কে এই খাসোগি কেন এই জিঘাংসা

৭ মিনিটেই খাসোগিকে শেষ করে দেয় ঘাতকেরা

৭ মিনিটেই খাসোগিকে শেষ করে দেয় ঘাতকেরা
সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের সাত মিনিটের মধ্যে ঘাতকরা সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে টুকরো টুকরো করে হত্যা করে বলে জানিয়েছে মিডল ইস্ট আই পত্রিকা।
খাসোগির জীবনের শেষ মুহূর্তের অডিও রেকর্ডিং পুরোটা শুনেছেন এমন একজন তুর্কি কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে একথা জানায় পত্রিকাটি। খবরে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নয় খাসোগিকে হত্যার জন্যই ইস্তাম্বুলে গিয়েছিল সৌদি ঘাতকেরা। খাসোগিকে সৌদি এজেন্টরা জিজ্ঞাসাবাদের সময় ভুলক্রমে তিনি নিহত হন, সৌদি আরব এমন রিপোর্ট তৈরি করছে বলে খবর প্রকাশ হওয়ার পর মিডল ইস্ট আই হত্যাকাণ্ডের বিশদ বিবরণ প্রকাশ করল।
বীভৎস হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় তুরস্কের সূত্রটি জানায়, খাসোগিকে কনসাল জেনারেলের অফিস থেকে টেনে-হিঁচড়ে পাশের একটি কক্ষের টেবিলের ওপর নিয়ে ফেলা হয়। এসময় নিচের তলায় উপস্থিত একজন ব্যক্তিও ভয়ঙ্কর চিৎকারের শব্দ শুনতে পান বলে জানায় সূত্রটি। ‘স্বয়ং কনসালকেও তার কক্ষ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। ঘাতকরা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই গিয়েছিল,’ মিডল ইস্ট আইকে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র। একসময় খাসোগিকে কোনো ধরনের চেতনানাশক দিয়ে তার চিৎকার বন্ধ করা হয়। গত ২ অক্টোবর খাসোগি ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর থেকে তার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। ওইদিন খাসোগি তার আগের বিয়ের তালাকের কাগজপত্র আনতে সৌদি কনস্যুলেটে গিয়েছিলেন।
এর আগের দিন একটি ব্যক্তিগত বিমানে ১৫ জন ঘাতকের একটি দল সৌদি থেকে ইস্তাম্বুলে গিয়ে পৌঁছান। এদের মধ্যে সৌদি নিরাপত্তা বিভাগে ফরেনসিক প্রধান সালাহ মুহাম্মদ আল-তুবাইগিও ছিলেন। খাসোগি জীবিত থাকতেই তাকে টেবিলের ওপর টুকরো টুকরো করতে শুরু করে তুবাইগি, জানায় তুরস্কের সূত্রটি। হত্যাকাণ্ড শেষ করতে সাত মিনিট সময় লাগে, যোগ করে সূত্রটি। খাসোগির দেহ কাটার সময় তুবাইগি কানে ইয়ারফোন দিয়ে গান শুরু করে এবং দলের অন্যান্যদেরও একই কাজ করতে বলে। ‘আমি কাজ করার সময় গান শুনি। তোমাদেরও একই কাজ করা উচিৎ,’ অডিও রেকর্ডিং-এ তুবাইগিকে বলতে শোনা যায়।
মিডল ইস্ট আই জানায়, অডিও রেকর্ডিং-এর তিন মিনিট অংশ তুরস্কের সাবাহ পত্রিকাকে দেয়া হয়েছে তবে তারা সেটি এখনও প্রকাশ করেনি। তুরস্কের একটি সূত্র মার্কিন পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানায়, তুবাইগি সৌদি ফেলোশিপ অফ ফরেনসিক প্যাথলজির প্রেসিডেন্ট। ২০১৪ সালে লন্ডনভিত্তিক সৌদি পত্রিকা আশারাক আল-আসওয়াত তুবাইগির একটি সাক্ষাৎকার নেয়। সেখানে সে একটি মোবাইল ক্লিনিকে কিভাবে সাত মিনিটের মধ্যে মৃত হজ যাত্রীদের অটোপসি করার বিষয়ে কথা বলে। এই মোবাইল ক্লিনিক ক্রাইম সিনেও ব্যবহার করা সম্ভব বলে জানায় সে। গত ২ অক্টোবর ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে খাসোগি তার আগের আগের তালাকের কাগজপত্র আনতে যান। এসময় কনস্যুলেটের বাইরে তার বাগদত্তা হাতিস চেঙ্গিজের কাছে তিনি তার ফোনটি রেখে যান। তিনি ফিরে না এলে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের এক উপদেষ্টা ফোন করার নির্দেশও হাতিসকে দিয়ে যান খাসোগি। ওই দিন মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষার পর হাতিস তার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেন। খাসোগি সৌদি যুবরাজ তথা রাজপরিবারের সমালোচনা করায় সৌদি পত্রিকায় তার কলাম বন্ধ করে সতর্ক করে দেয়া হয়। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসনে গিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় লেখালেখি করছিলেন। খাসোগির পরিচিত একজন গণমাধ্যমকে জানান, তাকে প্রলোভন দেখিয়ে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যও চেষ্টা করেছিল সৌদি সরকার। তুরস্কের কর্মকর্তারা বলছেন খাসোগিকে কনস্যুলেটের ভিতর হত্যা করা হয়েছে তার অডিও এবং ভিডিও প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে। কিন্তু, সৌদি কর্তৃপক্ষ খাসোগি নিখোঁজের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে।
বিশ্বব্যাপী এ মুহূর্তে তুমুল আলোচিত নাম সাংবাদিক জামাল খাসোগি। এমকি তাকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বিশ্ব রাজনীতিও। সৌদি আরবের স্বেচ্ছানির্বাসিত ভিন্নমতালম্বী এ সাংবাদিক গত ২ অক্টোবর তুরস্কে অবস্থিত সৌদি কনস্যুলেটে যাওয়ার পর থেকে লাপাত্তা। তবে ইতোমধ্যে প্রায় নিশ্চিত, খাসোগি খুন হয়েছেন।
তুরস্ক শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, ভিসা সংক্রান্ত কাজে সৌদি কনস্যুলেট কার্যালয়ে প্রবেশ করার পর আর বের হননি খাসোগি। অন্যদিকে প্রথমে সৌদি দাবি করেছিল, মূলদ্বার দিয়ে প্রবেশ করলেও খাসোগি বের হয়ে গেছেন পেছনের গেট দিয়ে। কিন্তু তুরস্ক পাল্টা দাবি করেছে, সিসিটিভি রেকর্ডে তা নেই। এরপরই বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে, খাসোগি খুন হয়েছেন। সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, অবশেষে জামাল খাসোগির মৃত্যুর কথা স্বীকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। সৌদির রাজপরিবারের প্রতিনিধিদের তদন্তের সময় মারা গেছেন খাসোগি-তাদের বিবৃতিতে এমনটা থাকতে পারে।
তুর্কি পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, খাসোগিকে কনস্যুলেট ভবনের ভেতরে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যা মিশনে অংশ নেয় রিয়াদ থেকে ইস্তাম্বুলে আসা ১৫ সদস্যের সৌদি স্কোয়াড। এ সদস্যের একজন সৌদি ফরেনসিক বিভাগের লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালাহ মুহাম্মদ আল-তুবায়গি। এদিকে নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক খবরে বলা হয়েছে, সৌদির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান খাসোগিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও অপহরণের অনুমোদন দেন। তবে সৌদি সরকার এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। খাসোগির মৃত্যু নিয়ে তুরস্কসহ পশ্চিমা বিশ্বের অভিন্ন দাবির পেছনে আছে সিসিটিভি ফুটেজ। এ ছাড়াও বলা হচ্ছে, সাংবাদিক জামাল খাসোগি বন্দি, নির্যাতন ও ‘হত্যা’র ঘটনা নিজেই রেকর্ড করেছিলেন। সৌদি কনস্যুলেটে ঢোকার আগে তিনি নিজের অ্যাপল ওয়াচে রেকর্ডিং চালু করেন। পরে কনস্যুলেট ভবনে প্রবেশের পর তাকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ, নির্যাতন ও সবশেষে ‘হত্যা’র ঘটনা সবই ওই অ্যাপল ওয়াচে রেকর্ড হয়। পরে সেগুলো তার ব্যবহৃত আইফোন ও তথ্য সংরক্ষণের অনলাইন স্টোরেজ ‘আইক্লাউডে’ জমা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাদশা সালমানের সঙ্গে খাসোগির বিষয়ে ফোনে কথা বলেছেন। ট্রাম্প এই ঘটনাকে ‘ভয়ঙ্কর’ বলে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া এ বিষয়ে জানতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া তুরস্কসহ এ নিয়ে সরব পশ্চিমা বিশ্ব। সব মিলিয়ে জামাল খাসোগি ইস্যুতে ক্রমাগত চাপ বাড়ছে সৌদি আরবের ওপর। প্রশ্ন উঠেছে, কে এই খাসোগি। কেনই বা তার ওপর সৌদি আরবের এত ক্ষোভ। এক কথার উত্তর-সৌদি যুবরাজের মোহাম্মদ বিন সালমানের কড়া সমালোচক ছিলেন খাসোগি। ওয়াশিংটন পোস্টসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কলাম লিখতেন তিনি। সঙ্গত কারণেই রাজপরিবারের রোষে পড়ে গ্রেপ্তার আতঙ্কে এক বছর আগে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসনে ছিলেন। যুবরাজ সালমানের শাসনে সৌদি আরবের পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে খাসোগি একবার লিখেছিলেন, ‘যখন আমি ভয়, হুমকি, মনের কথা অকপটে বলার মতো দুঃসাহসী বুদ্ধিজীবী ও ধর্মীয় নেতাদের গ্রেপ্তার ও প্রকাশ্যে অপমান করার বিষয়ে কথা বলি এবং ওই সময়ে যদি আমি আপনাকে জানাই যে আমি সৌদি আরবের মানুষ, তখন কি আপনি বিস্মিত হবেন?’ এই একটি বাক্যেই তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, সৌদিতে ভিন্নমত পোষণকারীদের প্রতি কতটা দমন-নিপীড়ন চলে। আল-জাজিরার এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ও আরব বিশ্বে নিজের প্রজন্মের সবচেয়ে প্রখ্যাত সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একজন ছিলেন খাসোগি। প্রায় ৩০ বছর ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত তিনি। ১৯৫৮ সালে সৌদি আরবের মদিনায় জন্ম। একসময় তিনি সৌদি রাজপরিবারের ক্ষমতাবৃত্তের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু যখন থেকে সৌদি আরবের অনেক নীতিমালার সমালোচনা করতে শুরু করলেন তখন থেকেই তিনি রাজপরিবারের টার্গেট। বিশেষ করে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই তার জীবন আরও সংশয়ের মুখে পড়ে। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর লেখা তার কলামের শিরোনাম ছিল, ‘সৌদি আরব সব সময় এমন দমনকারী ছিল না, এখন সেটা অসহনীয়’। এতে তিনি লেখেন, ‘তরুণ ক্রাউন প্রিন্স (পরবর্তী শাসক) মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতায় আসার পর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তিনি আমাদের দেশটিকে আরও উদার, সহিষ্ণু করে গড়ে তুলবেন। কিন্তু এখন আমি দেখতে পাচ্ছি, সেখানে একের পর এক গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন আমার ভালো বন্ধু। আমার দেশের নেতৃত্বের ব্যাপারে যারা দ্বিমত প্রকাশের দুঃসাহস দেখিয়েছেন, সেই বুদ্ধিজীবী ও ধর্মীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে।’

গণমাধ্যমকর্মী (চাকরির শর্তাবলি) আইন, ২০১৮’

গণমাধ্যমকর্মী আইন : যেসব সুবিধা পাবেন সাংবাদিকরা

অবশেষে ‘গণমাধ্যমকর্মী (চাকরির শর্তাবলি) আইন, ২০১৮’ এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে খসড়াটি অনুমোদন দেয়া হয়। গত বছরের অক্টোবরে এ আইনের খসড়া প্রকাশ করে মতামত নেয় তথ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু এরপর আর এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো আইনটি দ্রুত চূড়ান্ত করার দাবি জানিয়ে আসছিল। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম খসড়া আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘গণমাধ্যমকর্মীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, গণমাধ্যমে কর্মরত পূর্ণকালীন সাংবাদিক, কলাকুশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কর্মচারী বা নিবন্ধিত সংবাদপত্রের মালিকাধীন ছাপাখানা এবং বিভিন্ন বিভাগে নিয়োজিতরা হলেন গণমাধ্যমকর্মী। সম্প্রচারকর্মী হলেন, সম্প্রচার কাজে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত গণমাধ্যমের কর্মী।’ তিনি বলেন, ‘প্রযোজক, পাণ্ডুলিপি লেখক, শিল্পী, ডিজাইনার, কার্টুনিস্ট, ক্যামেরাম্যান, অডিও ও ভিডিও এডিটর, চিত্র সম্পাদক, শব্দ ধারণকারী, ক্যামেরা সহকারী, গ্রাফিক্স ডিজাইনারসহ পেশাজীবীরা যারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত তাদের কলাকুশলী বলা হবে।’

সাংবাদিকদের চাকরি আর শ্রম আইনের অধীনে নয়

শফিউল আলম বলেন, ‘এই আইনটি ভিন্নভাবে ছিল, দ্য নিউজ পেপার এমপ্লয়িজ কন্ডিশন সার্ভিস অ্যাক্ট-১৯৭৪ এই আইনের আওতায় এগুলো চলতো। এটার সঙ্গে শ্রম আইনের ওভারল্যাপিং হয়। সাংবাদিকদের শ্রম আইনের আওতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং ডেফিনেশনের মধ্যে শ্রমিক হিসেবে ডিফাইন করা হয়েছিল। ওই অংশটি ওখান থেকে বেরিয়ে এখানে এসেছে। শ্রমিক কথাটা থাকবে না।’ তিনি বলেন, ‘যারা গণমাধ্যমে কাজ করবেন তারা গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে পরিচিত হবেন।’

এক বছর চাকরির পর চালু হবে প্রভিডেন্ট ফান্ড

শফিউল আলম বলেন, ‘আইন অনুযায়ী, প্রভিডেন্ট ফান্ড গঠন করতে হবে। নিয়োগের এক বছর পর থেকে ভবিষ্যৎ তহবিলে মাসিক চাঁদা দিতে পারবেন। আগে দুই বছর চাকরি হলে ভবিষ্যৎ তহবিলে চাঁদা দিতে পারতেন। সর্বনিম্ন ৮ ও সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ অর্থ এই তহবিলে জমা রাখা যাবে। আগে ৭ শতাংশ অর্থ জমা রাখা যেত। মালিককে সমহারে টাকা রাখতে হবে।’

সপ্তাহে কাজ করতে হবে ৩৬ ঘণ্টা

নতুন আইনে সপ্তাহে কর্মঘণ্টা ৪৮ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৩৬ ঘণ্টা করা হয়েছে জানিয়ে শফিউল আলম বলেন, ‘এর থেকে বেশি কাজ করালে ওভারটাইম দিতে হবে।’

ছুটিতে যত সুবিধা

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘আগের ১০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি বাড়িয়ে ১৫ দিন করা হয়েছে। অর্জিত ছুটি ৬০ দিনের বদলে ১০০ দিন করা হয়েছে। ১১ দিনে একদিন করে জমা হবে। প্রত্যেক গণমাধ্যমকর্মী চাকরির ১৮ ভাগের এক ভাগ সময় অসুস্থতাজনিত ছুটি পাবেন। এ ক্ষেত্রে নিবন্ধিত রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র থাকতে হবে।’ গণমাধ্যমকর্মীরা এককালীন বা একাধিকবার সর্বোচ্চ ১০ দিন উৎসব ছুটি পাবেন জানিয়ে শফিউল আলম বলেন, ‘নারীরা সরকারি বিধি অনুযায়ী অর্থাৎ ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন। আগে আট সপ্তাহ মাতৃত্বকালীন ছুটি পেতেন নারী গণমাধ্যমকর্মীরা।’ ‘খসড়া আইন অনুযায়ী গণমাধ্যমকর্মীরা তিন বছর পরপর পূর্ণ বেতনসহ শ্রান্তি বিনোদন ছুটি পাবেন। গণমাধ্যমকর্মী বিধিমালা অনুযায়ী স্বাস্থ্য বীমা সুবিধা পাবেন।’

পাওনা আদায়ে আদালতে মামলা করা যাবে

শফিউল আলম বলেন, ‘যদি কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কাছে একজন গণমাধ্যমকর্মীর বকেয়া পাওনা থাকে তবে গণমাধ্যমকর্মী বা তার লিখিত ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি, মৃত গণমাধ্যমকর্মীর ক্ষেত্রে তার পরিবারের কোনো সদস্য বকেয়া পাওনা আদায়ে যথোপযুক্ত আদালতে মামলা করতে পারবেন।’ নতুন আইনে গণমাধ্যমকর্মীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি, এটি বিধি দিয়ে নির্ধারণ করা হবে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

আইন ভাঙলে মালিকের সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা

সচিব বলেন, ‘এই আইনে কোনো ধারা বা আইনের অধীনে প্রণীত বিধি লঙ্ঘন করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এর জন্য সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা ও সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে। জরিমানা আদায় না হলে জেল দিতে পারবেন আদালত।’ তিনি বলেন, ‘সরকার এই আইন লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়াসহ যে কোনো পর্যায়ে সরকার প্রদত্ত যে কোনো সুযোগ-সুবিধা স্থগিত বা বন্ধ করে দিতে পারবে।’

গণমাধ্যমের চাকরিবিধি পরিদর্শনে থাকবে কমিটি

আইনে পরিদর্শন কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে জানিয়ে শফিউল আলম বলেন, ‘পরিদর্শন কমিটির সদস্যরা পরিদর্শক হিসেবে গণ্য হবেন। পরিদর্শন কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে প্রত্যেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাকরিবিধি থাকবে, যা এই আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’ তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রচলতি আইন অনুসরণ করে নীতিমালা প্রণয়ন করে অভিযোগ নিরসন পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে।’ ‘গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য প্রজ্ঞাপন দিয়ে সরকার ওয়েজবোর্ড গঠন করবে। ওয়েজবোর্ডের সিদ্ধান্ত সব গণমাধ্যম মালিককে পালন করতে হবে’,- যোগ করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

স্যোশাল মিডিয়ায় গুজব শনাক্তে তথ্য মন্ত্রণালয়ে সেল গঠন

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (স্যোশাল মিডিয়া) গুজব শনাক্ত ও এ বিষয়ে জনগণকে সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য দিতে একটি মনিটরিং সেল গঠন করেছে সরকার। তথ্য অধিদফতরের (পিআইডি) কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত এই সেল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের বক্তব্য গণমাধ্যমকে জানাবে। মঙ্গলবার (০৯ অক্টোবর) সচিবালয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তারানা হালিম বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া গুজব ছড়ানোর একটা কারখানা হয়ে যায়। তথ্য সংগ্রহ ও তথ্য যাচাই শেষে তথ্য মন্ত্রণালয় প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়াকে অবহিত করবে। তথ্য মন্ত্রণালয় কোনো কনটেন্ট ডেভেলপ বা কোনোকিছু প্রচার করবে না। আমাদের কাজ জনগণকে সচেতন করা যে এটা গুজব, গুজবে কান দেবেন না। আমাদের কাজ এখানেই শেষ। তারানা হালিম বলেন, আমরা পুলিশিং করছি না। বাক রোধ করছি না, মনিটরিংও করছি না। অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো গুজব সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে তথ্য নিয়ে কনটেন্ট ব্লক বা কনটেন্ট ফিল্টার করার জন্য বিটিআরসিকে পাঠানো হবে।

‘জামাল খাসোগজিকে খুন করে খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়েছে’: ওয়াশিংটন পোস্ট

তুরস্ক সরকার মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে দাবি করেছে যে তাদের হাতে অডিও এবং ভিডিও প্রমাণ রয়েছে যে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগজিকে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটের ভেতর খুন করা হয়েছে।
মার্কিন সরকারি কর্মকর্তারা প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, এসব রেকর্ডিং-এ দেখা যাচ্ছে সৌদি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা কনসুলেটের ভেতরে জামাল খাসোগজিকে আটক করেছে, তারপর তাকে হত্যা করেছে এবং তার দেহকে খণ্ড-বিখন্ড করেছে। বিশেষভাবে অডিও রেকর্ডিং থেকে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সৌদি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের যোগসাজশের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলে তারা বলছেন। একজন মার্কিন কর্মকর্তা, যিনি এই অডিও এবং ভিডিও সম্পর্কে জানেন, তিনি ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, "জামাল খাসোগজি কনসুলেটের ভেতরে ঢোকার পর সেখানে কী ঘটেছিল তার একটা ধারণা ঐ অডিও রেকর্ড থেকে জানা যাচ্ছে।" "আপনি শুনতে পাবেন লোকজন আরবিতে কথা বলছে," নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা বলেন, "আপনি শুনতে পাবেন তাকে (জামাল খাসোগজিকে) জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, নির্যাতন করা হচ্ছে এবং পরে খুন করা হচ্ছে।" তুর্কী কর্তৃপক্ষ অন্য যে মার্কিন কর্মকর্তাকে এই প্রমাণ দেখিয়েছে, তিনি বলছেন এসব রেকর্ডিং থেকে জামাল খাসোগজিকে মারধরের প্রমাণ মিলেছে। জামাল খাসোগজি এক সময় সৌদি রাজপরিবারের খুব ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। কিন্তু বর্তমান সৌদি সরকার এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের কঠোর সমালোচনা করে তিনি সংবাদপত্রে লেখা ছাপিয়েছেন। তিনি ওয়াশিংটন পোস্টের একজন নিয়মিত কলামিস্ট ছিলেন। ওয়াশিংটন পোস্টের ঐ খবরে বলা হয়েছে, মি. খাসোগজি নিখোঁজ হওয়ার সাথে সাথেই তুরস্ক কেন সৌদি আরবকে দোষারোপ করেছে এসব প্রমাণ থেকে তার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, কিন্তু তুর্কী সরকার এসব অডিও এবং ভিডিও প্রকাশ করতে নারাজ কারণ এতে প্রমাণ হয়ে যাবে যে তুরস্ক একটি বিদেশি দূতাবাসের ভেতরে গুপ্তচরবৃত্তি চালাচ্ছে। সৌদি আরব এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। মি. খাসোগজির অন্তর্ধানের ঘটনা যৌথভাবে তদন্ত করার জন্য তারা তুরস্কের প্রতি প্রস্তাব দিয়েছে এবং আঙ্কারা সরকার সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেছে বলে ওয়াশিংটন পোস্ট খবর দিয়েছে।

কেন সৌদি কনস্যুলেটে এসেছিলেন জামাল খাসোগজি?

মি. খাসোগজির কনস্যুলেটে আসার উদ্দেশ্য ছিল, তার পূর্বতন স্ত্রীকে যে তিনি ডিভোর্স (তালাক) দিয়েছেন - এ মর্মে একটি প্রত্যয়নপত্র নেয়া, যাতে তিনি তুর্কী বান্ধবী হাতিস চেঙ্গিসকে বিয়ে করতে পারেন।মি. খাসোগজি তার মোবাইল ফোনটি মিস চেঙ্গিসের হাতে দিয়ে ভবনের ভেতরে ঢোকেন। মিজ চেঙ্গিস সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, মি. খাসোগজি এ সময় বিমর্ষ এবং মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন - কারণ তাকে ওই ভবনে ঢুকতে হচ্ছে। হাতিস আরো বলেন, মি. খাসোগজি তাকে বলেছিলেন যদি তিনি কনস্যুলেট থেকে বের না হন - তাহলে তিনি যেন তুর্কী প্রেসিডেন্ট রেচেপ তায়েপ এরদোয়ানের একজন উপদেষ্টাকে ফোন করেন। তিনি জানান, তিনি কনস্যুলেটের বাইরে অপেক্ষা করেন মঙ্গলবার স্থানীয় সময় দুপুর একটা থেকে মধ্যরাতের পর পর্যন্ত। কিন্তু তিনি জামাল খাসোগজিকে কনস্যুলেট থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেন নি। বুধবার সকালবেলা কনস্যুলেট খোলার সময় তিনি আবার সেখানে উপস্থিত হন। তখন পর্যন্ত মি. খাসোগজির কোন খোঁজ মেলেনি। তার পর থেকেই তিনি নিরুদ্দেশ।

এখনই পছন্দের পদে যাওয়ার উপযুক্ত সময়

নির্বাচনের আগে ব্যস্ততা বেড়েছে সচিবালয়ে

ফাইল ছাড়াতে দৌড়ঝাপ মন্ত্রী-এমপিদের ॥ পদোন্নতি ও বদলির তদবিরে কর্মকর্তারা

 একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি মাত্র তিন মাস। ফলে সরকারের শেষ সময়ে এসে কর্মব্যস্ততা বেড়েছে সচিবালয়সহ সরকারি দফতরগুলোতে। ফাইল ছাড় করাতে মন্ত্রী-এমপিসহ দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিশেষ করে প্রকল্প পাস করানো বা বদলির ফাইলগুলো নিয়ে তৎপর সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনকালীন সরকার গঠন ও তফসিল ঘোষণার আগেই প্রকল্প অনুমোদন এবং সংশোধনের হিড়িক পড়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। তার মধ্যে বেশির ভাগ প্রকল্পই ভোটাদের খুশি করার নির্বাচনি প্রকল্প। মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো তেমন যাচাই-বাছাই না করেই প্রকল্প পাঠাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশনে। আর পরিকল্পনা কমিশনও অতিরিক্ত চাপে তেমন বেশি যাচাই না করেই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) পাঠাচ্ছে। এতে করে প্রকল্পের মান রক্ষা ও ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া অনেক প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে, যা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প বেশি আসছে। কারণ জনপ্রতিনিধিরা চায় তাদের এলাকার প্রকল্প বেশি অনুমোদন পাক। এ জন্যই প্রকল্পের একটু চাপ আছে। তবে এসব প্রকল্পের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। বছরের এই সময়ে সাধারণত প্রকল্প চাপ একটু বেশি থাকে। জানা গেছে, অক্টোবর মাসের শেষ দিকে অথবা নভেম্বরের শুরুতে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা গঠিত হবে। আর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে নভেম্বরে। এই সময়ে সরকার তার ?রুটিন কাজের বাইরে কিছুই করতে পারবে না। ফলে অপেক্ষমাণ ফাইলগুলো এই সময়ের মধ্যেই ছাড় করাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মন্ত্রী-এমপি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিশেষ করে নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প, বিগত নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুত প্রকল্প এবং কর্মকর্তাদের বদলি ও পদোন্নতির কাজটি চলতি মাসের মধ্যেই সম্পন্ন করতে চাচ্ছেন সবাই। জানা গেছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ কিছু প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। উন্নয়নমূলক কাজ জনগণের সামনে তুলে ধরতে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। আর এসব প্রকল্পের বেশির ভাগই রাস্তা-ঘাট, গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের। যেহেতু সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচন হবে এবং উন্নয়ন প্রকল্পের দেখভালের দায়িত্ব রয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ওপর, ফলে তাদের মাধ্যমেই এসব প্রকল্পের অর্থ ব্যয় হবে। এ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবেই কাজগুলো চালিয়ে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়গুলো। সচিবালয় ঘুরে দেখা গেছে, ফাইল ছাড় করানো নিয়ে কর্মব্যস্ততার শীর্ষে রয়েছে শিক্ষা, প্রাথমিক গণশিক্ষা, বাণিজ্য, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, জনপ্রশাসন, এলজিআরডি, ভূমি, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, অর্থ, স্বরাষ্ট্র ও খাদ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়াও অন্য মন্ত্রণালয়েও কাজের ব্যস্ততা বেড়েছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রিসভায় উত্থাপনের জন্য অপেক্ষায় থাকা বিলগুলো নিয়ে ব্যস্ততা লক্ষ্য করা গেছে। এ বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০১৮ (সংশোধন) বিলটি সংসদে উত্থাপন করতে হবে। ইতিমধ্যে এটি মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেয়েছে। এছাড়া উন্নয়ন মেলায় আমাদের ১০ বছরের উন্নয়ন কাজগুলো উপস্থাপন করেছি। ফলে মন্ত্রণালয়ে কাজের বেশ তোড়জোড় আছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অধিশাখার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারের শেষ সময়ে পদোন্নতির আবেদন আসছে বেশি। অনেকের ধারণা এখনই পছন্দের পদে যাওয়ার উপযুক্ত সময়। নতুন সরকার আসার পর প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হতে সময় লাগবে। ফলে তখন পছন্দের পদ নাও পাওয়া যেতে পারে। তাই অনেকে পদোন্নতির আবেদন করছেন। সচিলায়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মাসের শুরু থেকে অপেক্ষমাণ ফাইলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তোড়জোড় বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তদবির ও সুপারিশ আসছে। এছাড়াও বদলি ও প্রশাসনিক কাজগুলো শেষ করার তাগিদ রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিব বলেন, সরকারের শেষ সময়ে কাজের চাপ থাকবেই। তফসিল ঘোষণা হলে অনেক কিছুতে বাধ্যবাধকতা থাকে। আমরা এখন কোনো ফাইল অপেক্ষমাণ রাখছি না। এখন কিছু বদলির সুপারিশ আছে, তবে এক্ষেত্রে গত পোস্টিংয়ের মেয়াদ বিবেচনা করে বদলি করা হবে। অন্যদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কাজের বেশ চাপ লক্ষ্য করা গেছে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের বদলির চাপ রয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এছাড়াও পদোন্নতির জন্য তদবিরও করছেন অনেকে। তবে নির্বাচনের আগে কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় গণপূর্ত, ভূমিসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের আগে শিক্ষা প্রশাসনে বড় ধরনের নিয়োগ ও পদোন্নতির তোড়জোড় চলছে। ইতিমধ্যে মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে বড় ধরনের নিয়োগ ও পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। আরো কয়েকটি নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশনার পর অপেক্ষমাণ যত পদোন্নতি ও নিয়োগ রয়েছে সব শেষ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে শিক্ষা ক্যাডারে সহযোগী অধ্যাপক থেকে রেকর্ড সংখ্যক ৪০৯ জনকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। পদ না থাকার পরও ৪০৯ জনকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। একইভাবে সহকারী থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়ার জন্য আগামী ১৪ অক্টোবর বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি (ডিপিসি) সভা ডাকা হয়েছে। পদ না থাকার পরও এ পদে হাজারের বেশি পদোন্নতি দেয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। এরপর চলতি মাসেই প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপকে আরো বড় ধরনের পদোন্নতি দেয়ার প্রস্তুতি সেরে রেখেছে মাউশি। ইতিমধ্যে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪২০ জন শিক্ষককে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৭১ জন সহকারী প্রধান শিক্ষক/শিক্ষিকা এবং ৫২ জন সহকারী মাধ্যমিক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা) ৩৮ হাজার ৮০০টি শিক্ষকের শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগ দিতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আর পদোন্নতি তালিকায় আছে শারীরিক শিক্ষার শিক্ষকরা। গত কয়েকদিনে সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঘুরে দেখা গেছে, মন্ত্রণালয়গুলো নতুন প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর কাজে সব থেকে বেশি ব্যস্ত। কারণ সরকারের শেষ সময়ে প্রকল্পের তেমন যাচাই-বাছাই হয় না। সহজেই পাস হয়ে যায়। শিক্ষা, গণপূর্ত, ভূমি, বিদ্যুৎ, সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগ, কৃষি, স্বরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দফতরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, সড়ক ও সেতু এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে  প্রায় অর্ধশতাধিক  প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর জন্য কাজ চলছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রায় ২০০ প্রকল্প একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তার মধ্যে ১০০’-এর মতো প্রকল্প প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে, আর বাকিগুলো প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অথবা অ্যাপ্রেইজাল সভা পর্যায়ে রয়েছে। আরও প্রকল্প আসতেই আছে। প্রতিদিনই কয়েকটি করে প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে আসছে। আর এসব প্রকল্প অনুমোদনের জন্য তদবির করছেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও মেয়রসহ প্রকল্প পরিচালকরা। এদিকে চলতি সপ্তাহে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অনুমোদন পেয়েছে ৩৭টি প্রকল্প। গত মঙ্গলবার নরসিংদীর পলাশে নতুন একটি ইউরিয়া সার কারখানা; চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল আনতে পাইপলাইন স্থাপন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস স্থাপনসহ ২০টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে মোট খরচ ধরা হয়েছে ৩২ হাজার ৫২৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে ১৫ হাজার ৪৯৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, বাস্তবায়নকারী সংস্থা থেকে আসবে ১১ হাজার ৬৫৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং বিদেশি সহায়তা থেকে আসবে ৫ হাজার ৩৭৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অপরদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরে-বাংলা নগরে এনইসিতে একনেক সভায় ফরিদপুর-ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা জাতীয় মহাসড়ক চারলেনে উন্নীতকরণসহ ১৭ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনের আগে সরকারের শেষ সময়ে প্রকল্প পাসের হিড়িক পরে যায়। নির্বাচন সামনে থাকায় সবাই চাচ্ছেন তাদের প্রকল্প অনুমোদন করাতে। স্বাভাবিকভাবেই সংসদ সদস্যরা তাদের এলাকার প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যস্ত হয়ে উঠেন। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় নিয়মনীতিও মানতে নারাজ তারা।

জজ মিয়া নয়— ‘জালাল’, দুর্ধর্ষ নামের আড়ালে হারায় যে নাম 

 ‘বাপ মায়ের দেওয়া নাম – মোহাম্মদ জালাল। সিআইডি কর্মকর্তারা নামের সঙ্গে জজ মিয়া নামটি যুক্ত করে দিয়ে সে সময় আমাকে বলে, নৃশংস ঘটনার আসামিদের নাম দুর্ধর্ষ হতে হয়। আর সে কারণেই বিনা অপরাধে আমাকে ওই নামে আসামি সাজানো হয়। বিনাবিচারে ৫ বছর জেল খাটলাম। যারা আমাকে এই অমানবিক শাস্তি দিল তাদেরও শাস্তি চাই। এখনও নিরাপত্তাহীনতায় ঘুরে বেড়াচ্ছি।’

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার সাজানো আসামি জজ মিয়া (জালাল) সারাবাংলার কাছে এভাবেই নিজের কথা তুলে ধরেন। জীবনের পাঁচটি বছর হারানো আর নির্মম নির্যাতনের শিকার জজ মিয়া (জালাল) বলেন, ‘আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই, হারানো পাঁচবছরের ক্ষতিপূরণ আর নিরাপত্তা চাই রাষ্ট্রের কাছে। ’ জজ মিয়া জানান, টানা এক মাস সিআইডি অফিসে রেখে তাকে কীভাবে নির্যাতন করা হয়। পরে জীবন বাঁচাতেই তিনি আদালতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। জজের শর্ত অনুযায়ী তার মাকে নিয়মিত টাকা দিতেন সিআইডি’র কর্মকর্তা এসপি রুহুল আমিন। তিনি বলেন, ‘কোর্টে সাক্ষী দিয়ে আইছি, সাক্ষী দেওয়ার সময় নিজের নিরাপত্তার কথা জানাইছি। এই নিয়ে কোনো ব্যবস্থা হয় নাই। কোর্ট এটা বিবেচনায় রাখছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার নিরাপত্তায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা কইরা আইছি, মন্ত্রী বলেছেন, তুমি পরে আইস, তোমার সাথে কথা হইব। ওনার সঙ্গে ওইভাবে কোনো কথা হয় নাই।’ রায়ের দিন কোর্টে যাবেন কি না জানতে চাইলে জজ মিয়া বলেন, ‘না। আমি যাব না।’ রাষ্ট্র যেভাবে প্রটেকশন দেওয়ার কথা ছিল, সেভাবে কি দিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র ওইভাবে আমাকে দেখেনি। রাষ্ট্র যদি ওইভাবে আমাকে দেখত তাহলে সেইভাবে আমাকে সেভ এ রাখত। কিন্তু কিছুই ঠিক নাই। এই মামলার পর আমার ঘরবাড়ি বিক্রি করে দেওয়া হইছে। আমার তো কিছুই নাই। ওটা আমি পুণর্বাসনের আবেদন জানাইছি।’ আপনি তো সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, সরকারের কাছেই তো চাইছি। বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে সরকারের কাছে আবেদন করেছি।’ ‘পাঁচবছর জেল খাটছি। জেল থেকে বের হওয়ার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে সরকারের কাছে তুলে ধরছি, জানাইছি। আমাকে পুণর্বাসন করা হোক, আমাকে একটা চাকরি দেওয়া হোক, যেন আমি স্বাভাবিকভাবে চলতে পারি। ওইগুলোর কিছুই হয়নি। সামনে মামলার রায়, এখন আমি আবার সরকারের কাছে তুলে ধরতেছি। আমি যে পাঁচটা বছর জেল খাটছি বিনা বিচারে, আমি অপরাধী না হইয়াও আমাকে অপরাধী সাজাইছে, এটার যেন ক্ষতিপূরণ আমি পাই। আর আমাকে সরকার যেন স্বাভাবিক জীবনযাপন করার জন্য পুণর্বাসনের ব্যবস্থা করে দেয়, চাকরি দিয়ে দেয়। এটাই সরকারের কাছে আমার চাওয়া।’ আপনাকে নিয়ে মানুষজন প্রশ্ন তোলে না? জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, নানানজনে নানান কথা বলে যে, বিএনপি সরকার তাকে এক রকম রেখেছিল। আবার আওয়ামী লীগ সরকার অন্যভাবে রাখছে। আসলে সত্য কোনটা?’ আপনার সাথেই কেন এমন হলো? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ আমি তো পুলিশের সোর্স ছিলাম। ঘটনার সময় গুলিস্তানে আমার দোকান ছিল। যারা আমাকে গ্রেফতার করেছিল তারা সবাই সিআইডির ছিল। কিছুদিন আগে তারা তেজগাঁও থানা থেকে বদলি হয়ে সিআইডিতে আসে।’ কেউ না কেউ তথ্য না দিলে তো হুট করে আপনাকে ধরবে না? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাকে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করেছে। আশেপাশে কেউ হয়ত দেখায় দিয়েছে। জয়নাল আবেদীন ফারুকের বাংলোতে তারা থাইকা পরে আমার গ্রামে আইসা রেড দিছে। ওয়ার্ড কমিশারসহ যাদেরকে ধরেছিল তাদের প্রথম আমি সিআইডিতে দেখেছি। আমাকে তো চোখ বেঁধে নিয়ে এসেছে। রিমান্ডের জন্য আপনাকে আদালতে তোলেনি পুলিশ জানতে চাইলে জজ মিয়া বলেন, ‘পুলিশ কোর্টে যাচ্ছে পিটিশন লইয়া, কোর্ট থেকে রিমান্ড লইয়া আইতাছে। হেগোর আসামি না নিলেও চলে। মুন্সি আতিক ও পুলিশ সুপার রুহুল আমিনকেও দেখেছি।’ আপনার নামে মামলা দিয়ে লাভ কি বলে মনে করেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে সাজায়ে মামলাটা ভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়া মামলাটার রায় দেরি করেছে। তা না হলে আরও আগে বিচার হইত।’ সিআইডিতে আর কার কার সঙ্গে দেখা হয়েছে জানতে চাইলে জজ মিয়া বলেন, ‘সিআইডিতে অনেকেই এসেছে। আইসা রুহুল আমিন স্যারের সাথে কথাবার্তা বলে তারা চলে যাইত। যখন বড় অফিসার আসত, তখন আমারে হাজির করত। খালি ইন্টারপোলের কাছে আমাকে ফেস করছে এভাবে যে, ইন্টারপোল আইতাছে, আমি তোর দিকে আঙ্গুল উঠাইলে, তুই তাদের দিকে হাত জোর করে হু বা হ্যাঁ করবি। এরপর যে রিপোর্ট দিছে, ইন্টারপোল তা গ্রহণ করেনি বলে শুনেছি। কারণ তারা তো আমার সাথে কথাই বলতে পারে নাই। ’ ওরা কারা ছিল জানতে পেরেছেন? জবাবে জজ মিয়া বলেন, ‘ওরা বিদেশি ছিল। এসে আমার সঙ্গে দেখা করে। এফবিআই ছিল নাকি অন্য কেউ ছিল তা জানি না। তবে ওদের বিদেশিদের মতোই মনে হইছে আমার।’ আপনাকে কে ধরে এনেছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে ধরে এনেছিলেন পুলিশের মুন্সি আতিক, রশিদ আর রুহুল আমিন।

ইয়াবা ঘটিত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজা

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন

ইয়াবা (অ্যামফিটামিন) পরিবহন, কেনাবেচা, ব্যবসা, সংরক্ষণ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তান্তর, সরবরাহ ইত্যাদি অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করতে হবে। অবশ্য ইয়াবার পরিমাণ অনুযায়ী সাজা কমবেশি দেওয়া হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই আইনের অধীন অপরাধ সংঘটনে অর্থ বিনিয়োগ, সরবরাহ, মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতা দিলেও একই ধরনের শাস্তি পেতে হবে। এমন বিধান রেখে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আজ সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনের এই খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম। দেশব্যাপী চলমান মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে সরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে কঠোর সাজা রেখে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। গত কয়েক মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অধিকাংশই নিহত হয়েছেন পুলিশ ও র‍্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’। এ-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনটি ১৯৯০ সালের। হেরোইন ও কোকেন উদ্ভূত মাদকদ্রব্যের জন্যও ইয়াবার মতোই কঠোর শাস্তি রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত এই আইনে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, হেরোইন, কোকেন, কোকো মাদকের পরিমাণ ২৫ গ্রামের বেশি হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। আর ২৫ গ্রামের নিচে হলে কমপক্ষে দুই বছর ও সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে। প্রস্তাবিত আইনানুযায়ী, মাদকাসক্ত ব্যক্তির ডোপ টেস্টে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে কমপক্ষে ৬ মাস ও সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হবে। এ ছাড়া মন্ত্রিসভার বৈঠকে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন-২০১৮-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। ‘শ্রমিকবান্ধব’ করে কিছুদিন আগেই আইনটির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। সেটিই এখন আইনি যাচাই-বাছাই (ভেটিং) করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যুগোপযোগী করে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড আইন-২০১৮-এর খসড়াও নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ ছাড়া সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ নারী ফুটবলে নেপালকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৮ নারী ফুটবল দলকে অভিনন্দন জানিয়েছে মন্ত্রিসভা।

মাদকদ্রব্যের চেয়ে ভয়ংকর নেশা

দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে ৮ কোটি ৮ লাখ। এর মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই বেশি। আজকাল এটি তরুণদের কাছে নেশা ও পেশায় পরিণত হয়েছে। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীরা জড়িয়ে পড়ছে ইন্টারনেট নামক ভয়ংকর এই নেশায়। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইমো, ওয়াটঅ্যাপ এই নেশার এক একটি অভিন্ন নামমাত্র। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জিং এই পৃথিবীতে বাস্তববাদী জীবন থেকে পরাবাস্তব জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এই নেশা। তরুণদের মন ও মগজে সারা দিন ঘুরপাক খাচ্ছে ইন্টারনেটের অবাধ দুনিয়া। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিযোগিতায় ১ম হওয়ার চেয়ে ফেসবুক সেলিব্রেটি হওয়া এখন তাদের কাছে বেশি আনন্দের। জীবনের রঙিন স্বপ্ন বিলীন করে দিচ্ছে আবর্জনার স্তূপে। এখন এটি হয়ে পড়ছে মাদকদ্রব্যের চেয়ে বেশি ভয়ানক, আণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী। পড়ার টেবিল, ক্লাস ও কোচিংয়ে শিক্ষকের নজর ফাঁকি দিয়ে, ঘরের কোণে দরজা বন্ধ করে, রাস্তায় হাঁটার ছলে, গল্পের আসরে বারবার ঢু মারছে ইন্টারনেটের রঙিন জগতে। সেই রঙিন জগৎ তাকে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। সেখানকার হাজারও অন্ধকার তাকে নিয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ অপরাধ জগতে। এর করুণ পরিণতিতে আমরা দেখি কীভাবে নীরবে নিভৃতে পাড়ার ভালো ছেলেটিও হঠাৎ করে আত্মপ্রকাশ করে একজন ভয়ংকর অপরাধী হিসেবে। কেউ বুঝে উঠার আগেই ততদিনে সে অপরাধ জগতের ডন হয়ে যায়। তারপর আর ফিরে আসার উপায় থাকে না। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে ডেটিং, ব্ল্যাকমেইলিং, পরকীয়া, অশ্লীলতা ও নষ্টামির ছড়াছড়ি এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদসহ বড় বড় অপরাধের সব ফিরিস্তি। ফলে নীতি-নৈতিকতাহীন ও জ্ঞানের আলো বর্জিত এক মুমূর্ষু জাতি গড়ে উঠছে যাদের সুন্দর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। দুচোখে কোনো স্বপ্ন নেই, পৃথিবী গড়ার মন্ত্র নেই। আছে কেবল অন্ধকার আর হতাশার কালো ছায়া। সেই কালো নিভিয়ে দেয় জাতির সমগ্র আলো। জাতির ভেতরে ও বাইরে হয়ে ওঠে বিষাদময়। তরুণ প্রজন্মকে ইন্টারনেট জগতের এই ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা গেলে রক্ষা পাবে ভবিষ্যৎ, রক্ষা পাবে জাতি। মানবতার ধর্ম ইসলাম তরুণদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। মানবজাতির শ্রেষ্ঠ সংস্কারক হজরত মুহাম্মদ (সা.) একটি আদর্শবাদী ও নৈতিকতাসম্পন্ন জাতি গঠনে তরুণদের দক্ষতা ও যোগ্যতার আলোকে গড়ে তোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি একটি মূলনীতি ঘোষণা করেছেন, ‘লা দারারা ওলা দিরারা- কারও ক্ষতি কর না, নিজেকে ক্ষতির মধ্যে ফেল না।’ (তিরমিজি)। মহাগ্রন্থ কোরআনুল কারিমে আল্লাহতায়ালা সময়ের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে মানবজাতিকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার পথ বাতলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিশ্রুতি সময়ের। নিশ্চয়ই মানবজাতি এক ভয়াবহ পরিস্থিতির ভেতরে রয়েছে। এ ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে ভালো কাজ করে যেতে হবে। সঠিক পথের দিকে দিকনির্দেশনা দিতে হবে। নির্দেশনা দিয়ে যেতে হবে বাধা পেরিয়ে পথ চলার’ ( সূরা আল আসর)। সূরা আসরের নির্দেশনা অনুযায়ী সময়ের অপচয় থেকে তরুণদের রক্ষা করে মানবতার কল্যাণে তাদের মেধা, শ্রম ও যোগ্যতাকে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে রাষ্ট্রকে। তাদের সময়ের সব নোংরামি ও ক্ষতিকর কাজ থেকে দূরে সরিয়ে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। ফেসবুকে সময় নষ্ট করা আজকের প্রজন্মকে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় নিয়ে আসা খুবই জরুরি। লেখক : শিক্ষক, আল আবরার মডেল মাদ্রাসা

বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এই ঋণের বড় অংশই...

দুর্নীতির টাকা সরানোর হিড়িক

নির্বাচনী বছরে বাড়ছে টাকা পাচার

দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির, অথচ ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বাড়ছে। একইভাবে বেপরোয়া গতিতে বাড়ছে আমদানি ব্যয়ও। এটিই রহস্যজনক। বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত এ রহস্যের জাল ভেদ করে দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে দুর্নীতির টাকা সরানোর হিড়িক পড়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানির নামে বিদেশে পাচার হচ্ছে টাকা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টেও এমন তথ্য উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, টাকা পাচারের মূল কারণ আস্থাহীনতা এবং নতুন করে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যারা ক্ষমতার সীমাহীন অপব্যবহার ও দুর্নীতি করে রাতারাতি বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন, তারা ভবিষ্যৎ দুশ্চিন্তায় দুর্নীতির টাকা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া নির্বাচনী বছরে এ রকম নানা ভয়ে অনেকে টাকা বিদেশে পাচার করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রফতানি ও রেমিটেন্স (প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ) মিলিয়ে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এসেছে, অফিশিয়াল হিসাবেই আমদানি তার চেয়ে অনেক বেশি। সংকট নিরসনে অর্থ পাচার ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। এ ক্ষেত্রে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংস্থাগুলোকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ তাদের। জানা গেছে, বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির হার যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে আমদানি ব্যয় ছিল ৫৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু রফতানি আয় ছিল ৩৬ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন রেমিটেন্স এসেছে ১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার। আর রফতানি এবং রেমিটেন্স মিলিয়ে ৫১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে রফতানি ও রেমিটেন্স মিলিয়েও আমদানি ব্যয়ের চেয়ে ২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার কম। অর্থাৎ দেশে যে হারে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে, দেশ থেকে বিদেশে যাচ্ছে তার চেয়ে বেশি। এটি অস্বাভাবিক। গত ১০ বছরেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আমদানি ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, তা স্বাভাবিক নয়। এখানে টাকা পাচারের যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, নির্বাচনী বছরে টাকা পাচার বাড়ে। কারণ, যাদের কাছে উদ্বৃত্ত টাকা আছে, তারা দেশে রাখাকে নিরাপদ মনে করেন না। সম্পদশালীরা মনে করেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হলে তাদের জন্য সমস্যা হতে পারে। এ কারণে আমদানিসহ অন্যান্য মাধ্যমে পুঁজি পাচার করা হয়। তিনি বলেন, এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পাচার রোধে তৎপরতা বাড়াতে হবে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টে বিদেশে বাংলাদেশিদের টাকা পাচারের তথ্য চলে এসেছে। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) রিপোর্ট অনুসারে গত দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৬ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ বছরে পাচার হয়েছে ৭৪ হাজার কোটি টাকা। পাচারের তথ্য এসেছে সুইস ব্যাংকের রিপোর্ট, পানামা ও প্যারাডাইজ পেপারসে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি কয়েকটি গ্রুপের কানাডা ও সিঙ্গাপুরে বিশাল অঙ্কের সম্পদের তথ্যও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। টাকা পাচারের জন্য সুনির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়কে দায়ী করছে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। এর মধ্যে রয়েছে- বিনিয়োগের পরিবেশের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা, পাচারকারীদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও প্রভাবশালী মহলের নিবিড় সম্পৃক্ততা, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর নজরদারির অভাব, দেশে পুঁজি নিরাপত্তার অভাব এবং বেপরোয়া দুর্নীতি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা অনুসারে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে কয়েকটি পদ্ধতিতে টাকা পাচার হয়। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে বেপরোয়া পদ্ধতিতে টাকা বিদেশে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ট্রাংকে ভরে সরাসরি ডলার নিয়ে যায় প্রভাবশালী মহল। আমদানির নামে এলসি খুলে বিল পরিশোধ করছে, কিন্তু কোনো পণ্যই দেশে আসছে না। বড় অঙ্কের অর্থ পাচারে সাম্প্রতিক সময়ে এটিই অন্যতম পন্থা। এ ছাড়া আমদানিতে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রফতানি মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং) এবং হুন্ডির মতো পুরনো পদ্ধতিগুলো তো আছেই। সম্প্রতি টাকা পাচারের আরও একটি বড় মাধ্যম হয়ে দেখা দিয়েছে রেমিটেন্স। বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিটেন্স একটি চক্র সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দেয়। আর এ দেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকায় এর দায় শোধ করা হয়। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপ অনুযায়ী এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে না। ওইগুলোও পাচার হয়ে বিদেশের কোনো না কোনো ব্যাংকে রাখা হচ্ছে। জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য যুগান্তরকে বলেন, দেশের ভেতরে অস্থিতিশীলতার কারণে নির্বাচনকালীন সময় টাকা পাচার বাড়ে। আর পাচার বন্ধের ব্যাপারে সরকারের কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আছে বলে মনে হয় না। এ ধরনের সিদ্ধান্ত থাকলে পানামা পেপারস এবং প্যারাডাইজ পেপারসে যাদের নাম আছে, তাদেরকে ধরে এনে শাস্তি দেয়া হতো। তিনি বলেন, পত্রিকায় নাম-ঠিকানাসহ বিস্তারিত ছাপা হয়েছে। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় সংস্থা এত লোকজনের বিরুদ্ধে খোঁজখবর নেয়, কিন্তু পাচারকারীদের খোঁজখবর নেয় না। তার মতে, সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না থাকলে এনবিআর যতই বাহ্যিক তৎপরতার কথা বলুক, তাতে কোনো লাভ হবে না। তিনি বলেন, টাকা পাচার রোধে নির্বাচনের আগে কিছু করবে বা কোনো পদক্ষেপ নেবে বলে মনে হয় না। কিন্তু অন্তত এতটুকু আশা করছি, নির্বাচনী ইশতেহারে দলগুলো বলবে, আমরা অবৈধভাবে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে যথোপযুক্ত, দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ নেব। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৮ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ প্রায় ৮৯ হাজার কোটি টাকা। অবলোপন মিলিয়ে তা ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এ ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এই ঋণের বড় অংশই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুসারে চলতি বছরের ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছে ৯৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৯৯ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা। এ হিসাবে আলোচ্য বছরে বিনিয়োগ নিবন্ধন কমেছে। একইভাবে গত ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত বিদেশি ও যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগের নিবন্ধন হয়েছে ৯৩২ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১ হাজার ৩৭৭ কোটি ডলার। এ হিসাবে বিদেশি বিনিয়োগও কমেছে। আর এই পরিমাণ নিবন্ধন হলেও বাস্তবতা আরও করুন। নিবন্ধনের পর প্রকৃত বিনিয়োগ একেবারে কম। চার বছরে মোট দেশজ উৎপাদন, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে প্রায় দেড় শতাংশ। এই হিসাবে বিনিয়োগ বাড়ার কথা ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু বেড়েছে আড়াই শতাংশের কম। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বিনিয়োগের সঙ্গে প্রবৃদ্ধি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। জানতে চাইলে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, তিন কারণে বিদেশে টাকা পাচার হতে পারে। প্রথমত, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু লোক বিদেশে টাকা নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা পাচার হতে পারে। এ ছাড়াও বিনিয়োগ মন্দার কারণেও ব্যবসায়ীদের টাকা বিদেশে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, কারণ যাই হোক, টাকা পাচার হওয়া দেশের জন্য সুখবর নয়। তার মতে, সরকারের দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে- টাকা ফিরিয়ে আনা এবং জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, এনবিআর এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকে একযোগে কাজ করতে হবে।

পরকীয়া অপরাধ নয়, স্বামী প্রভু হতে পারেন না স্ত্রীর, রায় সুপ্রিম...

পরকীয়া অপরাধ নয়, স্বামী প্রভু হতে পারেন না স্ত্রীর, রায় সুপ্রিম কোর্টের

পরকীয়া ফৌজদারি অপরাধ নয়। ইংরেজ শাসনকালে তৈরি এই আইনের ৪৯৭ ধারা অসাংবিধানিক। রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, এই আইন স্বেচ্ছাচারিতার নামান্তর। মহিলাদের স্বাতন্ত্র্য খর্ব করে। স্বামী কখনই স্ত্রীর প্রভু বা মালিক হতে পারেন না। ব্রিটিশদের তৈরি করা ১৮৬০ সালের আইনকে চ্যালেঞ্জ করে একটি মামলার প্রেক্ষিতেই ২৭ সেপ্টেম্বর শীর্ষ আদালতের এই রায়। রায়ের পর আবেদনকারীর আইনজীবী রাজ কালিশ্বরম বলেন, ‘‘এই রায় ঐতিহাসিক। আমি খুশি।’’ ১৮৬০ সালে তৈরি ওই আইনের ৪৯৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি কোনও মহিলার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করলে এবং ওই মহিলার স্বামীর অনুমতি না থাকলে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল এবং জরিমানা বা উভয়ই হতে পারে। এই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেন জনৈক যোশেফ শাইন। ৪৯৭ ধারাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে রায়দানের সময় প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, ‘‘এই আইন জোর করে চাপিয়ে দেওয়া এবং স্বেচ্ছাচারিতার সমান। এখন এটা বলার সময় হয়েছে যে, কোনও মহিলার স্বামী তাঁর প্রভু বা মালিক হতে পারেন না।’’ কোনও নারী কখনওই স্বামী বা কারও সম্পত্তি হতে পারেন না বলেও পর্যবেক্ষণ সাংবিধানিক বেঞ্চের। রায়ে আরও বলা হয়েছে, কারও যৌনতার অধিকারকে আইনি পরিসরে বেঁধে দেওয়া ঠিক নয়। কাউকে সমাজের ইচ্ছানুযায়ী ভাবতে এবং কাজ করতে বাধ্য করার অর্থ তাঁর স্বাধীনতা খর্ব করা। এটা মহিলাদের অধিকার রক্ষা এবং সমানাধিকারের পরিপন্থী। মামলার প্রেক্ষিতে পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠিত হয়। প্রধান বিচারপতি ছাড়াও বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি রোহিংটন ফলি নরিম্যান, বিচারপতি এ এম খানউলকর, বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় এবং বিচারপতি ইন্দু মলহোত্র। গত পয়লা অগস্ট শুনানি শুরু হয়। সরকার পক্ষের আইনজীবী ছিলেন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল পিঙ্কি আনন্দ। মামলাকারীর পক্ষে সওয়াল করেন আইনজীবী রাজ কালিশ্বরম এবং সুবধত এমএস। গত পয়লা অগস্ট মামলার শুনানি শুরু হয়। শেষ হয় আট অগস্ট। ওই দিনই ২৭ সেপ্টেম্বর রায়দানের দিন নির্ধারিত করে দেয় প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ।

সামাজিক কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত বিষয়ে শ্রমিকদের অসন্তোষের মাত্রা অনেক বেশি

দেশের স্বনামধন্য একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন আলাউদ্দিন মিয়া (ছদ্মনাম)। হেলপার হিসেবে যোগদানের পর তিনি টানা ১২ বছর কাজ করেছেন একটি কারখানায়। এ সময় তিনি কোনো ছুটি ভোগ করেননি। প্রতিদান হিসেবে কোম্পানি তাকে প্রতি বছর পুরস্কৃত করেছে।
আইনত প্রাপ্য ছুটি ভোগ না করার এমন উদাহরণ পোশাক শিল্পে অনেক। কারখানায় নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত কাজ করাই এ খাতে স্বাভাবিক বিষয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পোশাক খাতের ৯৬ শতাংশ কর্মীই দৈনিক নির্ধারিত ৮ ঘণ্টার বেশি সময় কারখানায় কাজ করেন। বিনিময়ে তারা পান বেতনের অতিরিক্ত অর্থ। ছুটি না নেয়া ও অতিরিক্ত কাজ করা পোশাক কারখানায় স্বাভাবিক হলেও খাতসংশ্লিষ্টরা বিষয়টিকে পোশাক শিল্পের অন্যতম বড় কমপ্লায়েন্স চ্যালেঞ্জ মনে করছেন। পণ্য জাহাজীকরণের জন্য স্বল্প সময় পাওয়া ও সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই শ্রমিককে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয় বলে তারা জানান। দেশের পোশাক শিল্পের সামাজিক কমপ্লায়েন্স নিয়ে এক সমীক্ষায় খাতটির এসব চ্যালেঞ্জ ও দুর্বলতার দিক উঠে এসেছে। ‘রেডিমেড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ ইন বাংলাদেশ: এ স্টাডি অন সোস্যাল কমপ্লায়েন্স’ শীর্ষক সমীক্ষাটি করেছেন এ খাতেরই অন্যতম প্রতিষ্ঠান ব্যাবিলন গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ হাসান। পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্ট গবেষকের পরিচালিত সমীক্ষায় খাতটির অন্দরমহলের কর্মী-ব্যবস্থাপকদের তথ্য, পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি উঠে এসেছে বিশেষজ্ঞ মতামত ও বিশ্লেষণ। বই আকারে প্রকাশিত সমীক্ষাটির মোড়ক উন্মোচন হয়েছে গতকাল। ২০১৫ সালে পরিচালিত মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষায় দেখা যায়, কর্মঘণ্টার বিষয়টি পোশাক শিল্পের বিরাট চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এ খাতের ৯৬ শতাংশ কর্মীই নির্ধারিত সময়ের পরও কারখানায় কাজ করেন। ৬২ শতাংশ শ্রমিক দৈনিক ১২ ঘণ্টা কাজ করেন। ২৩ শতাংশ শ্রমিক কাজ করেন ১০ ঘণ্টা। ১২ শতাংশ শ্রমিক দৈনিক ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কাজ করেন। যদিও শ্রম আইনের ১০২ ধারায় প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কোনো অবস্থাতেই সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমিকের কাজের সন্তুষ্টি ও ব্যবসার প্রবৃদ্ধিই সামাজিক কমপ্লায়েন্সের মাধ্যমে কারখানায় প্রতিফলিত হয়। জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত বিষয়ে শ্রমিকদের অসন্তোষের মাত্রা অনেক বেশি। ব্যবসা ও রফতানি প্রবৃদ্ধি ঘটলেও শ্রম ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে অসন্তোষ রয়ে গেছে। জরিপে উত্তরদাতাদের সবাই বলেছেন, ৮ ঘণ্টা কাজের মজুরি জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট নয়। মজুরি কম হওয়ায় তারা অতিরিক্ত কাজ করতে আগ্রহী থাকেন। জীবনধারণের মৌলিক চাহিদাগুলো নির্ধারিত মজুরিতে মেটানো সম্ভব নয় বলে তারা উল্লেখ করেন। তবে অতিরিক্ত সময়ের কাজ বা ওভারটাইমের জন্য আইনত প্রাপ্য পারিশ্রমিক পোশাক শ্রমিকরা পান না। দেখা গেছে, ওভারটাইমের জন্য দ্বিগুণ পারিশ্রমিক পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয় না। বড় কারখানাগুলো অতিরিক্ত সময়ের কাজের জন্য আইনত নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী ভাতা দিয়ে থাকে। এ বিষয়ে এক প্রশ্নে উত্তরদাতা শ্রমিকদের ২২ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা ওভারটাইমের জন্য আইন অনুযায়ী দ্বিগুণ পরিমাণ ভাতা পান না। কারখানাপ্রধানদের কাছে অতিরিক্ত সময় কাজের প্রয়োজনীয়তার যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলেছেন, মূলত দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা ও রফতানির জন্য প্রাপ্ত সময়স্বল্পতার অতিরিক্ত সময় কাজ করাতে হয় শ্রমিকদের। শ্রমিকের অতিরিক্ত কাজের কারণ সম্পর্কে পোশাক কারখানার কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপক ও কারখানাপ্রধানরা সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা ও পণ্য জাহাজীকরণের জন্য লিড টাইমের স্বল্পতাকে দায়ী করেছেন। তাদের ২১ শতাংশ জানিয়েছেন, অতিরিক্ত কাজের মূল কারণ দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা। ২০ শতাংশ বলেছেন, শর্ট লিড টাইম বা রফতানির জন্য বেঁধে দেয়া নির্ধারিত স্বল্প সময় অতিরিক্ত কাজের কারণ। ১৯ শতাংশ ব্যবস্থাপক শ্রমিকের অদক্ষতাকেই নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত কাজের কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন। ১৭ শতাংশ বলেছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কারণে শ্রমিককে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। এছাড়া পণ্যের নকশা পরিবর্তন ও বিভিন্ন উপকরণ অনুমোদন-সংক্রান্ত কারণে শ্রমিককে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয় বলে জানিয়েছেন যথাক্রমে ১০ ও ১৫ শতাংশ উত্তরদাতা। সরবরাহ চেইনের দুর্বলতার বিষয়ে ব্যবস্থাপকরা জানান, বিভিন্ন ক্রেতার নিজস্ব শর্ত ও চাহিদা থাকে। যেমন একেকটি শার্ট তৈরিতে ছোট-বড় প্রায় ২০টি উপকরণ প্রয়োজন হয়। এসব উপকরণের জন্য কমপক্ষে ২০ সরবরাহকারকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এভাবে পাঁচটি অর্ডার থাকলে একটি কারখানাকে একই সময়ে ১০০ সরবরাহকারকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এ প্রসঙ্গে সমীক্ষা পরিচালনাকারী মোহাম্মদ হাসান বলেন, পোশাক শিল্পের কমপ্লায়েন্সের বিষয়গুলো বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন হয়েছে। যেমন— যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ারের ঘটনার পর সিকিউরিটি কমপ্লায়েন্স যুক্ত হয়, রানা প্লাজার পর যুক্ত হয়েছে ভবন ও অগ্নিসংক্রান্ত কমপ্লায়েন্স। গবেষণায় দেখা গেছে, পোশাক কারখানায় সামাজিক কমপ্লায়েন্সের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শ্রমঘণ্টা। আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী একজন কর্মী বছরে ৩৫ দিন বিভিন্ন ছুটি ভোগ করার অধিকার রাখেন। তবে ৯৫ শতাংশ কর্মী আমাদের বলেছেন, তারা এ ছুটিগুলো পান না। কারণ উৎপাদনের চাপ ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা থাকে। মোহাম্মদ হাসান বলেন, আইনেই এমন ধারা আছে, যার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে শ্রমিকদের ছুটি না নিতে প্রণোদিত করা হচ্ছে। ছুটির পরিবর্তে শ্রমিককে টাকা নিতে আগ্রহী করা হচ্ছে। এছাড়া নানা রকমের বাধা-বিপত্তির কারণেও শ্রমিকরা ছুটি নিতে পারেন না। আমি দেখেছি, যিনি ছুটি নেন না তাকে পুরস্কৃত করা হয়। পোশাক কারখানায় প্রচলিত ট্রেড ইউনিয়ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা কম বলে সমীক্ষার সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে। এজন্য বিকল্প হিসেবে অংশগ্রহণমূলক কমিটির কার্যকারিতা বৃদ্ধির পরামর্শ দেয়া হয়েছে। একটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিও পোশাক শিল্পের সামাজিক কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রে সমস্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি সংস্থা, কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বের বোঝা চাপানো হয়েছে উল্লেখ করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ফায়ার সার্ভিস এবং নিপসমের মতো সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে প্রকাশনায়। শ্রমিকদের ঘন ঘন কারখানা বদল ঠেকাতে সার্ভিস বুক কার্যকর করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। এছাড়া কমিউনিটি রেডিওর ব্যবহার করতে সুপারিশ করা হয়েছে শ্রমিক অধিকারবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে। বিদেশী কর্মীর আধিক্য কমাতে স্থানীয়দের দক্ষতা উন্নয়নের পরামর্শ উঠে এসেছে সমীক্ষার ফলাফলে। সামাজিক কমপ্লায়েন্স রক্ষণাবেক্ষণে একটি সমন্বিত মানদণ্ড তৈরির তাগিদও দেয়া হয়েছে এতে। ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক কারখানাগুলোতে যেসব অঞ্চলের শ্রমিক বেশি, সে জেলাগুলোয় কারখানা স্থাপনের পরামর্শও দেয়া হয়েছে প্রকাশিত সমীক্ষায়।

‘দ্য লাস্ট গার্ল’ এর নোবেল বিজয়

নাদিয়া মুরাদ ২০১৮ সালে শান্তিতে নোবেল জয়ী।এখন ওর ২৫ বছর বয়স। ২০১৪ সালে নাদিয়া তখন ২১ বছরের একজন উচ্ছল মুসলিম তরুণী। ইরাকের একটি পাহাড়ি এলাকা নাম তার সিনজার। এই পাহাড়ি অঞ্চল সিনজারে একটি গ্রাম ইয়াজিদি। সেই গ্রামে নাদিয়ার জন্ম থেকে বেড়ে উঠা। ২০১৪ সালের ইয়াজিদি গ্রামে আকস্মিক হামলা চালায় আইএস জঙ্গিরা,যারা নিজেদের পরিচয় দেয় মুসলিম হিসেবে। মুসলিম নামধারী এই আইএস জঙ্গিরা নির্বিচারে শুরু করে গনহত্যা। গ্রামের প্রায় সব পুরুষ ও বয়স্ক নারীদের হত্যা করা হয়। যাদের মধ্যে নাদিয়ার ছয় ভাই এবং তার মাও ছিলেন। জঙ্গিরা গ্রামের অন্য ইয়াজিদি নারীদের সঙ্গে নাদিয়াকেও ধরে নিয়ে যায় এবং যৌনদাসী হিসেবে বন্টন করে দেয়। নানা হাত ঘুরে একসময় মসুল পৌঁছে যান নাদিয়া। এই সময়ে তাকে আইএস জঙ্গিরা অসংখ্যবার ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন করে। এক পর্যায়ে সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করেন নাদিয়া, ফল ধরা পড়া। বাড়ে নির্যাতনের মাত্রা। কিছুদিন পর তাকে আবারও বিক্রির প্রস্তুতি চলছিল। একদিন সুযোগ বুঝে আইএস বন্দিদশা থেকে পালিয়ে এক সুন্নি মুসলিম পরিবারে আশ্রয় নেন নাদিয়া। ওই পরিবার তাকে মসুল থেকে পালিয়ে আসতে সব রকম সহায়তা করে।নাসির নামে এক সুন্নি মুসলমান নাদিয়াকে স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে আইএসের কড়া নিয়ন্ত্রণে থাকা মসুল সীমান্ত পার করে দেন। জীবনের এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা বিশ্ববাসীকে জানাতে ‘দ্য লাস্ট গার্ল’ নামে একটি বই লেখেন নাদিয়া, যা ২০১৭ সালে প্রকাশ পায়। ওই বইতে তিনি লেখেন,“কখনও কখনও ধর্ষিত হওয়া ছাড়া আর কিছুই সেখানে ঘটত না। একসময় এটা প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে যায়।" আইএস জঙ্গিরা ইয়াজিদি জনগোষ্ঠীর পাঁচ হাজারের বেশী পুরুষ কে হত্যা করে। ধরে নিয়ে যায় তিন হাজারের বেশী যুবতী নারীকে। তাদের উপর চালায় যৌন নির্যাতন। প্রতিদিন এই নারীরা শিকার হত ধর্ষণের। ২০১৫ সালে ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আইএসের হাতে নিপীড়নের ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন নাদিয়া। তিনি মানবাধিকার এবং যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ধর্ষণের ব্যবহারের বিরুদ্ধেও কাজ শুরু করেন। নিজের আত্মজীবনী "‘দ্য লাস্ট গার্ল’ নামে লেখা একটি বইয়ে সেই কাহিনি তুলে ধরেন তিনি। যৌন সহিংসতা ও হয়রানিকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধে লড়াই করে এই বছর ২০১৮ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন জঙ্গিদের হাতে ধর্ষণের শিকার ইয়াজিদি নারী নাদিয়া। দাড়িয়ে স্যালুট তোমাকে হে নারী। তোমার জন্য থাকছে বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।।

ব্যাংক ঋণ: খেলাপির শীর্ষে পোশাক খাত

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীদের অনেকেই নতুন কারখানা করে ব্যবসা বাড়িয়েছেন। আবার শর্ত মেনে কারখানা করতে না পেরে ব্যবসাও ছেড়েছেন অনেক ছোট ব্যবসায়ী। এ কারণে ২০১৭ সালে পোশাক খাতে ঋণ যেমন বেড়েছে, খেলাপি ঋণও বেড়েছে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য মিলেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, ২০১৭ সালে পুরো ব্যাংক খাতে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা। আর ২০১৭ সালে এসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে আগের বছরের চেয়ে ১২ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০১৭ সালে এসে পোশাক খাতের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যা ২০১৬ সালে ছিল ৭৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। একই বছরে এ খাতের খেলাপি ঋণও বেড়েছে ২ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সাল শেষে পোশাক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৭ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা ২০১৭ সাল শেষে বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা।

পোশাক খাতের পাশাপাশি বস্ত্র খাত তথা টেক্সটাইল খাতেও ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। গত বছর শেষে এ খাতের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা, যা ২০১৬ সালে ছিল ৫৪ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। গত বছর শেষে বস্ত্র খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে ২ হাজার ২৪০ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরে অনেক পোশাক ব্যবসায়ী নতুন কারখানা করেছেন। আবার অনেকে নিয়ম মেনে কারখানা করতে না পারায় ব্যবসাও ছেড়ে দিয়েছেন। এ কারণেই পোশাক খাতে ঋণও বেড়েছে, খেলাপিও বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০১৬ সালে ব্যাংক খাতে ঋণ ছিল ৬ লাখ ৭৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। ২০১৭ সাল শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৭ লাখ ৯৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণও ৬২ হাজার ১৭০ কোটি থেকে বেড়ে হয় ৭৪ হাজার ৩০২ কোটি টাকা।

পোশাক ছাড়া অন্যান্য বড় শিল্পে ২০১৬ সালে ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২২০ কোটি টাকা, যা ২০১৭ সালে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। তবে একই সময়ে এসব শিল্পের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমেছে। ২০১৬ সালে বড় শিল্প খাতে খেলাপির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ১১০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে এসে তা কমে হয়েছে ৬ হাজার ৮০ কোটি টাকা।

নির্মাণশিল্প খাতে গত বছর শেষে ঋণের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৫৪ হাজার ২২০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে যার পরিমাণ ছিল ৪৮ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৫ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। একই সময়ে এ খাতের খেলাপি ঋণ আগের বছরের ৩ হাজার ৯৭০ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ২৬০ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, গত বছর শেষে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা, আগের বছর যার পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। একই সময়ে এ খাতে খেলাপির পরিমাণ কমে হয়েছে ১ হাজার ৫২০ কোটি টাকা—২০১৬ সালে যার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাতে ২০১৭ সালে ভোক্তা ঋণও বেশ বেড়েছে। বছর শেষে ক্রেডিট কার্ডের ঋণ ২৩০ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। তবে গাড়ির ঋণ কমে গেছে। গত বছর শেষে ভোক্তা ঋণের মধ্যে গাড়ির ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৩০ কোটি টাকায়, যা আগের বছর ছিল ২ হাজার ৩০ কোটি টাকা। গাড়ির ঋণ কমলেও বেড়েছে বাড়ি বা আবাসন ঋণ। ২০১৭ সাল শেষে আবাসনের জন্য ভোক্তা ঋণের পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে ৩ হাজার ৯০ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে এ খাতে ভোক্তা ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হালিম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, পরিবহন খাতে যেসব ঋণ গেছে, তা এখনো সুবিধাজনক অবস্থানে আসেনি। জাহাজ নির্মাণ খাতও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।’

প্রবাসী কয়েকজন বাংলাদেশির প্রতারণার ফাঁদে বাংলাদেশের গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা

নিউইয়র্ক প্রবাসী কয়েকজন  বাংলাদেশির প্রতারণায় রাজধানী ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অন্তত ১৫টি গার্মেন্টের মালিক পথে বসেছেন। চাকরি হারিয়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। প্রতারকরা এসব গার্মেন্ট ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কমপক্ষে দুই মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়ে নিউইয়র্কে আয়েশি জীবনযাপন করছেন। এসব প্রতারকের বিরুদ্ধে নিউইয়র্ক সুপ্রিম কোর্ট এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতারক চক্র প্রতি বছর বাংলাদেশের অন্তত একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি টার্গেট করত। এ প্রক্রিয়ায় নিউইয়র্ক পোর্ট থেকে মাল খালাসের পর লাপাত্তা দিত তারা।  এমন প্রতারণা ও ধাপ্পাবাজি করে গত ১০ বছরে তারা কমপক্ষে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রামসহ  কয়েকটি অঞ্চলের ১৫টি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির মালিককে পথে বসিয়েছে। বেতন-ভাতা দিতে না পেরে এর মধ্যে বেশকটিতে তালা ঝুলিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন মালিকরা। বেতন না পেয়ে হাজার হাজার গার্মেন্ট শ্রমিক মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্রতারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিউইয়র্ক প্রবাসী মো. নূর ইসলাম (গাজী নুরু) এবং বাংলাদেশের দেলোয়ার হোসেনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে নিউইয়র্ক সুপ্রিম কোর্ট এবং বাংলাদেশের কয়েকটি থানায় মামলা হয়েছে। টার্গেট করে গার্মেন্ট আমদানির পর মূল্য পরিশোধ না করার পরিপ্রেক্ষিতে কঠোর পরিশ্রমী গার্মেন্ট শ্রমিকরা নিদারুণ কষ্টে নিপতিত হওয়ার সংবাদে আমেরিকান শ্রমিক সংগঠনের আইনজীবীরাও গভীর উদ্বেগ এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী প্রবাসীদের এমন ঠকবাজির ফাঁদ ও মর্যাদা নিয়ে কর্মরত ‘বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটি’র প্রধান নির্বাহী কল্পনা আকতারের সঙ্গে এ নিয়ে টেলিফোনে কথা হলে তিনি জানান, ‘এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য আমার কাছে নেই।’ ভিকটিম ফ্যাক্টরির কয়েকটির নাম উচ্চারণ করলে কল্পনা আকতার বললেন, ‘নাম শুনে মনে হচ্ছে এগুলো পরিচিত কোনো ফ্যাক্টরি নয়।’ অথচ অনুসন্ধানে জানা গেছে, কল্পনা আকতার মাঝে-মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে এসে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শ্রমিকদের অধিকার-বঞ্চিত হওয়ার কাহিনী গণমাধ্যমসহ মার্কিন প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে উপস্থাপন করেন। শ্রমিকদের নাজুক অবস্থার জন্য সরকারকেও দায়ী করেন এ নেত্রী।  অথচ হাজার শ্রমিকের মজুরি অনিশ্চিতের জন্য দায়ীদের ব্যাপারে তার কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হচ্ছে না’-এ মন্তব্য করেন নিউদকে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে শ্রমিক-সংগঠকরা মন্তব্য করেছেন। অভিযোগে প্রকাশ, নিউইয়র্কের উপরোক্ত গাজী নুরুর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে ২০১৫ সালের ২৯ মে ঢাকার বিশ্বাস ফ্যাশনের পক্ষ থেকে ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৭৫০ ডলার ক্ষতিপূরণ দাবিতে মামলা হয়েছে। ইনডেক্স নম্বর-৬৯৭৫। এই মামলার নোটিস পাবার পর একই বছরের ৩০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের মেডিটেরিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি, ইউএসএ) জবাব দিয়েছে যে, এটি তাদের বিরুদ্ধে করা উচিত হয়নি। কারণ, এটি তাদের জানা নেই। এমএসসি হয়তো এজন্য দায়ী। উল্লেখ্য, একই মামলার মূল অভিযুক্ত মোহাম্মদ নূর ইসলাম তথা গাজী নূর নোটিসের কোনো জবাব দেননি এখন পর্যন্ত। মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে আরো রয়েছে ইউনাইটেড গ্লোবাল লজিস্টিক ইনক, মারকেন্টাইল ক্রেডিট ইনক। সেই মামলা এখনও বিচারাধীন বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ থেকে  ট্যুরিস্ট কিংবা ভিজিট অথবা ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় সদ্য আগতদের টার্গেট করেন নিউইয়র্কের চিহ্নিত একটি চক্র। সেই ব্যক্তিকে নগদ কমিশনের টোপ দিয়ে বাংলাদেশের যে কোনো একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির কাছে এলসি পাঠানো হয় লোভনীয় দামে টি শার্ট এবং অন্য পোশাকের বিপরীতে। অভিযুক্তরা শুধু কাগজপত্র (?) তৈরি করেন। সব যোগাযোগের বাহন করা হয় নবাগত ওই ব্যক্তিকে। এভাবে মালভর্তি কন্টেইনার নিউইয়র্কে  আসার পর প্রেরণকারী চট্টগ্রামের সিএনএফ-এর লোকজনের যোগসাজশে ভুয়া বিএল সংগ্রহ করা হয়। নিউইয়র্ক পোর্ট থেকে মাল খালাস করে নেওয়া হয়। ম্যানহাটানের কথিত শো রুমে উঠিয়ে তা বিক্রি করার পরও বাংলাদেশের সেই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিক জানতে পারেন না প্রকৃত তথ্য। অধিকন্তু নিউইয়র্ক থেকে জানানো হয় যে, মাল আসতে বিলম্ব হয়েছে, যে স্যাম্পল দেখানো হয়েছিল, সে অনুযায়ী মাল পাঠানো হয়নি বলে ক্রেতারা নিতে চাচ্ছেন না। এজন্য পোর্টেই পড়ে রয়েছে কন্টেইনার। অর্থাৎ পোর্ট থেকে কন্টেইনার খালাস না করলে দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়া গুনতে হবে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ী কোনো কুল-কিনারা না দেখে প্রস্তাব দেন যে, লোকসান দিয়ে হলেও যেন কন্টেইনার খালাস করা হয়। এমন দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া হয় পুরোদমে। সে সময়ে এক লাখ ডলারের কাপড়ের দাম ৪০ হাজারে নেমে আসে এবং বিক্রির পর সেই অর্থ পরিশোধের অঙ্গীকার করা হয়(প্রকৃত অর্থে ওই কাপড় আগেই বিক্রি হয়ে গেছে সিএনএফ’র সহায়তায় জাল বিএল’র মাধ্যমে)। এমন কথাতেও হাফ ছেড়ে বাঁচেন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিক। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ নয়, মাসের পর বছর অতিবাহিত হলেও ওই ৪০ হাজার ডলারও পরিশোধ করা হয় না। এ নিয়ে মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তিও এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। কারণ, বাংলাদেশের ফ্যাক্টরি মালিকের সঙ্গে প্রতারকরা কখনোই তেমনভাবে যোগাযোগ করে না। পরিস্থিতির শিকার ব্যক্তিরা দেনদরবার করেও কূল-কিনারা পান না। বাংলাদেশের ফ্যাক্টরি মালিকেরাও এক পর্যায়ে হাল ছেড়ে দিয়ে নিকটস্থ থানা-পুলিশ করেন। অনুসন্ধানকালে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের নিউ রেসুলি গার্মেন্টস, বিশ্বাস ফ্যাশন লিমিটেড, হালিমা গার্মেন্টস, সাফারি গার্মেন্টস, এইচ এ্যান্ড ডব্লিউ এপারেলসহ ১৫টি ফ্যাক্টরি বিভিন্ন থানায় নিউইয়র্কের এই চক্রের বিরুদ্ধে জিডি করেছেন। গাজী নূরের ভাই দেলোয়ারকে কয়েক দফা থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। সম্প্রতি এই দেলোয়ার নিউইয়র্কে এসেছিলেন। কিন্তু পাওনাদারদের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার চেষ্টা করেননি। এ ব্যাপারে ঢাকাস্থ ‘এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম টেলিফোনে এ সংবাদদাতাকে জানান, ডজনখানে ফ্যাক্টরি নিউইয়র্কের গাজী নূরের প্রতারণার শিকার হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমিও চেষ্টা করেছি ওই অর্থ উদ্ধারের জন্য। নিউইয়র্কে বৈঠকের চেষ্টাও করেছি।  কিন্তু ইতিবাচক সাড়া পাইনি এখন পর্যন্ত। আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসকালে নিজ দেশের ব্যবসায়ী ও গার্মেন্টস শ্রমিকদের পেটে লাথি দেওয়ার এমন কাণ্ড প্রতিরোধে সব প্রবাসীর সহায়তা চাই।’ জানা গেছে, কয়েকজন ব্যবসায়ী ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে প্রতারকদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের আবেদনও করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাড়া পাননি বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। অবশেষে তারা বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার মার্কিন মানবাধিকার সংস্থার আইনজীবীগণের শরণাপন্ন হয়েছেন। ‘সিটিজেনশিপ গ্রহণকারী ওই ব্যক্তিরা কোনোভাবেই আইনের উর্দ্ধে নন, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট পেলে সংশ্লিষ্টদের বিচারে সোপর্দ করা হবে’-মন্তব্য শ্রমিক নেতাদের। অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য জানতে কয়েক দফা ফোন করা হয় গাজী নূরকে। মেসেজও রাখা হয়েছে সেলফোনে। কিন্তু এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি কলব্যাক করেননি।

মিথ্যা অভিযোগের জন্য ক্ষমা চাওয়ার অনুরোধ

নাজমুল হুদার বিরুদ্ধে উকিল নোটিশ

কাল্পনিক অভিযোগ প্রত্যাহার না হলে ১০ হাজার কোটি টাকার মানহানি মামলা

পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার (এসকে সিনহা) বিরুদ্ধে করা মামলায় অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপির বিরুদ্ধে যে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও মানহানিকর অভিযোগ করা হয়েছে, তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহারের জন্য ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার প্রতি উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

বুধবার সাবেক প্রতিমন্ত্রী, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট সালমা ইসলামের পক্ষে তার আইনজীবী মো. জিয়াউল হক নোটিশটি পাঠান। এতে মিথ্যা অভিযোগের জন্য তাকে (নাজমুল হুদা) ক্ষমা চাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, অভিযোগ প্রত্যাহার না করলে ১০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে মানহানি মামলা করা হবে।
নোটিশে নাজমুল হুদাকে উদ্দেশ করে জিয়াউল হক বলেন, আপনি একজন আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও এক সময়ে সম্মানজনক অবস্থানে ছিলেন। আমার মক্কেল সালমা ইসলামও একজন আইনজীবী। শুধু আইনজীবীই নন, তিনি একজন সংসদ সদস্যও। আপনি বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্য ছিলেন। কিন্তু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যেভাবে শত্র“তা দেখিয়েছেন, সংকীর্ণ মানসিকতার বশবর্তী হয়ে যে মিথ্যা, কুৎসামূলক ও মানহানিকর বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে আপনি এলাকায় আর সেই অবস্থানে নেই। কিন্তু আমার মক্কেল নিজের পকেটের টাকা খরচ করে এলাকায় অসংখ্য উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। মানুষের সেবামূলক কাজ করেছেন। এলাকায় তিনি অনেক জনপ্রিয়। আগামী নির্বাচনের কথা ভেবে আপনি এবং আপনার চাচা (যিনি ‘জাতীয় দরবেশ’ হিসেবে পরিচিত) ভীত হয়ে পড়েছেন। তাই আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে অসঙ্গত, অপ্রাসঙ্গিক, বিশ্বাসঘাতী ও হাস্যকার অভিযোগ এনেছেন। আপনার চাচা ও তার স্বার্থান্বেষী মহলকে খুশি করার জন্য এজাহারে আপনি স্পর্শকাতর বিষয়কে বেছে নিয়েছেন। বিষয়টির সঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিমকোর্টের মর্যাদা জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত সাবেক এ প্রধান বিচারপতির লেখা বই প্রকাশ হওয়ার পর সরকারের সামনে আসা খারাপ সময়টিকে আপনি কাজে লাগিয়েছেন। নোটিশে বলা হয়, চলতি বছর ৩০ মার্চ দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কথা উলে­খ করে আপনি স্বীকার করেছেন যে, আপনার বিরুদ্ধে সাবেক প্রধান বিচারপতির দেয়া রায়ের কপি পেয়েছেন, সেটি পেতে দেরিও হয়নি। সুতরাং অভিযোগের যে গল্প আপনি তৈরি করেছেন, তা অস্পষ্ট ও স্ববিরোধিতাপূর্র্ণ (২০ জুলাই ২০১৭ ঘুষ চাওয়ার বিষয়টি অগ্রহণযোগ্য, নিশ্চয়ই এসকে সিনহা তা মোকাবেলা করবেন)। কাজেই ওই রায় ও ঘুষ চাওয়ার বিষয়ে তাকে (সালমা ইসলাম) জড়ানো দুর্ভাগ্যজনক। জিয়াউল হক বলেন, আপনি সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু আপনারও জানার কথা আমার মক্কেলও একজন সংসদ সদস্য। তিনি একজন বড় শিল্পপতি ও সমাজকর্মী। দাতব্য ও সমাজসেবামূলক অনেক কাজ তিনি করেছেন। এতকিছু আপনি কখনোই করেননি। সুতরাং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভেবে হিংসা, আক্রোশ ও অনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে আপনি সালমা ইসলামের বিরুদ্ধে যা করেছেন, তা একেবারেই অনৈতিক। জিয়াউল হক আরও বলেন, আপনি জানেন না, অনেক মামলার রায়ে এসকে সিনহা আমার মক্কেল সালমা ইসলাম ও তার কোম্পানির (যমুনা গ্র“প) প্রতি অবিচার করেছেন; যার কারণে কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। অর্থাৎ আমার মক্কেল কখনই বিচারপতি সিনহার গুড বুকে ছিলেন না। তারপরও আপনি (নাজমুল হুদা) সেই ব্যক্তির (এসকে সিনহা) সঙ্গে আমার মক্কেলকে মেলাতে চেয়েছেন, যিনি (এসকে সিনহা) দেশে-বিদেশে বিতর্কিত। আশা করি এটা জানার পর আপনার শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনীত শিশুসুলভ অভিযোগ এজাহার থেকে প্রত্যাহার করে নেবেন। নোটিশে আইনজীবী উলে­খ করেন, ‘একজন সম্মানিত ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ সব সময় অন্যের সম্মান রক্ষার চেষ্টা করে, তিনি প্রতিপক্ষ হলেও। একজন রাজা সর্বদাই অন্য রাজাকে সম্মান করেন। একজন রানী অন্য রানীকে সম্মান করেন। তবে একজন চোর সর্বদা অন্যদের চোর ভাবে। ঘুষখোর সর্বদাই অন্য ঘুষখোরের গুড বুকে থাকে। সুতরাং আপনাকে (নাজমুল হুদা) আবার চিন্তা করে দেখতে হবে সালমা ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে কী সাংঘাতিক ভুল আপনি করেছেন। যথাযথ ফোরামে চ্যালেঞ্জ করা হলে আপনি কি আপনার অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবেন? নিশ্চিত করে বলা যায়-পারবেন না। ব্যর্থ হবেন। সুতরাং আপনার মতো একজন বিজ্ঞ মানুষ স্বার্থান্বেষী মহলের ফাঁদে পা দিয়েছেন।’

MOST POPULAR

HOT NEWS

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.