Home মতামত-বিশ্লেষণ

মতামত-বিশ্লেষণ

ব্যক্তিগত গাড়ি ও ধনী-গরিবের ঈদ

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া

ব্যক্তিগত গাড়ি ও ধনী-গরিবের ঈদ

ব্যক্তিগত ছোট গাড়ি বা মাইক্রোবাস নিয়ে গ্রামে ঈদ করতে যেতে পারবেন। গাড়ি বা মাইক্রোবাস না থাকলে যেতে পারবেন না। এ ঘোষণা দিয়েছেন র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যে কেউ গ্রামের বাড়িতে যেতে পারবেন। গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব না। জনকল্যাণের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবো। যদি ব্যক্তিগত গাড়িতে কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভ্রমণ করেন, তাহলে তিনি পরিবারের সঙ্গেই থাকছেন।’ এই ঘোষণা ও যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে কিছু প্রসঙ্গ মাথায় ঘুরছে। ১. গাড়ির ভেতরে পরিবারের সদস্যরা থাকবেন, করোনা সংক্রমণের ভয় নেই— বুঝলাম। গত মাস দুয়েক ব্যক্তিগত গাড়ি প্রায় চলছে না বললেই চলে। চালকরা নিজেদের বাসায় অবস্থান করছিলেন। এখন সেই চালক গাড়ি চালিয়ে মালিক পরিবারকে গ্রামে নিয়ে যাবেন। এদেশে এখন বহুল আলোচিত শব্দ ‘স্বাস্থ্যবিধি’। চালকেরা কোন পরিবেশে থাকেন, সেখানে ‘স্বাস্থ্যবিধি‘ শব্দটির আদৌ যে কোনো উপস্থিতি নেই— তা কমবেশি সবাই জানি। গাড়ির মালিক বা চালক কারোরই করোনা পরীক্ষা হয়নি। ২. গাড়ি নিয়ে যারা যাবেন, তারা কি গাড়িতেই থাকবেন? পথে কোথাও থামবেন না? ফেরিঘাটে বা ফেরিতে নামতে হবে না? গ্রামের বাড়ি গিয়ে কোথায় থাকবেন? ‘স্বাস্থ্যবিধি‘ মেনে আলাদা ঘরে? ব্যবহার করবেন আলাদা আলাদা বাথরুম? এতে একেকজন মানুষের গ্রামের বাড়িতে কতগুলো ঘর ও বাথরুম থাকতে হবে? আমাদের কি একেবারেই কোনো ধারণা নেই? এখন না হয় আমরা শহুরে নাগরিক হয়েছি বা হওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু, এসেছি তো গ্রাম থেকেই। এই যে শহর থেকে যারা গ্রামে যাবেন, তারা করোনাভাইরাস সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন— না নিয়ে আসবেন, তা কি আমরা জানি? কেউ জানেন? ৩. আজ সকালে এই ঘোষণার পর থেকে ছোট গাড়ি ও মাইক্রোবাস ভাড়া করে গ্রামে যাওয়া শুরু হয়েছে। চালকসহ পাঁচ আসনের গাড়িতে ছয়-সাত জন, আটজনের গাড়িতে ১০-১২ জন, ১৪ আসনের গাড়িতে ১৮-১৯ জন যাচ্ছেন। ধারণা করা যায় আগামী কয়েকদিন এ ধারা অব্যাহত থাকবে। দুর্ঘটনার বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় কখনও থাকে না, এবারও নিশ্চয়ই নেই। তা ছাড়া, ‘স্বাস্থ্যবিধি‘ জিনিসটার অবস্থা কী হচ্ছে আর কী হওয়ার সম্ভাবনা আছে? কে কার পরিবারের সদস্য, কে বা কারা তা নিশ্চিত করবেন? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী? সম্ভব? সেই সামর্থ্য আমাদের আছে? ৪. এমন আরও বহু প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে। সেদিকে না যাই। দুই কোটিরও বেশি মানুষের এই নগরে পাঁচ লাখের মতো ব্যক্তিগত ছোট গাড়ি ও মাইক্রোবাস আছে। তার মানে নগরের মোট জনসংখ্যার খুব ক্ষুদ্র অংশের গাড়ি আছে। এই ক্ষুদ্র অংশ যারা তুলনামূলক বিচারে বিত্তবান, তারা গ্রামে যেতে পারবেন। যাদের প্রায় সবাই পরিবার নিয়ে ঢাকায় একসঙ্গে থাকেন। আর নগরের মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ যারা ঢাকায় একা থাকেন। স্ত্রী-সন্তান থাকেন গ্রামে। ঈদে যেকোনো উপায়ে তারা গ্রামে চলে যান। তারা এবার যেতে পারছেন না। এ কথা বলছি না বা বলার কোনো সুযোগ নেই যে, তাদের গ্রামে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। অবশ্যই করোনা মহামারিকালে তাদের গ্রামে যেতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু, বিত্তবান-গাড়িওয়ালাদের যেতে দিবেন কেন? একটি রাষ্ট্রের নীতি ধনী-গরিব ভেদে এতটা বৈষম্যমূলক হবে কেন? যে মানুষটির হৃদয়ে আজ হাহাকার, একটি গাড়ি নেই বলে আমি গ্রামে যেতে পারলাম না! দেশটা তো তাদেরও। এমন একটি সিদ্ধান্তের আগে, তাদের কথা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি ছিল না? ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, ট্রাক কোনো পরিবহনেই বাংলাদেশের বাস্তবতায় ‘স্বাস্থ্যবিধি‘ মেনে যাতায়াত করা সম্ভব নয়। দৃশ্যমানভাবে হয়তো একটু কমবেশি পরিলক্ষিত হতে পারে, এ ছাড়া আর কিছু নয়। ৫. করোনা মহামারি মোকাবিলায় দূরদর্শী সিদ্ধান্ত এখনো অনুপস্থিত। পোশাক কারখানা বন্ধ-খোলা বিষয়ক সিদ্ধান্তহীনতার মতো, ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে গ্রামে যাওয়া যাবে, আরও একটি অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত। যা হতে পারে ভয়ঙ্কর বিপদের কারণ, করোনাভাইরাস সংক্রমণের সহায়ক। আমরা সবকিছু সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দায় এড়ানো সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। এত মানুষ কেন গ্রামে যায়, এক গাড়িতে কেন এতজন গেল, কেন স্বাস্থ্যবিধি মানল না— এসব দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো খুব সহজ। এর অনেক কিছু হয়তো সত্যিও। কিন্তু, রাষ্ট্র ধনী আর গরিবের জন্যে আলাদা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। যে সিদ্ধান্ত বৈষম্য তৈরি করে, যে সিদ্ধান্তে অধিকসংখ্যক মানুষ আঘাত পান-বেদনাহত হন, সেই সিদ্ধান্ত কী করে ‘জনকল্যাণে’ নেওয়া হয়? এ কেমন ‘জনকল্যাণ’? একটি ঈদে গরিবের মতো বিত্তবানদেরও গ্রামে যেতে না দিলে কোনো ক্ষতি ছিল না। s.mortoza@gmail.com

ঋণের টাকায় ফ্ল্যাট-বাড়ি: সম্পদ নাকি দায় বাড়ানো

ঋণের টাকায় ফ্ল্যাট-বাড়ি: সম্পদ নাকি দায় বাড়ানো

সাইফুল হোসেন

করোনাকালে তথ্য আড়ালের এই প্রাণান্ত চেষ্টা কেন?

মতামত

করোনাকালে তথ্য আড়ালের এই প্রাণান্ত চেষ্টা কেন?

কামাল আহমেদ | প্রথম আলো ০৯ মে ২০২০ মহামারির সঙ্গে স্বাভাবিক সময়ের তুলনা চলে না। বিশেষ করে, যে মহামারিতে শত্রু অদৃশ্য, রোগটা অতিছোঁয়াচে এবং ‍মৃত্যুঝুঁকি হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। আমাদের আইনে মহামারির সময়ে সংক্রমণের ঝুঁকির তথ্য গোপন নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে আইনে সরকারি কর্মচারী ও সাধারণ নাগরিকের মধ্যে কোনো পার্থক্যও করা হয়নি। অথচ এখন সেই তথ্য আড়ালের প্রাণান্তকর চেষ্টারই প্রতিফলন ঘটছে। ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্যসংবলিত কোনো পোস্ট দেওয়া ও সে ধরনের পোস্টে লাইক বা শেয়ার করা থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরত থাকার এক নোটিশ জারি করা হয়েছে ৭ মে। কেউ তা না মানলে আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই নোটিশ জারি করা হলো এমন দিনে, যে দিনে ফেসবুকে সরকার অথবা কোনো ব্যক্তিবিশেষ বা তাদের কাজের সমালোচনা এবং ভিন্নমত প্রকাশের দায়ে এক দিনে ঢাকায় ১১ জন এবং অন্যান্য জায়গায় আরও অন্তত ৪ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তার আইনে মামলার বিষয়টি শহরে সবার মধ্যে আলোচিত হচ্ছিল। এসব আলোচনা বেশির ভাগই সামাজিক মাধ্যমে, কিছুটা টেলিফোনে আর কিছুটা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। মামলা দেওয়ার আগে কোনো ধরনের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া লেখক, কার্টুনিস্ট, ব্যবসায়ীসহ কয়েকজনকে সাদা পোশাকের লোকজন বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ায় অনেকের মধ্যে গুমের আতঙ্কও দেখা দেয়। যদিও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার না করার বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশ রয়েছে। টেলিভিশনের কথিত ব্রেকিং নিউজের স্ক্রলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংবাদভিত্তিক অনলাইন পোর্টালগুলোতেও এই হুঁশিয়ারির কথা প্রচার হতে থাকে। কিন্তু হুঁশিয়ারিটি যে শুধু সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য, সেটা অনেকেরই নজর এড়িয়ে যায়। হয়তো উদ্দেশ্যটাই এমন ছিল। লকডাউনে থাকা সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত যখন করোনার চিকিৎসার অব্যবস্থা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বেহাল এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়ে অস্থিরতায় ভুগছেন, তখন ফেসবুকে সরকারের সমালোচনা-নিন্দা-প্রতিবাদ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। সুতরাং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার লক্ষ্যে এ ধরনের হুঁশিয়ারি মোক্ষম বলে বিবেচিত হয়ে থাকতে পারে। তা না হলে, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এ রকম নির্দেশনা জারি করতে হবে কেন? সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিবিধিতে অনেক ধরনের বিধিনিষেধ আছে। তাঁরা সাধারণত সরকারবিরোধী মতামত এড়িয়ে চলেন। তা ছাড়া ফেসবুক ব্যবহারের বিষয়ে ২০১৫ সালের ২৮ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিল। পরে তা আবার হালনাগাদও করা হয়েছে। তবে যথারীতি সরকারের বাইরেও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে তাঁদের অনেকে নানা সময়ে মন্তব্য করলেও কখনো কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে শুনিনি। সরকারবিরোধী কোনো মতামত তাঁরা কখনো করেছেন, এমনটি চোখে পড়েনি। বিরল এ রকম কিছু হলে, তা এত ব্যাপকভাবে আলোচিত হওয়ার কথা যে সে ধরনের কিছু গণমাধ্যমের চোখের আড়ালে থাকত না। তাহলে হঠাৎ কেন সরকার আবারও এই হুঁশিয়ারির কথা স্মরণ করানো জরুরি মনে করল? এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে একটি ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি। গণ-সমালেচনা বন্ধের জন্য জনমানসে আতঙ্ক সৃষ্টির কৌশল হিসেবে এটি বেশ কার্যকর হতে পারে। অন্য আর যে সম্ভাবনাগুলো থাকে, তা হচ্ছে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের মুখ বন্ধ করা, যাঁদের ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিবিধির কড়াকড়ি প্রয়োগ তেমন একটা ছিল না। বিশেষত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অনুসারী চিকিৎসকেরা রাজনৈতিক কর্মীর মতো আচার-আচরণ করলেও অতীতে তা কখনোই শৃঙ্খলাবিধির ব্যত্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়নি। কিন্তু ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী পিপিই এবং এন-৯৫ মাস্ক নিয়ে যে অবিশ্বাস্য কেলেঙ্কারি ঘটেছে, তার খেসারত যেহেতু চিকিৎসকদের জীবন দিয়ে দিতে হতে পারে, সে কারণে তাঁদের ক্ষোভের বিষয়টি সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কাছে অপ্রত্যাশিত নয়। এ বিষয়ে যথাযথ সরকারি বিধি মেনে যাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন, তাঁদের পরিণতি কী ঘটেছে, তা আমরা সবাই জানি। অথচ দেশের প্রচলিত জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ সুরক্ষা প্রদান আইন ২০১১ অনুসারে তাঁদের সুরক্ষা পাওয়ার কথা। অতএব এই হুঁশিয়ারি চিকিৎসক ও চিকিৎসাসেবীদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বন্ধের চেষ্টায় হয়ে থাকতে পারে। তা ছাড়া রোগের বিস্তৃতি বাড়তে থাকা এবং হাসপাতালগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে অন্য সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে সরকার তাঁদেরও সাবধান করতে চাইছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠতে পারে। বলে রাখা ভালো, আগেকার নির্দেশনাগুলো থেকে নতুন পরিপত্রের একটা পার্থক্য আছে। তা হলো এবারই আলাদা করে কোনো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বর্পূণ ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্যের কথা বলা হয়েছে। যদিও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বর্পূণ ব্যক্তির আইনগত সংজ্ঞা কী বা কোন আইনে আছে, তার কোনো উল্লেখ পরিপত্রে নেই। দেশে খুব গুরুত্বর্পূণ ব্যক্তি বা ভিআইপি এবং ভিভিআইপিদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু কারা ভিআইপি, তা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। আর প্রচলিত ভিআইপিমাত্রই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বর্পূণ ব্যক্তি হবেন, বিষয়টি এমন হওয়ার কথা নয়। অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে জনমনে অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে, এমন কোনো লেখা, অডিও, ভিডিও ইত্যাদি প্রকাশ বা শেয়ার করা যাবে না বলেও এতে বলা হয়েছে। পরিপত্রের এই নির্দেশনাতেই সরকারের আসল উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হলে, তা নিশ্চয়ই অযৌক্তিক হবে না। সরকারি চাকরিবিধির বাইরে আলাদা করে এ ধরনের নির্দেশনা স্বাভাবিক সময়ে জারি করা হলেও তা নিয়ে প্রশ্ন উঠত। এখন মহামারির অস্বাভাবিক সময়ে তাই এমন নির্দেশনা জারিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে গণ্য করা যাচ্ছে না। সংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮‘য় বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে, এমন তথ্য গোপন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ওই আইনের ২৪-এর ১ উপধারায় বলা হচ্ছে: যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক জীবাণুর বিস্তার ঘটান বা বিস্তার ঘটাতে সহায়তা করেন, বা জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও অপর কোনো ব্যক্তি সংক্রমিত ব্যক্তি বা স্থাপনার সংস্পর্শে আসিবার সময় সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি তাহার নিকট গোপন করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ। ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনেই এই অপরাধের তদন্ত ও বিচার হওয়ার কথা বলা আছে আইনে। খুনের অপরাধে যেমন সরকারি কর্মকর্তা আর সাধারণ নাগরিককে আলাদা করা দেখা হয় না, এ ক্ষেত্রেও তেমনই হওয়ার কথা। সুতরাং চিকিৎসক, নার্স, আয়া, শুচিকর্মী কিংবা প্রশাসক—সবারই সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়ে তথ্য প্রকাশের দায়িত্ব আছে। জনস্বাস্থ্যের তথ্য শুধু ঊর্ধ্বতন কর্তাকেই জানানোর বিষয় নয়, ঝুঁকিতে থাকা সবাইকে জানানোর বিষয়। আর সে ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিম্নমানের পিপিই, মাস্ক কিংবা অন্য যেকোনো সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়ে সহকর্মী, পরিবার ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সজাগ করার মতো তথ্য ও মতামত প্রকাশ নিষিদ্ধ হবে কেন? আবার এই আইনেই আরেকটি ধারা, ২৬ (১) বলছে: যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা ভুল তথ্য প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ। তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত যে ধরনের লুকোচুরিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন, তাতে প্রশ্ন তোলাই যায়, তাঁরা আইন লঙ্ঘন করছেন কি না? কামাল আহমেদ: সাংবাদিক

কোভিড ১৯: ঝুঁকিতে থাকা সংবাদকর্মীর সুরক্ষা ও বার্তাকক্ষের দায়িত্ব

কোভিড ১৯:  ঝুঁকিতে থাকা সংবাদকর্মীর সুরক্ষা ও বার্তাকক্ষের দায়িত্ব

[caption id="attachment_23873" align="aligncenter" width="1170"] ছবি: পিক্সাবে Courtesy:medical-concept-poster-pixabay[/caption] নতুন করোনোভাইরাস যাদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, সেই তালিকায় ডাক্তার, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীদের নাম নিঃসন্দেহে সবার ওপরে। কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকারের এই তালিকা দেখলে বোঝা যাবে, সবচেয়ে বিপদে থাকাদের দলে সাংবাদিকরাও আছেন। এখন খবরের খোঁজে প্রতিনিয়তই রিপোর্টাররা চষে বেড়াচ্ছেন সংক্রমণের শিকার হওয়া অঞ্চল; ঘুরছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে; কথা বলছেন বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক থেকে শুরু করে নানা ধরণের মানুষের সাথে। এতে মাঠের সেই রিপোর্টার শুধু নয় – তাদের পরিবারের সদস্য, বার্তাকক্ষে থাকা সহকর্মী এবং রিপোর্টের প্রয়োজনে যাদের কাছে যাচ্ছেন – সবাই কমবেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন পালসের সম্পাদক জেইমি কাফাশ একে তুলনা করেছেন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সাথে। তিনি বলেছেন, “যুদ্ধের ময়দানে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে যে ধরণের নীতিমালা মানতে হয়, এখানেও ঠিক তেমনটাই প্রযোজ্য।” গত কয়েকদিনে কোভিড-১৯ নিয়ে বেশ কয়েকটি লেখা প্রকাশ করেছে জিআইজেএন: দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার টিপসঅনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য প্রশ্নচীনা সাংবাদিকদের পরামর্শ, ইত্যাদি। গোটা বিশ্বে বিভিন্ন ভাষার হাজার হাজার সাংবাদিক লেখাগুলো পড়েছেন। এই গাইডটি ঝুঁকি নিয়ে যারা মাঠে কাজ করছেন, সেই সব রিপোর্টারদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে তৈরি। এখানে রিপোর্টার বা ক্যামেরাপার্সনের নিজস্ব সতর্কতার বিষয় যেমন আছে, তেমনি উঠে এসেছে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম কর্তাদের দায়িত্ব।

হাসপাতাল বা কোয়ারেন্টিন জোনে কী করবেন?      

কোভিড-১৯ কাভার করা সাংবাদিকদের জন্য একটি অ্যাডভাইজরি প্রকাশ করেছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। এটি প্রতিনিয়ত আপডেট হচ্ছে। এখানে অ্যাসইনমেন্টে যাওয়ার আগে, খবর সংগ্রহের সময় এবং ফিরে আসার পরে – কী করতে হবে তার বিশদ বিবরণ রয়েছে। তারা হাসপাতাল বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সংক্রমণ এড়ানোর জন্য যত পরামর্শ দিচ্ছে, এখানে তার-ই সারাংশ। প্রবেশের আগে: যাতায়াতের ক্ষেত্রে গণ-পরিবহণ (যেমন বাস বা ট্রেন) পরিহার করুন, বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে। অন্য সময়ে যদি চড়তে বাধ্য হন, তাহলে নামার পর হাত অ্যালকোহল-সমৃদ্ধ হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে জীবানুমুক্ত করে নিন। হাসপাতাল বা কোয়ারেন্টিন জোনে প্রবেশের আগে জেনে নিন সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা সংক্রমণরোধী ব্যবস্থা কেমন। দুর্বল হলে প্রবেশ না করাই ভালো। [caption id="attachment_23875" align="aligncenter" width="1170"] হাসপাতালে সার্জিক্যাল মাস্কের বদলে এন৯৫ রেসপিরেটর ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে সিপিজে। ছবি: গার্ডিয়ানের ইউটিউব ভিডিওর স্ক্রিনশট[/caption] যখন ঘটনাস্থলে: হাসপাতালে যেন হাতে অবশ্যই গ্লাভস এবং পরনে পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট থাকে। সাথে ডিজপোজেবল জুতো অথবা পানিনিরোধী ওভারশু পরে নিন; সেখান থেকে বের হওয়ার পর ফেলে দিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, সংক্রমিত ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের মাস্ক পরার দরকার নেই। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীদের তারা মাস্ক পরার নির্দেশ দিয়েছে। হাসপাতাল বা ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় সাংবাদিকদেরও এন-৯৫ মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে সিপিজে। এর দাম বেশি এবং এখন বেশ দুষ্প্রাপ্য। বেরুনোর পরে: সংক্রমণ আছে এমন জায়গায় যাওয়ার আগে, সেখানে গিয়ে এবং ফেরার পরে যতবার সম্ভব গরম পানি ও সাবান দিয়ে হাত ভালো করে ধুয়ে নিন। ধোয়ার আগে মুখে, নাকে বা চোখে হাত লাগাবেন না। এলাকা থেকে বেরুনোর পর আপনার প্রতিটি সরঞ্জাম (যেমন, ক্যামেরা বা মাইক্রোফোন) অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল ওয়াইপ দিয়ে ভালো করে মুছে নিন। অফিসে জমা দেয়ার আগে আরেকবার জীবানুমুক্ত করুন। অনেক রিপোর্টার বলেছেন, তারা সংক্রমণ আছে এমন জায়গা থেকে ফিরে নিজেদের পোশাক গরম পানিতে ধুয়ে নিয়েছেন এবং ভালোমত গোসল করেছেন। ফেরার পরে যদি সংক্রমণের কোনো লক্ষণ দেখেন, তাহলে অফিসকে জানান এবং সঙ্গে সঙ্গে সেল্ফ-কোয়ারেন্টিনে চলে যান। অন্যদের প্রতি দায়িত্ব: যখন কোনো বয়স্ক ব্যক্তির সাথে কথা বলছেন, তখন বাড়তি সতর্ক হোন। তাদের কাছ থেকে সচেতনভাবেই দূরে থাকুন। কারণ, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে কোভিড-১৯ রোগে প্রবীণদেরই মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। আপনার শরীরে, কাপড়-চোপড়ে অথবা যন্ত্রপাতিতে থাকা ভাইরাস থাকলে যেন তাদের শরীরে না ছড়াতে পারে, সেটি নিশ্চিত করুন। শুধু প্রবীন নয়, যে কারো ক্ষেত্রেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল বা সিডিসির মতে, এই রোগে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে দুই ধরণের মানুষ; যাদের বয়স বেশি, এবং যাদের আগে থেকেই গুরুতর অসুস্থতা বা স্বাস্থ্যসমস্যা আছে। তাই এমন কোনো রিপোর্টারকে হাসপাতাল, কোয়ান্টিন জোন অথবা সংক্রমণ আছে এমন জায়গায় পাঠাবেন না। অন্তসত্বা রিপোর্টারদেরও এমন অ্যাসাইনমেন্টে পাঠানো থেকে বিরত থাকুন। কোনো রিপোর্টারকে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় পাঠানোর আগে তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন। রোগের হটস্পট, অর্থ্যাৎ যেখানে বিস্তার বেশি – ঐসব জায়গায় কাউকে অ্যাসাইনমেন্ট দেবেন না। বাইরে অনেক গণমাধ্যমই এই নীতি মেনে চলছে। যদি দিতেই হয়, তাহলে দলের সদস্যদের বডিস্যুট, রেসপিরেটর এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠান। [caption id="attachment_23876" align="aligncenter" width="1050"] ছবি: আনস্প্ল্যাশ[/caption]

সাক্ষাৎকার কিভাবে নেবেন?

ভারতে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রথম যে বৃদ্ধ মারা যান, তার বাড়ী কর্নাটকে। সেই বৃদ্ধের ছেলের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলেন চার সাংবাদিক। সেখান থেকে ফিরে, এখন চার জনই কোয়ারেন্টিনে আছেন। সাংবাদিকদের করোনাভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার বড় ঝুঁকি থাকে এই সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়। মার্কিন বিজ্ঞান সাংবাদিক লিসা এম ক্রিগার সম্প্রতি ২০২০ ক্যালিফোর্নিয়া ফেলোশিপ-জয়ী সাংবাদিকদের পরামর্শ দিতে গিয়ে বলেছেন, “আমাদের কাজ সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলা নয়। যা দরকার, তা যদি ফোনে পাওয়া যায়, সেভাবেই নিয়ে নিন।” পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো করোনাভাইরাসের এই সময়ে এসে বেশিরভাগ সাক্ষাৎকারই নিচ্ছে ফোন, স্কাইপ বা অন্য যে কোনো অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে। একই কথা বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টিভি সাংবাদিক, সম্পাদক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কলাকুশলীসহ ব্রডকাস্ট জগতের ১লাখ ৬০ হাজার পেশাজীবির প্রতিনিধিত্ব করা সংগঠন স্যাগ-আফট্রা। করোনাভাইরাসের এই সময়ে সদস্যদের জন্য তারা কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছে:
  • রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষের মতামত সংগ্রহের মত যেসব সাক্ষাৎকার, তা বাদ দিন। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সাক্ষাৎকার নেয়ার ইকুইপমেন্ট থাকলে বিবেচনা করে দেখতে পারেন।
  • যারা কোভিড-১৯ আক্রান্ত, অথবা আক্রান্তদের সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের সামনাসামনি সাক্ষাৎকার নেবেন না। তাদের বক্তব্য ফোন, ভিডিও চ্যাট, ইত্যাদির মাধ্যমে নিন।
  • রোগী বা সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি বাদে বাকি সবার সাক্ষাৎকার নেয়ার আগেও সামাজিক দূরত্ব (সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং) বজায় রাখুন। সিডিসির পরামর্শ মেনে, অন্তত ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রেখে বক্তব্য ধারণের চেষ্টা করুন।
  • যদি দূরত্ব বজায় রাখতে না পারেন, তাহলে ফোন বা ভিডিও চ্যাটের সহায়তা নিন। কিভাবে রিমোট রেকর্ডিং করবেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত পরামর্শ পাবেন এই টিপশীটে। এটি তৈরি করেছে রেডিও ও মাল্টিমিডিয়া প্রযোজকদের সংগঠন এয়ার
  • যদি কোনো সংবাদ সম্মেলনে আপনার অ্যাসাইনমেন্ট থাকে, তাহলে সেখানে গিয়েও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার মত ব্যবস্থা আগেই করে নিন। যদি না পারেন, তাহলে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করুন। (যেমন, সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ)
  • সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় মাইক্রোফোনের ওপর ডিজপোজেবল কাভার লাগিয়ে নিন। ব্যবহারের পর ফেলে দিন। তারপর সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন বা স্যানিটাইজার দিয়ে জীবানুমুক্ত করুন। লিপ মাইক্রোফোন কারো সাথে শেয়ার করবেন না।
  • আপনার প্রতিটি ইক্যুইপমেন্ট সাক্ষাৎকার শেষে অ্যালকোহল ওয়াইপ দিয়ে জীবানুমুক্ত করুন। আপনার সেলফোনটিও নিয়মিত ওয়াইপ দিয়ে মুছে নিন।
মনে রাখবেন, শুধু ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা নয়, আপনি যে কোন অ্যাসাইনমেন্টেই আক্রান্ত হতে পারেন। তাই সব সময় ছয় ফুট দূরত্বে থাকার বিষয়টি মাথায় রাখুন।

সরঞ্জাম কি ভাইরাসমুক্ত?

মার্কিন বাস্কেটবল খেলোয়াড় রুডি গোবার্ট একটি সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে নেহাত কৌতুক বশে সাংবাদিকদের রাখা মাইক্রোফোনে হাত দিয়েছিলেন। তারপর থেকে তিনি সংক্রমিত। এবং তার মাধ্যমে ইউটাহ জাজ দলের আরো কয়েকজন খেলোয়াড় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। এভাবে সাংবাদিকরাও তাদের ইক্যুইপমেন্ট থেকে আক্রান্ত হতে পারেন যে কোনো সময়। নতুন করোনাভাইরাস প্লাস্টিক বা ধাতব যে কোনো বস্তুর ওপরে দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। তাই যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জাম পরিস্কার রাখুন। আপনার মাইক্রোফোন কিভাবে পরিস্কার করবেন, তার একটি বিস্তারিত নির্দেশনা পাবেন ট্রানসমের এই লেখা থেকে। তাদের মূল পরামর্শ: জীবানুনাশক স্প্রে না করে বরং মাইক পরিষ্কারের ফোম ব্যবহার করুন, এবং পরিস্কার কাপড় দিয়ে তা মুছে ফেলুন। আর পেটাপিক্সেলের এই লেখায় বলা হচ্ছে, আপনি কিভাবে আপনার স্মার্ট ফোন, ক্যামেরা এবং গিয়ার পরিস্কার করবেন। তারাও মূলত অ্যালকোহলভিত্তিক ওয়াইপস দিয়ে লেন্স মুছে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছে। টিভি হোক, অনলাইন বা প্রিন্ট – যে কোনো মাধ্যমের সাংবাদিকদের জন্য এখন সংবাদ সংগ্রহের বড় উপায় হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন। আপনি যেখানেই যাচ্ছেন, এটি আপনার হাতে থাকছে। তা দিয়ে আপনি কথা রেকর্ড করছেন, ভিডিও বা ছবি তুলছেন, টেবিলে বা সারফেসে রেখে কাজ সারছেন। সেটি কি জীবানুমুক্ত? করোনাভাইরাসের এই কঠিন সময়ে, আপনাকে এই দিকেও নজর দিতে হবে। এখানে বিবিসি ক্লিকের একটি ভিডিও, জেনে নিন ফোন কিভাবে নিরাপদে রাখবেন। https://youtu.be/wkmFKpAqJbM

টিভি চ্যানেলের ভেতরেও কি নিরাপদ?

টিভি চ্যানেলের ভেতরে যারা কাজ করছেন, দয়া করে নিজেদের পুরোপুরি নিরাপদ ভাববেন না। আপনার স্টুডিওতে প্রতিদিন যত অতিথি আসছেন বা যাচ্ছেন, তারা সবাই কি সংক্রমণমুক্ত? আপনি যদি নিশ্চিত হতে না পারেন, তাহলে স্টুডিওটিকেও নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করুন। একটি উদাহরণ দিলে আরো পরিস্কার হবে। গেল ৯ মার্চ, অস্ট্রেলিয়ার নাইন নেটওয়ার্ক টিভির স্টুডিওতে গিয়েছিলেন অভিনেতা টম হ্যাংকসের স্ত্রী রিটা উইলসন। তখনো কারো জানা ছিল না এই দম্পতি করোনাভাইরাস আক্রান্ত। তারা কিছুদিন পরই সেই ঘোষণা দেন। রিটা উইলসনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন সাংবাদিক রিচার্ড উইলকিন্স। কয়েকদিন পর তিনি নিজেও সংক্রমিত হন। এমন পরিস্থিতি এড়াতে স্যাগ-আফট্রার পরামর্শ হলো:
  • টিভি চ্যানেলের কমন জায়গা, যেখানে সবাই আসেন বা বসেন, তা নিয়মিত জীবানুমুক্ত করা;
  • প্রতিটি শো শেষে স্টুডিও অ্যালকোহলভিত্তিক জীবানুনাশক দিয়ে মুছে ভালো মত পরিস্কার করে নেয়া;
  • স্টুডিওতে যে মাইক্রোফোনগুলো ব্যবহার হচ্ছে তা প্রত্যেক শো শেষে জীবানুনাশক দিয়ে পরিস্কার করে নেয়া;
  • স্টুডিওতে ব্যক্তিগত মেক-আপ কিট, ব্রাশ ও ফোম নিয়ে আসা এবং শুধু সেগুলো ব্যবহার করা;
  • প্রয়োজনে ঘরকেই স্টুডিও বানিয়ে নেয়া বা ভিডিও চ্যাটে অতিথিদের সংযুক্ত করা;
  • ওয়াইপস সাথে রাখা এবং দরজার হাতল থেকে শুরু করে স্পর্শ করতে হবে এমন;জিনিস মুছে নেয়া:
  • এবং টিভি শোতেও সামাজিক দূরত্ব অর্থ্যাৎ ৬ ফুট দূরে থাকার নীতি মেনে চলা।

নিউজরুমগুলো কী করছে?

বাংলাদেশের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। গণমাধ্যম সাময়িকী মুক্তবাকের এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেশ কিছু গণমাধ্যম তাদের কর্মীদের সুরক্ষায় ইতোমধ্যেই ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। কেউ পুরোপুরি, কেউ আংশিকভাবে বাড়ি থেকে কাজের নীতি গ্রহণ করেছেন। অফিসে প্রবেশের আগে জ্বর মাপা, মাস্কের যোগান, জীবানুনাশক দিয়ে হাত পরিষ্কার করা, কর্মীদের নিজস্ব গাড়ি দিয়ে পিক এবং ড্রপের ব্যবস্থা, পালা করে কাজ করা – এমন অনেক উদ্যোগই নেয়া হয়েছে। বাড়ি থেকে কাজ গণমাধ্যমের জন্য বলতে গেলে নতুন বিষয়। করোনাভাইরাস গোটা বিশ্বেই বার্তাকক্ষগুলোকে এমন পরিস্থিতির দিকে নিয়ে গিয়েছে। অন্যান্য দেশের নিউজরুমগুলো কোভিড-১৯ এর সাথে যেভাবে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যাবে ওয়ান-ইফরা ব্লগের এই লেখা থেকে। নিচে কয়েকটি উদাহরণ। স্ট্রেইটস টাইমস, সিঙ্গাপুর: তারা বার্তাকক্ষের সম্পাদকীয় বিভাগকে ২৫ জনের দুটি দলে ভাগ করে নিয়েছেন। প্রতিটিতে বিভিন্ন পদ মর্যাদার কর্মী আছেন। একদল ঘরে বসে কাজ করেন, আরেকদল অফিসে। দুই সপ্তা পর, তারা স্থান বদল করেন। এর উদ্দেশ্য হলো: একটি দলের কেউ আক্রান্ত হলে, তাদের সবাইকে কোয়ারেন্টিনে পাঠিয়ে, বাকিদের নিয়ে কাজ চালানো। সম্পাদকীয় এই দল ছাড়া তাদের বাকি সব কর্মী ঘর থেকেই কাজ করছেন। অ্যাসাইনমেন্ট থাকলে সেটি সেরে, বাড়ি থেকেই তা পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছেন গুগল হ্যাংআউটে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, হংকং: জনপ্রিয় এই পত্রিকাটি অর্ধেক কর্মীকে বাড়ি থেকে কাজ করতে বলেছে। যারা অফিসে কাজ করেন, তাদেরকে প্রতিটি ফ্লোরে বিভক্ত রাখা হয়েছে, যেন এক তলার কর্মী থেকে অন্য তলায় সংক্রমণ ছড়াতে না পারে। তারাও নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করেন গুগল হ্যাংআউটে। নিজেদের বদ্ধ সম্মেলনকক্ষে বড় মিটিং বা সভা নিষিদ্ধ করেছে এসসিএমপি। বার্তাকক্ষের কর্মীরা ছোট ছোট দলে মিটিং সেরে নেন। দ্য টাইমস, যুক্তরাজ্য: টাইমসের একজন কর্মী করোনাভাইরাসে আকান্ত হওয়ার পর থেকে লন্ডনে তাদের প্রধান কার্যালয়ের প্রতিটি লিফট, টয়লেট এবং বসার জায়গা ৩০ মিনিট পর পর জীবানুমুক্ত করা হচ্ছে। হার্স্ট, মেরিডিথ কর্প কর্পোরেশন, পেনস্ক মিডিয়া কর্পোরেশন, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস, বাজফিড, বিজনেস ইনসাইডার, রিফাইনারি ২৯, নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিন, পলিটিকো, এক্সিয়োস, এবং ওয়ার্নার মিডিয়াসহ অনেকেই কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করতে উৎসাহি°÷ত করছে। রিপোর্টারদের যাতে বাইরে যেতে না হয়, সেজন্য কোয়ার্টজ এক্সপ্লেইনার ধাঁচের ভিডিও বানানোতে মন দিয়েছে। নাওদিস বলছে, তারা ভিডিওর জন্য প্রতিটি সাক্ষাৎকারই অনলাইনে নিচ্ছে, এবং দর্শকদেরও জানাচ্ছে, কেন এমন করতে হচ্ছে। https://youtu.be/8zKoQKeGbyY ওয়াশিংটন পোস্টের এই ভিডিও আপনাকে জানাবে বাড়ি থেকে কাজ করা সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা।

বার্তাকক্ষের কর্তাদের জন্যে…

কোভিড-১৯ রোগের গতিপ্রকৃতি প্রতিনিয়তই বদলে যাচ্ছে, যার ভভিষ্যৎও অজানা। বাড়ি থেকে বা অফিসে বসে, কাজ যেখান থেকেই হোক – এই অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গণমাধ্যমকে কতদিন যেতে হবে, তা কেউ বলতে পারে না। এই সময়টা যেমন কর্মস্থলকে নিরাপদ রাখার, তেমনি নিজেদের একে অপরের দিকে খেয়াল রাখারও বটে। আর এখানে বড় দায় আছে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকদের, অর্থ্যাৎ যারা বার্তাকক্ষকে নেতৃত্ব দেন। কঠিন এই সময়ে তাদের মূল দায়িত্ব দু’টি – প্রথমত, সহকর্মীদের ঝুঁকিতে না ফেলা; এবং দ্বিতীয়ত, কর্মীদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা। কিভাবে সেটি করবেন? নিচে কয়েকটি পরামর্শ:
  • এই সময়ের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করুন, এবং তা কিভাবে মেনে চলতে হবে বার বার সহকর্মীদের বুঝিয়ে বলুন। বার্তাকক্ষের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে এই নীতিমালার মুখপত্র হতে হবে। বাস্তবায়নের জন্য জবাবদিহিও করতে হবে, তাকেই।
  • রিপোর্টার অ্যাসাইনমেন্টের কাজে ভ্রমণ করবেন কি করবেন না, তিনি অফিস নাকি বাড়ি থেকে কাজ করবেন – সেই সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে দিন। তার সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখুন, কোনো ব্যাখ্যা চাইবেন না।
  • কর্মক্ষেত্রে এমন জায়গা রাখুন যেখানে সাংবাদিকরা একে অপরের সাথে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে পারেন, প্রশ্ন করতে পারেন। দলগত সভা দরকার তো বটেই, এসময় ওয়ান-টু-ওয়ান সাক্ষাতও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
  • একজন রিপোর্টার কত রিপোর্ট দেবে, তা নিয়ে আপনার প্রত্যাশাকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন। সময়টি কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে অভিজ্ঞ রিপোর্টারকেও অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যার প্রভাব পড়ে তাদের উৎপাদনশীলতায়।
প্রতিটি পরামর্শ নেয়া হয়েছে “নিউজরুম গাইড টু কোভিড-১৯” নামের একটি সহায়িকা থেকে। এটি তৈরি তৈরি করেছেন ১১ জন  সাংবাদিক, তাদের মত অন্য সাংবাদিকদের জন্যে। হাতে যদি সময় থাকে পুরো গাইডটি পড়ে দেখুন
[caption id="attachment_23877" align="alignleft" width="140"] মিরাজ আহমেদ চৌধুরী, জিআইজেএন-এর বাংলা সম্পাদক। এর পাশাপাশি তিনি জিআইজেএন-এর সদস্য সংগঠন, গণমাধ্যম উন্নয়ন সংস্থা, এমআরডিআইয়ের হেড অব প্রোগ্রাম অ্যান্ড কমিউনিকেশনস্ হিসেবে কাজ করছেন। সাংবাদিকতায় তাঁর রয়েছে ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা, যার বড় অংশই টেলিভিশনে।[/caption]

অর্থনীতির নুতন কালচার ‘ডিপোজিট খেলাপি’

অর্থনীতির নুতন কালচার ‘ডিপোজিট খেলাপি’ জ্যোতিষ মন্ডল, এফসিএ বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে পুরো দেশজুড়ে। তৈরি হচ্ছে- পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, কর্নফুলি টানেল, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট, উড়াল সেতু, এয়াপোর্ট। বাড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জিডিপি ও সরকারি দলের অপ্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। সবকিছু মিলিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তারপরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকেই যায়- আমরা আসলে কতখানি এগোচ্ছি? বা আমাদের এই এগোনো ও উন্নয়ন কতখানি টেকসই? বিজ্ঞাপন টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ারের মধ্যে অন্যতম একটি হলো ‘মানি মার্কেট’ বা টাকার বাজার। টাকার বাজারে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি আমাদের দেশে আগেও ছিল এখনও আছে; যদিও সম্প্রতি জ্যামিতিক হারে তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এর সঙ্গে নুতন আরেকটি সংস্কৃতির উত্থান ঘটেছে, সেটি হলো- ডিপোজিট খেলাপি। বিশেষত নন-ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল অরগানাইজেশনগুলোর ডিপোজিট বা ফান্ড কিছু ঋণখেলাপি লুটেপুটে নেওয়ায় তারা এখন গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। তৈরি হচ্ছে ডিপোজিট খেলাপি। সংকট এখন কেবল নন-ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরেই সীমাবদ্ধ নেই, সরকারি, বেসরকারি ব্যাংকেও তা ছড়িয়ে পরছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। যা ২০১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ছিল ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। তিন বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় শতভাগ। গেল বছরের প্রথম নয় মাসেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ২২ হাজার কোটি টাকা। বিজ্ঞাপন প্রায়ই সরকারি বাজেটে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির জন্য বিশেষ বরাদ্ধ রাখা হয়। এখন প্রশ্ন হলো- মুলধনে ঘাটতি কেন? উত্তর একটাই- খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলোকে বেশি প্রভিশন করতে হয়েছে। তাই লোকসান বেড়ে ব্যাংকগুলোর মূলধনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। দেশের প্রান্তিক মানুষও সরকারকে কর দেন। তারা গাছের কলা বেচে যে লুঙ্গি কেনেন সেখানেও প্রদত্ত ভ্যাটের টাকা দেন। আর সেই টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হন হলমার্কের তানভীরদের মতো ব্যবসায়ীরা। কাজেই ঋণখেলাপিদের কারণে সরকারি ব্যাংকের মূলধনের ঘাটতি মেটানো কতখানি উচিত বা নৈতিক? দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সর্বপ্রথম প্রয়োজন মূলধনের যোগান ও বিনিয়োগ বাড়ানো। আর এই মূলধনের যোগান দিতে হলে প্রয়োজন জাতীয় সঞ্চয় বৃদ্ধি। মূলধনের যোগান না হলে বিনিয়োগ বাড়বে কিভাবে? বিনিয়োগ যদি না বাড়ে, উচ্চ প্রবৃদ্ধি আসবে কোথা থেকে? তাই সর্বপ্রথম যা প্রয়োজন সেটি হলো- সঞ্চয় বৃদ্ধি ও মূলধনের যোগান দেওয়া। দেশের গরিব, নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত মানুষ সঞ্চয় বাড়ায়। এই সঞ্চয় বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন সুগঠিত মানি ও ক্যাপিটাল মার্কেট। শেয়ারবাজার নিয়ে বিশেষ কিছুই লিখতে চাই না। কথায় আছে, ছাইয়ে বাতাস দিলে ওড়ে বেশি। তেমনি দুঃখ নিয়ে বিলাপ করলে সেটাও বাড়ে বেশি। তাই আজ শুধু মানি মার্কেট নিয়েই বলতে চাই। সম্প্রতি পিপল’স লিজিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। আর্থিক খাতের কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণার ঘটনা দেশের ইতিহাসে প্রথম। শুনেছি অবসায়নে সরকার সদয় সম্মতিও দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করায় আমার মতো সাধারণ খেটে খাওয়া অনেক মানুষেরই কষ্টার্জিত সঞ্চয় চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। যারা ডিপোজিট রেখেছেন তারা এবং যারা শেয়ারবাজার থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনেছেন তারাও রয়েছেন বিরাট ঝুঁকির মধ্যে। একটা প্রতিষ্ঠান ডুবলে দেশের সাংঘাতিক বড় কোনো ক্ষতি হয়ে দেশ দেউলিয়া হবার কথা নয়। তবে এতে সাধারণ মানুষের আস্থার অভাবে অন্যান্য নন-ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট এবং ব্যাংকগুলোর ডিপোজিট সংগ্রহে চরম অসুবিধা হবে। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাবে। ফলে দেশের জাতীয় সঞ্চয় বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লিকুইডিটি কমে ঋণ প্রদানের সক্ষমতা কমে যাবে, অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমে যাবে, জাতীয় প্রবৃদ্ধিও চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। মাত্র কয়েকদিন আগেই আমরা পত্রিকায় রিপোর্ট দেখেছি যে, ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। এর দুটি অর্থ দাঁড়ায়- এক. দেশে জাতীয় প্রবৃদ্ধি বা অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমে যাচ্ছে, দুই. মানুষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবিশ্বাস করতে শুরু করেছে; তাই তারা নগদে লেনদেন শুরু করেছে। সম্ভাব্য দুটি সম্ভাবনার মধ্যে কোনটি সত্য? জাতীয় নীতি নির্ধারকদের তা খুঁজে বের করে ওভারকাম করার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে আমি মনে করি, ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন কমার পেছনে পিপলস লিজিংয়ের ডুবে যাওয়া অবশ্যই একটি কারণ। বাংলাদেশের রেগুলেটরি বডিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে সব সময়ই অগ্রগামী মনে করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার কারণে তাদের ভূমিকার কার্যকরিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। পিপলস লিজিংয়ের মতো আরও একটি বড় ঘটনা হলো- বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি। সাবেক অর্থমন্ত্রীকে এই সেদিনও বেসিক ব্যাংকের প্রধান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিষধগার করতে শোনা গেছে। যদিও ক্ষমতায় থাকতে তিনি বেসিক ব্যাংক প্রধানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি। জানি না পুতুল নাচের সূতা কার হাতে। বাচ্চু সাহেবরা কি সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীর থেকেও বেশি প্রভাবশালী? তাদের ক্ষমতার উৎস কোথায়? নাকি সরিষাতেই ভূত? শুধু বেসিক ব্যাংক বা পিপলস লিজিং-ই নয়, আর্থিক খাতের আরও অনেক প্রতিষ্ঠানই খারাপের দিকে চলে যাচ্ছে। অনেক লিজিং কোম্পানি ডিপোজিটরদের অর্থ যথাসময়ে ফেরত দিতে পারছে না। কারণ মানুষ তাদের কাছে নুতন করে অর্থ জমা রাখতে আর আস্থা পাচ্ছে না। আর্থিক খাতের একটি প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া ঘোষণা করার আগে নীতি নির্ধারকদের ভাবা উচিত ছিল- মানুষ আত্মীয়-স্বজনের কাছে অর্থ জমা রাখতে আস্থা পায় না। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে জমা রাখতে আস্থা পায়। কিন্তু রেগুলেটরি বডি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কি মানুষের সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছে? রাখেনি। ফলে মানুষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। এরই মধ্যে আরও আট থেকে নয়টি ব্যাংকের মূলধনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সেগুলোর ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, সময়ই তা বলতে পারবে। অনেকেই হয়তো প্রশ্ন করবেন, প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে টাকা গেল কোথায়? উত্তরটা সবারই জানা। কিছু খেলাপিঋণ ব্যবসায়িক লোকসানের কারণে আর সিংহভাগ নামে-বেনামে অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলেছে। তবে এই টাকা সরিয়ে ফেলা ব্যক্তিরা বিচারের মুখোমুখি না হয়ে বরং আরামে পাজেরো চেপে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পৃথিবীর সব সভ্য দেশেও খুন, ধর্ষণ, চুরি, রাহাজানি, বাটপারি- এসব হয়। কিন্তু অসভ্য দেশের সঙ্গে সভ্য দেশের পার্থক্য হলো- সভ্য দেশে প্রত্যেকটি অনিয়মের যথাযথ বিচার হয়, অন্যায়কারী শাস্তি ভোগ করেন। কিন্তু অসভ্য দেশে অন্যায়কারীর বিচার হয় না; ক্ষমতার দাপটে আরও সে দিগুণ উৎসাহে বুক ফুলিয়ে সমাজে ঘুরে বেড়ায়। সাধারণ বিচার প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশের বড়বড় অপরাধীরা প্রায়ই পার পেয়ে যায়। প্রশ্ন হলো- গরিবের অর্থ চুরি করে যারা একটি দেশের সঞ্চয়, ব্যাংকিং খাত, শিল্প ও অর্থনীতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, তারা কেন বড় অপরাধী বলে গণ্য হবেন না? লেখক: ফেলো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, ই-মেইল: bangla.joti@icloud.com

দূষিত নগরে এ কেমন জীবন!

দূষিত নগরে এ কেমন জীবন

আমিরুল আলম খান
০৯ জানুয়ারি ২০২০
ফাইল ছবিমঙ্গলবার, ৭ জানুয়ারি। বেলা ১১টা। শ্যামলীতে একটা ব্যাংকে জরুরি কাজ সেরে এসওএস শিশুপল্লির ওভারব্রিজে উঠি মিরপুর রোড পার হতে। চারদিকে গাড়ির বিকট হর্ন, গাড়ি চলার শব্দ, সঙ্গে আরও নানা ধরনের আওয়াজ। খানিক পরেই শ্বাসকষ্ট অনুভূত হতে লাগল। মনে হচ্ছিল, ব্রিজ পার হতে পারব না। রেলিং ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। ধীরে ধীরে নেমে এলাম শিশুমেলার মোড়ে। সেখানে একটু বিশ্রাম নিয়ে উবার ডাকলাম। তিন মিনিট লাগবে। আমি যেন দিশেহারা। কান ঝালাপালা করছে। সহ্য হচ্ছে না গাড়ি চলা আর হর্নের আওয়াজ। মিনিট তিনেকের মধ্যেই উবার হাজির। উঠে বসলাম। গাড়ির ভেতর গাড়ির আওয়াজ কমেছে। বাইরের বাতাসে শ্বাস নিতে হচ্ছে না। মিনিট দুয়েকের মধ্যে শ্বাসকষ্ট কমে এল। নিজেকে অনেকটাই সুস্থ মনে হলো। ঢাকায় রোজ অন্তত কোটি দেড়েক মানুষ নানা কাজে ঘরের বাইরে চলাচল করে। তাদের ৮০ ভাগই নানা দূষণে আয়ু ক্ষয় করছে। কত শত শারীরিক–মানসিক সমস্যা নিয়ে তারা ভিড় করে ডাক্তারের দরজায় দরজায়। দূষিত বাতাস, শব্দের বাড়াবাড়িতে তাদের এমন স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়। ধুলাবালু তো আছেই; আছে ধোঁয়া, জান কবজ করা ভারী ভারী নানা পদার্থ। বাস, মিনিবাস, লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, কাভার্ড ভ্যান, মোটরবাইক—সবকিছুই পাল্লা দিয়ে দূষণ ছড়াচ্ছে। সেই সঙ্গে নগরে উন্নয়নের ঘোড়দৌড় তো লেগেই আছে। সরকারি–বেসরকারি হাজারো উন্নয়ন প্রকল্প। সে জন্য যেখানে–সেখানে ইট, সুরকি, পাথর, বালু, রড, সিমেন্টের পাহাড়। রাস্তা, ফুটপাত সব দখল করেই এসব উন্নয়নসামগ্রীর স্তূপ। পাল্লা দিয়ে করপোরেশনও স্তূপ করে রাখে গৃহস্থালি বর্জ্য। তার সঙ্গে হোটেল, দোকান, হাসপাতালের বর্জ্য মিশে একাকার। বর্জ্য পচে দুর্গন্ধে এলাকা নরক না হলে করপোরেশন তা সাফা করার গাড়ি, লোক কিছুই পাঠায় না। আবর্জনা ফেলার জন্য তারা উপযুক্ত জায়গা হিসেবে বেছে নেয় স্কুল–কলেজের পাশের কোনো জায়গা। শিশুরা সে আবর্জনার দুর্গন্ধে বমি-বমি-গায়ে ঢোকে ক্লাসরুমের জেলখানায়। সঙ্গী লাখো কোটি জীবাণু। ফিরতি পথে আবার দুর্গন্ধ আর জীবাণুর দঙ্গল নিয়ে বাসায় আসে। কেউ দেখার নেই, প্রতিবাদ করার জো নেই। একুশ শতকের প্রথম দুই দশক পার করেছি আমরা। তৃতীয় দশকে যে অবস্থার উন্নতি হবে, তা দুরাশা মাত্র। কারণ, বিশৃঙ্খলা বাড়ছেই দিনে দিনে। আজই সংবাদমাধ্যমের জবর খবর, ঢাকা দুনিয়ার সবচেয়ে দূষিত শহরে তালিকার সেরাতে আজও। গত ডিসেম্বর থেকে ঢাকা মাসের অর্ধেকজুড়েই দূষিততম নগরের তকমা নিয়ে হাজির হচ্ছে। উচ্চ আদালতের হুকুম জারি আছে রোজ পানি ছিটিয়ে শহর ধূলিমুক্ত রাখার। সে হুকুম কোথাও আমল হচ্ছে কি না, ঈশ্বর জানেন; আমরা ঢাকাবাসী তা চোখে দেখিনে, কানেও শুনিনে। একদা ঢাকা ছিল নদীঘেরা এক চমৎকার নগরী। দুনিয়ার কয়টা শহরের চারপাশ চার–চারটা নদী বহমান, তা আমার জানা নেই। কিন্তু ঢাকা ছিল সেই বিরল শহর, যেটি চারপাশ নদীবেষ্টিত। কিন্তু হলে কী হবে? ‘সরকারকা মাল, দরিয়ামে ঢাল’—আমরা এমন রপ্ত করেছি যে গোটা নদীই দখল করে করে ওদের জান কবজ করে ফেলেছি। প্রাণীর জান কবজের কাজ আজরাইল ফেরেশতার। কিন্তু খোদ দুনিয়ার জান কবজের কাজটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে আশরাফুল মখলুকাত—মানুষ। শুধু ঢাকার নদী নয়, নদীমাতৃক বাংলাদেশে এখন নদী খুঁজে পাওয়াই ভার। যদিওবা নদী কিছু অবশিষ্ট আছে, পানি তার ভয়ংকর দূষিত। বেশির ভাগ নদী এখন খাল বলেও চেনা যায় না। যেটুকু আছে, তা কচুরিপানায় ভরা। নয়তো দখলবাজরা তা দখলে নিয়ে মাছের ঘের, পুকুর বানিয়েছে, বাড়ি, দোকানের ইমারত তুলেছে।
ঢাকায় এককালে খাল ছিল বহু। এখন সেগুলোও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ধানমন্ডি, বনানী, গুলশান, উত্তরা, বারিধারায় ভদ্দরলোকদের জন্য যেসব লেক তৈরি করা হয়েছিল, তারও অবস্থা কাহিল। এমনকি কয়েক শ কোটি টাকায় নান্দনিক শোভার বার্তা দিয়ে হাতিরঝিল তৈরি করা হলো দশক দেড়েক আগে, সেটা এখন পচা পুকুরেরও অধম, চরম দূষিত। ওই এলাকার বাসিন্দারা কী করে বসবাস করে, তা কেবল মাবুদ জানেন। ওদিকে দেশের একসময়ের আইকন হোটেল সোনারগাঁও এলাকা পচা সবজি আর মাছের গন্ধে কাক-শকুনেরও অরুচি। সেদিন দেখি, হাতিরঝিলে ছুটছে বিনোদনের কলের নৌকা। তা নৌবিহারের ব্যবস্থা যদি করেন নগরপিতা, তাহলে দুটি বিষয় মাথায় নিলে ভালো করতেন। এলাকাটা আগে সাফসুতরো করে দুর্গন্ধ তাড়িয়ে নিতেন। আর দ্বিতীয় নিদান, কলের জাহাজ না চালিয়ে দাঁড় আর হালের নৌকা চালালে নতুন প্রজন্ম ‘প্রমোদে ঢালিয়া দিত মন’। বাতাস যখন বইত, ধীরে ধীরে উড়িয়ে দিলে নানা রঙিন পাল, খুশির পালে লাগত জবরদস্ত হাওয়া। তাতে হাতিরঝিলের মান বাড়ত, নাগরিকদের দেহ–মন চনমনিয়ে উঠত। কিন্তু সেসব দিকে নজর দেবেন, তেমন লোকের এখন বেজায় অভাব। বরং দেখি, চারদিকে কোটি কোটি লোক নগরটাকেই খাবলে–খুবলে খেতে হল্লা করে আসছে ধেয়ে ধেয়ে। তাদের সঙ্গে আছেন আবার গদির ওপর বসা অনেক মানুষ। তাঁরা সবাই দল বেঁধেছে আসছে আমাদের মতো পথের মানুষের জান খাবলে খাবলে খেতে। গরিব মানুষের কলজে খাওয়া বেশ মজার। আমিরুল আলম খান: যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান

পোশাক খাত এ মুহূর্তে একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছেঃ রুবানা হক

সাক্ষাৎকার :রুবানা হক

পোশাক খাতের ভালো গল্পগুলো বিশ্ববাসীকে শোনাতে চাই

তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রফতানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর নতুন সভাপতি হিসেবে আজ শনিবার দায়িত্ব নিচ্ছেন মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড.রুবানা হক। তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র এবং বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনিসুল হকের স্ত্রী। বিজিএমইএর ৩৬ বছরের ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী সভাপতি। পোশাক খাত নিয়ে তার পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন বিষয়ে সম্প্রতি গুলশানে তার বাসায় সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন রুবানা হক। তিনি বলেছেন, পোশাক খাতের ভালো গল্পগুলো তিনি বিশ্ববাসীকে শোনাতে চান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আবু হেনা মুহিব। সমকাল :নির্বাচনী ইশতেহারে আপনি বলেছেন, পোশাক খাত এ মুহূর্তে একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ভাবমূর্তি, পোশাকের দর, রফতানি বাজারকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেবেন- এই ক্রান্তিকাল কী। রুবানা হক :ক্রান্তিকাল এজন্য বলছি যে, অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো সমস্যায় আছে। শ্রমিকদের মজুরি দিতে পারছে না। তাদের কষ্ট হচ্ছে। বাজারের চেহারা বদলে গেছে। যারা পোশাক কেনেন, অর্থাৎ ভোক্তাদের রুচি বদলে গেছে। তারা এখন অনেক কম কিনছেন। কিন্তু দামি অর্থাৎ মানসম্পন্ন ভালো পোশাক তারা খোঁজেন। বাজারে দুই ধরনের পোশাকের চাহিদা রয়েছে। একটি হলো, একেবারেই বেসিক অর্থাৎ কম দামের কাপড় এবং মূল্য সংযোজিত বা উচ্চমূল্যের পোশাক। এই মানের পোশাক আমাদের এখানে কম হয়। আমাদের ৩১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৫ বিলিয়ন শুধু টি-শার্ট পণ্য। কাজেই মূল্য সংযোজিত পোশাকের উৎপাদন বাড়াতে হবে। এখানে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আবার কিছু নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি হয়েছে। এগুলোই চ্যালেঞ্জ। আবার চ্যালেঞ্জ আছে যেখানে, সেখানে সুযোগও আছে। আমাদের সুযোগ হয়েছে, আমরা চেষ্টা করব। সমকাল :ভাবমূর্তি সংকটের বিষয়টি? রুবানা হক :ভাবমূর্তির ঘাটতি কাটাতে নিজেদের গল্পগুলো গুছিয়ে বলতে হবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো আমাদের বিরুদ্ধে যা তা লিখছে। গার্ডিয়ানও সেদিন এরকম একটা রিপোর্ট করেছে। খুবই ভালো একটি কমপ্লায়েন্ট কারখানা, অথচ এটার বিরুদ্ধে যা-তা লিখে দিল। ৪০ লাখ শ্রমিকের শিল্প। সেখানে তো কিছু ভুল-ভ্রান্তি থাকতেই পারে। আমরা যদি ভুল মেনে নিয়ে সেটা ঠিক করতে পারি, তাহলে সম্মিলিত আস্থার জায়গায় আসতে পারি। মিডিয়া, সুশীল সমাজ, মালিক-শ্রমিক এই জায়গাগুলোতে আস্থা অর্জন করা জরুরি। এজন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। আমার একটাই পরিচয় নয়। আমি কেবল পোশাক কারখানা চালাই তা-ই নয়। আমি লিখি, আমার বিশ্বাসের জায়গা আছে। আমি আনিসের বিধবা স্ত্রী। আমি তার আদর্শ ধারণ করি। আমার পক্ষে কোনো বিচ্যুতিকে প্রশ্রয় দেওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। আমিই খুবই সরল মানুষ, কিন্তু বুঝি কীভাবে এগোতে হবে। আমার মনন আমাকে ধেয়ে বেড়ায়, আমার বিবেক আমাকে ধেয়ে বেড়ায়। আমার পক্ষে কখনও কোনো ফাঁকি হবে না। পোশাক খাতে কোনো সংকট হলে আমাদের ত্রুটি থাকলে আমি ভুল স্বীকার করে মিডিয়ার সহযোগিতা নিতে পারি। আমাদের পোশাক খাতে অনেক ভালো গল্প আছে। আমরা গল্পগুলো বিশ্ববাসীকে জানাতে চাই, শোনাতে চাই। দ্বিতীয়ত, আমাদের ২০ ভাগ মাত্র সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে কাজ করি, বাকি ৮০ শতাংশ বায়িং হাউসের মাধ্যমে হচ্ছে। এর কারণ, আমাদের দর কষাকষিতে দুর্বলতা আছে। দর কষাকষির জায়গায় আমরা দুর্বল থাকি। এজন্য ক্রেতারা আমাদের চেপে ধরে। সমকাল :বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে দর কষাকষিতে এই দুর্বলতা কেন? রুবানা হক :আমাদের উদ্যোক্তাদের একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। পাশের কারখানা হয়তো কেউ ১ ডলারে একটা কাজ করে। তার থেকে কমে আমি হয়তো হুট করে ৭৫ সেন্টে কাজ করলাম। এরকম যারা করে তারা মনে করে কারখানার চাকা চললেই হলো। এ শিল্পে ওভার ক্যাপাসিটির সমস্যা আছে। একেক জন ১০০-২০০ লাইনের কারখানা করে বসে আছি। সেরকম কাজ হয়তো সব সময় থাকে না। এখন চাকা সচল রাখতে গিয়ে অসম প্রতিযোগিতা হচ্ছে। এতে গোটা শিল্পকে মাশুল দিতে হচ্ছে। এ কারণে শ্রীলংকায় বেইজ সিলিং করে দেওয়া হয়েছে। আমরাও সেরকম চিন্তা করছি। কোনো কারখানা দর কষাকষির সহযোগিতা নিতে চাইলে তাদের সহযোগিতা দেব। সমকাল :দর কষাকষিতে দুর্বলতার ক্ষেত্রে আরও একটা বিষয় হচ্ছে ভাবমূর্তির দুর্বলতা। রুবানা হক :হ্যাঁ, এই সুযোগটাও নিয়ে থাকে ক্রেতারা। এ জন্য আমরা ভাবমূর্তিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। কারণ, ভাবমূর্তি ঠিক করা গেলে আমরা বলতে পারব, এত বেশি গ্রিন কারখানা কোনো দেশে নেই। আমাদের অনেক ভালো গল্প আছে। মিরপুরের একজন নারী শ্রমিকের আয়ের ওপর পরিবারের ৫ সদস্য নির্ভরশীল। আবার ধরেন, শেয়ারড বিল্ডিংয়ের কারখানাগুলোকে বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। অথচ এসব কারখানাকে উদ্যোগ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে দিলে দর কষাকষিতে শক্তি বাড়বে। সমকাল :আমাদের মনোযোগ ছিল অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্সকে তাড়ানোর দিকে। রুবানা হক :অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সকে তাড়ানোর পক্ষে আমিও। তারা আমাদের অনেক উপকার করেছে। তবে অ্যাকর্ড নানা ছুতা খুঁজছে। অ্যাকর্ডের নির্বাহী পরিচালক রব অয়েজের ভিসা নেই হয়তো। কাজের অনুমতি হয়তো নেই। তাদের অনেক দুর্বলতা আছে। তারপরও তারা থাকছে ৮টি শর্তের ভিত্তিতে। এই শর্তগুলোর চারটা আমার লেখা। বাকি চারটা মহিউদ্দিন ভাইয়ের (বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি) লেখা। এই শর্ত থেকে আমরা সরব না। এই শর্ত খাড়া থাকলে অ্যাকর্ড কাজ চালিয়ে গেলেও কোনো সমস্যা তৈরি করার সুযোগ থাকবে না। অ্যাকর্ডের অফিসে বিজিএমইএর সেল থাকবে। এই সেল প্রতিদিনের কাজ তদারক করবে এবং আদায় করবে। দুই পক্ষের প্রকৌশলীরা যেকোনো বিষয়ে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। সমকাল :পোশাক খাত এগিয়ে নিতে আপনার পরিকল্পনা কী? রুবানা হক :আমাদের গল্পগুলো কখনই গুছিয়ে বলতে পারিনি। আমার পরিকল্পনা আছে, প্রতিটি কারখানার সাধারণ শ্রমিকের গল্পটা সুতায় বেঁধে দিতে পারি কি-না। ছোট একটা বারকোডে ৭ সেকেন্ডের একটা গল্প বলা। ক্রেতারা তা জানুক। এথিক্যাল বায়িং (ক্রয় বাণিজ্যে নৈতিকতা) নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, তারা জানুক যদি তারা বাংলাদেশের পোশাক না কেনে তাহলে এই শ্রমিকরা যাবে কোথায়। ক্রেতাদের এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটা নিয়ে আমার স্বপ্ন আছে। আমার আরও কিছু পাগলা স্বপ্ন আছে। আমাকে এমনিতে সবাই শ্রমিকপাগল বলে। ২০ মিলিয়ন ডলারের ওপরে যাদের রফতানি তাদের কারখানায় স্কুল থাকতে হবে। আমি শ্রমিকদের স্বপ্ন দেখাতে চাই। আমি ৫৫ বছরে পিএইচডি করেছি। শ্রমিকরা কেন আরও বড় কাজ করার জন্য এগোতে পারবে না। আমাদের ১৫০ শ্রমিক এখন এশিয়ান উইম্যান ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। তারা ইংরেজিতে কথা বলতে খুব সাবলীল। আমাকে ইংরেজিতে মেইল করে, কেন ল্যাপটপ দিচ্ছি না। অর্থাৎ, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ আছে সামনে। এজন্য শ্রমিকদের তৈরি করতে তাদের পুনঃদক্ষতার সুযোগ দিতে হবে। যদি শ্রমিকদের দিয়ে না পারি, তাহলে তাদের সন্তানদের দিয়ে চেষ্টা করব। এ বিষয়ে সরকারের এটুআই প্রকল্পের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা আছে আমার। সমকাল :তৈরি পোশাকের দুর্বলতার কারণে গোটা রফতানি খাতের মার্কিন জিএসপি স্থগিত করা হয়েছে। এ খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে আপনাকে কতটা পীড়া দেয়? রুবানা হক :ভীষণ পীড়া দেয়। তবে, এই স্থগিতাদেশ মূলত রাজনৈতিক কারণে। কলম্বিয়ার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের দেশের সঙ্গে চুক্তি করে আমেরিকা। অথচ আমাদের জিএসপি স্থগিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদেরও শ্রম-সংক্রান্ত অনেক দুর্বলতা আছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি নেই সেখানে। শ্রমিক ইউনিয়ন কয়টা আছে তাদের। সমকাল :শ্রমিক স্বার্থ নিয়ে আপনার ভাবনা কী? রুবানা হক :হ্যাঁ, এটা সত্য। মিডলেভেল ম্যানেজমেন্টে আমাদের দুর্বলতা আছে। বিজিএমইএতে এ-সংক্রান্ত কী প্রকল্প আছে সেটা দেখতে হবে। শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য দাবি আদায়ে যা করতে হয় আমি তা করব। আমার কাছে দাবি করতে হবে না। আগেই বলেছি আমার কাছের লোকজন আমাকে শ্রমিকপাগল বলে। সুতরাং তাদের বিষয়ে আমার একটা মমত্ববোধ আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণার পর ১ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে সুদে গৃহায়ন ঋণ থেকে শুধু আমি এবং মহিউদ্দিন ভাই ঋণ পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার ৫ বছর পরও কাজ না হলে সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। আর একটা কথা বলি, শ্রমিকদের জন্য কোনটা কল্যাণ সেটা বুঝতে হবে। কোনো কিছু গড়তে অনেক সময় লাগে। ধ্বংস করতে লাগে আধা মিনিট। এটা বোঝা দরকার। সমকাল :স্বাধীনতার ৫০ বছরে অর্থাৎ ২০২১ সালে পোশাক রফতানি থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কি? রুবানা হক :রফতানিতো বাড়াতেই হবে। আগামী বছর ৪০ বিলিয়ন এবং পরের বছর ৫০ বিলিয়ন। এটা বাড়ানোর জন্য এক্সিট প্ল্যান করা হবে। যারা টিকতে পারছে না তাদের আইনসম্মতভাবে বিদায় নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। যারা সহযোগিতা দিলে সক্ষমতা বাড়বে তাদের সহযোগিতা দেওয়া হবে। বড় কারখানাগুলোকে উচ্চ মূল্যের পোশাক উৎপাদনে মনোযোগ বাড়াতে হবে। নতুন বাজার বিশেষ করে রাশিয়ায় যেখানে ৪৫ শতাংশ হ্রাস করা কিংবা এরকম অন্যান্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করা, ইউরোপের যে সব দেশে বাজার বাড়েনি সেখানে বাড়ানো। এসব ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করতে হবে। সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে আমি কাজ করতে চাই।

অপরাধীরা হিংস্র হয়ে উঠেছে বিচারহীনতার কারণে’

অপরাধীরা হিংস্র হয়ে উঠেছে বিচারহীনতার কারণে’

|বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট|

নারীর প্রতি সহিংসতা দিন দিন বাড়ছে। সেই সঙ্গে অপরাধীরাও হয়ে উঠছে হিংস্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতার ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। এসবের অন্যতম কারণ প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা ও বিচারহীনতা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘আগুনে পুড়লো মানবতা’ শীর্ষক বৈঠকিতে এই মন্তব্য করেন আলোচকরা। মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় মঙ্গলবার (৯ এপ্রিল) বিকাল সাড়ে ৪টায় শুরু হয় বাংলা ট্রিবিউনের সাপ্তাহিক এই আয়োজন। বৈঠকিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থার একটি নিয়ম হচ্ছে, যতোক্ষণ পর্যন্ত অপরাধ প্রমাণিত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত অভিযুক্তকে নির্দোষ ধরা হবে। এটা তো আইনের মৌলিক বিধান। এখানে মাদ্রাসার অপরাধটি আমাদের বিশেষভাবে বিস্মিত করে এ কারণে যে, ছাত্রীও আরেকজন মাওলানার মেয়ে। তাতে দেখা যাচ্ছে, মাদ্রাসায় ছাত্রীরা পড়তে গেলে আমরা বাইরে থেকে ভাবি “নিরাপদ”। কিন্তু যেখানে নিরাপদ মনে করে রক্ষক যখন ভক্ষক হন তখন আমাদের মধ্যে একটু বেশি ও আলাদা বেদনা হয়। আমাদের এখানে ক্ষমতা যতো বেশি হয় ততো বেশি অন্যায় হয়। সেগুলোর বিচার তো করা যাবে না।’ এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের গ্রহণ করা উচিত। আমরা ঘটনাকে লোকাল এনেস্থেটিকের মতো দেখি। এখন নারী আক্রান্ত হচ্ছে বলেই কি আমরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছি? কিন্তু আক্রান্ত তো সব জায়গাতেই হচ্ছে। ৫০ বছর আগেও বিচারটা আমরা করতাম রাষ্ট্র বনাম। রাষ্ট্র হচ্ছে বাদী আর আমি হলাম সাক্ষী মাত্র। যে ক্রিমিনাল মামলাগুলো একই সঙ্গে সিভিল মামলাও বটে। আমার হাত নষ্ট হলো, চোখ চলে গেলো– এতে আমাদের এখানে ক্ষতিপূরণের বিধান নেই। থাকলেও তা হাইকোর্টের দয়ার ওপর নির্ভর করে। আমার মনে হয় বিচারের ক্ষেত্রে খুনির মৃত্যুদণ্ড হয়, কিন্তু আমার খুন তো আর পূরণ হবে না। আমার পরিবার তো আমাকে পাবে না। সেজন্য ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্রকে দিতে হবে। নাগরিককে রক্ষার জন্য যে অঙ্গীকার করে রাষ্ট্র হয়েছে, যেহেতু আমরা ট্যাক্স দিই, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র তার অঙ্গীকার পূরণ করছে না। ‘আমি তো মনে করি আমাদের রাষ্ট্র একটি অদ্ভুত ধরনের যন্ত্র। অতএব এবার যন্ত্র দায়িত্বহীন সেটা ঢাকা শহর ঘুরলেই বোঝা যায়। ঢাকায় ফুটপাথ তৈরি করতে পারছে না কিন্তু পদ্মা সেতু তৈরি করতে পারছে। তার মানে এটা অগ্রাধিকারের প্রশ্ন! প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হয় যে, মানুষ যাতে বোঝে এজন্য আপনারা রায় বাংলায় লিখুন। এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কিছু হতে পারে না। অন্য কোনও ভদ্র দেশে বিচারক যদি বলেন, “আমি বাংলায় লিখতে পারি না,” তার তো চাকরি থাকার কথা না। তাহলে ন্যায়বিচার কোথায়? কথায় আছে, দান-খয়রাত সবার প্রথমে আত্মীয়স্বজনকে করবেন। তো আপনি যদি নিজের ঘরেই বিচার প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন, তাহলে আপনি অন্যের কাছে করবেন কী করে। নারী-পুরুষ বাদ দিয়ে এখানে যারা গরিব তারা সব সময় নিপীড়িত হয়।’ সময়ের সঙ্গে অপরাধ ভিন্নরূপে সংঘটিত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে অপরাধের সঠিক চিত্র নেই। কয়েক বছর আগে আমরা অ্যাসিড সন্ত্রাসের কথা শুনেছি, কিছুদিন ধরে মনে হচ্ছে সেটা নেই, অন্য রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণ কিংবা নানাধরনের হয়রানিমূলক আচরণ রয়েছে। সত্যি বলতে কি, আমরা জানি না কীভাবে এসব দমন করা যায়। আমরা যেটা করি সেটা হলো পুলিশ দিয়ে সরাসরি অপরাধ দমন। কিন্তু অপরাধের সূত্রপাত যেখানে হয়, চিন্তার ধরনের মধ্যে, সেটার জন্য কী দরকার আমি জানি না। অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, এক্ষেত্রে শিক্ষামূলক কার্যক্রম হাতে নিতে হয়। তার মানে অপরাধীকে বই পড়ানো নয়। আমাদের প্রধান সমস্যা, বড় বড় অপরাধের বিচার হয়নি। সেটা কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় আমরা শুনেছি। সে ব্যাপারে যেহেতু আমাদের একটি প্রশিক্ষণ হয়েছে চুপ করে থাকার। কারণ অপরাধী হিসেবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, তারা যদি আমার চেয়ে “বড়লোক” হয়, তাহলে আমাদের সাংবাদিক এমনকি পুলিশ পর্যন্ত নীরবতা পালন করে। আমাদের চুপ করে থাকার প্রশিক্ষণ হয়েছে। আলোচনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাম্মানিক সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী মেঘনা গুহঠাকুরতা বলেন, ‘আমাদের যে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা আছে, জীবনাচরণের যে ধারাবাহিকতা আছে, সেই জায়গা থেকে নারীর প্রতি সহিংসতা আমরা দূর করতে পারিনি। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রীর ব্যাপারে দেখেছি, সহিংসতার ব্যাপ্তি ঘটছে। হয়রানির সঙ্গে হিংস্রতাও আসছে, সেটা আমার কাছে বিশেষভাবে লক্ষণীয় মনে হচ্ছে।’ সময়ের সঙ্গে সহিংসতার ধরন বদলাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা একটি সিস্টেমিক ভায়োলেন্স। এটি আমাদের সমাজ কাঠামোর মধ্যে জড়িত। আমরা দেখেছি একেক সময় একেক রকমভাবে নারীর প্রতি সহিংসতামূলক আচরণ করা হয়েছে। একসময় আমরা দেখেছি, অ্যাসিড নিক্ষেপ ছিল প্রধান সহিংসতা।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘যৌন হয়রানি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, গায়ে হাত না লাগিয়েও হতে পারে। আমাদের হাইকোর্টের নির্দেশনা আছে, সেটা জানলে আমরা ব্যাপ্তি বুঝতে পারি। ফেনীর এই ঘটনার মতো আরেকটি নরসিংদীর ঘটনা দেখছি। হয়রানির ঘটনাগুলো প্রকট রূপ ধারণ করছে। সেটা আমার কাছে ভয়াবহ লাগছে।’ বেসরকারি সংস্থা আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট উই ক্যানের প্রধান সমন্বয়ক জিনাত আরা হক বলেছেন, ‘যখন কেউ সন্ত্রাস করে তখন তার পরিচয় সন্ত্রাসী। সন্ত্রাস বা ক্ষমতাচর্চার জন্য একটা “টুলস” লাগে। কোনও একটা কিছু ব্যবহার করেই তো সে ক্ষমতা চর্চা করে, সে সন্ত্রাস করে, নিপীড়ন করে। তখন সে ব্যবহার করে ক্ষমতাকাঠামোতে তার পজিশন। সে ব্যবহার করে ধর্ম থেকে পাওয়া তার গ্রহণযোগ্যতা, সমাজ থেকে পাওয়া তার কদর। এগুলো ব্যবহার করেই সে সন্ত্রাসটা করে। সেই সন্ত্রাসটা আরও জায়েজ করা হয় যখন বিচার হয় না।’ বিচার না পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন কোথাও বিচার পাই না তখন আমরা বলি– “ঠিক আছে! আমরা বিচার পাবো বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে।” কিন্তু সেখানে গিয়েও আমরা বিচার পাই না। বিচার ব্যবস্থা নিয়ে অনেক কথা হয়। এটি তো একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপার নয়। এটি সামগ্রিক ব্যাপার। যেখানে কাজ করবেন পুলিশ থেকে শুরু করে উকিল, বিচারক।’ [caption id="attachment_23733" align="alignleft" width="620"] সম-সাময়িক বিষয়ের উপর আয়োজিত বাংলা ট্রিবিউন-এর গোলটেবিল বৈঠক [/caption] এ প্রসঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. সৈয়দ শাহ এমরান বলেন, ‘আমাদের নির্ধারণ করা দরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধ কেমন হবে? মূল্যবোধটা শুধু শিক্ষার্থীরা শিখবে নাকি শিক্ষকদেরও শেখার প্রয়োজন আছে।’ এ সময় ফেনীতে মাদ্রাসাছাত্রীর ওপর সংঘটিত সহিংসতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যেখানে মানবতা ভূলুণ্ঠিত,সেখানে ডিফেন্ড করার প্রশ্নই আসে না। যেখানে কোনও বিবেক, কোনও ধর্ম কিংবা কোনও ধরনের ব্যাখ্যা, কোনও আইন যদি কাজ করে তাহলে ভিকটিমের পক্ষেই কাজ করবে। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রীর সঙ্গে যা হয়েছে, সেটি ভয়াবহ সহিংসতা। এখানে মানবতা মেয়েটির পক্ষেই থাকবে, তার পক্ষেই তো আমরা লড়বো। সুতরাং এখানে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজুল্লাহ কে, তিনি কোথায় পড়েছেন, কোথায় শিক্ষকতা করেছেন, কোথায় কাজ করেছেন সেসব বিষয় মুখ্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবাই জানি, যে সন্ত্রাসী তার কোনও ধর্ম নেই। তার কোনও ভালো কর্মক্ষেত্র হতে পারে না। আমরা জানি, জাহেলিয়া যুগের কথা। তখন কি শিক্ষিত লোক ছিল না? অনেক ছিল। তারপরও অন্ধকার যুগ কেন? তখনও মেয়েশিশুদের জীবন্ত কবর দেওয়া হতো।’ পুলিশ সদর দফতরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ সর্বনিম্ন সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্তদের আইনের আওতায় নেওয়া হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশ মামলা রুজু হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত করা শুরু করেছে।’ সম্প্রতি ফেনীতে মাদ্রাসাছাত্রীর ওপর সহিংসতার ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রীকে আগুন দিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় পুলিশই কিন্তু সবার আগে তার আগুন নিভিয়েছে। মেয়েটি যখন সিঁড়ি দিয়ে চিৎকার করতে করতে নেমে আসছিল, তখন পুলিশ সদস্যরাই দৌড়ে গিয়ে হাতের কাছ থেকে একটি পাপোশ নিয়ে তার গায়ে জড়িয়ে আগুন নিভিয়েছে। পুলিশই কিন্তু তাকে সর্বনিম্ন সময়ে হাসপাতালে নিয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজকে (মঙ্গলবার) নরসিংদীর ঘটনাতেও কিন্তু সর্বনিম্ন সময়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ইতোমধ্যে দুজনকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া ভিকটিমদের পাশে ঢাকায় সার্বক্ষণিকভাবে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন। তারা ভিকটিমের চিকিৎসা থেকে শুরু করে অন্য বিষয়গুলো সমন্বয় করছেন। এই বিষয়গুলো তদারকি করার জন্য আমাদের একটি টিম কাজ করছে।’ [caption id="attachment_23732" align="alignleft" width="620"] উদিসা ইসলাম[/caption] বিচারহীনতার প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের প্রধান প্রতিবেদক উদিসা ইসলাম বলেন, ‘একদিকে যেমন নারীর প্রতি সহিংসতার বিচার হচ্ছে না, আবার এ কারণে আমরা অপরাধের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচারও করতে পারছি না। দৃষ্টান্ত হিসেবে সর্বসাধারণের সামনে বিষয়টি তুলে ধরতে পারছি না যে, এ ধরনের ঘটনা ঘটলে এই বিচার হচ্ছে। যার ফলে অপরাধীদের সাহস বেড়ে যাচ্ছে। এটি এই পর্যায়ে এসে দাঁড়াচ্ছে যে, নারীকে দমানোর জন্য আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। এর মধ্যে এক ধরনের হিংস্র উল্লাসও কাজ করছে। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ জায়গায় যাচ্ছে বিচারহীনতার কারণে। যতোদিন পর্যন্ত আমরা এই বিচারগুলো আমরা না করতে পারবো এবং গণমাধ্যম সেগুলো সঠিকভাবে প্রচার না করবে ততোদিন পর্যন্ত এই সমস্যাগুলো কমে আসার সম্ভাবনা খুব কম।’ [caption id="attachment_23731" align="alignleft" width="620"] মুন্নী সাহা[/caption] রাজধানীর পান্থপথে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এ বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করেছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে লাইভ দেখা গেছে এ আয়োজন। ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) সহযোগিতায় বৈঠকিটি আয়োজিত হয়। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

নিজের দুর্বলতা প্রমাণ করেছে ইসি

নিজের দুর্বলতা প্রমাণ করেছে ইসি

শারমিন মুরশিদ

প্রতি নির্বাচনের আগে পর্যবেক্ষকদের কিছু নির্দেশনা দিয়ে থাকে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যেমন: আইন মেনে চলতে হবে, নিরপেক্ষ থাকতে হবে, বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে ইত্যাদি। এবারও সেগুলো মনে করিয়ে দিয়েছে ইসি, সেটি ঠিক আছে। তবে এবার নির্দেশনার মধ্যে কিছু অবাক হওয়ার মতো বিষয়ও ছিল। নির্বাচন কমিশন বলছে, পর্যবেক্ষকদের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে হবে। গণমাধ্যমের সঙ্গে পর্যবেক্ষকেরা কথা বলতে পারবেন না, কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। নির্বাচন শেষে একটি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে এমন নির্দেশনা প্রথম পেলাম। নির্বাচন কমিশন এমন নির্দেশনা কেন দিল? একটি স্বচ্ছ নির্বাচন দিতে নির্বাচন কমিশন কি প্রস্তুত নয়? নির্বাচন কমিশন কি চায় না পর্যবেক্ষকেরা পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়া তলিয়ে দেখুক? জনমনে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে যে আস্থাহীনতার জায়গা তৈরি হচ্ছে, এই নির্দেশনা তা আরও সুদৃঢ় করে দিল না? অস্বচ্ছতার জায়গা তৈরি করে দিল না? নির্বাচন কমিশন কিছু লুকানোর চেষ্টা করছে কি না, সে প্রশ্ন উঠবেই। পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন এমন বক্তব্য দিয়ে নিজের দুর্বলতা প্রমাণ করেছে। সবার মনে প্রশ্ন জাগছে, কী লুকাতে চাইছে নির্বাচন কমিশন। ভোটারদের তাড়িয়ে কেন্দ্র দখল হলে পর্যবেক্ষকেরা তা নির্বাচন কমিশনকে জানান। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পুলিশকেও জানান। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়টি জানানোর ফলে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। নির্বাচন কমিশন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে। ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা ঘটতে দেখেও পর্যবেক্ষকেরা নির্লিপ্ত থাকতে পারেন না। এটি নৈতিকতার প্রশ্ন। যে দেশে নির্বাচনে সহিংসতায় মানুষ মারা যায়, সেখানে প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। পর্যবেক্ষকদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে নির্বাচন কমিশনকে জানানো। কমিশন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পর্যবেক্ষকদের নিরপেক্ষ থাকতে বলার বিষয়টি সত্য। তবে নির্বাচন কমিশন এবার যেভাবে নিরপেক্ষ থাকার কথাটি বলেছে, তা সবার মনে সংশয় জাগিয়েছে। এমন বক্তব্য পর্যবেক্ষণকে অনুৎসাহিত করছে। এবার পর্যবেক্ষণ প্রথাগতভাবে যেভাবে হয় সেভাবে হচ্ছে না। এবার পর্যবেক্ষকও থাকবেন কম। রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যে এবারের নির্বাচন হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। অথচ, বহুদিন ধরে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে এমন অনেক সংস্থা এবার পর্যবেক্ষণ করতে পারবে না। নির্বাচন কমিশন বলেছে, পর্যবেক্ষকেরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না। এটি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। জায়গা থেকে তথ্য পাঠাতে, যোগাযোগ করতে মোবাইল ফোন লাগেই। আমার মনে হচ্ছে, পর্যবেক্ষকদের কাজটা কঠিন করে দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন বাতিল হতে পারে বলে নির্বাচন কমিশন যে হুমকি দিয়েছে, এটি লজ্জাজনক। এবারের নির্বাচন ভিন্নমাত্রার। শাসক দলের অধীনে, সব দলের অংশগ্রহণে, সমঝোতার অভাবের মধ্যে নির্বাচন হচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো খড়্গ মাথায় নিয়ে পর্যবেক্ষকেরা কাজ করবেন। অনেক পর্যবেক্ষক সংগঠন চিন্তা করছে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে যাবে কি যাবে না। পর্যবেক্ষণে গেলেও কতটুকু পর্যন্ত যাবে, তা নিয়ে চিন্তিত। যত বেশি নজরদারি, তত বেশি স্বচ্ছতা। নির্বাচন কমিশন পর্যবেক্ষকদের নিজের হাত, পা, কান, চোখ বলে মনে করবে। পর্যবেক্ষকদের মতামতগুলো কমিশন মুক্তমনে আমলে নেবে এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তাহলে বুঝব নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী ও তৎপর। নির্বাচন কমিশন আস্থা নিয়ে সংগ্রাম করছে। আস্থার জায়গা তৈরি করতে হলে এই মুহূর্ত থেকে নির্বাচন কমিশনের ভাষা বদলানো দরকার। শারমিন মুরশিদ: নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী ও ব্রতীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা

কেন আমাদের সুপারহিরো প্রয়োজন?

কেন আমাদের সুপারহিরো প্রয়োজন?

অর্ণব সান্যাল

মার্ভেল কমিকসের সৃষ্ট সুপারহিরোরা। ছবিটি মার্ভেল কমিকসের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া মার্ভেল কমিকসের সৃষ্ট সুপারহিরোরা। ছবিটি মার্ভেল কমিকসের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া অসংখ্য ভক্তকে কাঁদিয়ে মার্ভেল কমিকসের প্রতিষ্ঠাতা স্ট্যান লি কিছুদিন আগে মারা গেছেন। মৃত্যুর আগে পুরো পৃথিবীকে একগুচ্ছ কাল্পনিক ‘সুপারহিরো’ দিয়ে গেছেন তিনি। শুধু মার্ভেল নয়, ডিসি কমিকসও অনেক সুপারহিরো চরিত্র সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশেও তৈরি হচ্ছে কমিক হিরো। কমিকসের পাতা বা রুপালি পর্দাতেই এসব সুপারহিরোর রাজত্ব। কিন্তু এই পৃথিবীর ৭০০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবনে সুপারহিরোর প্রয়োজন কতখানি? আদতেই কি সুপারহিরোর দরকার আছে? বিশ্বজুড়েই ইদানীং হুলুস্থুল খুব বেশি। কোথাও যুদ্ধ হচ্ছে, কোথাও সাংবাদিককে হত্যার পর লাশ গায়েব করে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার জোট (যেমন ব্রেক্সিট) থেকে বের হয়ে যাওয়া নিয়ে বাহাস হচ্ছে, কোথাও আবার বিরুদ্ধ মতকে বলপ্রয়োগ করে দমন করা হচ্ছে। শেষেরটি কম-বেশি বিশ্বের সব দেশেই দেখা যাচ্ছে। কখনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট সহ্য করতে পারছেন না, কখনো বা শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট। শুধু দেশের নামই পরিবর্তন হয়, রাষ্ট্রীয় পদ সেই ঘুরেফিরে মোটামুটি একই থাকে। প্রশ্ন আসতে পারে, সুপারহিরোরা এ ক্ষেত্রে কী করতে পারবে? কিছুদিন আগের কথা মনে করিয়ে দিই। বক্তব্য পছন্দ না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক সাংবাদিককে হোয়াইট হাউসে পা রাখতে না করে দিয়েছিলেন। একেবারে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই সাংবাদিককে নিষিদ্ধ করেছিল হোয়াইট হাউস কর্তৃপক্ষ। পরে আদালতের আদেশে সেই সাংবাদিক ফের প্রবেশাধিকার পান। অভিবাসী বিষয়েও নির্বাহী আদেশ দিয়ে বিপাকে পড়েছেন ট্রাম্প। আদালত সেই আদেশে স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিষয়ে আমার এক প্রিয়জনের মন্তব্য মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন, ট্রাম্পকে দেখলেই তাঁর নাকি একটি কবিতার লাইন মনে পড়ে। তা হলো, ‘আসছে আমার পাগলা ঘোড়া...’! এমন মন্তব্যের হেতু জিজ্ঞেস করায় তাঁর বক্তব্য, এই মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘পাগলাটে’ কর্মকাণ্ডই যত নষ্টের গোড়া। ট্রাম্প আজ সৌদি যুবরাজকে মাথায় তুলছেন, তো পরদিনই খাসোগির হত্যার ক্রীড়নক বানাচ্ছেন। এহেন প্রেসিডেন্টের কার্যকলাপ আগে থেকে আঁচ করার জন্য কিন্তু একজন সুপারহিরো বেশ কাজে আসত। সেই চরিত্রটি হলো, ‘প্রফেসর এক্স’ বা প্রফেসর চার্লস ফ্রান্সিস জেভিয়ার। মার্ভেল কমিকসের সৃষ্টি ‘এক্স-ম্যান’ সিরিজে মিউট্যান্টদের প্রধান এই প্রফেসর এক্স। তার একটি অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা আছে। তার টেলিপ্যাথ অত্যন্ত শক্তিশালী। এই চরিত্রটি অন্যের মনের কথা যেমন জানতে পারে, তেমনি নিয়ন্ত্রণও করতে পারে। একবার ভেবে দেখুন তো, যদি সত্যিই প্রফেসর এক্স বলে কেউ থাকত মার্কিন মুলুকে, তবে কত সহজেই না ট্রাম্পের সদা অস্থির মনের নাগাল পাওয়া যেত! আবার উল্টাপাল্টা আদেশ দেওয়ার সময় ট্রাম্পের মনের গতিপথও পাল্টে দেওয়া যেত। কী মনে হচ্ছে, পাগলের প্রলাপ? আসলে শান্তি তো সবাই চায়, তা যেভাবেই হোক। একটু কল্পনাবিলাসী হলে যদি সমাধান মেলে, তবে ক্ষতি কি—বলুন তো? একবার যখন কল্পনা ডানা মেলেছে, তখন আসুন একটু উড়েই বেড়াই। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ ইয়েমেন। উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের হিসাব বলছে, দেশটিতে শুধু খাবারের অভাবেই প্রাণ গেছে প্রায় ৮৫ হাজার শিশুর। এই শিশুদের সবার বয়স পাঁচ বছরের নিচে। তাহলে গুলি-বারুদে কতজনের মৃত্যু হয়েছে? সেই অঙ্কটি কত বড়? এখন যদি ইয়েমেনে ‘ব্যাটম্যানের’ মতো কেউ থাকত, তবে কতই না ভালো হতো! ডিসি কমিকসের অমর সৃষ্টি ব্যাটম্যান। অন্যান্য সুপারহিরোর মতো ব্যাটম্যানের কোনো অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা নেই। কিন্তু কোনো অপরাধীকে ছাড় দেয় না ব্যাটম্যান। অপরাধের গন্ধ পেলেই হাজির এই সুপারহিরো তথা ব্রুস ওয়েইন। সব অপরাধীকে নিকেশ করে তবেই তার শান্তি। হাজার হাজার শিশুকে হত্যা নিশ্চয়ই মাত্রার দিক থেকে অনেক অনেক বড় অপরাধ। কিন্তু সুপারহিরোবিহীন এই বিশ্ব চরাচরের তাতে থোড়াই কেয়ার। চোখে ঠুলি পরে বসে আছেন সবাই। অন্তত ব্যাটম্যান এসব অপরাধের বিচার করত নিশ্চয়ই। আবার আফগানিস্তানে অস্ত্রের ঝনঝনানি ঠেকাতে ভালো ভূমিকা রাখতে পারত মার্ভেলের ‘আয়রন ম্যান’। হুট করে উড়ে এসে সন্ত্রাসীদের ‘শুট’ করতে পারত কল্পিত স্টার্ক ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক। এবার আসি উপমহাদেশে। শ্রীলঙ্কায় এক অদ্ভুত সংকট চলছে। সংকটের হোতা বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা। সাংবিধানিক ও সংসদীয় জটিলতায় এখন দেশটিতে দুজন প্রধানমন্ত্রী—রনিল বিক্রমাসিংহে ও মাহিন্দা রাজপক্ষে। দুজনেই প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাজনৈতিক এই জটিলতায় শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক সংকটে ভুগতে পারে পুরো দেশ! কিন্তু তাতে রাষ্ট্রের অধিকর্তাদের কিছু যাবে-আসবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ সংকটের সমাধানের চেয়ে, তা আরও পাকানোতেই তাঁদের মনোযোগ যেন বেশি। এ নিয়ে পার্লামেন্টে ঢিসুম ঢিসুমও করে ফেলেছেন আইনপ্রণেতারা। সেই মারামারি ঠেকাতে কিন্তু পেশিবহুল ‘সুপারম্যান’, ‘থর’ অথবা ‘হাল্ক’-এর বিকল্প নেই। ওদিকে ভারতে নোট বাতিলের জনদুর্ভোগ এড়াতে ভালো ভূমিকা রাখতে পারত জাদুকর ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ’। এক তুড়িতেই হয়তো সমস্যার সমাধান করে ফেলত সে, উড়িয়ে দিত সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। বাংলাদেশেও সুপারহিরো প্রয়োজন। সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবাদে এ দেশে রাস্তায় নেমেছিল শিশু-কিশোরেরা। কিন্তু মাস গেলে পরে দেখা যাচ্ছে, অবস্থা যে কে সেই। আজও রাস্তায় হাঁটার সময় ফুটপাত খালি পেলাম না। সেখানে বসেছে দোকান, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গাতেও ভ্রাম্যমাণ দোকান। গাড়িগুলো দাঁড় করানো রাস্তায়। আর আমি, হতভাগ্য পথচারী বাধ্য হয়ে হাঁটছি গাড়ি চলা রাস্তায়। কারওয়ান বাজার মোড়ে এলে দেখা যাবে, ঠিক রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছেন যাত্রীরা। গাড়ির ধাক্কা খাওয়ার কোনো আশঙ্কা যেন নেই! বলতে গেলে, আরও আছে। দুর্নীতিতে হয়তো আমরা চ্যাম্পিয়ন নই, কিন্তু নাগরিক সুবিধা কতটুকু পাই? স্পিড মানি কোথায় নেই? ট্রেনের টিকিট থেকে পাসপোর্ট—অনিয়ম, দুর্নীতি সবখানেই। সামনে আবার নির্বাচন। বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। পরিবেশ ঠান্ডা করতে একজন সর্ব গুণে গুণান্বিত সুপারহিরো খুব প্রয়োজন। যদি সে অনিয়ম-দুর্নীতি ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে পারত, কী ভালোই না হতো! শেষ করছি, স্পাইডারম্যান কমিকসে বলা উক্তি দিয়ে। স্রষ্টা স্ট্যান লি তাঁর এই কমিক হিরোর চাচাকে দিয়ে বলিয়ে নিয়েছিলেন, ‘উইথ গ্রেট পাওয়ার কামস গ্রেট রেসপনসিবিলিটি’। এই কথাটিই শেষে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে স্পাইডারম্যানের মূলনীতি হয়ে দাঁড়ায়। আর ঠিক এখানেই সুপারহিরোদের সঙ্গে আমাদের তফাত। আমাদের অনেক ‘পাওয়ারফুল’ মানুষ আছেন, কিন্তু তাঁদের ‘গ্রেট রেসপনসিবিলিটি’ নেই। তাই তাঁরা ‘হিরো’ থেকে ‘সুপারহিরো’ হতে পারেন না। মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ না থাকাটাই আসলে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তখন ‘ক্ষমতা’ কারও কল্যাণে আসে না। হম্বিতম্বি বাড়লেও, মানবজাতির মঙ্গল হয় না। ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ববোধের মিশেল হলেই একমাত্র একজন ‘হিরো’ হতে পারেন ‘সুপারহিরো’। তা যখন আর হচ্ছে না, তখন সুপারহিরো ছাড়া গতি কি! অর্ণব সান্যাল: সাংবাদিক

৭ নভেম্বরের কুশীলবেরা কে কোথায়

৭ নভেম্বরের কুশীলবেরা কে কোথায়

সোহরাব হাসান

৭ নভেম্বরকে এখন আর কেউ বিপ্লব বলে না। জাসদের ‘সিপাহি জনতার বিপ্লব’ এবং বিএনপির ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ সময়ের ব্যবধানে ফিকে হয়ে গেছে। কিন্তু ৭ নভেম্বর ইতিহাসের বুকে যে ক্ষত রেখে গেছে, তা সহজে উপশম হওয়ার নয়। ৭ নভেম্বর কী ঘটেছিল, জাসদ কী ঘটাতে চেয়েছিল, তার বিক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায় বিভিন্ন বই ও পত্রপত্রিকায়। সেই সময়ের অস্থির রাজনীতি নিয়ে মহিউদ্দিন আহমদ বই লিখেছেন ‘জাসদের উত্থান-পতন’। সে সময়ে ঢাকা সেনানিবাসে মেজর হিসেবে কর্মরত ছিলেন সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, যিনি পরবর্তী সময় মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ একটি লিফলেট তাঁর হাতে পৌঁছায়। সে লিফলেটে লেখা ছিল, ‘সৈনিক-সৈনিক ভাই-ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই। ‘এ থেকে আমি বুঝলাম, রাতে কিছু একটা হবেই হবে। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম প্রথমত, নিজে বেঁচে থাকতে হবে, দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনীকে বাঁচাতে হবে।’ ৭ নভেম্বর প্রথম প্রহরে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হলেও বেলা ১১টার দিকে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফকে তাঁর দুই সহযোগী কর্নেল নাজমুল হুদা ও লে. কর্নেল এ টি এম হায়দারসহ হত্যা করা হয়। খালেদ মোশাররফ হত্যাকাণ্ডের বিবরণ একটি বইতে তুলে ধরেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, যিনি পরবর্তী সময় নির্বাচন কমিশনার হয়েছিলেন। ‘৭ নভেম্বর রাত ১২টার পর ঢাকা সেনানিবাস থেকে যখন সিপাহি বিপ্লবের সূচনা হয়, তখন খালেদ মোশাররফ ও অন্যরা বঙ্গভবনেই ছিলেন। এসব সংবাদ শুনে খালেদ মোশাররফ কর্নেল হুদার মাধ্যমে ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক নওয়াজেশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে নওয়াজেশের ইউনিটে তাঁদের আসার জন্য বলা হয়। কিন্তু সেটা পরে রটে যায় যে তারা আরিচা হয়ে উত্তরবঙ্গের দিকে একটি বেসামরিক গাড়িতে যাওয়ার পথে আসাদ গেটের নিকট তাদের গাড়ি বিকল হয়ে পড়লে তারা নিকটস্থ একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে কাপড় বদলিয়ে ১০ ইস্ট বেঙ্গলের দিকে হেঁটে অধিনায়কের অফিসে পৌঁছায়। ভোরের দিকে জিয়াউর রহমান খালেদ মোশাররফের অবস্থান জানার পর তার সঙ্গে কথা বলেন এবং দুজনের মধ্যে কিছু উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পরে জিয়াউর রহমান নওয়াজেশকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেন। এ কথা মরহুম নওয়াজেশ নিজেই আমাকে বলেছিলেন। নওয়াজেশ সকালে তাদের জন্য নাশতার বন্দোবস্ত করে এবং তার বর্ণনামতে এ সময় খালেদ মোশাররফ অত্যন্ত স্বাভাবিক ও শান্ত ছিলেন। তবে কর্নেল হুদা ও হায়দার কিছুটা শঙ্কিত হয়ে উঠলে খালেদ মোশাররফ তাদেরকে স্বাভাবিক সুরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বলেন। ইতিমধ্যে সেনানিবাস থেকে কিছু বিপ্লবী সৈনিক ১০ ইস্ট বেঙ্গলের লাইনে এসে সেখানকার সৈনিকদের বিপ্লবের সপক্ষে উত্তেজিত করতে থাকে এবং খালেদ মোশাররফ ও তার সহযোগীদের হস্তান্তরের জন্য অধিনায়কের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। নওয়াজেশ উত্তেজিত সৈনিকদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এর কিছুক্ষণ পর কিছুসংখ্যক সৈনিক অধিনায়কের অফিসের দরজা একপ্রকার ভেঙে তিনজনকেই বাইরে মাঠে নিয়ে এসে গুলি করে হত্যা করে।’ (‘বাংলাদেশ রক্তাক্ত অধ্যায়: ১৯৭৫-৮১’) ১৯৭৬ সালে বিশেষ সামরিক আদালতে যে বিচারের মাধ্যমে কর্নেল আবু তাহেরকে ফাঁসি দেওয়া হয়, সেই বিচারকে ২০১১ সালে উচ্চ আদালত অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করেছেন। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার আবু তাহেরের অপহৃত মর্যাদাও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ রায়ের মধ্য দিয়ে পঁচাত্তরের কথিত সিপাহি বিপ্লবসৃষ্ট বিতর্কের অবসান হয়নি। তথ্য-প্রমাণে দেখতে পাই, সেদিন সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও জাতীয় সংহতি ঘটেছিল দুই পক্ষের অভিন্ন শত্রু ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে। ৭ নভেম্বরের কুশীলবদের ভাষায় তিনি ছিলেন ‘সম্প্রসারণবাদী রুশ এবং আধিপত্যবাদী ভারতের’ মিত্র। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারী ও ঘাতকদের বিরুদ্ধে যখন খালেদ মোশাররফ পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটালেন, তখনই ৭ নভেম্বরের কুশীলবেরা তাঁর বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আদালতে দেওয়া কর্নেল আবু তাহেরের জবানবন্দিতে ছিল: ‘ওই দিন (৩ নভেম্বর) বহু সেনাসদস্য, এনসিও এবং বেসিও আমার নারায়ণগঞ্জের বাড়িতে এলেন। তাঁরা আমাকে জানালেন, ভারত খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে মদদ জুগিয়েছে এবং বাকশালের সমর্থকেরা আবার ক্ষমতা দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে।’এরপর তিনি বলছেন, ‘৩ নভেম্বরের পর জাতি কী ভয়ংকর ও নৈরাজ্য পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তা কারওই অজানা নয়। আমাদের জাতীয় সম্মান ও সার্বভৌমত্ব কীভাবে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ সময় জনগণের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে ভারত খালেদ মোশাররফকে মদদ দিচ্ছিল।’ ৩ নভেম্বরের পর সেনানিবাসের ভেতরে ও বাইরে কেউ একটি গুলি ছুড়েছে, কিংবা কেউ কারও হাতে নিহত হয়েছে-এ দাবি কেউ করতে পারবেন না। তাহলে পরিস্থিতি ভয়ংকর হলো কীভাবে? ১৫ আগস্ট রশীদ-ফারুক চক্র সপরিবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরও দেশে কোনো ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন না ৭ নভেম্বরের কুশীলবরা। তাঁদের সঙ্গে ফারুক-রশীদ চক্রের একেবারে যোগাযোগ ছিল না, তা-ও বলা যাবে না। কর্নেল রশীদের একজন প্রতিনিধি ফোনে মুজিব হত্যার খবর দিয়ে তাহেরকে বাংলাদেশ বেতার ভবনে যেতে বলেন। তাহেরের ভাষ্য: ‘আমি তখন রেডিও চালিয়ে দিয়ে জানতে পেলাম শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে এবং খন্দকার মোশতাক ক্ষমতা দখল করেছেন। এ খবর শুনে আমি যথেষ্ট আঘাত পাই। আমার মনে হলো, এতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে।...১৭ আগস্ট পরিষ্কার হয়ে গেল যে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান এ ঘটনার নেপথ্য নায়ক।’ (অসমাপ্ত বিপ্লব, লরেন্স লিফশুলজ, ঢাকা, বাংলা ভাষান্তর) অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘মোশতাক সরকার জনগণকে মুজিব সরকারের চেয়ে কোনো ভালো বিকল্প উপহার দিতে পারেনি। পরিবর্তন হয়েছিল শুধু রুশ-ভারতের প্রভাববলয় থেকে মুক্ত হয়ে দেশ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষপুটে ঝুঁকে পড়েছিল। সত্যিকার অর্থে দেশ বেসামরিক একনায়কতন্ত্র থেকে সামরিক একনায়কতন্ত্রের কবলে পড়েছিল।’ (সূত্র: ওই) তাঁর ভাষায় দেশ যখন ‘বেসামরিক একনায়কতন্ত্রের’ কবলে ছিল, তখন সেই সরকারের পতন ঘটাতে ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থান ঘটানোর ডাক দিল জাসদ। কিন্তু সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে তারা কিছুই করল না, কেবল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকল এবং পরবর্তী সুযোগের অপেক্ষা করল। তারা মোশতাকের ‘সামরিক একনায়কতন্ত্রের’ প্রধান সেনাপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলল। তাঁকে পরামর্শ দিল খালেদ মোশাররফকে কোনো দায়িত্ব না দেওয়ার। (সূত্র: ওই) মার্কিন সাংবাদিক ও তাহেরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু লরেন্স লিফশুলজ লিখেছেন, ‘মুজিব উৎখাতের কয়েক মাস আগে থেকে জাসদ এক গণ-অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। স্বাধীনতাযুদ্ধের সাবেক সৈনিক সমবায়ে গঠিত বিপ্লবী গণবাহিনী ও কার্যরত সৈনিকদের গোপন সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা; জাসদের এই দুই সশস্ত্র শাখা নিয়ে গোপন সামরিক অধিনায়ক তাহেরের নেতৃত্বে এই প্রস্তুতি চলছিল।’ (অসমাপ্ত বিপ্লবী, লিফশুলজ, পৃষ্ঠা ১৯, বাংলা সংস্করণ) জনগণকে বাদ দিয়ে সেনানিবাসকেন্দ্রিক গণ-অভ্যুত্থানের প্রস্তুতির দ্বিতীয় নজির পৃথিবীতে নেই, সামরিক অভ্যুত্থানের অসংখ্য নজির আছে। বাংলাদেশেও পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর একটি প্রাণঘাতী সেনা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে, কোনো বিপ্লব নয়। কর্নেল তাহের খালেদ মোশাররফকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে আখ্যায়িত করলেও খন্দকার মোশতাকের নিয়োগপ্রাপ্ত বিমানবাহিনীর প্রধান এম জি তোয়াবের ব্যাপারে কোনো বিরূপ মন্তব্য করেননি। খালেদ মোশাররফকে উৎখাত করার পর তিনি ভবিষ্যৎ জাতীয় সরকার গঠনের উদ্দেশ্যে যে বৈঠকে মিলিত হয়েছেন, তাতে অন্যদের মধ্যে এম জি তাওয়াব ও মাহবুব আলম চাষীও ছিলেন। এর আগে ৪, ৫ ও ৬ নভেম্বর প্রতিদিন রাতে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনী নেতাদের সঙ্গে তাহেরের বৈঠক হতো। এসব বৈঠকে খালেদ মোশাররফ চক্রকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা, বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা, বিপ্লবী সামরিক কমান্ড কাউন্সিল গঠন করা, দলমত-নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তিদান, রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহার, বাকশালকে বাদ দিয়ে একটি সর্বদলীয় গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠন করা এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ১২ দফা দাবি বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত হয়। খালেদ মোশাররফ কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারী ছয় মেজরের বাড়াবাড়ি রোধ এবং সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এই অভ্যুত্থানের সঙ্গে রুশ-ভারত দূরের কথা, দেশেরও কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতার সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে জানা যায় না। অনেকের মনে থাকার কথা, খালেদ মোশাররফ যে তিন দিন ক্ষমতায় ছিলেন, ছায়াসঙ্গীর মতো ছিলেন সাংবাদিক এনায়েতুল্লাহ খান ও শাহাদত চৌধুরী। তাঁরা কেউ ভারত বা রুশপন্থী ছিলেন না। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন কর্নেল শাফায়েত জামিল। এর আগে শাফায়েত জামিল জিয়ার কাছেও চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি রাজি হননি। খালেদ মোশাররফ রাজি হয়েছিলেন। শাফয়েত জামিলের সাক্ষ্য: ‘৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠা, ১৫ আগস্টের বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার, সংবিধানবহির্ভূত অবৈধ সরকারের অবসান এবং একজন নিরপেক্ষ সৈনিকের অধীনে ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জনগণের নির্বাচিত সরকারের কাছে হস্তান্তর করা।’ ৬ নভেম্বরের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘বাসভবনে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠছি, তখন ব্রিগেড মেজর হাফিজ আমাকে বলল, স্যার, একটা জরুরি কথা আছে। হাফিজ জানাল, একজন প্রবীণ জেসিও বলেছে, ওই দিন রাত ১২টায় সিপাহিরা বিদ্রোহ করবে। জাসদ ও সৈনিক সংস্থার আহ্বানেই তারা এটা করবে। খালেদ ও আমাকে মেরে ফেলার নির্দেশও সৈনিকদের দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জিওসিটি।’ [একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর] ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান বা কথিত বিপ্লব প্রয়াসের কুশীলবেরা এখন কে কোথায় সেটি বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে। অভ্যুত্থানের দুই প্রধান কুশীলব জিয়াউর রহমান ও কর্নেল আবু তাহের বেঁচে নেই। তাহের বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে তাঁর (জিয়া) জনপ্রিয়তার কারণে। কিন্তু তাহের ও জাসদ যে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গঠন করেছিল, তার সদস্যরা বিপ্লবের প্রথম প্রহরেই ‘সৈনিক সৈনিক, ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’ স্লোগান তোলেন এবং ১২জন অফিসারকে হত্যা করেন। এ অবস্থায় জিয়াউর রহমানের কাছে একটি পথই খোলা ছিল, হয় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার দাবি মেনে নিয়ে সেনাবাহিনীকে ‘অফিসারমুক্ত’ করা অথবা সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। তিনি দ্বিতীয়টি বেছে নেন এবং জাসদ ও সৈনিক সংস্থার বিপ্লব সেখানেই শেষ। পরবর্তী সময় জিয়া তাঁর ক্ষমতা নিষ্কণ্টক করতে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে তাহেরকে ফাঁসি দেন। তার আগে তাহেরও জিয়াকে উৎখাতের চেষ্টা করেছিলেন। ক্ষমতার লড়াইয়ে জিয়া জয়ী হন, তাহেরকে জীবন দিতে হয়। যেই মামলায় তাহেরের ফাঁসি হয়েছিল, সেই মামলায় সিরাজুল আলম খান ও এম এ জলিলের যাবজ্জীবন এবং আ স ম রব, হাসানুল হক ইনু, আখলাকুর রহমান, আনোয়ার হোসেন ও নুরুল আম্বিয়ার বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড হয়। কিন্তু তাঁদের কাউকেই পুরো মেয়াদে জেল খাটতে হয়নি। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে জেল থেকে নেতারা সমঝোতার ভিত্তিতে ছাড়া পান। সবশেষে ছাড়া পান জাসদের তাত্ত্বিক গুরু সিরাজুল আলম খান। তাহেরকে ফাঁসি দেওয়ার চার বছরের মাথায় ১৯৮০ সালে জাসদ যে ১৮ দফা কর্মসূচি দেয়, তাতে শর্তসাপেক্ষে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঐক্য এবং সরকারে যোগদানের কথাও ছিল। ১৮ দফা প্রশ্নে মতভেদের কারণে জাসদ ভেঙে বাসদ প্রতিষ্ঠিত হয়। ৭ নভেম্বরের ঘটনায় যেসব রাজনৈতিক নেতা বিপ্লব বাসনা বা ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাঁরা এখন স্পষ্ট দুই শিবিরে বিভক্ত। আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, আবদুল মালেক রতন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নামে বিএনপি শিবিরে, যদিও প্রথমজন শেখ হাসিনার প্রথম মন্ত্রিসভায় পাঁচ বছর মন্ত্রিত্ব করেছেন, দ্বিতীয়জন ৮ বছর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও নগর নেতা আবদুস সালামও এক সময়ে জাসদে সক্রিয় ছিলেন। আবার হাসানুল হক ইনু, শরীফ নূরুল আম্বিয়া, আনোয়ার হোসেন ১৪ দলের নামে আওয়ামী লীগ শিবিরে আছেন। প্রথমজন বর্তমান মন্ত্রিসভায় তথ্যমন্ত্রী । মন্ত্রিসভার অপর সদস্য শাজাহান খান মাদারিপুর গণবাহিনীর নেতা ছিলেন। তাহেরের ছোট ভাই ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল এখন আওয়ামী লীগের সাংসদ। আরেক ভাই ২৬ নভেম্বর ১৯৭৫-এ ভারতীয় হাইকমিশনারকে অপহরণ করতে গিয়ে নিহত হন। ১৯৭৫ সালের সাত নভেম্বর যারা সিপাহী বিপ্লব করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে ‘তাহের হত্যাকারী’ জিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন তৈরি করতে চেয়েছিলেন, তাঁদের অনেকে এখন আওয়ামী লীগের কিংবা বিএনপির সঙ্গে নিজেদের ভাগ্য বেঁধে ফেলেছেন। বিপ্লব ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র পেছনে ফেলে তারা ক্ষমতার হিস্যা নিতেই তারা এ দলে ও দলে ভাগ হয়ে আছেন। কিন্তু তাঁদের তাত্ত্বিক গুরু সিরাজুল আলম খান পাঁচ শ আসনের সংসদ নিয়ে বেশ কিছু কাল হই চই করে এখন রাজনীতি থেকে পুরোপুরি ‘অবসর’ নিয়েছেন।

আয়করের ৭ শতাংশ আসে রিটার্ন থেকে : কর আদায়ে সক্রিয় হোক...

রাজস্ব আয়ে আয়করের অংশ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও কেন যেন তা স্থবির হয়ে আছে। নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও আয়করের মাত্র ৭ শতাংশ আসছে রিটার্ন থেকে, ৬৭ শতাংশ আসছে উেস কর থেকে। বিশ্বব্যাপী আয়করের বড় অংশই আসে রিটার্নের মাধ্যমে। বছর শেষে রিটার্ন জমা দেয়ার মাধ্যমে আয়কর পরিশোধ করেন বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা। করযোগ্য নাগরিকদের কাছ থেকে আয়কর রিটার্নের মাধ্যমেই সম্পদের হিসাব ও কর আহরণ করা হয়। আমাদের এখানে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের আয়করের পরিমাণ কম হওয়ায় করদাতা বাড়লেও এ খাত থেকে রাজস্ব আহরণ খুব একটা বাড়েনি। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের আয়ের উৎস থেকে কেটে নেয়া করই আয়করে মূল অবদান রাখে।

আয়কর ফাঁকির মহোৎসবে পেশাজীবীদের এক বড় অংশ জড়িত বলে মনে করা হয়। এক্ষেত্রে আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী সবাই যেন একাট্টা। এনবিআরের তদন্তে পেশাজীবীদের কর ফাঁকির বিষয়টি ধরা পড়েছে। কর ফাঁকিবাজের তালিকায় রয়েছেন রাজনীতিবিদরাও।

আয়ের উৎস পেশাজীবীরা প্রকাশ করতে চান না। সরকার চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণ করে দিলেও নির্ধারিত ফির চেয়ে তারা বেশি নেন। একইভাবে আইনজীবীরা তাদের মক্কেলের কাছ থেকে কত টাকা নেন, এরও হিসাব অন্য কেউ রাখে না। শিক্ষকরা স্কুল-কলেজের বাইরে প্রাইভেট পড়ালেও সে আয়ের তথ্য প্রকাশ করেন না। দেশের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এনবিআরের যে সাফল্য, তা ব্যবসায়ীনির্ভর। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আয়কর আদায়ে তারা যতটা সক্রিয়, ততটাই নিষ্ক্রিয় পেশাজীবীদের কাছ থেকে আদায়ে। ফলে দেশের লাখ লাখ পেশাজীবী এখনো আয়করের আওতায় আসেননি। তাদের নেই করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা ই-টিআইএন। এমনকি দেশে কতজন পেশাজীবী করদাতা আছেন, কোন পেশার করদাতা কী পরিমাণ আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছেন, এরও সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। পেশাজীবীদের আয়কর আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা থাকায় সরকার প্রতি বছর রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশে এমন অসংখ্য কোটিপতি রয়েছেন, যাদের নাম আয়করদাতার তালিকায় নেই। যাদের নাম তালিকায় আছে তারা প্রকৃত আয় অনুযায়ী আয়কর দেন কিনা, সেটিও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। দেশের উন্নয়ন ও জাতীয় অগ্রগতির স্বার্থে আয়কর ফাঁকির বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়কর রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অন্তত এক কোটি ব্যক্তিকে করজালের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাছাড়া ২০২০-২১ সালের মধ্যে এ খাত থেকে মোট রাজস্বের ৫০ শতাংশ (বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ দশমিক ৪১ শতাংশ) আহরণের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জন হওয়া উচিত এবং সম্ভবও। কারণ দেশের আর্থিক অবয়ব অনুযায়ী মোট রাজস্ব আয় খাতে আয়করের (২৭ শতাংশ) অবস্থান মূল্য সংযোজন কর বা মূসক (৩৮ শতাংশ) ও শুল্ক (৩৩ শতাংশ) খাতের নিচে থাকার কথা নয়। কারণ যে সমাজে ভোগ্যপণ্য ও বিলাসবহুল সামগ্রী আমদানি বাবদ ব্যয় বেশি, সে সমাজে আয়কর দেয়ার মানুষের সংখ্যা সামান্য, এটি গ্রহণযোগ্য নয়। এনবিআরের চেয়ারম্যানের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ভিয়েতনামের ৯ কোটি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৯০ লাখ কর দেয়। আমাদের ১৭ কোটি মানুষের দেশে এক কোটি মানুষকে কেন আয়করের আওতায় আনতে পারবে না এনবিআর, তা এক বড় প্রশ্ন। জাতীয় কর দিবসের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী স্বেচ্ছায় করদাতাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি কর দেয়ার উপযুক্ত অনিচ্ছুক নাগরিকদের আইনের আওতায় আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সংকল্প ব্যক্ত করেছিলেন। বর্তমান বাস্তবতায় এটি একটি জরুরি সিদ্ধান্ত, যা রাষ্ট্রের কল্যাণকামী সব নাগরিকের প্রত্যাশার প্রতিফলন। তাই করজাল সম্প্রসারণ নীতির সুফল পেতে হলে সরকারকে অতীত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সতর্কতার সঙ্গে এমনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে আয়কর দেয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিরা একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির ভেতর দিয়ে আয়কর দিতে বাধ্য হন। সাধারণভাবে মনে করা হয়, আয়করদানের যোগ্য ব্যক্তিদের সর্বাধিক ২৫ শতাংশ আয়করদাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। পদ্ধতিগত জটিলতা ও আয়কর বিভাগের হয়রানির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই করদাতাদের পকেট থেকে আয়কর খাতে যে অর্থ ব্যয় হয়, তা ভোগ করেন আয়কর আইনজীবী ও কর বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বর্তমান সরকারের আমলে আয়কর ব্যবস্থায় গতি আনতে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও পদ্ধতিগত জটিলতা রয়েই গেছে।

লিটল বাংলাদেশে গ্যাং আতংক

কমিউনিটির শান্তি-শৃঙ্ঘলা বজায় রাখার আহবানে লিটিল বাংলাদেশে সভা

কিছুদিন ধরে একদল বখে যাওয়া বাংলাদেশী তরুণ কিছু ভিন দেশী গ্যাং মেম্বারসহ হাতুড়ি, বেইস বল ব্যাট, গলফ ক্লাব সহ বিভিন্ন মারাত্মক অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কয়েকটি গাড়িতে করে এসে অতর্কিতে লিটিল বাংলাদেশ লস এঞ্জেলেসের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে স্বদেশী তরুণদের উপর হামলা, খোঁজা-খুঁজি ও ভীতি প্রদর্শন করে আসছে। অবস্থার পরিপেক্ষিতে পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার পূর্বে লিটিল বাংলাদেশের উৎকণ্ঠিত তরুণদের উদ্যোগে গত ১ লা নভেম্বর লিটিল বাংলাদেশে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা জনাব মাসুদ রব চৌধুরী ও পরিচালনা করেন সাইদুল হক সেন্টু। কমুনিটির শান্তি-শৃঙ্ঘলা বজায় রাখার আহবান ও আইন নিজের হাতে না তুলে নিয়ে দোষী বখে যাওয়া যুবকদের আইনের হাতে তুলে দেবার আহবান জানান লস এঞ্জেলেস বাংলাদেশ কমুনিটির নেতৃবৃন্দের প্রতিনিধি ড: জয়নুল আবেদীন, শামসুল ইসলাম, সোহেল রহমান বাদল, খোকন আলম, আবুল ইব্রাহিম প্রমুখ। সভায় গত ২৩শে অক্টোবর স্থানীয় বাংলাবাজারের সামনে গ্যাং হামলার প্রত্যক্ষদর্শীরা হামলাকারীদের নাম উল্লেখ করে বলেন, তারা হাতুড়ি সহ বিভিন্ন মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এই অতর্কিত হামলায় অংশ নেয়। তারা উপস্থিত কয়েকজনকে মারাত্মক আহত করে এবং অনেকের মাথার খুব কাছে বিপজ্জনকভাবে হাতুড়ি ঘুড়িয়ে আঘাতের চেষ্টা চালায়। অনেকে প্রাণভয়ে রেস্টুরেন্টে আশ্রয় নেন। উল্লেখ্য ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার এরা সদলবলে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ভিনদেশি গ্যাং মেম্বার নিয়ে স্থানীয় কস্তুরী রেস্টুরেন্টে অতর্কিতে আবির্ভাব হয়ে কয়েকজনের নাম উচ্চারণ করে খুঁজে বেড়ায় ও ভীতির সঞ্চার করে। অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে এইরূপ নিয়মিত হামলার ঘটনায় লিটিল বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। অনেকে শান্তিপূর্ণ লিটিল বাংলাদেশে বড় ধরণের কিছু ঘটার আশংকায় রাতে এসব এলাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এড়িয়ে চলছেন। অনেকেই কমুনিটির মান ইজ্জত রক্ষায়, শান্তি-সৌহার্দ বজায় রেখে বাংলাদেশী গ্যাং মেম্বারদের পুলিশের হাতে তুলে দেবার আহবান জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। আবার অনেকেই নিজেরাই প্রতিরোধ গড়ে তোলার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, অনেক সময় আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে এইসব মারাত্মক অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে এদের সমুচিত শাস্তি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিলে এরা ভবিষ্যতে আর গ্যাং এর দলে ভিড়তে দশবার চিন্তা করবে। অনেকে বলেন, গেল বছর অর্থমন্ত্রীর সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে এরাই শ্লোগান দিয়ে প্রতিপক্ষের উপর হামলা করলে অনুষ্ঠানের ভলান্টিয়ার ও নিরাপত্তা রক্ষীরা এদেরকে অনুষ্ঠানস্থল থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। এমনকি এদের আশ্রয়-প্রশয় দাতা একজন নেতাকে মন্ত্রীর সামনেই স্টেজ থেকে চ্যাং দোলা করে নামিয়ে দেওয়া হয়। ওপর এক বক্তা বলেন, কয়েক মাস পূর্বে লস এঞ্জেলেস ভ্রমণরত আরেকজন মন্ত্রীর সামনে হোটেল লবিতে বেয়াদবির চেষ্টাকালে এদের নেতাকে কষে চপেটাঘাত করলে এরা কিছুদিন চুপচাপ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামীলীগের ক্যালিফোর্নিয়া শাখার সাবেক সভাপতি ও কমুনিটির একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা সোহেল রহমান বাদল বলেন, গেল একুশে ফেব্রুয়ারীতে লস এঞ্জেলেসের বাংলাদেশ কন্সুলেটে এই গ্যাং তার উপর হামলা করে মহান শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানটি পন্ড করে দেয়। সেইসব গুন্ডামির ভিডিও গুলো পুলিশের হাতে তুলে দেবার উদ্যোগ নেন সভায় উপস্থিত কয়েকজন। মুনির শরীফ বলেন, জেলের ভিতরে গেলে এরা নিজেরাই তাদের বসদের নাম বলে দিবে নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে। আর সকলে যখন একই ব্যক্তির নাম বলবে তখন এদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও ইন্ধন দাতারা আইনের শাস্তি থেকে পার পাবে না। ইলিয়াস টাইগার শিকদার বলেন, আমেরিকার আইনে হাতুড়ি একটি মারণাস্ত্র হিসেবে বিবেচিত। এ প্রসঙ্গে তিনি তার দোকানে হাতুড়ি দিয়ে ঘটে যাওয়া এক ব্যক্তির আহতের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, আক্রমণকারী ওই ব্যক্তি এখন দশ বছরের সাজা কাটছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন সুষ্ঠুভাবে আইনি সহযোগিতা দিতে পারলে, অন্তত হাতুড়ি ওয়ালাকেও দশ বছরের জন্য জেলে পাঠানো সম্ভব হবে। এ পর্যায়ে সোহেল রহমান বাদল সকলকে সতর্ক করে বলেন, আগে যেভাবে কেউ জেলে গেলে খুব সহজেই বেইল বন্ডে ছাড়িয়ে আনা যেত, নুতন গভর্নর ক্যালিফোর্নিয়ায় সেই প্রথা বন্ধ করে দিয়েছে। এখন থেকে সকলকে সতর্কতার সাথে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। হুমায়ুন কবির, তৌফিক সোলেমান তুহিন, শাহ আলম, সিদ্দিকুর রহমান, রফিকুল ইসলাম, অপু সাজ্জাদ, নিয়াজ মোহাইমেন, সাইফুল আনসারী, হাবিবুর রহমান ইমরান, রফিকুজ্জামান, শওকত হোসেন আনজিন, লিঙ্কন খান, মোর্শেদ খন্দকার, সাইয়েদুল হক সেন্টু, আলমগীর হোসেন, তাপস নন্দী, জামাল হোসেন, নূর আলম লাবু, জামিউল বেলাল, ইমাম হোসেন, ফয়সাল কোরেশী, ইকবাল হোসেন, হরে কৃষ্ণ, হাসানাত ভূইঁয়া, হাবিবুল ইসলাম সহ উপস্থিত সকলের বক্তব্যে ফুটে উঠে লিটিল বাংলাদেশের সৌহার্দ-ঐতিহ্য ধরে রেখে কমিউনিটিতে যে কোন অপরাধ প্রবণতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধের আকাঙ্খার দীপ্ত অঙ্গীকার। এদিকে পুলিশের সাথে যোগাযোগ, আইনি পদক্ষেপ, নেইবারহুড ওয়াচ, একশন কমিটি প্রভৃতি বিভিন্ন দ্বায়িত্ব দিয়ে কয়েকটি কমিটি করা হয় সভায় উপস্থিত তরুণদের নিয়ে। লিটিল বাংলাদেশ নেইবারহুড ওয়াচ কমিটির উদ্যোগে প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার টাউন হল সভা অনুষ্ঠিত হবে। যেখানে কমিউনিটি থেকে সন্ত্রাস দমনের সর্বশেষ আপডেট উপস্থাপন ও কমুনিটির সার্বিক পরিস্থিতি আলোচনা করা হবে। লিটিল বাংলাদেশ নেইবারহুড ওয়াচ কমিটিতে রয়েছেন খোকন আলম, আবুল ইব্রাহিম, শামসুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, অপু সাজ্জাদ, ইলিয়াস টাইগার শিকদার, জহির উদ্দিন পান্না, হাবিবুর রহমান ইমরান, শওকত হোসেন আনজিন, শাহ আলম, রফিকুল ইসলাম, রফিকুজ্জামান, আসিফ, আলমগীর হোসেন, প্রমুখ। উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন মাসুদ রব চৌধুরী, ডঃ জয়নুল আবেদীন, সোহেল রহমান বাদল, তৌফিক সোলায়মান তুহিন, সিদ্দিকুর রহমান, নিয়াজ মোহাইমেন, সাইফুল আনসারী, লিঙ্কন খান, মোর্শেদ খন্দকার, সাইয়েদুল হক সেন্টু, তাপস নন্দী, জামাল হোসেন, নূর আলম লাবু, জামিউল বেলাল, ইমাম হোসেন, ফয়সাল কোরেশী, ইকবাল হোসেন, হরে কৃষ্ণ, হাসানাত ভূইঁয়া, হাবিবুল ইসলাম প্রমুখ। আগামী ২৩ শে নভেম্বরের সভায় উপস্থিত উৎসাহী তরুণদের থেকে এই কমিটিতে আরও সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একশন কমিটিতে এ পর্যন্ত রয়েছেন মাত্র পাঁচ জন। ড: জয়নুল আবেদীন বলেন, একশন কমিটি সন্ত্রাস প্রতিরোধের বিবিধ উপায় নিয়ে ভাববেন এবং আমাদের দিক নির্দেশনা দিবেন। সবশেষে সভার সভাপতি বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা মাসুদ রব চৌধুরী এই সংক্ষিপ্ত নোটিশের সভায় উপস্থিত হওয়ার জন্য সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আইনের মধ্য দিয়েই এই সন্ত্রাস প্রতিরোধের পথ খোঁজার নির্দেশনা দেন। নতুন কয়েকজন নব্য তথ্য-সন্ত্রাসীর থাবা থেকে কমিউনিটিকে রক্ষাকল্পে সামাজিক প্রতিরোধ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনেরও সিদ্দ্বান্ত নেওয়া হয়। রিপোর্টঃঃ

‘মি-টু’ ঝড়: ভয় পাচ্ছেন?

‘মি-টু’ ঝড়: ভয় পাচ্ছে?

তপন মাহমুদ যত বড় ঝড়ই হোক, একদিন ঠিকই থেমে যায়। হয়তো আবার আসবে বলে খানিক বিরতি নেয় কখনও। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে যে ‘মি-টু’ ঝড় উঠেছে, তা থেমে না থেকে ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। আর এর ফলে, অনেকেরই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠতে শুরু করেছে। চোরের মনে কি তাহলে পুলিশ পুলিশ ডাকতে শুরু করে দিয়েছে? পুরুষতন্ত্রের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার ভাঙতে শুরু করেছে নারীরা। আর তাতেই খোলস বের হতে শুরু করেছে অনেকের। যেসব পুরুষ যৌন হেনস্থা করে এতদিন নিশ্চিন্ত দিন যাপন করতেন, আরও শিকার খুঁজতেন, তাদের দিন মনে হয় শেষ হতে চললো। যারা ভাবতেন, আর যাই হোক এমন লজ্জার কথা বাইরে বলতে পারবেন না, তারা এবার উল্টো দিকে মুখ করে থাকলেও কালি এড়াতে পারবেন না। ‘মি-টু’ আন্দোলন নিয়ে কিছু বিতর্ক হতেই পারে। যারা অভিযোগ করছেন, তার সত্যতা কী? তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে করছেন কিনা? আগে বলেননি কেন? হ্যাঁ, ঠিক আছে। ধানের মধ্যে চিটা থাকতেই পারে। কিন্তু ধানকে ছাড়াতে পারে কি কখনও? তার মানে এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে, দুনিয়াব্যাপী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী যৌন হয়রানির শিকার। আর পুরুষ তার মূল শিকারি। এই সত্যটাই, যা এতদিন ট্যাবু আকারে নারী বয়ে বেরিয়েছে নিচের ভেতরে, গোপন করেছে চাপা কষ্ট নিয়ে, সেটা ভাঙতে শুরু করেছে। ভাঙতে শুরু করেছে এই ধারণা যে, কোনও কিছুই গোপন নয়। উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের একটা কথা আমার খুব পছন্দ। তিনি বলেছেন, ‘গোপনীয়তা মানেই ষড়যন্ত্র’। আমরা যেটা গোপনে করতে পারবো, কিন্তু প্রকাশ্যে বলতে পারবো না, বুঝতে হবে সেখানে ‘ঘাপলা’ আছে। সতীত্ব, সম্ভ্রম, পর্দা, লজ্জা-শরম, ইত্যাদি নারীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলে চালিয়ে দিয়ে সেই গোপনীয়তার ফল এতদিন ভোগ করেছে পুরুষ সমাজ। এবার আয়নায় মুখ দেখার পালা। আর একটা কথা পুরুষতন্ত্র যে তারই সৃষ্ট ট্যাবুকেই ব্যবহার করেছে, তা নয়। বরং পুরুষতন্ত্র পেশীশক্তি ও ক্ষমতাকেও ব্যবহার করেছে। ‘মুখ খুললে বিপদ হবে’– বলে হুমকিটাও দরকারে দিয়ে রেখেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশি মডেল প্রিয়তি ‘মি-টু’ শিরোনামে তার সঙ্গে হওয়া যৌন হয়রানির কথা জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এতদিন এই ঘটনার বিরুদ্ধে কিছু না বলতে না পারার পেছনে যতটা না ট্যাবু ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল ক্ষমতার ভয়। বলা যায়, এই ধরনের যৌন হয়রানির ঘটনায় সমাজের তথাকথিত ট্যাবু, পুরুষতন্ত্রের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার এতদিন নারীকে স্পাইরাল অব সাইলেন্সের খাঁচায় বন্দি করেছিল। সেই নীরবতা যখন একবার ভেঙেছে, তখন আদতে সব নারীই ভয়ের শৃঙ্খল খুলে নিজের কষ্ট আর যন্ত্রণা বলতে শুরু করেছে। এটি শুধু তাদের হালকাই করছে না, অনেক বড় সত্যকে সামনে হাজির করছে। পুরুষতন্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে। এমন ঘটনায় অনেকে নারীকেও হয়তো বলতে শোনা গেছে, ‘চেপে যাও লোকে কী বলবে?’ সেই ‘চাপিয়ে দেওয়া লোক-লজ্জার ভয়’ জয় করা নারীরা আগামী দিনের নারীর পথচলা কতটা মসৃণ করে দিচ্ছেন, তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। কিন্তু নারীর লড়াইয়ে এটি যে মাইলফলক ঘটনা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই সাহসী নারীদের স্যালুট। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি আসলে কেমন? আমাদের সমাজ বিষয়টাকে কীভাবে দেখছে? নাকি সমাজ এখনও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিচার করছে ‘মি-টু’ আন্দোলন। বিভিন্ন জন-পরিসরে এই নিয়ে আলোচনাটা খেয়াল করতে হবে আমাদের। তাহলে হয়তো বিষয়টা ধরতে পারা যাবে। এ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের জন্য আরও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তবে, এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে। অন্য দেশের ‘মি-টু’ আন্দোলন নিয়ে গণমাধ্যম যতটা সরব, বাংলাদেশের কোনও নারীর অভিযোগ নিয়ে ততটা পারবে কি? অন্তত এখন পর্যন্ত সেটা দৃশ্যমান নয়। যদিও বড় আঘাত আসেনি এখনও। কিন্তু অভিযোগ ছোট করে দেখা উচিত কি? মূলধারার গণমাধ্যম এ বিষয়ে নিশ্চুপ থাকলে, তাদের নৈতিকতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। হয় তাদের এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ করতে হবে, নয়তো এ নিয়ে আগে যেসব খবর প্রকাশ করেছে, তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। আর কেন এটি সংবাদ নয়, তারও ব্যাখ্যা দিতে হবে। তারা যদি এসব সংবাদ ব্ল্যাক আউট করে দেয়, তা হবে তাদের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। অথবা এটাও হতে পারে প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্ট কারও চাপে চেপে যাওয়া। যে ভয়টাই মডেল প্রিয়তি করেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মি টু হ্যাশ ট্যাগ করেছেন সীমন্তি নামের একজন নারী। জানিয়েছেন, তার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন তিনি। যখন আমাদের মূলধারার গণমাধ্যম ভারতীয় ‘মি-টু’ আন্দোলন নিয়ে অনেক সংবাদ পরিবেশন করলো, তখন নিজদেশে ঘটে যাওয়া ‘মি-টু’ কেন মূলধারার গণমাধ্যমে প্রচারিত হলো না, এটাও একটা বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে। তাহলে বিষয়টা কি এমন যে, দেশের বেলায় এক নিয়ম, ভিনদেশিদের বেলায় আলাদা? এ কেমন সংবাদমূল্য নির্ধারণপদ্ধতি? সূত্র অনুযায়ী দেশের ঘটনা তো নৈকট্যের কারণে আরও বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা। আমরা আশা করবো, গণমাধ্যমও ‘মি-টু’ আন্দোলনের সঙ্গে তাদের নৈতিক সমর্থন জানাবে। অন্তত সংবাদমূল্য আগে যেমন দিয়েছে, দেশের ঘটনায় সে রকমই দিক। খালি নাটক সিনেমার লোকদের নয়, কাঠগড়া সবার জন্য! মনে রাখা ভালো, ঝড়ের পর একটা সুন্দর ঝলমলে রোদ আসে। সেই আলো হোক মুক্তির আলো। পারস্পরিক শ্রদ্ধায় বিশ্বাসে গড়ে উঠুক নারী পুরুষের সম্পর্ক–যা প্রকাশে কোনও ভয় থাকবে না, ভালোলাগা থাকবে। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

মানহানি অপরাধের বিচার

মানহানি অপরাধের বিচার

আসিফ নজরুল ‘আপনি একজন ঘৃণ্য নারীবিদ্বেষী। আমরা সারা পৃথিবীর কাছে এটা দেখাব যে কী ধরনের ডাহা জোচ্চর আর মিথ্যাবাদী আপনি।’ ওপরের কথাগুলো বলা হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে। তাঁর নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে এ কথাগুলো বলেছেন পর্নো তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলের আইনজীবী। এ জন্য তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মানহানি মামলা হয়নি। ট্রাম্পের পূর্বসূরি ওবামার ওপর ক্ষিপ্ত মানুষকে আকর্ষণ করার জন্য ওবামার নামে বের করা হয়েছিল টয়লেট টিস্যু। এ জন্যও কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। বাংলাদেশে আমরা এমন পরিস্থিতির কথা কল্পনাও করতে পারি না। বাংলাদেশের মতো দুর্বল গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বরং মানহানি মামলা হয় শক্তিমানদের পক্ষে, আরও নির্দিষ্টভাবে বললে সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে। অথচ এটি মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে বাদ দেওয়া হয়েছে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে। আমেরিকা বা ইউরোপের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানহানির মামলা সাধারণত হয় বরং প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী বা ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে অসাধারণদের সম্পর্কে কিছু বলার জন্য মানহানি মামলা হয়েছে এটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা সেখানে। সাধারণ মানুষেরা মানহানি মামলা করলেও যে সেসব দেশের আদালত খুব উৎসাহিত হয়ে ওঠে তা–ও নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা এই অভিযোগ খারিজ করে দেয় বাক্স্বাধীনতার স্বার্থে। ১৯৬৪ সালে আমেরিকান সুপ্রিম কোর্ট নিউইয়র্ক টাইমস বনাম সুলিভান মামলায় রায় দিয়েছিল যে কিছু মানহানিকর বক্তব্য বাক্স্বাধীনতা দ্বারা সংরক্ষিত। মানহানিকর বক্তব্যেরÿ ক্ষেত্রে এটিই আমেরিকার এবং পশ্চিমা বিশ্বের আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি। উন্নত বিশ্বে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডে মানহানি লঘু একটি অপরাধ। মানহানি সেখানে দেওয়ানি অপরাধ, অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি হয় তাই শুধু অর্থদণ্ডে। মানহানি অপরাধের জন্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা জামিন না দিয়ে আটক করে রাখা অকল্পনীয় বিষয় সেখানে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন (পরে কাউন্সিল) তার বহু পর্যবেক্ষণে মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখা ১৯৬৬ সালের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৯ ধারার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কমিশনের মতে, মানহানি মামলায় গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ডের বিধান থাকলে তা অপব্যবহারের বহু সুযোগ থাকে এবং সেটি হলে মানুষ স্বাধীনভাবে ন্যায্য কথা বলতেও ভয় পায়। মানহানিকে ডিক্রিমিনালাইজেশন (ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে অব্যাহতিকরণ) করছে বহু দেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কাও রয়েছে এর মধ্যে। ২. মানহানি সম্পর্কে বাংলাদেশের আইন ভিন্ন, আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি আরও ভিন্ন। বাংলাদেশের আইনে মানহানি দেওয়ানি এবং একই সঙ্গে ফৌজদারি অপরাধ। তবে ফৌজদারি হলেও এটি বাংলাদেশের আইনেও লঘু একটি অপরাধ। এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র ২ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড। ফৌজদারি কার্যবিধির ২ নম্বর তফসিল অনুসারে এটি জামিনযোগ্য, আমল–অযোগ্য এবং আপসযোগ্য অপরাধ। আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে এ ধরনের লঘু একটি অপরাধকেই বাংলাদেশে ভিন্নমত দমনের বড় অস্ত্র বানিয়ে ফেলা হয়েছে এর অপপ্রয়োগের মাধ্যমে। সাম্প্রতিক কালে মানহানি মামলার শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন সম্পাদক, সাংবাদিক, সমাজের বরেণ্য ব্যক্তি থেকে সাধারণ মানুষ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলাগুলো করা হয়েছে সরকারের ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বলার অভিযোগে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৮ ধারা অনুসারে মানহানির মামলা করার অধিকার রয়েছে শুধু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির। অথচ গত কয়েক বছরে ক্ষমতাসীন দলের কর্মী এমনকি দলের সঙ্গে কোনোরকম সংস্রবহীন ব্যক্তি মানহানি মামলা করেছেন অন্যের বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্যের অভিযোগ তুলে। মানহানি মামলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে একই অভিযোগে একাধিক মামলা গ্রহণ। আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধির ২০৫ঘ ধারা অনুসারে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই বিষয়ে থানায় এবং আদালতে দুটো ভিন্ন মামলা হলে আদালতের মামলাটি স্থগিত থাকে। এই বিধানের পেছনে যে চিন্তাগুলো কাজ করেছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে একই ঘটনায় কোনো মানুষকে বারবার ভোগান্তিতে না ফেলা এবং ভিন্ন সিদ্ধান্তের অবকাশ না রাখা। ‘নো পারসন শুড বি ভেক্সেড টোয়াইস’ নামে যে ন্যায়বিচারের সূত্র রয়েছে, তাতেও একটি ঘটনায় একাধিক মামলার কোনো অবকাশ নেই। বাংলাদেশে খুনের মতো জঘন্য অপরাধেরও আমরা সাধারণত একাধিক মামলা দায়ের করতে দিতে দেখি না। তাহলে মানহানির মতো লঘু অপরাধে কীভাবে একই অভিযোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু মামলা গ্রহণ করে আদালতগুলো? ৩. মানহানি মামলায় তবু এত দিন আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না দিয়ে সমন দিত, আসামিকে জামিন দিতেও কোনো কার্পণ্য করত না। আইনে তা–ই করার কথা বলা আছে। কিন্তু সম্প্রতি আইনজীবী মইনুল হোসেনের ক্ষেত্রে এসব আইনও অনুসরণ করা হয়নি। তিনি একজন সাংবাদিককে টিভি টক শোতে ‘চরিত্রহীন’ বলার মতো অত্যন্ত আপত্তিকর একটি মন্তব্য করেছেন। এ জন্য অবশ্যই বিচার চাওয়ার অধিকার আছে আক্রান্ত সাংবাদিকের, এই বিচার হওয়াই উচিত। কিন্তু এ বিচারপ্রক্রিয়ায় এমন কিছু অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। ক. আমি আগেই ব্যাখ্যা করেছি ন্যায়বিচারের স্বার্থে একটি অভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা হয় না। বিশেষ করে বাদী নিজে সংক্ষুব্ধ হয়ে মামলা করার পরে আইনজীবী মইনুলের বিরুদ্ধে একই অভিযোগে অন্যদের মামলা দায়েরের কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। পরবর্তী মামলাগুলো আমলে নেওয়ার আগে আদালতগুলো অন্তত তদন্তের আদেশ দিতে পারত সিআরপিসি সেকশন ২০২ অনুসারে। খ. ২০১১ সালের ১ নম্বর আইনে ফৌজদারি কার্যবিধির ২ নম্বর তফসিলের ৪ নম্বর কলামে যে পরিবর্তন আনা হয় তাতে মানহানির অভিযোগের ক্ষেত্রে ওয়ারেন্টের পরিবর্তে সমন পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়। এই পরিবর্তনের পর মানহানির অভিযোগে মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে আদালতে হাজির হওয়ার সমন না দিয়ে প্রথমেই গ্রেপ্তারের পরোয়ানা দেওয়া অযৌক্তিক ও নজিরবিহীন। গ. দণ্ডবিধির ৫০০ ধারার অধীন দায়েরকৃত মানহানি মামলা একটি জামিনযোগ্য অপরাধ। জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন পাওয়া আসামির অধিকার। এমন একটি অপরাধে মইনুল হোসেনের জামিন মঞ্জুর না হওয়া শুধু অযৌক্তিক নয়, অস্বাভাবিকও। যে অপরাধ আমল–অযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আদালতের অনুমোদন ছাড়াই আপসযোগ্য, সেখানে জামিনের আরজি বাতিল হয় কীভাবে? মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে এই প্রশ্নসাপেক্ষ সিদ্ধান্তগুলো হয়েছে দণ্ডবিধির অধীনে দায়েরকৃত মামলায়। এখন তাঁর বিরুদ্ধে মানহানি মামলা হয়েছে অতি বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও। এই আইনে মানহানির মতো লঘু অপরাধকে অজামিনযোগ্য, আমলযোগ্য এবং তিন বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড পাওয়ার মতো বড় অপরাধ হিসেবে দেখানো হয়েছে। আমার প্রশ্ন: যে অপরাধকে এমনকি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে না দেখানোর দায়দায়িত্ব রয়েছে ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক চুক্তিটিতে, যে অপরাধকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখা বাদ দিচ্ছে একের পর এক রাষ্ট্র, সেখানে আমরা এই অপরাধকে আরও অনেক বেশি গুরুতর ও ভয়ংকর ফৌজদারি অপরাধ দেখিয়ে কীভাবে আইন করি? লঘু আইনই কী কঠোর আর অস্বাভাবিকভাবে প্রয়োগ হতে পারে ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে, তা আমরা মইনুল হোসেনের উদাহরণে দেখছি। এর সঙ্গে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ভয়ংকর বিধান যোগ হলে সমাজে এমনকি ন্যায্য কথা বলার ঝুঁকিও কেউ আর নেবে না। ৪. মইনুল হোসেনের মানহানি মামলার পর উচ্চ আদালতের কাছে কিছু বিষয় পরিষ্কারভাবে আমাদের তুলে ধরা উচিত। একই অভিযোগে একাধিক মামলা হতে পারে কি না? মানহানি মামলায় সংক্ষুব্ধ বলতে আসলে কাদের বোঝাবে? সমন দেওয়ার এবং জামিন দেওয়ার আইন থাকলে নিম্ন আদালত তার ব্যত্যয় ঘটাতে পারে কি না? মইনুল হোসেনের বিচার আমরাও চাই। কিন্তু তা করতে হবে তাঁর আইনগত অধিকার রক্ষা করে। এসবের ব্যত্যয় বিনা প্রশ্নে মেনে নিলে মানুষের অধিকার রক্ষার শেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগকে আরও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করার সুযোগ পাবে সরকার। আসিফ নজরুল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

MOST POPULAR

HOT NEWS

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.