাম্বার কক্ষে। মেয়েটির শরীরের জখমগুলো তখন ব্যথার জানান দিতে শুরু করেছে। ওই শুভাকাঙ্ক্ষী বলেন, ২১২ নাম্বার কক্ষে গিয়ে তাদের পড়তে হয় অন্য পরিস্থিতিতে। সেখানে গর্ভবতী ও প্রসূতি নারীদের ভিড়। ডাক্তারের টেবিলে ৫/৬ জন চিকিৎসক। সেখানেও ভিকটিমকে সেই একই প্রশ্ন— নাম কী, বাবার নাম কী, কখন ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, কিভাবে ঘটেছে, ধর্ষক কয় জন ছিল? একই তথ্য দ্বিতীয় দফায় বর্ণনা করার পর শুরু হলো অপেক্ষার পালা। সঙ্গে হেনস্থারও। ভিকটিমের সঙ্গে থাকা একজনকে পাঠানো হলো নিচতলার ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি)। সেখান থেকে একটা টিউব/স্টিক আনতে বলা হলো। এসময় তার সঙ্গে একজন পুলিশ থাকতে হবে বলেও শর্ত দেওয়া হলো।
দেখতে দেখতে কেটে গেলে ১০ মিনিট, ২০ মিনিট , আধাঘণ্টা। টিউব/স্টিক এলো পৌনে একঘণ্টা পর। এবার আঁতকে ওঠার পালা । মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে লেবার রুমে। সেখানে তিন-চার জন নারীর প্রসব প্রক্রিয়া চলছিল। পুরো রুমটিতে হুল্লোড়–চেঁচামেচি, বিকট কান্নার শব্দ। তেমনই এক পরিস্থিতিতে পড়ে রীতিমতো ভড়কে যান মেয়েটি। শুভাকাঙ্ক্ষীটি বলেন, সেখানে একটা ভাঙা বেঞ্চে ওকে বসতে বলা হয়। কিছুক্ষণ পরে সেখানে অন্যদের সামনেই নগ্ন হতে বললে তিনি অস্বীকৃতি জানান। চিকিৎসক বলেন, এটাই নিয়ম, পর্দাটা দিয়ে আড়াল করে নেন। চিকিৎসকের কথা মেনে সহযোগিতা করেন মেয়েটি। সেভাবেই ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ করা হয়। তখনই দেখা যায় মেয়েটির গায়ের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন। সঙ্গের ওই শুভাকাঙ্ক্ষী বলেন, আমরা তখন বারবার আঘাতের চিহ্নগুলোর কথা বলতে চাচ্ছিলাম । কিন্তু এ নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখালেন না চিকিৎসকরা। তিনি বলেন, এক পর্যায়ে আলামত নেওয়া শেষ হলে তাকে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নেওয়ার জন্য বলা হয়। সেখানে যখন মেয়েটি পৌঁছায়, তখন রাত ২টা। ভাবলাম এবার অন্তত রেহাই পাওয়া গেল। মেয়েটার চিকিৎসা শুরু হবে। একটু ঘুমাতে পারবে। কিন্তু না, সেখানেও সেই একই প্রশ্নবাণ– নাম কী, বাবার নাম কী, কখন হলো ধর্ষণ, কিভাবে হলো, কে করলো, কয়জন ছিল? ওই শুভাকাঙ্ক্ষী বলেন, আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। জানতে চাইলাম এত ফরম কেন? একই সব প্রশ্নের জবাব কয় জনকে দিতে হবে, কতবার দেবে? কতবার লিখতে হবে? এমন প্রশ্নে সেখানকার দায়িত্বে থাকা একজন  পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘এটাই এখানকার নিয়ম। বরং আপনাদের পরিচয়ের কারণেই আপনাদের ক্ষেত্রে নিয়ম কিছু শিথিল করা হচ্ছে। অন্যদের আরও দৌড়াতে হয়। ধর্ষণের শিকার হয়ে হাসপাতালে আসা একটি মেয়ে নিঃসন্দেহে ট্রমাটাইজড থাকে। সে অবস্থায় দফায় দফা যখন ঘটনার বর্ণনা দিতে হয়, তখন মানসিক শক্তি এমনিতেও শেষ হয়ে যায়। নিয়ম থাকলেও আমি মনে করি এই নিয়ম পাল্টানো উচিত, বলেন তিনি। সেই নিয়মের খেসারত দিতে হলো মেয়েটিকেই। রাতটাই তার র্নিঘুম কাটলো। নিয়ম-কানুন শেষ করে যখন তিনি হাসপাতালের বিছানায়, তখন শুরু হলো মানুষের আনাগোনা। রাতভর কত মানুষ যে এলেন, তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী, র‌্যাব, ডিবি, সিআইডি, থানা পুলিশসহ— মানুষের যেন অভাব নেই। তাদের সবার মুখেও সেই একই প্রশ্ন! এক পর্যায়ে সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসক আর সাইকিয়াট্রিস্ট ভিজিটরদের অনুরোধ করলেন ভিড় কমাতে। কারণ ওই রুমেই আরও ছয় জন ভিকটিম (নারী-শিশু) রয়েছেন। কিন্তু হাসপাতাল পরিচালকের অনুমতি নিয়ে সেই রাতেই কমপক্ষে ১৩ জন গিয়েছিলেন মেয়েটির রুমে, তাকে দেখতে, সান্ত্বনা-সমবেদনা জানাতে! সেভাবেই রাত পার হয়ে গেল। ঘুম আর হলো না মেয়েটির। পরদিন এই ভিজিটরের সংখ্যা বেড়ে তিনগুণ হলো। ওসিসির চিকিৎসক, পুলিশ , মেয়েটির মা ,বন্ধু কারও  অনুরোধেই কিছু হলো না । সকাল গড়িয়ে যখন দুপুর, তখনো নির্ঘুম মেয়েটি। তখনও চলছিল একই প্রশ্নোত্তর। নাম কী, বাবার নাম কী, কখন ঘটল, কে ঘটালো, কেমন করে হলো, কয়জন ছিল? দুপুরের খাবার বা ওষুধ খাওনোর সুযোগও পাওয়া গেল না বলেই অভিযোগ করলেন তার সঙ্গে থাকা স্বজনরা। একে একে সবার আনাগোনা শেষে সন্ধ্যা গড়িয়ে যখন রাত নেমেছে, বলা যায় প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর মেয়েটি প্রথমবারের মতো একটু চোখ বোঁজার সুযোগ পেলেন। তাতেও কী শেষ রক্ষা হলো? না। এবার রাত ৮ টার দিকে এলেন উচ্চ পদস্থ একজন গোয়েন্দা। তাকে জানানো হলো— ঘুমাচ্ছেন মেয়েটি। বললেন, ডেকে তুলুন। তদন্তের জন্য লাগবে। এবার রেগে গেলেন মেয়েটির মা। কিন্তু সে রাগ ধোপে টিকলো না। গোয়েন্দা কর্মকর্তা উল্টো রেগে গেলেন। বললেন, ‘ঠিক আছে এতে তদন্তও দেরিতে হবে।’ শেষ পর্যন্ত  বাধ্য হয়ে মেয়েটির পক্ষ থেকে একটি আবেদন জানানো হয় হাসপাতাল পরিচালক বরাবর। তাতে লেখা, মেয়েটি আর কথা বলতে চাইছে না কারো সঙ্গে। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি বলে সারাবাংলাকে জানান মেয়েটির ওই শুভাকাঙ্ক্ষীসহ স্বজনরা। একদিন পরও অনেকেই গেছেন ওসিসিতে । বারবার, দীর্ঘ সময় নিয়ে মেয়েটিকে সেই  একই প্রশ্ন করে গেছেন তারা। রেহাই মেলেনি এর পরদিনও। এত দেখতে যাওয়া কেন? একই প্রশ্ন বারবার কেন করা হচ্ছে— সে প্রশ্ন সারাবাংলার তরফ থেকে ছিল ওসিসিতে কর্তব্যরত উপপরিদর্শক (এসআই) নাসরিন সুলতানার কাছে। তিনি বলেন, মেয়েটিকে তিন দিন ধরে অনেকেই দেখতে এসেছেন। এ ধরণের কোনো পরিচয়ের  ভিকটিম এলে এমন অনেকেই আসেন। এমন এমন মানুষ আসেন যে সবাইকে ফিরিয়ে দেওয়া যায়নি। অনেকেই আবার হাসপাতাল পরিচালকের অনুমতি নিয়ে এসেছেন। এসআই নাসরিন বলেন, তবে ভিজিটর আরও ছিল। ভেতরে ঢোকার পর আমরা অনেককেই অনুরোধ করে ভিকটিমের রুম পর্যন্ত যেতে দেইনি। মনোচিকিৎসকও বারবার নিষেধ করেছেন, ভিকটিমকে বেশি প্রশ্ন যেন না করা হয়। তিনিও তাকে বিশ্রামে রাখতে পরামর্শ দিচ্ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, আমার কাছে অনেকেই এসেছেন মেয়েটির সঙ্গে দেখা করতে চান বলে।  আমি সবাইকেই বুঝানোর চেষ্টা করেছি। মেয়েটির সম্পর্কে তথ্য জানিয়েছি। অনেকে বুঝেছেন, চলে গেছেন। কিন্তু অনেকেই আবার বুঝতে চাননি, বুঝতে চান না। ভিড় কমাতে নিরাপত্তাকর্মী বাড়িয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তদন্ত বা মামলার স্বার্থে কেউ দেখা করতে চাইলে কিংবা তার শিক্ষকরা এলে তো নিষেধ করা যাবে না। ‘তবে  সাইকিয়াট্রিস্ট তাকে নিরিবিলি পরিবেশে রাখতে বলেছেন। মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত দিলে আর ভিকটিম চাইলে আমরা তাকে ছেড়ে দেবো। তার এখন মা-বাবার সঙ্গে স্বাভাবিক পরিবেশ থাকা দরকার,’— বলেন ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক। ওসিসির প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন মনে করছেন, এসব ভিকটিমদের জন্য আলাদা করে কোনো প্রাইভেসির দরকার নেই। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ওসিসিতে যে ব্যবস্থাপনায় ভিকটিমদের সেবা দেওয়া হচ্ছে, তা যথেষ্ট ভালো। কুর্মিটোলায় ধর্ষণের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে কিছু বিশৃঙ্খলা হয়েছে মেনে নিয়েই ওসিসির পরিচালক বলেন, সব ভিকটিমের ক্ষেত্রে এমনটা হয় না। সারাবছর এত বেশি পরিমাণ ভিকটিমও থাকে না যে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা যায়। এই প্রকল্প পরিচালক জানান,  নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১১ টি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে চলে ওসিসি।  আগামী বছর শেষ হচ্ছে ৫ বছর মেয়াদি  এই প্রকল্প। এরপর হয়তো নতুন করে প্রকল্প ডিজাইন ও বাস্তবায়ন করা হবে। দেশের বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের একটি প্রধান কর্মসূচি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি)। নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য এসব সেন্টার থেকে স্বাস্থ্যসেবা, পুলিশি সহায়তা, ডিএনএ পরীক্ষা, সামাজিক সেবা, আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং ও আশ্রয় দেওয়া হয়।

ধর্ষণের পর ঢাবি শিক্ষার্থীকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল মজনুর: র‌্যাব

 জানুয়ারি ৮, ২০২০ | উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
ঢাকা: ধর্ষণের পর ঢাবি শিক্ষার্থীকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল মজনুর। শ্বাসরোধ করে হত্যার উদ্দেশ্যে তিনি বারবার গলা টিপে ধরেছেন। মেয়েটি ধস্তাধস্তি করে পালিয়ে আসতে না পারলে ভিন্ন কিছু ঘটতে পারতো— বলছে র‌্যাব। বুধবার (৮ জানুয়ারি) দুপুরে কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। মজনুর বরাত দিয়ে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় চিকিৎসা নিতে মজনু কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে বের হয়ে হাসপাতালের গেটের পাশে তিনি ঢাবি শিক্ষার্থীকে দেখতে পান। এরপর একটু সামনে এগিয়ে ঝোঁপের পাশে ওৎ পাতেন মজনু এবং চারদিকে নজর রাখেন কেউ আসছে কি না। পথে মেয়েটি একাই ছিলেন। তিনি ফুটপাত ধরে হেঁটে শেওড়া এলাকার দিকে যাচ্ছিলেন। এক প্রশ্নের জবাবে সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, নির্যাতনের শিকার মেয়েটির শ্বাসজনিত সমস্যা রয়েছে। যে কারণে মজনু যখন মেয়েটির মুখ এবং গলা চেপে ধরে, তখন সে নিস্তেজ হয়ে যায়। অচেতন হয়ে পড়ে। তার শরীরে কোনো ধরনের চেতনানাশক ওষুধ বা মাদক প্রয়োগ করা হয়নি। আমরা জানতে পেরেছি, রাত ১০টার দিকে মেয়েটি সম্বিত ফিরে পান। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি মজনুকে ফেলে দৌড়ে পালান। রাস্তা পার হয়ে শেওড়া রেলক্রসিং থেকে রিকশা নিয়ে বান্ধবীর বাসায় যান। বান্ধবীরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। মেয়েটি পালিয়ে যাওয়ার পরে মজনুও খালি হাতে চলে যান। পরে ঘটনাস্থলে ফিরে এসে মোবাইল ফোন, পাওয়ার ব্যাংক ও ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে যান বলে জানিয়েছেন মজনু। যে কারণে আলামতগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে— বলেন র‌্যাবের এই কর্মকর্তা। তিনি আরও বলেন, ধর্ষক একজনই ছিল। মজনু এবং ঢাবি শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। মজনুকে আটক করার পরে তার ছবি মেয়েটিকে দেখানো হয়েছিল। তিনি শনাক্ত করার পরেই আসামিকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা গেছে, মজনুর বাড়ি নোয়াখালী জেলার হাতিয়ায়। ১০ বছর আগে তিনি ঢাকায় আসেন। কয়েক বছর আগে তিনি বিয়ে করেছিলেন, স্ত্রী মারা গেছেন। ঢাকার কমলাপুর, তেজগাঁও, বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় থাকতেন তিনি। মজনু মাদকাসক্ত। ছিনতাই তার মূল পেশা। এর আগেও তিনি ভাসমান নারী ভিখারীকে একই জায়গায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছেন।

সারাবাংলা

অপরাধীরা হিংস্র হয়ে উঠেছে বিচারহীনতার কারণে’

অপরাধীরা হিংস্র হয়ে উঠেছে বিচারহীনতার কারণে’

|বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট|

নারীর প্রতি সহিংসতা দিন দিন বাড়ছে। সেই সঙ্গে অপরাধীরাও হয়ে উঠছে হিংস্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতার ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। এসবের অন্যতম কারণ প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা ও বিচারহীনতা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘আগুনে পুড়লো মানবতা’ শীর্ষক বৈঠকিতে এই মন্তব্য করেন আলোচকরা। মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় মঙ্গলবার (৯ এপ্রিল) বিকাল সাড়ে ৪টায় শুরু হয় বাংলা ট্রিবিউনের সাপ্তাহিক এই আয়োজন। বৈঠকিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থার একটি নিয়ম হচ্ছে, যতোক্ষণ পর্যন্ত অপরাধ প্রমাণিত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত অভিযুক্তকে নির্দোষ ধরা হবে। এটা তো আইনের মৌলিক বিধান। এখানে মাদ্রাসার অপরাধটি আমাদের বিশেষভাবে বিস্মিত করে এ কারণে যে, ছাত্রীও আরেকজন মাওলানার মেয়ে। তাতে দেখা যাচ্ছে, মাদ্রাসায় ছাত্রীরা পড়তে গেলে আমরা বাইরে থেকে ভাবি “নিরাপদ”। কিন্তু যেখানে নিরাপদ মনে করে রক্ষক যখন ভক্ষক হন তখন আমাদের মধ্যে একটু বেশি ও আলাদা বেদনা হয়। আমাদের এখানে ক্ষমতা যতো বেশি হয় ততো বেশি অন্যায় হয়। সেগুলোর বিচার তো করা যাবে না।’ এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের গ্রহণ করা উচিত। আমরা ঘটনাকে লোকাল এনেস্থেটিকের মতো দেখি। এখন নারী আক্রান্ত হচ্ছে বলেই কি আমরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছি? কিন্তু আক্রান্ত তো সব জায়গাতেই হচ্ছে। ৫০ বছর আগেও বিচারটা আমরা করতাম রাষ্ট্র বনাম। রাষ্ট্র হচ্ছে বাদী আর আমি হলাম সাক্ষী মাত্র। যে ক্রিমিনাল মামলাগুলো একই সঙ্গে সিভিল মামলাও বটে। আমার হাত নষ্ট হলো, চোখ চলে গেলো– এতে আমাদের এখানে ক্ষতিপূরণের বিধান নেই। থাকলেও তা হাইকোর্টের দয়ার ওপর নির্ভর করে। আমার মনে হয় বিচারের ক্ষেত্রে খুনির মৃত্যুদণ্ড হয়, কিন্তু আমার খুন তো আর পূরণ হবে না। আমার পরিবার তো আমাকে পাবে না। সেজন্য ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্রকে দিতে হবে। নাগরিককে রক্ষার জন্য যে অঙ্গীকার করে রাষ্ট্র হয়েছে, যেহেতু আমরা ট্যাক্স দিই, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র তার অঙ্গীকার পূরণ করছে না। ‘আমি তো মনে করি আমাদের রাষ্ট্র একটি অদ্ভুত ধরনের যন্ত্র। অতএব এবার যন্ত্র দায়িত্বহীন সেটা ঢাকা শহর ঘুরলেই বোঝা যায়। ঢাকায় ফুটপাথ তৈরি করতে পারছে না কিন্তু পদ্মা সেতু তৈরি করতে পারছে। তার মানে এটা অগ্রাধিকারের প্রশ্ন! প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হয় যে, মানুষ যাতে বোঝে এজন্য আপনারা রায় বাংলায় লিখুন। এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কিছু হতে পারে না। অন্য কোনও ভদ্র দেশে বিচারক যদি বলেন, “আমি বাংলায় লিখতে পারি না,” তার তো চাকরি থাকার কথা না। তাহলে ন্যায়বিচার কোথায়? কথায় আছে, দান-খয়রাত সবার প্রথমে আত্মীয়স্বজনকে করবেন। তো আপনি যদি নিজের ঘরেই বিচার প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন, তাহলে আপনি অন্যের কাছে করবেন কী করে। নারী-পুরুষ বাদ দিয়ে এখানে যারা গরিব তারা সব সময় নিপীড়িত হয়।’ সময়ের সঙ্গে অপরাধ ভিন্নরূপে সংঘটিত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে অপরাধের সঠিক চিত্র নেই। কয়েক বছর আগে আমরা অ্যাসিড সন্ত্রাসের কথা শুনেছি, কিছুদিন ধরে মনে হচ্ছে সেটা নেই, অন্য রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণ কিংবা নানাধরনের হয়রানিমূলক আচরণ রয়েছে। সত্যি বলতে কি, আমরা জানি না কীভাবে এসব দমন করা যায়। আমরা যেটা করি সেটা হলো পুলিশ দিয়ে সরাসরি অপরাধ দমন। কিন্তু অপরাধের সূত্রপাত যেখানে হয়, চিন্তার ধরনের মধ্যে, সেটার জন্য কী দরকার আমি জানি না। অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, এক্ষেত্রে শিক্ষামূলক কার্যক্রম হাতে নিতে হয়। তার মানে অপরাধীকে বই পড়ানো নয়। আমাদের প্রধান সমস্যা, বড় বড় অপরাধের বিচার হয়নি। সেটা কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় আমরা শুনেছি। সে ব্যাপারে যেহেতু আমাদের একটি প্রশিক্ষণ হয়েছে চুপ করে থাকার। কারণ অপরাধী হিসেবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, তারা যদি আমার চেয়ে “বড়লোক” হয়, তাহলে আমাদের সাংবাদিক এমনকি পুলিশ পর্যন্ত নীরবতা পালন করে। আমাদের চুপ করে থাকার প্রশিক্ষণ হয়েছে। আলোচনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাম্মানিক সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী মেঘনা গুহঠাকুরতা বলেন, ‘আমাদের যে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা আছে, জীবনাচরণের যে ধারাবাহিকতা আছে, সেই জায়গা থেকে নারীর প্রতি সহিংসতা আমরা দূর করতে পারিনি। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রীর ব্যাপারে দেখেছি, সহিংসতার ব্যাপ্তি ঘটছে। হয়রানির সঙ্গে হিংস্রতাও আসছে, সেটা আমার কাছে বিশেষভাবে লক্ষণীয় মনে হচ্ছে।’ সময়ের সঙ্গে সহিংসতার ধরন বদলাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা একটি সিস্টেমিক ভায়োলেন্স। এটি আমাদের সমাজ কাঠামোর মধ্যে জড়িত। আমরা দেখেছি একেক সময় একেক রকমভাবে নারীর প্রতি সহিংসতামূলক আচরণ করা হয়েছে। একসময় আমরা দেখেছি, অ্যাসিড নিক্ষেপ ছিল প্রধান সহিংসতা।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘যৌন হয়রানি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, গায়ে হাত না লাগিয়েও হতে পারে। আমাদের হাইকোর্টের নির্দেশনা আছে, সেটা জানলে আমরা ব্যাপ্তি বুঝতে পারি। ফেনীর এই ঘটনার মতো আরেকটি নরসিংদীর ঘটনা দেখছি। হয়রানির ঘটনাগুলো প্রকট রূপ ধারণ করছে। সেটা আমার কাছে ভয়াবহ লাগছে।’ বেসরকারি সংস্থা আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট উই ক্যানের প্রধান সমন্বয়ক জিনাত আরা হক বলেছেন, ‘যখন কেউ সন্ত্রাস করে তখন তার পরিচয় সন্ত্রাসী। সন্ত্রাস বা ক্ষমতাচর্চার জন্য একটা “টুলস” লাগে। কোনও একটা কিছু ব্যবহার করেই তো সে ক্ষমতা চর্চা করে, সে সন্ত্রাস করে, নিপীড়ন করে। তখন সে ব্যবহার করে ক্ষমতাকাঠামোতে তার পজিশন। সে ব্যবহার করে ধর্ম থেকে পাওয়া তার গ্রহণযোগ্যতা, সমাজ থেকে পাওয়া তার কদর। এগুলো ব্যবহার করেই সে সন্ত্রাসটা করে। সেই সন্ত্রাসটা আরও জায়েজ করা হয় যখন বিচার হয় না।’ বিচার না পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন কোথাও বিচার পাই না তখন আমরা বলি– “ঠিক আছে! আমরা বিচার পাবো বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে।” কিন্তু সেখানে গিয়েও আমরা বিচার পাই না। বিচার ব্যবস্থা নিয়ে অনেক কথা হয়। এটি তো একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপার নয়। এটি সামগ্রিক ব্যাপার। যেখানে কাজ করবেন পুলিশ থেকে শুরু করে উকিল, বিচারক।’ [caption id="attachment_23733" align="alignleft" width="620"] সম-সাময়িক বিষয়ের উপর আয়োজিত বাংলা ট্রিবিউন-এর গোলটেবিল বৈঠক [/caption] এ প্রসঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. সৈয়দ শাহ এমরান বলেন, ‘আমাদের নির্ধারণ করা দরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধ কেমন হবে? মূল্যবোধটা শুধু শিক্ষার্থীরা শিখবে নাকি শিক্ষকদেরও শেখার প্রয়োজন আছে।’ এ সময় ফেনীতে মাদ্রাসাছাত্রীর ওপর সংঘটিত সহিংসতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যেখানে মানবতা ভূলুণ্ঠিত,সেখানে ডিফেন্ড করার প্রশ্নই আসে না। যেখানে কোনও বিবেক, কোনও ধর্ম কিংবা কোনও ধরনের ব্যাখ্যা, কোনও আইন যদি কাজ করে তাহলে ভিকটিমের পক্ষেই কাজ করবে। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রীর সঙ্গে যা হয়েছে, সেটি ভয়াবহ সহিংসতা। এখানে মানবতা মেয়েটির পক্ষেই থাকবে, তার পক্ষেই তো আমরা লড়বো। সুতরাং এখানে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজুল্লাহ কে, তিনি কোথায় পড়েছেন, কোথায় শিক্ষকতা করেছেন, কোথায় কাজ করেছেন সেসব বিষয় মুখ্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবাই জানি, যে সন্ত্রাসী তার কোনও ধর্ম নেই। তার কোনও ভালো কর্মক্ষেত্র হতে পারে না। আমরা জানি, জাহেলিয়া যুগের কথা। তখন কি শিক্ষিত লোক ছিল না? অনেক ছিল। তারপরও অন্ধকার যুগ কেন? তখনও মেয়েশিশুদের জীবন্ত কবর দেওয়া হতো।’ পুলিশ সদর দফতরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ সর্বনিম্ন সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্তদের আইনের আওতায় নেওয়া হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশ মামলা রুজু হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত করা শুরু করেছে।’ সম্প্রতি ফেনীতে মাদ্রাসাছাত্রীর ওপর সহিংসতার ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রীকে আগুন দিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় পুলিশই কিন্তু সবার আগে তার আগুন নিভিয়েছে। মেয়েটি যখন সিঁড়ি দিয়ে চিৎকার করতে করতে নেমে আসছিল, তখন পুলিশ সদস্যরাই দৌড়ে গিয়ে হাতের কাছ থেকে একটি পাপোশ নিয়ে তার গায়ে জড়িয়ে আগুন নিভিয়েছে। পুলিশই কিন্তু তাকে সর্বনিম্ন সময়ে হাসপাতালে নিয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজকে (মঙ্গলবার) নরসিংদীর ঘটনাতেও কিন্তু সর্বনিম্ন সময়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ইতোমধ্যে দুজনকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া ভিকটিমদের পাশে ঢাকায় সার্বক্ষণিকভাবে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন। তারা ভিকটিমের চিকিৎসা থেকে শুরু করে অন্য বিষয়গুলো সমন্বয় করছেন। এই বিষয়গুলো তদারকি করার জন্য আমাদের একটি টিম কাজ করছে।’ [caption id="attachment_23732" align="alignleft" width="620"] উদিসা ইসলাম[/caption] বিচারহীনতার প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের প্রধান প্রতিবেদক উদিসা ইসলাম বলেন, ‘একদিকে যেমন নারীর প্রতি সহিংসতার বিচার হচ্ছে না, আবার এ কারণে আমরা অপরাধের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচারও করতে পারছি না। দৃষ্টান্ত হিসেবে সর্বসাধারণের সামনে বিষয়টি তুলে ধরতে পারছি না যে, এ ধরনের ঘটনা ঘটলে এই বিচার হচ্ছে। যার ফলে অপরাধীদের সাহস বেড়ে যাচ্ছে। এটি এই পর্যায়ে এসে দাঁড়াচ্ছে যে, নারীকে দমানোর জন্য আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। এর মধ্যে এক ধরনের হিংস্র উল্লাসও কাজ করছে। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ জায়গায় যাচ্ছে বিচারহীনতার কারণে। যতোদিন পর্যন্ত আমরা এই বিচারগুলো আমরা না করতে পারবো এবং গণমাধ্যম সেগুলো সঠিকভাবে প্রচার না করবে ততোদিন পর্যন্ত এই সমস্যাগুলো কমে আসার সম্ভাবনা খুব কম।’ [caption id="attachment_23731" align="alignleft" width="620"] মুন্নী সাহা[/caption] রাজধানীর পান্থপথে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এ বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করেছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে লাইভ দেখা গেছে এ আয়োজন। ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) সহযোগিতায় বৈঠকিটি আয়োজিত হয়। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

পন‍্যের বা পানির দাম বেশী নিলে ফর্মে কমপ্লেইন করুন

আপনি কি একজন সচেতন নাগরিক? এই ফর্মটি সংগ্রহ করে রাখুন! পন‍্যের বা পানির দাম বেশী নিলে ফর্মে প্রদত্ত ই-মেইল আইডি ব‍্যবহার করুন! জরিমানার ২৫ %আপনি নিতে পারবেন! -----জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতিঃ ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর ধারা ৭৬ (১) অনুযায়ী, “যে কোন ব্যক্তি, যিনি, সাধারণভাবে একজন ভোক্তা বা ভোক্তা হইতে পারেন, এই অধ্যাদেশের অধীন ভোক্তা-অধিকার বিরোধী কার্য সম্পর্কে মহাপরিচালক বা এতদুদ্দেশ্যে মহাপরিচালকের নিকট ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অবহিত করিয়া লিখিত অভিযোগ দায়ের করিতে পারিবেন।” যেখানে অভিযোগ দায়ের করা যাবেঃ মহাপরিচালক, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ১ কারওয়ান বাজার (টিসিবি ভবন-৮ম তলা), ঢাকা, ফোন: +৮৮০২ ৮১৮৯৪২৫ জাতীয় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্র, টিসিবি ভবন- ৯ম তলা, ১ কারওয়ান বাজার ঢাকা, ফোন: ০১৭৭৭ ৭৫৩৬৬৮, ই-মেইল: nccc@dncrp.gov.bd উপ পরিচালক, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, টিসিবি ভবন, বন্দরটিলা, চট্টগ্রাম, ফোন: ০৩১-৭৪১২১২ উপ পরিচালক, রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, শ্রীরামপুর, রাজশাহী, ফোন: +৮৮০৭ ২১৭৭২৭৭৪ উপ পরিচালক, খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, টিসিবি ভবন, শিববাড়ী মোড়, খুলনা, ফোন: ০৪১-৭২২৩১১ উপ পরিচালক, বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, মহিলা ক্লাব ভবন, বরিশাল, ফোন: +৮৮০৪ ৩১৬২০৪২ উপ পরিচালক, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, সিলেট ফোন: ০৮২১-৮৪০৮৮৪ উপ পরিচালক, রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিউ ইঞ্জিনিয়ার পাড়া, রংপুর, ফোন: ০৫২১-৫৫৬৯১ প্রত্যেক জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। যেভাবে অভিযোগ দায়ের করতে হবে। দায়েরকৃত অভিযোগ অবশ্যই লিখিত হতে হবে। ফ্যাক্স, ই-মেইল, ওয়েব সাইট, ইত্যাদি ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে; বা অন্য কোন উপায়ে; অভিযোগের সাথে পণ্য বা সেবা ক্রয়ের রশিদ সংযুক্ত করতে হবে। অভিযোগকারী তাঁর পূর্ণাঙ্গ নাম, পিতা ও মাতার নাম, ঠিকানা, ফোন, ফ্যাক্স ও ই-মেইল নম্বর (যদি থাকে) এবং পেশা উল্লেখ করবেন। Link for pdf: http://dncrp.portal.gov.bd/sites/default/files/files/dncrp.portal.gov.bd/page/c9431d5f_3a18_467c_bf5c_bf889b42205d/Complain%20%20Form.pdf

গরিব মানুষের বসবাসে বিশ্বে পঞ্চম বাংলাদেশ

গরিব মানুষের বসবাসে বিশ্বে পঞ্চম বাংলাদেশ

|জাহাঙ্গীর শাহ, ঢাকা|

গরিব মানুষের বসবাসে বিশ্বে পঞ্চম বাংলাদেশ • বেশি হতদরিদ্র আছে—এমন ১০ দেশের তালিকা বিশ্বব্যাংকের • যাঁদের দৈনিক আয় ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম, তাঁরা হতদরিদ্র • এটা আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা হিসেবে বিবেচিত • বাংলাদেশে হতদরিদ্রের সংখ্যা ২ কোটি ৪১ লাখ • নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ বিবেচনায় এই সংখ্যা ৮ কোটি ৬২ লাখ • বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় ঢুকে গেছে

অতিধনী বৃদ্ধির হারের দিকে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম। ধনী বৃদ্ধির হারে তৃতীয়। দ্রুত মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি বা ধনী হওয়ার যাত্রায় বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও অতিগরিব মানুষের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। অতিগরিব মানুষের সংখ্যা বেশি এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। বাংলাদেশে ২ কোটি ৪১ লাখ হতদরিদ্র মানুষ আছে।

বিশ্বব্যাংক ‘পভার্টি অ্যান্ড শেয়ার প্রসপারিটি বা দারিদ্র্য ও সমৃদ্ধির অংশীদার-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি হতদরিদ্র মানুষ আছে, এমন ১০টি দেশের তালিকা তৈরি করেছে। ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুসারে (পিপিপি) যাঁদের দৈনিক আয় ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম, তাঁদের হতদরিদ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটা আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বব্যাংক ২০১৬ সালের মূল্যমান ধরে পিপিপি ডলার হিসাবে করেছে। বাংলাদেশে প্রতি পিপিপি ডলারের মান ধরা হয়েছে সাড়ে ৩২ টাকা। সেই হিসাবে বাংলাদেশের ২ কোটি ৪১ লাখ লোক দৈনিক ৬১ টাকা ৬০ পয়সাও আয় করতে পারেন না। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় ঢুকে গেছে। যদিও বাংলাদেশ এখনো নিম্ন আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাংকের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। এ কারণে বিশ্বব্যাংক নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অতিগরিব মানুষের একটি আলাদা হিসাবও দিয়েছে। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে হলে দৈনিক কমপক্ষে ৩ দশমিক ২ পিপিপি ডলার আয় করতে হবে। বিশ্বব্যাংক বলছে, এভাবে হিসাব করলে বাংলাদেশে অতিগরিব মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৮ কোটি ৬২ লাখ। আর দারিদ্র্যের হার হবে ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মানে হলো, টেকসইভাবে গরিবি হটাতে বাংলাদেশের প্রায় ৬ কোটি ২১ লাখ মানুষকে দ্রুত দৈনিক ৩ দশমিক ২ ডলার আয়ের সংস্থান করতে হবে। এই বিশাল জনগোষ্ঠী এখন ঝুঁকিতে আছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে সবচেয়ে বেশি ১৭ কোটি ৫৭ লাখ হতদরিদ্র আছে। ভারত ছাড়া বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হতদরিদ্র মানুষ বসবাস করে নাইজেরিয়া, কঙ্গো ও ইথিওপিয়ায়। তালিকায় থাকা শীর্ষ ১০–এর অন্য ৫টি দেশ হলো তানজানিয়া, মাদাগাস্কার, কেনিয়া, মোজাম্বিক ও ইন্দোনেশিয়া। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আগে দারিদ্র্য কমানোর পূর্বশর্ত ছিল প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দারিদ্র্য কমাতে হবে। দেশে ৬-৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও হয়েছে। এত প্রবৃদ্ধি অর্জনের পর দেখা যাচ্ছে প্রবৃদ্ধি যেমন বেড়েছে, বৈষম্যও বেড়েছে। অন্যদিকে দারিদ্র্য হ্রাসের গতিও কমেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি দিয়ে দারিদ্র্য নির্মূল করা যাবে, এটা ঠিক নয়। তাঁর মতে, প্রবৃদ্ধিতে গরিব মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। গরিব মানুষের সম্পদ হলো পরিশ্রম। এই শ্রমের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে গরিব মানুষের মজুরি বাড়াতে হবে। আবার কৃষির বাইরের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের জন্য গরিব মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর নজর দিতে হবে। জাহিদ হোসেন আরও বলেন, যেহেতু বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে গেছে। তাই ৩ দশমিক ২ ডলারের দৈনিক আয়ের হিসাবও মাথায় রাখতে হবে। যে বিশাল জনগোষ্ঠী দুই হিসাবের মধ্যবর্তী স্থানে আছে, তাদের দ্রুত আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে হবে। আয়ের বৈষম্য পরিমাপের পদ্ধতি হচ্ছে জিনি (বা গিনি) সহগ। বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০১৬-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মান এখন ০.৪৮৩। জিনি সহগ ০.৫ পেরিয়ে গেলে তাকে উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ বলা হয়। বাংলাদেশ এর খুব কাছে পৌঁছে গেছে। গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্স বলেছে, অতিধনী বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ প্রথম। গত বুধবার একই প্রতিষ্ঠান আরেকটি প্রতিবেদনে বলেছে, ধনী বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ তৃতীয়। আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশের ধনী মানুষের সংখ্যা ১১ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বাড়বে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিজি) অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে শূন্যের কোঠায় দারিদ্র্য নামিয়ে আনা। এই সময়সীমার দুই-তিন বছর আগেই এই লক্ষ্য অর্জন করতে চায় বাংলাদেশ। অর্থাৎ আগামী ১০ বছরে হতদরিদ্রের হার ৩ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, এখন বাংলাদেশে অতিদারিদ্র্য হার ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০৩০ সালে যখন অতিদারিদ্র্য হার ৩ শতাংশে মধ্যে নেমে আসবে, তখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটিতে পৌঁছাবে। এর মানে, তখনো বাংলাদেশে প্রায় ৬০ লাখ লোক অতিগরিব থেকে যাবে। এই বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য নির্মূলকে প্রাধান্য দিয়ে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে শোভন কাজের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে গুণগত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করা হবে। এ ছাড়া এখন যে অঞ্চলভিত্তিক দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য আছে, তাতেও বিশেষ নজর দেওয়া হবে। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের হিসেবে দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠার জন্য আয় বৃদ্ধির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শামসুল আলম বলেন, বিষয়টি বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে ২০২১ সালের মধ্যে অর্থনীতির সক্ষমতাও বাড়বে। আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনও আসবে।

কোন দেশে কত গরিব

বিশ্বব্যাংকের তালিকা অনুসারে, শীর্ষ স্থানে থাকা ভারতে অতিগরিব মানুষের সংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা নাইজেরিয়ায় ৮ কোটি ২৬ লাখ, তৃতীয় স্থানে থাকা কঙ্গোতে ৫ কোটি ৩২ লাখ ও চতুর্থ স্থানে থাকা ইথিওপিয়ায় ২ কোটি ৬৭ লাখ অতিগরিবের বসবাস। এ ছাড়া ষষ্ঠ থেকে দশম স্থানে থাকা তানজানিয়ায় ২ কোটি ৭ লাখ, কেনিয়ায় ১ কোটি ৭৪ লাখ, মাদাগাস্কারে ১ কোটি ৭৩ লাখ, মোজাম্বিকে ১ কোটি ৭১ লাখ ও ইন্দোনেশিয়ায় ১ কোটি ৫১ লাখ অতিগরিব মানুষের বসবাস। সব মিলিয়ে সারা বিশ্বে এখন ৭৩ কোটি ৬০ লাখ হতদরিদ্র মানুষ আছে। ওই ১০টি দেশেই বাস করে ৪৫ কোটি অতিদরিদ্র মানুষ। এই সংস্থাটি আরও বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে এমন গরিব মানুষের সংখ্যা কমে দাঁড়াবে ৪৭ কোটি ৯০ লাখে।

অতিধনীর বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথমঃ ধনী মানুষের সংখ্যা...

ওয়েলথ-এক্সের প্রতিবেদন

ধনী বৃদ্ধির হারে বিশ্বে তৃতীয় বাংলাদেশ

রাজীব আহমেদ, ঢাকা

অতিধনীর বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বে প্রথম। এখন দেখা যাচ্ছে, ধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক থেকেও বাংলাদেশ এগিয়ে, বিশ্বে তৃতীয়। দুটি তথ্যই যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্সের। সংস্থাটি বলছে, আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশে ধনী মানুষের সংখ্যা ১১ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বাড়বে।



১০ থেকে ৩০ লাখ মার্কিন ডলারের সম্পদের মালিককে (সাড়ে ৮ থেকে ২৫ কোটি টাকা) এ তালিকায় রেখেছে ওয়েলথ-এক্স। প্রতিষ্ঠানটি তাদের উচ্চ সম্পদশালী বা হাই নেট ওর্থ (এইচএনডব্লিউ) বলে অভিহিত করেছে। গত বুধবার ‘গ্লোবাল এইচএনডব্লিউ অ্যানালাইসিস: দ্য হাই নেট ওর্থ হ্যান্ডবুক’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। আর অতিধনী বৃদ্ধির প্রতিবেদনটি প্রকাশ পেয়েছিল গত বছরের সেপ্টেম্বরে।

নতুন প্রতিবেদনে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ধনী বৃদ্ধির হারে শীর্ষে থাকবে, এমন ১০টি দেশের নাম উল্লেখ করা হয়। এ তালিকায় শীর্ষে নাইজেরিয়া। এর পরের অবস্থানে মিসর, যেখানে ধনী বাড়বে সাড়ে ১২ শতাংশ হারে। বাংলাদেশের পরে আছে যথাক্রমে ভিয়েতনাম, পোল্যান্ড, চীন, কেনিয়া, ভারত, ফিলিপাইন ও ইউক্রেন। জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ হলেও নাইজেরিয়া দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে পরিচিত।

২০১৮ সালে সম্পদশালী বৃদ্ধির হার ও ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রক্ষেপণ ধরে এ হিসাব করেছে ওয়েলথ-এক্স। সেপ্টেম্বর মাসের প্রতিবেদনে বলা ছিল, ৩ কোটি ডলার বা আড়াই শ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিকদের সংখ্যা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি হারে বাড়ছে। ওয়েলথ-এক্সের হিসাবে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে অতিধনীর সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৭ শতাংশ হারে। এ হার যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ মোট ৭৫টি বড় অর্থনীতির দেশের চেয়ে বেশি।

তবে ওয়েলথ-এক্সের প্রতিবেদনে দেশে ধনী ও অতিধনীর সংখ্যা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধির চিত্র উঠে এলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদনে দরিদ্র মানুষের আয়ে বড় ধরনের বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার বিপরীত চিত্রও রয়েছে। আবার অনেকে মনে করছেন, এই ধনীদের বড় অংশের উত্থান ঘটছে স্বজনতোষী পুঁজিবাদ বা ক্রোনি ক্যাপিটালিজম, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারি কাজ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে।

বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০১৬–এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে দেশে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের আয় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৯৪১ টাকায়। বিপরীতে একই সময় সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে ৫৯ শতাংশ। তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৭৩৩ টাকায়, যা ২০১০ সালে ১ হাজার ৭৯১ টাকা ছিল।

জানতে চাইলে বেসরকারি সংস্থা পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে একটি টেকসই অর্থনীতির দিকে যাচ্ছে, এটা সত্য। কিন্তু এটার আলোচনা বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার উদ্বেগকে ঢেকে দিচ্ছে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা আরও বলেন, এখন গবেষণা হওয়া দরকার, এই ধনীদের উত্থান কি অর্থনীতিতে অবদান রাখার মাধ্যমে হচ্ছে, নাকি অনৈতিক উপায়ে হচ্ছে। কারণ, ব্যাংকসহ বিভিন্ন খাতে অনিয়মের কারণে অর্থনৈতিকভাবে ধনী হওয়ার ধারণাটিই সামনে চলে আসে।

আওয়ামী লীগ সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে দুর্নীতি দমনের দিকে জোর দিচ্ছে। হোসেন জিল্লুর রহমানও মনে করেন, সরকারের এই মেয়াদে উন্নয়ন কৌশল পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

অবশ্য অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মনে করেন, উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে দেশে বৈষম্য বেড়ে যায়। অর্থনীতি একটি টেকসই অবস্থানে যাওয়ার পর এই বৈষম্য কমে যায়। পাশাপাশি স্বজনতোষী পুঁজিবাদ উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ চিত্র। অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন, উন্নয়নের প্রথম দিকে বৈষম্য বাড়তেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। সে ক্ষেত্রে বড় উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া।

দেশে আয়বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সরকারও খানিকটা উদ্বিগ্ন বলে উল্লেখ করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য শামসুল আলম। তিনি বলেন, ‘এটা ভালো দিক যে সরকার এটি অনুধাবন করেন। এ জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে জোর দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া আমরা অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত করেছি, যেখানে বৈষম্য কমাতে ব্যাপক জোর দেওয়া হবে।’

শামসুল আলম আরও বলেন, বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বিশ্বের মধ্যে বেশি। এই প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কারণ সম্পদ তৈরি হচ্ছে। এ সময়ে কোটিপতির সংখ্যা বাড়বেই।

অতিধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির হারেও প্রথম হয়েছিল বাংলাদেশ। এর বিপরীতে অবশ্য দেশে ধনী-গরিবের আয়ের বৈষম্যও বাড়ছে।

উন্নয়নের শুরুর দিকে বৈষম্য বৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী কি না, তা নিয়ে অবশ্য অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিতর্ক আছে। যেমন, গত ১৫ ডিসেম্বর বেসরকারি সংস্থা পিপিআরসি ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছিলেন, উন্নয়ন শুরুর দিকে বৈষম্য বাড়তেই হবে, এটা অবশ্যম্ভাবী নয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া। তাঁর মতে, ‘দুর্নীতি ও অন্যায়–অনিয়মের বিরুদ্ধে যদি আমরা কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ তৈরি করতে না পারি, এটা যদি ক্রমাগত বিস্তৃতি লাভ করে, তাহলে এর আর্থিক বোঝা ভবিষ্যতে অর্থনীতি নিতে পারবে না।’

সংখ্যায় শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র

ওয়েলথ-এক্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বিশ্বে ধনীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ২৪ লাখে, যা আগের বছরের চেয়ে ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এশিয়ায় গড় প্রবৃদ্ধি আরও কম, মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। যদিও আলোচ্য সময়ে চলতি মূল্যে এশিয়ার জিডিপি ৮ শতাংশ বেড়েছে। এশিয়ায় ১০ থেকে ৩০ লাখ ডলারের মালিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫ লাখ ৭৩ হাজার।

ধনীর সংখ্যার দিক দিয়ে শীর্ষ পাঁচে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র (৮৬ লাখ ৭৭ হাজার), চীন (১৮ লাখ ৮০ হাজার), জাপান (১৬ লাখ ১৯ হাজার), জার্মানি (১০ লাখ ২৩ হাজার) ও যুক্তরাজ্য ৮ লাখ ৯৪ হাজার। এরপর রয়েছে ফ্রান্স, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ইতালি।

গবেষণা যেভাবে

ওয়েলথ–এক্স মার্কিন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি ইনসাইট ভেঞ্চার পার্টনারসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। তাদের দাবি, সম্পদশালীদের সংখ্যা বের করতে তারা সম্পদ ও বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ বা ওয়েলথ অ্যান্ড ইনভেস্টেবল অ্যাসেটস মডেল নামের একটি কৌশল ব্যবহার করেছে। সংস্থাটি বলছে, তাদের কাছে ৫ লাখ ৪০ হাজার উচ্চধনীর তথ্য রয়েছে। সেটা তারা প্রতিবেদনে ব্যবহার করেছে।

অ্যাকশনএইডের গবেষণা দেশে পারিবারিক সহিংসতার শিকার ৬৬% নারী

দেশে পারিবারিক সহিংসতার শিকার ৬৬ শতাংশ নারী, অর্থাৎ প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন এ সহিংতার শিকার। গণমাধ্যমে বাড়ির বাইরের সহিংসতা ও যৌন সহিংসতাকে বেশি তুলে ধরা হলেও প্রকৃতপক্ষে নারীরা ঘরেই বেশি অনিরাপদ। এছাড়া শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনার বিষয়ে অনেকেই জানে না। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশনএইডের পৃথক দুটি গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের হলরুমে গবেষণা প্রবন্ধ দুটি উপস্থাপন করা হয়।

বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার ওপর দৃষ্টিপাত:

প্রবণতা এবং সমাধান শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালনা করেন অ্যাকশনএইডের কনসালট্যান্ট আহমেদ ইব্রাহিম। দেশের ২০টি জেলায় সংঘটিত সহিংসতার তথ্য, পুলিশের কাছে দেয়া অভিযোগ, বিচার বিভাগীয় কার্যক্রম, জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরামের (জেএনএনপিএফ) তথ্য এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বিষয়ে মিডিয়া প্রতিবেদন থেকে নেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এ গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, প্রচলিত ধারণা এবং পিতৃতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রহণযোগ্য বিশ্বাস হচ্ছে, ‘নারীরা ঘরেই বেশি নিরাপদ’। কিন্তু প্রকৃত সত্য নারীদের প্রতি বেশির ভাগ সহিংসতা বাড়িতে সংঘটিত হয়। গবেষণায় বলা হয়, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা সম্পর্কিত মামলাগুলোর প্রতি পাঁচটির মধ্যে চারটিই আদালতে উত্থাপিত হতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। তারপর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সহিংসতায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নিজেদের পক্ষে বিচার পায়, ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ ভুক্তভোগীর অভিযোগ আদালতে শুনানির পর্যায়ে যায় না বা গেলেও বাতিল হয়ে যায়। আদালতের মামলা খারিজ করে দেয়া বা আসামিকে খালাস দেয়ার সম্ভাবনা ৩২ শতাংশ। শুধু ১০ দশমিক ৭ শতাংশ মামলা থাকে পারিবারিক বিরোধ-সংক্রান্ত। যদিও বেশির ভাগ অভিযোগ পারিবারিক সহিংসতা সম্পর্কিত। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ৭৫ শতাংশ প্রতিবেদনে ধর্ষণ বা গণধর্ষণ সম্পর্কিত। একই অনুষ্ঠানে ‘কর্ম এবং শিক্ষাক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা ২০০৯-এর বাস্তবায়ন’ শীর্ষক পৃথক আরেকটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। গবেষণাটি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোতে ২০০৯ সালের গাইডলাইনের প্রয়োগ একবারেই নেই বললে চলে। যেখানে আছে, সেখানে সীমিতভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে গাইডলাইন প্রয়োগের জন্য কমিটি দেখা গেলেও সেখানে শিক্ষার্থীর তুলনায় অভিযোগের সংখ্যা একেবারেই কম। গবেষণায় বলা হয়েছে, কর্ম এবং শিক্ষাক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন একটি তাত্পর্যপূর্ণ রায় বা নির্দেশনা ঘোষণা করেন। তবে এ নির্দেশনা প্রণয়নের দীর্ঘ নয় বছর পরও কর্ম এবং শিক্ষাক্ষেত্রে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা বা কৌশল হাতে নিতে দেখা যায়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের গবেষণায় বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী যৌন হয়রানি-সংক্রান্ত কোনো কমিটির কথা জানে না। ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা সম্পর্কে জানে না। মাত্র ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার কথা নামমাত্র শুনেছে। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের নির্দেশনার বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ২০ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ কিছুই জানে না। অন্যদিকে ১৪ শতাংশ উত্তরদাতা নির্দেশনা সম্পর্কে জানলেও এ বিষয়ে কোনো পরিষ্কার ধারণা নেই। অ্যাকশনএইডের বাংলাদেশের ডেপুটি ডিরেক্টর ফারিয়া চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল করিম, দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, বাংলা ট্রিবিউনের হেড অব নিউজ হারুন উর রশীদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সামিয়া হক, ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টারের উপকমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন প্রমুখ। প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক সুবর্ণচরের ধর্ষণের ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে সুবর্ণচরের ঘটনায় যে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে, গণমাধ্যমে তা সঠিকভাবে আসেনি। সুবর্ণচরে ধর্ষণের ঘটনায় দোষী যে-ই হোক না কেন, তাকে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে— এ কথাটি আমরা মিডিয়ার কাছে বলেছিলাম। সবার বোঝার স্বার্থে আমরা পুরো প্রতিবেদন দিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সুবর্ণচরের তদন্ত প্রতিবেদন গণমাধ্যমে অন্যভাবে এসেছে। মেসেজটাকে যেভাবে নেয়া হয়েছে, সেটা কিন্তু আমাদের মেসেজ ছিল না। তিনি আরো বলেন, একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কিনা, এটাই আমাদের কাছে মুখ্য বিষয় ছিল। আমরা এটাই তদন্ত করি। নির্বাচন-সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ এসেছে, আমি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে সেগুলো পাঠিয়ে দিতে বলেছি। আমরা তো সেখানে হাত দিতে পারব না। নির্বাচন-সংক্রান্ত ব্যাপারে কে কাকে ভোট দিয়েছে, কে কোন দলের লোক, সেটা তারা দেখবে। সেটা তো আমাদের তদন্ত রিপোর্টে আসতে পারে না এবং আমরা এ ধরনের কোনো কথাও বলিনি। আমরা বলেছিলাম, ওই নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তাকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করা হয়েছে। সুতরাং তার সঙ্গে যারাই এ রকম করেছে, সে যে-ই হোক না কেন, তাকে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

ক্রিসেন্ট গ্রুপের ১ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা পাচার : জনতা ব্যাংক...

ক্রিসেন্ট গ্রুপের ১ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা পাচার : জনতা ব্যাংক ও ক্রিসেন্টের ১৭ জনের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে দুদক

জেসমিন মলি |

রফতানি বিলের মাধ্যমে জনতা ব্যাংক থেকে ক্রিসেন্ট গ্রুপ কর্তৃক ১ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা পাচার ও আত্মসাতের ঘটনায় ব্যাংকটির ১১ কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জনের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

অনুসন্ধান সূত্র জানিয়েছে, জনতা ব্যাংকের ১১ কর্মকর্তা ও ক্রিসেন্ট গ্রুপের ছয়জনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের সুপারিশ করে শিগগিরই একটি প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেয়া হবে। কমিশনের অনুমোদন পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে।

দুদকের প্রাথমিক তদন্তে জনতা ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে তারা হলেন নোট প্রস্তুতকারী এক্সিকিউটিভ অফিসার (এসও) মো. আবদুল্লাহ আল মামুন, পরীক্ষণকারী সিনিয়র অফিসার মো. মনিরুজ্জামান, সুপারিশকারী সিনিয়র অফিসার মো. সাইদুজ্জামান, প্রিন্সিপাল অফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমীন, সিনিয়র অফিসার মো. মাগরেব আলী, সিনিয়র অফিসার মো. খায়রুল আমিন, এজিএম মো. আতাউর রহমান সরকার, অনুমোদনকারী ডিজিএম (বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের ডিএমডি) মো. রেজাউল করিম, ডিজিএম ও শাখাপ্রধান মুহাম্মদ ইকবাল, ডিজিএম ও শাখাপ্রধান একেএম আসুদুজ্জামান এবং ডিজিএম ও এফটিডি কাজী রইস উদ্দিন আহমেদ।

অন্যদিকে গ্রাহকদের মধ্যে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে তারা হলেন ক্রিসেন্ট লেদার প্রডাক্টের চেয়ারম্যান এমএ কাদের, একই প্রতিষ্ঠানের দুই পরিচালক সুলতানা বেগম ও রেজিয়া বেগম, লেসকো লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. জাকারিয়া, রিমেক্স ফুটওয়্যারের চেয়ারম্যান মো. আবদুল আজিজ, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিটুন জাহান মীরা।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ক্রিসেন্ট গ্রুপ কর্তৃক জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে জনতা ব্যাংকের টাকা পাচার এবং আত্মসাতের ঘটনায় জনতা ব্যাংক কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত ছিলেন। তাই এখানে দুদকের আওতাভুক্ত সম্পৃক্ত ধারার অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। জনতা ব্যাংক কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এখানে সম্পৃক্ত ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং পরবর্তী পর্যায়ে মানি লন্ডারিং অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তাই দুদক ছাড়া অন্য সংস্থার এ বিষয়ে মামলা করার আইনগত ভিত্তি নেই। বর্তমানে দুদকের অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে। দুদক দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৭১, ১০৯ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪ (২), (৩) ধারায় শিগগিরই মামলা দায়ের করবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, একটি স্বাধীন সংস্থা হিসেবে যেকোনো অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদক আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। আমরা দুদকের যেকোনো উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। ব্যাংকের পক্ষ থেকে ক্রিসেন্ট গ্রুপের অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্তও চলমান। ক্রিসেন্ট গ্রুপের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য এরই মধ্যে দুই দফায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করার জন্য আইনজীবীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, জনতা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক রেজাউল করিম ও অন্যান্যের বিরুদ্ধে ব্যাংকের নিয়ম-নীতি লঙ্ঘন, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে নতুন ৫৭০টি রফতানি বিল কেনার নামে ক্রিসেন্ট লেদারের চেয়ারম্যানের সহায়তায় ৯৯৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন স্মারকে অনুসন্ধান করার জন্য সহকারী পরিচালক মো. গুলশান আনোয়ারকে প্রধান করে দুই সদস্যের একটি দল গঠন করা হয়। এখন পর্যন্ত দুদকের অনুসন্ধানে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ৬৫৩টি রফতানি বিলের মাধ্যমে পণ্য বিদেশে সরবরাহ করে সে অর্থ বাংলাদেশে প্রত্যাবাসন না করে ১ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে দুদকের পরিচালক ও তদারককারী কর্মকর্তা সৈয়দ ইকবাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, অভিযোগটির অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এ কারণে বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই। তবে দুদকের অনুসন্ধানে অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অনুসন্ধানকালে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাপ্ত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তা হচ্ছে রফতানি এলসি ইস্যুকারী ব্যাংক প্রথম শ্রেণী/আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এবং আর্থিক সংগতি বিশ্লেষণে গ্রহণযোগ্য কিনা তা ব্যাংকার্স অ্যালামনাক বা অন্য কোনোভাবে শাখা কর্তৃক যাচাই করা হয়নি।

বৈদেশিক ক্রেতার সন্তোষজনক ক্রেডিট রিপোর্ট গ্রহণপূর্বক ক্রেতার স্ট্যাটাস বিশ্লেষণ, মূল্য পরিশোধের সক্ষমতা সম্পর্কে বৈদেশিক ক্রেতার ব্যাংকের মতামত সংগ্রহপূর্বক তা যাচাই না করে ব্যাংকগুলোর রফতানি নেগোসিয়েশন/বিল ক্রয় করা হয়েছে। ফরেন ডকুমেন্টারি বিল পারচেজ (এফডিবিপি) ক্রয়ের জন্য গ্রাহকের আবেদনপত্রে গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের স্বাক্ষর যাচাই করেনি ব্যাংক শাখা। শাখায় রক্ষিত শিপিং ডকুমেন্ট প্রেরণের কুরিয়ার রিসিপ্টে ডকুমেন্ট গ্রহণকারীর স্বাক্ষর নেই। বৈদেশিক ব্যাংকে ডকুমেন্ট প্রেরণের প্রুফ অব ডেলিভারি নথিভুক্ত নেই, ফলে ডকুমেন্টগুলো সংশ্লিষ্ট বৈদেশিক ব্যাংকে প্রেরণ করা হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত নয়। ক্রয়াদেশ প্রদানকারী/আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভিন্ন দেশে (যেমন যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত) অবস্থিত হলেও পণ্য রফতানি হচ্ছে হংকং ও চীনের মতো দেশে। এক্ষেত্রে ক্রয়াদেশ প্রদানকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পণ্য গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সমঝোতা/চুক্তি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে শাখা। চুক্তিপত্রের বিপরীতে প্রধান কার্যালয়ের এফডিবিপি লিমিট মঞ্জুরিপত্রে হংকং ও চীনের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান মিউচুয়াল ওয়েল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও ম্যাক্রোভাইল লিমিটেডের গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিল নেগোসিয়েশনের অনুমতি দেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ওই গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠান কিনা এবং চুক্তিপত্রগুলো যথাযথ কিনা তা যাচাই না করেই বিলগুলো ক্রয় করা হয়েছে।

বড় ঋণ কেলেঙ্কারির হোতারা এখনো অধরা

বড় ঋণ কেলেঙ্কারির হোতারা এখনো অধরা

|মোর্শেদ নোমান|

বড় ঋণ কেলেঙ্কারির হোতারা এখনো অধরা অধরাই থেকে যাচ্ছেন দেশের ইতিহাসে বড় কেলেঙ্কারির নেপথ্য নায়কেরা। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রভাব এবং আইনের মারপ্যাঁচে আইনের আওতায় তাঁদের আনা যাচ্ছে না।

ব্যাংক খাতে জালিয়াতির কয়েকটি ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান ও তদন্ত করলেও অদৃশ্য ইশারায় ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন অনেকে। বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংকসহ কয়েকটি বড় জালিয়াতির হোতা হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিরা এখনো দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে ‘ব্যাংকিং সেক্টর ইন বাংলাদেশ: মুভিং ফ্রম ডায়াগনোসিস টু অ্যাকশন’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে বলা হয়, বড় কয়েকটি জালিয়াতির মাধ্যমে গত ১০ বছরে ব্যাংকিং খাতে ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকার কেলেঙ্কারি হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের বড় কয়েকটি ব্যাংক থেকে এ অর্থ লোপাট হয়। সরকারি-বেসরকারি এসব ব্যাংকে যা হয়েছে, তাকে চুরি নয়, ‘ডাকাতি’ ও ‘হরিলুট’ বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কমিটি ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ব্যবসায়ী নামের কিছু লুটেরা মিলেমিশে ভাগ-বাঁটোয়ারার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর অর্থ লুটপাট করেছেন। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনার বিষয়টি জরুরি। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নির্মোহভাবে অনুসন্ধান ও তদন্ত করে তাঁদের বিচার করতে না পারলে এ ধরনের অপরাধ কমবে না।

বেসিক ব্যাংক জালিয়াতির মামলায় ৪০ মাসেও অভিযোগপত্র নেই

বেসিক ব্যাংকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনায় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৫৬টি এবং পরের বছর আরও পাঁচটি মামলা করে দুদক। এসব মামলা করার পর ৪০ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো অভিযোগপত্র দেয়নি সংস্থাটি। মামলায় ব্যাংকার ও ঋণগ্রহীতাদের আসামি করা হলেও ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের কাউকেই আসামি করা হয়নি। বেসিক ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের জড়িত থাকার কথা বলা হলেও মামলায় তাঁদের আসামি করা হয়নি। মামলা হওয়ার পর তদন্ত–পর্যায়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে আবদুল হাই বাচ্চুসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেও অভিযোগপত্র এখনো জমা দেওয়া হয়নি। বেসিক ব্যাংকের ঘটনায় করা মামলাগুলোয় ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা অনেক দিন ধরে কারাগারে। ঋণগ্রহীতা কেউ কেউ ব্যবসায়ী। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁরা জামিনে বেরিয়ে দেশের বাইরে চলে গেছেন। কেউ কেউ গ্রেপ্তার এড়াতে দেশ ছেড়েছেন। যাঁরা এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত বলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তাঁদের সবাই এখন বাইরে আছেন। বেসিক ব্যাংকের তদন্ত সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চাইলে বলেন, শুধু বেসিক ব্যাংক নয়, সব আর্থিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হবেন তাঁরা।

জনতা ব্যাংকে জালিয়াতির হোতারা বাইরে

জনতা ব্যাংকের বড় কেলেঙ্কারি নিয়ে দুদক একের পর এক অনুসন্ধান-তদন্ত চালালেও প্রতিবারই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন হোতারা। দুদক সূত্র জানায়, ২০১২ সালে বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটিকে নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয় গ্রাহকদের মধ্যে। ওই কেলেঙ্কারির ঘটনায় দুদক কিছু ব্যক্তিকে ‘অভিযুক্ত’ করতে পেরেছিল, যদিও তাঁরা পালিয়ে আছেন দেশের বাইরে। কিন্তু অধরাই থেকে যায় ব্যাংকটির তৎকালীন ঋণ প্রদানকারী ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। যখনই ব্যাংকটি ওই জালিয়াতির ঘটনার পর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছিল, তখনই উদ্‌ঘাটিত হয় অ্যাননটেক্স গ্রুপের পাঁচ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি। আলোয় আসে ক্রিসেন্ট ও রিমেক্স ফুটওয়্যারের চার হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি। এসব কেলেঙ্কারির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৮ সাল থেকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জালিয়াতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। ২০১২-১৩ সালে উদ্‌ঘাটিত বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির অনুসন্ধানেও দেখা যায়, ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির সুযোগটি তৈরি করে দেওয়া ২০০৮ সালে। ঘটনা চাউর হওয়ার আগেই লাপাত্তা হয়ে যান বিসমিল্লাহ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা সোলায়মান, পরিচালক আনোয়ার চৌধুরী, নওরীন হাসিবসহ ঋণগ্রহীতারা। ওই কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন জনতা, বেসরকারি যমুনা, প্রিমিয়ার ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের কোনো কোনো কর্মকর্তা। সম্প্রতি উদ্‌ঘাটিত অ্যাননটেক্স গ্রুপ, ক্রিসেন্ট ও রিমেক্স ফুটওয়্যারের ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গেও বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জড়িয়ে পড়ার তথ্য মিলেছে। জনতা ব্যাংকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানপ্রক্রিয়ায় সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুদকের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করে জানান, ব্যাংকটিতে অনেক জালিয়াতির ঘটনাই ঘটেছে, যার দালিলিক প্রমাণ কষ্টসাধ্য। বৃহৎ ঋণগুলোর প্রস্তাব প্রেরণ, একেকটি ধাপ অতিক্রম এবং ঋণ মঞ্জুরের সময়কাল খুব সংক্ষিপ্ত। অর্থাৎ দ্রুতগতিতেই ঋণগুলো মঞ্জুর এবং টাকা ছাড় হয়। এ সময়কালে কর্মকর্তাদের দায়-দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করলে দেখা যায়, আত্মসাতের সঙ্গে শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। অথচ এটি প্রমাণ করা দুঃসাধ্য। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে দুদকের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির সূচনা হয় ২০০৮ সালের দিকে। সে বছরের ২৮ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন এস এম আমিনুর রহমান। ওই সময় অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট ও রিমেক্স ফুটওয়্যারের মতো ঋণগুলো অনুমোদন পায়। ওই আমলে দেওয়া ঋণের প্রায় পুরোটাই এখন খেলাপি। এসব আত্মসাতের ঘটনায় দুদক এখন অনুসন্ধান শুরু করতে পারছে না। দুদকের আরেকটি সূত্র জানায়, জনতা ব্যাংকের একাধিক ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে অনুসন্ধান চলমান থাকলেও ঋণ কেলেঙ্কারির মূল হোতাদের ধরা যাচ্ছে না। দুদকের একাধিক অনুসন্ধানে ওই সময়ের ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীদের নাম এলেও তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। ফারমার্স ব্যাংকের জালিয়াতি নিয়ে ধীরে চলছে দুদক ফারমার্স ব্যাংকে জালিয়াতির ঘটনায় ইতিমধ্যে কয়েকটি মামলা করেছে দুদক। এসব মামলায় ব্যাংকটির নিরীক্ষা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতীসহ (বাবুল চিশতী) কয়েকজন ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীকে আসামি করা হয়। কোনো মামলায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে আসামি করা হয়নি। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তদন্তে ব্যাংকটির সাবেক দুই শীর্ষ ব্যক্তির অনিয়ম তুলে ধরা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকটির গ্রাহকের ঋণের ভাগ নিয়েছেন মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও মাহবুবুল হক চিশতী। এর মাধ্যমে দুজনের নৈতিক স্খলন ঘটেছে এবং তাঁরা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকটির জনবল নিয়োগ হয়েছে মূলত এ দুজনের সুপারিশেই। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তাঁরা নিয়োগ দিয়েছেন। এ ছাড়া মাহবুবুল হক চিশতীর ছেলে রাশেদুল হক চিশতীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আরসিএল প্লাস্টিকের সঙ্গে ব্যাংকের গ্রাহকদের অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্যও বেরিয়ে আসে। ২০১২ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়া ফারমার্স ব্যাংক কার্যক্রম শুরুর পরই অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। আস্থার সংকট তৈরি হলে আমানতকারীদের অর্থ তোলার চাপ বাড়ে। পরিস্থিতির অবনতি হলে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ ছাড়তে বাধ্য হন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী। পরিচালকের পদ থেকেও পদত্যাগ করেন তাঁরা। জালিয়াতির হোতারা আইনের বাইরে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বড় জালিয়াতির ঘটনাগুলোয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এগুলো নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করেছে, সরকারের কাছে সব তথ্য আছে। নতুন অর্থমন্ত্রীর কাছে বড় প্রত্যাশার কথা জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, নতুন অর্থমন্ত্রী একজন চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট। তিনি এ বিষয়গুলো বোঝেন। আমরা চাই সব কটি বিষয়ে যেসব প্রতিবেদন আছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে নতুন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’

টিআইবির গবেষণা: ৫০টির মধ্যে আগের রাতে ৩৩টিতে সিল, বিচার বিভাগীয় তদন্ত...

ভোটে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ত্রুটিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিচার বিভাগীয় তদন্তের পক্ষে মত দিয়েছে সংস্থাটি। ‘একাদশ সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা’ শীর্ষক গবেষণার প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার টিআইবির ধানমন্ডি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে করা গবেষণা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এসব তথ্য তুলে ধরে টিআইবি।

নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্য থেকে দ্বৈবচয়নের (লটারি) ভিত্তিতে ৫০টি বেছে নেয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। নির্বাচনের দিন ৪৭ আসনে কোনো না কোনো নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে টিআইবি। অনিয়মের ধরনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৫০টির মধ্যে ৪১টি আসনে জাল ভোট; ৪২টি আসনে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর নীরব ভূমিকা; ৩৩টি আসনে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল; ২১টি আসনে আগ্রহী ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়ানো বা কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা; ৩০টি আসনে বুথ দখল করে প্রকাশ্যে সিল মেরে জাল ভোট; ২৬টি আসনে ভোটারদের জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা; ২০টিতে ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা; ২২টিতে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া; ২৯টিতে প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেওয়া ইত্যাদি।

নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ও ত্রুটিপূর্ণ

সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের ফলে একাদশ সংসদ নির্বাচনকে ‘অংশগ্রহণমূলক’ বলা গেলেও ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ বলা যায় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে টিআইবি। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। যেমন—সব দলের সভা-সমাবেশ করার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, বিরোধীদের দমনে সরকারের বিতর্কিত ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে অবস্থান নেওয়া, সব দলের প্রার্থী ও নেতা-কর্মীর নিরাপত্তা সমানভাবে নিশ্চিত করা, নির্বাচনী অনিয়ম ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বিশেষ করে সরকারি দলের প্রার্থী ও নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের উপযুক্ত ভূমিকা গ্রহণ ইত্যাদি। এর ফলে কার্যত নির্বাচন কমিশন সব দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারেনি। এ ছাড়া নির্বাচনের সময়ে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ যেমন—পর্যবেক্ষক ও সংবাদমাধ্যমের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা; মোবাইলের জন্য ফোর-জি ও থ্রি-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ; জরুরি ছাড়া মোটরচালিত যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। টিআইবির গবেষণার সার্বিক পর্যবেক্ষণে ক্ষমতাসীন দল ও জোটের কোনো কোনো কার্যক্রম নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে। যেমন- সংসদ না ভেঙে নির্বাচন করায় সরকারের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন সমর্থক গোষ্ঠী সম্প্রসারণের জন্য আর্থিক ও অন্যান্য প্রণোদনা এবং নির্বাচনমুখী প্রকল্প অনুমোদনসহ নির্বাচনের প্রায় এক বছর আগে থেকেই ক্ষমতাসীন দলের প্রচারণা; বিরোধী পক্ষের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের মাধ্যমে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া; সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিশ্চয়তা দেওয়ার পরও নির্বাচনের সময় পর্যন্ত ধরপাকড় ও গ্রেপ্তার অব্যাহত রাখা এবং সরকারবিরোধী দলের নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দেওয়াসহ প্রার্থী ও নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা ও সহিংসতা নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সব কটি আসনেই নির্বাচনী প্রচারের ক্ষেত্রে এককভাবে সক্রিয় ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা। কোনো কোনো আসনে ক্ষমতাসীন দল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সরাসরি প্রচারের জন্য সুবিধা আদায়সহ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য কর্তৃক প্রার্থীর প্রচারণায় অংশগ্রহণ এবং সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে প্রচারণার দৃশ্যও দেখা যায়। অন্যদিকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৫০টির মধ্যে ৩৬টি আসনে বিরোধী দলের প্রচারে বাধা দেওয়াসহ ৪৪টি আসনে সরকারবিরোধী দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই দলীয় নেতা-কর্মীদের নামে মামলা, পুলিশ বা প্রশাসন কর্তৃক হুমকি ও হয়রানি, প্রার্থী ও নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ও কর্মী কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি দেখানোর তথ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১৯ আসনে সহিংসতাসহ প্রার্থীদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে মারামারি, সরকারবিরোধী দলের প্রার্থীর সমর্থক ও নেতা-কর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা, নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুর করা, পুড়িয়ে দেওয়ার চিত্র দেখা যায়।

প্রচারে বেশি ব্যয় আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের, কম স্বতন্ত্ররা

প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সার্বিকভাবে তফসিল ঘোষণার আগে থেকে নির্বাচন পর্যন্ত প্রার্থীদের গড় ব্যয় ৭৭ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫ টাকা, যা নির্বাচন কমিশন দ্বারা নির্ধারিত ব্যয়সীমার (আসনপ্রতি সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা) তিন গুণেরও বেশি। প্রচারে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা (গড়ে পাঁচ গুণের বেশি) এবং সবচেয়ে কম ব্যয় করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। সংবাদ সম্মেলনে নির্বাহী ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এবারের নির্বাচনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসনের একাংশ ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে, যেটি আইনের লঙ্ঘন এবং নীতিবিবর্জিত। সর্বোপরি আংশিকভাবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছে। কারণ একদিকে সব রাজনৈতিক দল প্রার্থিতার মাপকাঠিতে নির্বাচনে ছিল, কিন্তু নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় সক্রিয়তার বিবেচনায় বৈষম্য প্রকট ছিল। তা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ভোটাররা অবাধে ভোট দিতে পারেননি। আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘন হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অবশ্যই ব্যাপকভাবে লজ্জাজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ভূমিকাও ছিল বিতর্কিত। আর এসব কারণেই নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ এবং বলা যায়, অভূতপূর্ব একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে; যার ফলাফলও অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য হিসেবে আলোচিত হয়েছে। তাই আমরা সরকারের নৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য এবং সরকারের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির জন্য যে অভিযোগগুলো উত্থাপিত হয়েছে সেগুলোর বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানাই। টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল বলেন, ‘যেভাবে এবারের নির্বাচনটা পরিচালিত হয়েছে তাতে প্রচুর ত্রুটি ছিল। তাই আমরা আশা করব নির্বাচন কমিশন এই ত্রুটিগুলো দেখে, এই ত্রুটিগুলোর সত্যাসত্য বিচার করে পরবর্তী যে নির্বাচনগুলো হবে সেগুলোতে যাতে এর পুনরাবৃত্তি না হয় সে চেষ্টাই করবেন। কারণ আমরা দেখতে চাই, সত্যিকার অর্থেই জনগণের পছন্দের মানুষেরাই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাচ্ছেন।’ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য এই উদাহরণ রেখে যায় যে, যদি নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ না থাকে তাহলে নির্বাচনটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়, বিতর্কিত হয়ে যায়। আর তখন একটা সংশয় থেকেই যায় যে, যাঁরা আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে গেলেন, তাঁরা আমাদের কতটুকু প্রতিনিধিত্ব করবেন, জনগণের স্বার্থ কতখানি দেখবেন।’

নির্বাচনী ব্যবস্থা সুষ্ঠু ও কার্যকর করতে ৬ দফা সুপারিশ:

নির্বাচনী ব্যবস্থা সুষ্ঠু ও কার্যকর করতে টিআইবির পক্ষ থেকে ৬ দফা সুপারিশ পেশ করা হয়েছে। সেগুলো হলো: নির্বাচনে বহুমুখী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে; আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে তাদের ব্যর্থতা নিরূপণ করে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে কমিশনের গৃহীত পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ নিতে হবে; নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা নির্ধারণ করে আইন প্রণয়ন করার মাধ্যমে সৎ, যোগ্য, সাহসী ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে; দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার স্বার্থে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ অন্যান্য অংশীজনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ হতে হবে; নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ ডিজিটালাইজ করতে হবে এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের তথ্য সংগ্রহের জন্য অবাধ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল/জোট ও প্রার্থী, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ বিভিন্ন অংশীজন নির্বাচনী প্রক্রিয়া কতটুকু আইনানুগভাবে অনুসরণ করেছেন, তা পর্যালোচনা করার পাশাপাশি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ প্রাক্কলন করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রধান অংশীজনদের ভূমিকা পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণার জন্য নভেম্বর ২০১৮ থেকে জানুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। তবে তফসিল ঘোষণার আগে থেকে শুরু করে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বর্তমান প্রাথমিক প্রতিবেদনটি প্রণীত হয়েছে। পরবর্তী সময় নির্বাচন-পরবর্তী প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। গবেষণার জন্য প্রত্যক্ষ তথ্যের উৎস হিসেবে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী, দলীয় নেতা-কর্মী, রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ অন্যান্য নির্বাচনী কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা, নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা, স্থানীয় সাংবাদিক ও ভোটারদের সাক্ষাৎকার ও পর্যবেক্ষণ গ্রহণ করা হয়েছে এবং পরোক্ষ তথ্যের জন্য নির্বাচনসংক্রান্ত আইন ও বিধি, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন, ওয়েবসাইট ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও প্রবন্ধ পর্যালোচনা করা হয়েছে। গবেষণায় উপস্থাপিত পর্যবেক্ষণ সব রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নাগরিক সমাজ ও সংগঠন, ভোটার এবং সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য না-ও হতে পারে। তবে, এ গবেষণা নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট প্রশাসন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের ভূমিকা সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম। গবেষক দলের অন্য সদস্যরা হলেন প্রোগ্রাম ম্যানেজার জুলিয়েট রোজেটি, তাসলিমা আক্তার, বিশ্বজিৎ কুমার দাস এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা মিনা।

সিঙ্গাপুর হয়ে উঠছে বাংলাদেশীদের কালো টাকার গন্তব্যস্থল

বৈশ্বিক আর্থিক গোপনীয়তার সূচকে সিঙ্গাপুরের অবস্থান পঞ্চম। দেশটিতে অফশোর আর্থিক সেবার বাজার ক্রমেই বড় হচ্ছে। এশিয়ার শীর্ষ অফশোর ফিন্যান্সিয়াল সেন্টার হতে হংকংয়ের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা করছে দেশটি। মূলত এশিয়ার দেশগুলোর ক্রমবিকাশমান অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে অফশোর বিনিয়োগের অন্যতম শীর্ষ গন্তব্যও হয়ে উঠেছে সিঙ্গাপুর। একই সঙ্গে হয়ে উঠেছে মুদ্রা পাচার ও কালো টাকার নিরাপদ গন্তব্যস্থলও। এ সুযোগ নিচ্ছে বাংলাদেশীরাও।

সিঙ্গাপুরে রয়েছে নামিদামি অনেক ক্যাসিনো। বেশকিছু ক্যাসিনোর মালিকানায় রয়েছেন বাংলাদেশীরা, যেগুলো কালো টাকার অন্যতম গন্তব্য। এছাড়া সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল হোটেল। ভিআইপি ক্যাসিনো হিসেবে রয়েছে এটির বিশেষ পরিচিতি। সূত্র বলছে, মেরিনা বে ক্যাসিনোতেই কোটি ডলারের বোর্ডেও খেলেছেন এক বাংলাদেশী। তিনি নিজেকে যুবলীগের একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। আলোচিত এ নেতা সিঙ্গাপুরের জুয়ার বোর্ডে খেলতে বসলে লাখ ডলারের বান্ডিল নিয়েই বসেন। জনশ্রুতি রয়েছে, জুয়ার বোর্ডে ওড়ানো বিপুল অংকের টাকা তার নিজের উপার্জিত নয়। এ টাকার সবচেয়ে বড় উৎস ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক। তার ছায়ায় ঢাকায় অন্তত ১৫০ জুয়ার স্পট রয়েছে। সেগুলো চালানো হয় সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোর আদলে, যার মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে দৈনিক প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এ টাকার বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে চলে যাচ্ছে সিঙ্গাপুরে। জানা গেছে, একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকও কয়েকটি ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ না করে তা সিঙ্গাপুরে পাচার করেছেন। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা ও পরিচালকরাও অর্থ পাচারের জন্য সিঙ্গাপুরকে বেছে নিচ্ছেন। আর্থিক গোপনীয়তার সুযোগ নিয়ে দেশটিতে অর্থ পাচার করছেন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসায়ীরাও। আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের মাধ্যমেও সিঙ্গাপুরে অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটছে। উচ্চমূল্যে আমদানি দেখিয়ে দেশটিতে অর্থ পাচার করছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি আমদানি-রফতানির অন্যতম রুট হওয়ায় ব্যবসায়ীদের নিত্য গন্তব্য হয়ে উঠেছে সিঙ্গাপুর। গার্মেন্ট বা টেক্সটাইলের মেশিনারিজ আমদানির জন্যও দেশটিতে যেতে হয় ব্যবসায়ীদের। এ সুযোগ কাজে লাগিয়েও অনেকে দেশটিতে অর্থ স্থানান্তর করেন। সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশীদের যাতায়াত বাড়ায় প্রতিযোগিতা বেড়েছে এ রুটের এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যেও। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস। পাশাপাশি মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস ও এয়ার এশিয়াও ঢাকা-সিঙ্গাপুর রুটে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করছে। চিকিৎসা, ব্যবসা ও পর্যটনের নামে বাংলাদেশীরা সিঙ্গাপুরে গেলেও এদের অনেকেই ক্যাসিনোয় জুয়া খেলেন এবং অর্থ পাচার করেন। এসবই তারা করছেন দেশটির আর্থিক গোপনীয়তা আইনের সুযোগ নিয়ে। সিঙ্গাপুর এ গোপনীয়তা সুরক্ষার কাজটি শুরু করে নব্বইয়ের দশকে আর্থিক বাজার ও ব্যাংকিং খাত উদারীকরণের মধ্য দিয়ে। মূলত ওই সময়ের পর থেকেই দেশটিতে তহবিল ব্যবস্থাপনা, ট্রেজারি অপারেশন, বীমা, ইকুইটি মার্কেট, ডেট ইন্স্যুরেন্স, করপোরেট ফিন্যান্সিংসহ আর্থিক খাতের বিভিন্ন অংশের বাজার সম্প্রসারণ হতে থাকে। এ উদারীকরণ আরো জোরালো হয় ২০০১ সালের আর্থিক গোপনীয়তার নীতিমালাকে আরো কঠোর করে তোলার মধ্য দিয়ে। এজন্য সংশোধন করা হয় ব্যাংকিং আইন। সিঙ্গাপুরে গোপনীয়তার আইন লঙ্ঘনের শাস্তি হলো তিন বছরের জেল। ২০০৪ সালে ট্রাস্ট আইনে সংশোধন করার মধ্য দিয়ে কালো টাকার নিরাপদ গন্তব্য করে তোলা হয় দেশটিকে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্র্যাকটিশনারদের ভাষ্য হলো, অন্যান্য দেশের সঙ্গে আর্থিক খাতের তথ্য বিনিময়ে কোনো চুক্তি করা হলেও স্থানীয় আদালতেই বিশেষ সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে তাতে ভারসাম্য নিয়ে আসা হয়। আদালতের এ বিশেষ সুবিধার কারণে অন্যান্য দেশের কর্তৃপক্ষের জন্য আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য বের করে আনাটাও বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে এ-সংক্রান্ত কিছু সংস্কার করা হয়। এর পরও কালো টাকার স্বর্গ হয়ে উঠেছে দেশটি, যার অন্যতম কারণ হলো আর্থিক গোপনীয়তার নীতি। এ গোপনীয়তা রক্ষায় বেশকিছু সেবা প্রচলিত রয়েছে সিঙ্গাপুরে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দেশটিতে প্রচলিত প্রাইভেট ট্রাস্ট কোম্পানি (পিটিসি) ব্যবস্থার কথা। এটি মূলত আর্থিক লেনদেনে গোপনীয়তা রক্ষা করে চলা ট্রাস্টগুলোর ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় এক প্র্যাকটিশনারের ভাষ্যমতে, একটি পিটিসির কাজ হলো ধনী ব্যক্তিদের ‘ট্রাস্টের ওপর উচ্চমাত্রার নিয়ন্ত্রণ ও সতর্কতা’ বজায় রাখার সুযোগ করে দেয়া। সিঙ্গাপুরের অধিবাসী নয়, এমন কেউ যদি অন্য কোনো দেশ থেকে কোনো ধরনের আয় নিয়ে আসে; তাহলে তার কোনো ধরনের কর পরিশোধ করতে হয় না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশ থেকে দেশটিতে অর্থ পাচার হচ্ছে এবং তা ফিরিয়ে আনার নজিরও আছে। বিএনপি চেয়াপারসনের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর পাচার করা ১৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা ২০১২ সালে ফেরত আনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মূলত সিঙ্গাপুরে পাচার হওয়া কোকোর অর্থের লভ্যাংশ হিসেবে এ টাকা ফেরত আনে দুদক। সর্বশেষ ২০১৩ সালে ফেরত আনা হয় আরো ৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। সিঙ্গাপুরে পাচার হওয়া কোকোর টাকা ফিরিয়ে আনতে দুদকের পরামর্শক হিসেবে কাজ করে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ফেরদৌস আহমেদ খানের প্রতিষ্ঠান অক্টোখান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ১৯৪৭ সালের ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট ও ২০১৭ সালের মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ আইনের সামঞ্জস্য নেই। ফলে দেশের ব্যবসায়ীরা বিদেশে তাদের ব্যবসা প্রক্রিয়াকে সহজ করতেই বৈধ আয়ের একটি অংশ সিঙ্গাপুরের ব্যাংকিং চ্যানেলে রাখছেন। যদি কেউ তার ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে অবৈধ কিছু না করেন, তাহলে সিঙ্গাপুরে আধুনিকতম ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা সে সুযোগই নিচ্ছেন। তাদের গচ্ছিত অর্থই যে কালো টাকা সেটি নয়। বরং দেশের আইনের প্রতিবন্ধকতার কারণেই তারা সে দেশে তাদের আয়ের অর্থ রাখছেন। এজন্য দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মিলিয়ে এ খাতের প্রচলিত আইন সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বড় ব্যবসায়ীদের অনেকে বিভিন্ন দেশে আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করেছেন। সেখান থেকেই মূল ব্যবসা পরিচালনা করছেন তারা। আর আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনে প্রথম পছন্দ হিসেবে তারা বেছে নিচ্ছেন সিঙ্গাপুরকে। যদিও অভিযোগ আছে, অর্থ পাচারের নতুন উপায় হিসেবে বিভিন্ন দেশে আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করছেন ব্যবসায়ীরা। এর মাধ্যমে আমদানি-রফতানিতে মূল্য বেশি ও কমের মাধ্যমে অর্থ পাচার করছেন। সুইজারল্যান্ডের আইন শক্ত হওয়ায় সেখানে টাকা রাখতে গেলে প্রশ্ন করা হয়। এ কারণে দেশটিতে টাকা পাচারে ধীরগতি আসছে। তবে সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের ভূমিকায় সিঙ্গাপুরকে দেখা যাচ্ছে। সেখানে টাকা রাখতে গেলে প্রশ্ন করা হয় না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিঙ্গাপুর থেকে রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশই হুন্ডির মাধ্যমে দেশে ঢুকছে। এসব দেশে বুথ খুলে প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে সংঘবদ্ধ চক্র। এ চক্রের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ আছে বাংলাদেশের বড় ব্যবসায়ীদের। বাংলাদেশী প্রবাসীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থের গন্তব্য আগে সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপ-আমেরিকার দিকে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে দিক পরিবর্তিত হয়েছে। এখন দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থেরও বড় অংশ সিঙ্গাপুরে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নজরেও রয়েছে বিষয়টি।

স্বৈরতান্ত্রিক ও ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক অবস্থার মাঝামাঝি ‘হাইব্রিড রেজিম’ তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ

যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) সর্বশেষ প্রতিবেদনে 'গণতান্ত্রিক' কিংবা 'ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক' দেশের তালিকায়ও বাংলাদেশের নাম নেই।

গত বুধবার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইআইইউ। খবর বিবিসির। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক দশক ধরে স্বৈরতান্ত্রিক ও ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক অবস্থার মাঝামাঝি 'হাইব্রিড রেজিম' তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিলো ৯২তম, পরের বছর ২০১৮ সালে হয়েছে ৮৮তম। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের স্কোর আগের বছরের তুলনায় ০.১৪ বেড়েছে। ইআইইউ প্রতিটি দেশকে গণতন্ত্র সূচক পরিমাপ করতে পাঁচটি মানদণ্ড ব্যবহার করে। সেগুলো হলো - নির্বাচনী ব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, নাগরিক অধিকার, সরকারে সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। প্রত্যেকটি মানদণ্ডকে ০ থেকে ১০ স্কোরের মধ্যে হিসেব করে গড় করা হয়। প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে দেশগুলোকে চারটি ক্যাটেগরিকে ভাগ করা হয় - স্বৈরতন্ত্র, হাইব্রিড রেজিম, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র এবং পূর্ণ গণতন্ত্র। এই হিসেব অনুযায়ী, একটি দেশকে "পূর্ণ গণতান্ত্রিক" অবস্থায় যেতে হলে গণতান্ত্রিক সূচকে ৯ থেকে ১০ স্কোর করতে হয়। ১৬৭টি দেশের মধ্যে মাত্র ২০টি দেশ গণতন্ত্রের তালিকায়, ৫৫টি দেশ ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায়, ৩৯টি দেশ হাইব্রিড রেজিমের তালিকায় এবং ৫৩টি দেশ স্বৈরতান্ত্রিক দেশের তালিকায় আছে। http://country.eiu.com/bangladesh

রিজার্ভের অর্থ চুরি : মায়া দেগুইতোর জেল, ১১ কোটি ডলার জরিমানা

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের সাবেক ব্যাংকার মায়া সান্তোস দেগুইতোর কারাদণ্ড ঘোষণা করেছেন সে দেশের স্থানীয় এক আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়েছে।

রাজধানী ম্যানিলার একটি আদালতে গতকাল এ রায় ঘোষণা করা হয়। মায়া দেগুইতো এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে তার আইনজীবী জানিয়েছেন। খবর এএফপি ও ইনকোয়্যারার। ২০১৬ সালে নিউইয়র্ক ফেডে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি যায়। ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) একটি শাখায় খোলা চারটি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে ওই অর্থ তুলে নেয়া হয়। ওই ঘটনার মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে পাচারকৃত অর্থ ও ‘ডার্টি মানির’ গন্তব্য হিসেবে ফিলিপাইনের নাম উঠে আসে। একই সঙ্গে ব্যাংকিংয়ে কঠোর গোপনীয়তা আইনের আড়ালে মুদ্রা পাচারে জড়িতদের সুরক্ষা দেয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। ওই সময়ে মুদ্রা পাচারে ব্যবহূত আরসিবিসির ওই শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন মায়া দেগুইতো। এ ঘটনায় মুদ্রা পাচারের আটটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ম্যানিলার ওই আদালত গতকাল তার কারাদণ্ড ঘোষণা করেন। আটটি অভিযোগের প্রতিটির জন্য তাকে কমপক্ষে চার বছর করে কয়েদ থাকতে হবে বলে রায় দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলারের অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তবে বিচার চূড়ান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত জামিনে মুক্ত থাকার পাশাপাশি আপিলের সুযোগ রয়েছে মায়া দেগুইতোর। এ সুযোগ তিনি নেবেন বলে তার আইনজীবী জানিয়েছেন। মায়া দেগুইতোর বিরুদ্ধে আনা প্রধানতম অভিযোগ হলো, চুরি যাওয়া অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি সমন্বয়ের কাজে তিনি সহযোগিতা করেছিলেন। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় একমাত্র তাকেই দোষী সাব্যস্ত করা গেছে। তার আইনজীবী দিমিত্রিও কাস্তোদিওর ভাষ্য হলো, মায়া দেগুইতোকে এ ঘটনায় স্রেফ বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। দিমিত্রিও কাস্তোদিও বলেন, ‘এ ঘটনা তার (মায়া দেগুইতোর) পক্ষে একা ঘটানো সম্ভব ছিল না। তার মতো নিম্নপদস্থ এক কর্মকর্তা একা এ ধরনের ঘটনার পরিকল্পনা করবেন, আরসিবিসির মতো বড় একটি ব্যাংকে এটি সম্ভব নয়। সুতরাং এ ঘটনার সঙ্গে আরো কেউ না কেউ জড়িত।’ ফিলিপাইনের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এ বিচারের কার্যক্রম এখনো শেষ হয়নি। তবে এ বিষয়ে তাত্ক্ষণিক বিস্তারিত কোনো তথ্যও জানায়নি বিভাগটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে উত্তর কোরীয় এক হ্যাকারকে খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ। মার্কিনিদের অভিযোগ, ওই হ্যাকার ও পিয়ংইয়ংয়ের রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট কয়েকজন সহযোগী এ ঘটনার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করেছে। চুরি যাওয়া অর্থ ফিলিপাইনে প্রবেশের অব্যবহিত পরই এটি তুলে নেয়া হয়। এখন পর্যন্ত এ অর্থের মধ্যে মাত্র দেড় কোটি ডলার পুনরুদ্ধার করা গেছে। উত্তোলনের পরপরই চুরি যাওয়া অর্থ ফিলিপাইনের ক্যাসিনোগুলোয় স্থানান্তর করে দুষ্কৃতকারীরা। ঘটনার সময় দেশটির ক্যাসিনোগুলো মুদ্রা পাচার প্রতিরোধী আইনের আওতার বাইরে থাকায় এর সুযোগ নিয়েছিল তারা। ঘটনা প্রকাশের পর আরসিবিসিকে রেকর্ড ২ কোটি ১০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা করে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রধানমন্ত্রীর ছবি বিকৃত করার মামলায় একজনের সাত বছর কারাদণ্ড

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি বিকৃত করার মামলায় মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী মো. মনিরের (২০) সাত বছর সশ্রম করাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

বুধবার সাইবার ট্রাইব্যুনালের (বাংলাদেশ) বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন এ রায় ঘোষণা করেন। কারাদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় মো. মনির ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার পর তাকে সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আলমগীর হোসেন ও শীল সুব্রতকে খালাস দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। মো. মনির টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর থানার কেদারপুর বাজারের মনির টেলিকমের মালিক। ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর নজরুল ইসলাম (শামীম) যুগান্তরকে বলেন, আসামি মো. মনির হোসেন নাগরপুর থানার কেদারপুর বাজারে মোবাইল ফোনের ব্যবসা করতেন। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ছবি বিকৃত করে বিভিন্ন মোবাইল ফোনে দিতেন। এ অভিযোগে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থানায় দায়ের করা মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল আসামিকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন। আদালত সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ১০ নভেম্বর মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া থানার উত্তর রৌহান গ্রামের লাল মিয়ার ছেলে আলমগীর হোসেন বিভিন্ন লোকজনকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বিকৃত ছবি দেখান। বিষয়টি জানতে পেরে সাটুরিয়া থানা পুলিশ আলমগীরকে গ্রেফতার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আলমগীর জানায়, সে এই ছবিগুলো টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর থানার কেদারপুর বাজারের মনির টেলিকম থেকে এসব বিকৃত ছবি নিয়েছে। এ ঘটনায় ওই থানায়র এসআই আব্দুস ছালাম বাদী হয়ে চারজনের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ (২) ধারায় মামলাটি দায়ের করেন। কারাদণ্ডপ্রাপ্ত মনির ছাড়া মামলার অপর তিন আসামি হলেন- আলমগীর হোসেন, শীল সুব্রত ও শ্রী প্রভাব চন্দ্র সরকার। তদন্ত শেষে ২০১৪ সালের ২০ মার্চ সাটুরিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক আলমগীর হোসেন ওই চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি শ্রী প্রভাত চন্দ্র সরকারকে অব্যাহতি দিয়ে বাকি তিনজনের বিরুদ্ধে চার্জ (অভিযোগ) গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। মামলায় মোট ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে।

শ্রীলংকায় দুই বাংলাদেশী নাগরিককে আটক

মাদকের চালানসহ শ্রীলংকায় দুই বাংলাদেশী আটক : আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের পুরো তথ্য জানতে চায় ঢাকাঃ

সম্প্রতি মাদকের বড় চালানসহ শ্রীলংকায় দুই বাংলাদেশী নাগরিক আটক হয়েছেন। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে ২৭২ কেজি হেরোইন ও ৫ কেজি কোকেন, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে জব্দ করা শ্রীলংকায় মাদকের সবচেয়ে বড় চালান। এদিকে আটক দুই বাংলাদেশী কোনো আন্তর্জাতিক চক্র কিংবা মাদক নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত কিনা তার পুরো তথ্য উদ্ঘাটন করতে চায় ঢাকা। এ উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দলসহ শিগগিরই কলম্বো যাবে। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে শ্রীলংকায় মাদকসহ আটক বাংলাদেশীদের নিয়ে পরবর্তী করণীয় বিষয়ে একটি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শহিদুল হক। সভায় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। জানা গেছে, গত ৩১ ডিসেম্বর শ্রীলংকার রাজধানী কলম্বোর উপকণ্ঠ মাউন্ট লাভিয়ানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে দুই বাংলাদেশী নাগরিককে আটক করে দেশটির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয় ২৭২ কেজি হেরোইন ও ৫ কেজি কোকেন। জব্দ করা মাদকের দাম প্রায় ১৫২ কোটি টাকা। বড়দিন ও থার্টিফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে শ্রীলংকা পুলিশের মাদক বিভাগ ও স্পেশাল টাস্কফোর্স ওই বিশেষ অভিযান চালায়। এর আগে ১৪ ডিসেম্বর কলম্বোর উপকণ্ঠের একই এলাকা থেকে ৩২ কেজি হেরোইনসহ আটক করা হয় বাংলাদেশী এক নারীকে। তিনি গত অক্টোবরের শুরুতে মালয়েশিয়া থেকে কলম্বো যান বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়। বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য বিব্রতকর। তাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। এ কারণে শিগগিরই একটি বিশেষজ্ঞ দল শ্রীলংকায় যাবে। প্রতিনিধি দলটিতে গোয়েন্দা বাহিনীতে মাদক দমনে যারা কাজ করেন, যারা আন্তর্জাতিক মাদক চক্রকে মনিটরিং করেন এমন সদস্যদের রাখতে বলা হয়েছে। দ্রুত যাতে প্রতিনিধি দলটি শ্রীলংকা গিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারে তার নির্দেশনা বৈঠকে দেয়া হয়েছে।   পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাত্র এক মাসের মধ্যে ৩০৪ কেজি হেরোইন, ৫ কেজি কোকেনসহ তিন বাংলাদেশিকে আটকের ঘটনা দেশের জন্য উদ্বেগের। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও শ্রীলংকার কর্তৃপক্ষ আভাস দিয়েছে। বিপুল পরিমাণ মাদক চোরাচালানের বিষয়ে বিশেষায়িত তথ্য বিনিময় ও তদন্তে সহযোগিতার জন্য শ্রীলংকার প্রেসিডেন্টের দপ্তর, দেশটির পুলিশের মহাপরিদর্শক ও পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্সের প্রধান কলম্বোয় বাংলাদেশের হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এদিকে শ্রীলংকা পুলিশের মুখপাত্র রুয়ান গুনাসেকারার বরাত দিয়ে সম্প্রতি দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, মাউন্ট লাভিয়ানার টেম্পলার্স রোডের একটি আবাসিক এলাকা থেকে প্রথমে ৯ কেজি হেরোইনসহ দুই বাংলাদেশী জামাল ও রফিউলকে আটক করা হয়। কেকের বাক্সে বিশেষ কায়দায় রাখা ওই হেরোইন জব্দের সময় দুই বাংলাদেশির একজনের কাছে ফ্ল্যাটের স্বয়ংক্রিয় চাবি পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদের পর দুজনকে নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা স্থানীয় একটি দোতলা বাড়িতে যান। বাড়িতে ঢুকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চোখ আটকে যায়। তারা দেখতে পান, ঘরজুড়ে রয়েছে হেরোইন ভর্তি প্যাকেট। পরে সেখান থেকে ২৬৩ কেজি হেরোইন, ৫ কেজি কোকেনসহ সব মিলিয়ে ২৬৮ কেজি মাদক উদ্ধার করা হয়। শ্রীলংকার মুদ্রায় উদ্ধারকৃত মাদকের দাম ৩৩৩ কোটি রুপি। শ্রীলংকার পুলিশ ও বিশেষ টাস্কফোর্সের সদস্যদের ধারণা, মাদক হাতবদলের জন্য ওই বাড়িকে নিরাপদে ব্যবহার করে আসছিল পাচারকারীরা। কলম্বোর ওই বাড়িটি থেকে সারা দেশে মাদকের চালান পৌঁছে দেয়া হতো।

MOST POPULAR

HOT NEWS

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.