একুশে গ্রন্থমেলা এবারই প্রথম অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজন করা নিয়ে মতবিরোধ
আব্দুল্লাহ রায়হান
দীর্ঘ ৪১ বছরের ঐতিহ্য ভেঙে একুশে গ্রন্থমেলা এবারই প্রথম অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলা একাডেমির বাইরে তথা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আর এই নিয়ে মেলার আয়োজক কর্তৃপক্ষ ও প্রকাশকদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। গ্রন্থমেলা বারোয়ারি মেলায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কাও করেছেন কেউ কেউ। গত সোমবার আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হলে মেলা কমিটির মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। এ সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন অধিকাংশ প্রকাশক। অন্যদিকে খোদ মেলার আয়োজক কমিটির একটি বড় অংশ এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে। তারা বলেছেন, প্রকাশকদের ব্যবসায়িক মনোভাবের কারণে ৪১ বছরের ঐতিহ্য রক্ষা করে গ্রন্থমেলাটিকে একাডেমি প্রাঙ্গণে আর ধরে রাখা গেল না। এর ফলে মেলার সার্বিক সৌন্দর্য ব্যাহত হবে।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল বাংলা একাডেমি ও তৎসংলগ্ন এলাকায় মেলা আয়োজনের নানা দিক পর্যালোচনা। তবে মেলা কমিটির প্রকাশকদের কয়েকজন সদস্যের প্রস্তাবের কারণে আলোচনার মূল বিষয় হয়ে ওঠে মেলা সম্প্রসারণের প্রসঙ্গটি। শেষ পর্যন্ত মেলার উল্লেখযোগ্য অংশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয় এই বৈঠকে। সে অনুযায়ী বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লিটল ম্যাগাজিন চত্বর, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের স্টল বসানোরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শুধু তাই নয়, নজরুল মঞ্চেই থাকছে নতুন বইয়ের মোড়ক উšে§াচনের মঞ্চ। তবে একাডেমি প্রাঙ্গণে থাকছে না লেখককুঞ্জ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থাকবে প্রকাশকের স্টল।
এর আগে মেলা কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, একাডেমি প্রাঙ্গণ ও এর দেয়াল ঘেঁষে মেলা অনুষ্ঠিত হবে। সে হিসেবেই এক ইউনিট বরাদ্দ প্রাপ্ত প্রকাশনা সংস্থাগুলো প্রাঙ্গণে এবং ২ ও ৩ ইউনিট প্রাপ্ত প্রকাশনা সংস্থার স্টলগুলো রাস্তায় বসানোরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আর সেই অনুযায়ীই মেলার অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজও শুরু হয়েছিল। হঠাৎ করে নেয়ায় এ সিদ্ধান্তে সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে বলেও জানায় একাডেমি কর্তৃপক্ষ।

এ প্রসঙ্গে একাডেমির মহাপরিচালক ড. শামসুজ্জামান খান জানান, প্রতি বছর গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হয় মহান ভাষাসৈনিকদের স্মরণে। আর এই ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই এসেছে মহান মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণ দেন সোহরাওয়ার্দীতে। মূলত সেখান থেকেই স্বাধীনতার ডাক আসে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের সম্পর্ক রয়েছে। তাই সেখানে গ্রন্থমেলা আয়োজিত হলে একুশ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অপূর্ব সম্মিলন ঘটবে। গ্রন্থমেলার সঙ্গে একুশের পাশাপাশি স্বাধীনতার চেতনাও যুক্ত হবে। তিনি বলেন, নতুন বই আর প্রকাশকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। মেলায় আগ্রহী পাঠক-ক্রেতার সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু একাডেমির ভেতরে এবার জায়গার পরিসর কম। তাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলা আয়োজন সময়ের দাবি ছিল।
গ্রন্থমেলা সম্প্রসারণের বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল। বেশ কয়েকজন সদস্য ঐতিহ্য, নিরাপত্তাগত দিক, পাঠকের যাতায়াত ইত্যাদি বিবেচনায় বাংলা একাডেমির ভেতরেই মেলা আয়োজনের পক্ষে মত দেন। তারা যুক্তি দেখান, উদ্যানের কোন অংশে কতটুকু জায়গা নিয়ে মেলা আয়োজন করা হবে আগে তা স্টাডি বা সরেজমিন পরিদর্শন পর্যন্ত করা হয়নি। এমনকি উদ্যানটি ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পর্যন্ত যোগাযোগ বা পূর্বানুমতি নেয়া হয়নি। এছাড়া আগে মেলার আয়োজকদের কড়াকড়ি সত্ত্বেও মেলায় পাইরেটেড বই, মেলার পরিচ্ছন্নতা, মেলার নিরাপত্তাসহ নানা বিষয়ে বিড়ম্বনা দেখা দেয়। আর এবার বড় আয়োজনে খোলা আকাশের নিচে গ্রন্থমেলা হলে মেলার ঐতিহ্য হারিয়ে বারোয়ারি মেলায় পরিণত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আয়োজক ও প্রকাশকদের একটি অংশ। তবে তাদের মতবিরোধ সত্ত্বেও এবার মেলা একাডেমির বাইরেই সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

একাডেমির এ সিদ্ধান্তকে আবার স্বাগত জানিয়েছেন অনেকে। জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ওসমান গনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্তে আমরা প্রকাশকরা অত্যন্ত খুশি। কেননা, আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়ন হয়েছে। অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম বলেন, প্রকাশকদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে আজ মেলা বড় পরিসরে হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে বড় বড় স্টল ও প্যাভিলিয়ন করে প্রকাশকরা পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেন।
একাডেমির এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মেলা কমিটির সদস্য হাসান আরিফ। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেছি। সেখানে মেলা হওয়ার মতো কোনো পরিবেশ নেই। এ মেলা একুশের চেতনাবহ মেলা, সেজন্যই এটিকে একাডেমির বাইরে নেয়া কিছুতেই ঠিক হয়নি।’
মেলা কমিটির সদস্য সচিব শাহিদা খাতুন বলেন, পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মেলার আয়োজনের কাজ অনেকটাই এগিয়ে আনা হয়েছিল। এখন নতুন করে জায়গা নির্ধারণের কারণে এসব কাজ পিছিয়ে যেতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর অনুমোদন দ্রুত পেলে আমরা সব কাজ দ্রুততার সঙ্গে শেষ করার চেষ্টা করব।
১৯৭২ সালের ৮ ফেব্র“য়ারি একাডেমির বটতলায় মাত্র ৩২টি বই নিয়ে একাই বইমেলার আয়োজন করেছিলেন মুক্তধারা’র চিত্তরঞ্জন সাহা। ঘাসের ওপরে চট বিছিয়ে বই নিয়ে বসেছিলেন তিনি। যুদ্ধের পর স্বাধীন দেশে এটাই ছিল প্রথম বইমেলা। ১৯৭৬ সালে এসে মেলায় যোগ দেয় আহমদ পাবলিশিং হাউস। এরপর ১৯৭৭ সালে একে একে যোগ দেয় নওরোজ কিতাবিস্তান ও চলন্তিকা। ১৯৭৮ সালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বইমেলার আয়োজন শুরু করে বাংলা একাডেমি।

সূত্রঃ মানব কন্ঠ