ছুটির দিনে জনস্রোত

ছুটির দিনে জনস্রোত
ছুটির দিনে জনস্রোতযেমন ধারণা করা হয়েছিল, তেমনটিই হয়েছে। প্রথম শুক্রবার ছুটির দিনে জমবে মেলা। এমন একটা দিনেরই অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। সপ্তম দিনে এসে বইমেলায় লাইন পড়েছে। শুধু লাইনই নয়, নেমেছিল জনস্রোত।

যেমন ধারণা করা হয়েছিল, তেমনটিই হয়েছে। প্রথম শুক্রবার ছুটির দিনে জমবে মেলা। এমন একটা দিনেরই অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। সপ্তম দিনে এসে বইমেলায় লাইন পড়েছে। শুধু লাইনই নয়, নেমেছিল জনস্রোত। নানা বয়সী মানুষের পদভারে মেলার দুই প্রাঙ্গণজুড়ে হাঁটাচলাই ছিল কষ্টকর। শুধু কি পাঠক-ক্রেতা? না। এসেছেন লেখক-বুদ্ধিজীবীরাও। রেওয়াজ অনুযায়ী মেলার সব দ্বার খুলে দেওয়া হয় সকাল ১১টায়। তবে সকালে একঝাঁক শিশু-কিশোরের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে একাডেমি প্রাঙ্গণ। বাংলা একাডেমি আয়োজন করে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার। উদ্বোধক ছিলেন শিল্প-সমালোচক অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনটি শাখায় ৬৯১ খুদে প্রতিযোগী অংশ নেয়।

বেলা গড়াতে থাকে, বাড়তে থাকে ভিড়। নানা বয়সী মানুষের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মেলাপ্রাঙ্গণ। তারা বন্ধু-বান্ধব কিংবাপরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন, কিনেছেন প্রিয় লেখকের বই। লেখক-কবি-সাহিত্যিক-পাঠক-ক্রেতা থেকে রাজনীতিবিদ, সবার পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে মেলা। মেলায় প্রবেশের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চারটি প্রবেশপথে পড়ে দীর্ঘ লাইন। দুই লাইনে আর্চওয়ে তল্লাশি শেষে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে। এখানেও ছিল দীর্ঘ সারি।বারিধারা থেকে এসেছিলেন দুই ভাই রফিক ও আরিয়ান। মেলা সম্পর্কে বললেন, সব দিক দিয়ে ভালো, পরিচ্ছন্ন। মেলার পরিসর ঠিক আছে কি-না তার উত্তরে বলেন, বাংলা একাডেমির মেলা হিসেবে বিবেচনা করলে এ পরিসর ঠিক বলেই মনে হয়। রাজাবাজার থেকে এসেছিলেন স্কুলশিক্ষিকা সানজিদা হক। অন্যপ্রকাশের স্টলের সামনে মেলার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে মেলায় আসছেন। দিন দিন মেলা প্রাণবন্ত হচ্ছে। তার প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ। মেলায় এসে প্রিয় লেখকের অনুপস্থিতিতে তিনি পীড়া অনুভব করেন।অনন্যা স্টলে পাঠক-ভক্তদের অটোগ্রাফ দেন কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলন। এবারের মেলায় তার আটটি বই বের হচ্ছে। এর মধ্যে চারটি বের হয়েছে। তিনি জানান, এবারের মেলার পরিসর বাড়ায় বইপ্রেমীর সংখ্যা বেড়েছে। তবে মেলাটি এক জায়গায় স্থির রাখা গেলে পাঠকরা কোনো কিছু মিস করতে পারতেন না। প্রথমার স্টলে বসে অটোগ্রাফ দেন আনিসুল হক। একাডেমির বর্ধমান হাউসের সামনে ভক্তদের কবলে পড়েছিলেন জনপ্রিয় রম্যলেখক আহসান হাবীব। মেলায় এসেছিলেন কবি আসাদ চৌধুরীও।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চেয়ে বেশি ভিড় ছিল একাডেমি প্রাঙ্গণে। বর্ধমান হাউসে জাতীয় ভাষা ও সাহিত্য জাদুঘর ঘুরে গেলেন দর্শনার্থীরা। একাডেমির বহেড়াতলায় লিটল ম্যাগ চত্বরেও ছিল তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বল উপস্থিতি ও সরব আড্ডা।

প্রথম শিশুপ্রহর আজ : আজ শনিবার প্রথম শিশুপ্রহর। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত নারী ও শিশুদের দখলে থাকবে মেলা। এ সময় একজন অভিভাবক মেলায় প্রবেশ করতে পারবেন সঙ্গে শিশুদের নিয়ে। আগামী দুই শনিবার ১৫ ও ২২ ফেব্রুয়ারিও থাকবে শিশুপ্রহর।নজরুল মঞ্চের চিত্র : মেলার সপ্তম দিনে শুক্রবার নজরুল মঞ্চে ছিল নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের হিড়িক। এদিন ২৯টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এসব বইয়ের মোড়ক খুলতে এসেছিলেন কবি আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, আহসান হাবীব, রওশন আরা, হাসান আরিফ, গোলাম সারোয়ার, অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারী, লিলি হক, নমিতা ঘোষসহ আরও অনেকে। এ তথ্য দেয় একাডেমির সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ।

নতুন বই : নতুন বইয়ের প্রকাশ সংখ্যা তিন অঙ্কে পেঁৗছেছে শুক্রবার। বাংলা একাডেমির তথ্যমতে, বই এসেছে ১৭৩টি। এর মধ্যে কবিতা ৩২, উপন্যাস ৩১, গল্প ২২, প্রবন্ধ ১১, ভ্রমণ ৯, শিশুতোষ ৭, জীবনী ৭, মুক্তিযুদ্ধ ৬, রম্য/ধাঁধা ৬, ইতিহাস ৪, গবেষণা ৩, ধর্মীয় ৩, ছড়া ২, রাজনীতি ২, নাটক ২, কম্পিউটার ২, অনুবাদ ২, বিজ্ঞান ১, সায়েন্স ফিকশন ১ এবং অন্যান্য ১২। বইমেলার প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত মোট নতুন বইয়ের সংখ্যা ৪৬৩।

মেলায় বিভাস এনেছে হাসানাল আবদুল্লাহ অনুদিত গ্রন্থ ‘নির্বাচিত কবিতা হুমায়ুন আজাদ’ আতা সরকারের ‘কালো ধারাপাত’, আলম তালুকদারের ‘বিশ একুশের ছড়া’, রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর ‘বিষ বিরিক্ষের বীজ’ ও ‘কবিতাসমগ্র’-এর নতুন সংস্করণ, কাকলী এনেছে রোহিত হাসান কিছলুর ‘মজা লস’, সুমন্ত আসলামের ‘মহাকিপ্পন’ চারুলিপি এনেছে শাহরিয়ার কবিরের ‘গণআদালত থেকে গণজাগরণ’, মিজান পাবলিশার্স এনেছে হালিম আজাদের ‘নীল বাংকার’, আগামী এনেছে শাহাবুদ্দীন নাগরীর ‘যেখানে খনন করি সেখানেই মধু’, ধ্রুব এষের ‘ঘুঘুর গল্প’, ঝর্ণা রহমানের ‘বিপ্রতীপ মানুষের গণ্ডা’, নান্দনিক এনেছে আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘সেইসব দিন’, বিশ্বজিৎ ঘোষের ‘অশেষ রবীন্দ্রনাথ’, প্রশান্ত মৃধার ‘কাছে দূরের গান’, ধ্রুব এষের ‘টিউনিয়া’, মোশতাক আহমেদের ‘লাল ডায়েরি’, আহমাদ মোস্তফা কামালের ‘প্রেম ও অপ্রেমের গল্প’, চারুলিপি এনেছে সুজন বড়ূয়ার ‘আবৃত্তিযোগ্য কিশোর কবিতা’, এশিয়া পাবলিকেশন্স এনেছে ড. আনু মাহমুদের ‘খাদ্য নিরাপত্তা অর্থনীতির প্রবাহ’, অনুপম এনেছে ড. মোরশেদ শফিউল হাসানের ‘স্বাধীনতার পটভূমি ১৯৬০ দশক’, রোদেলা আনে আহসান হাবীবের ‘ব্রোকিং রোমমো’, উৎস প্রকাশন এনেছে নন্দলাল শর্মা সম্পাদিত রাধামরণ গীতিমালা, রব্বানী চৌধুরীর ‘বাঘের মাসি ঐরাবতে’, সৈয়দ জয়নুল শামসের ‘সমস্ত সুন্দর তুমি’, ইত্যাদি এনেছে ইফতেখার আহমেদ টিপুর ‘সময়ের প্রতিধ্বনি’, অনন্যা এনেছে মহাদেব সাহার ‘গোলাপের গায়ে কী গন্ধ’, চন্দ্রাবতী একাডেমি এনেছে জাহীদ রেজা নূরের ‘শৌনিক আর হাফ রাশান ইভানের অ্যাডভেঞ্চার’, ঐতিহ্য এনেছে নওশাদ জমিলের ‘কফিনে কাঠগোলাপ’, আবদুল হাইয়ের ‘জাকাত ও দারিদ্র্য বিমোচন’, কলি প্রকাশনী এনেছে দীপঙ্কর দীপকের ‘নাস্তিকের অপমৃত্যু’, রকিব হাসানের ‘ওয়াইল্ডক্যাট রহস্য’, কথাপ্রকাশ এনেছে সেলিনা হোসেনের ‘মৃত্যুর নীলপদ্ম’ ও খন্দকার মাহমুদুল হাসানের ‘সেরা কিশোর গল্প’, বিজয় প্রকাশ আনে মে. জে. একে মোহাম্মদের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধু’, পাঠক সমাবেশ এনেছে শামসুদ্দিন চৌধুরীর ‘দেখার যত উপায়’, অন্বেষা প্রকাশন এনেছে মোস্তফা মামুনের ‘আনন্দনগর এক্সপ্রেস’ সময় এসেছে হুমায়ূন আহমেদের ‘একাত্তর এবং আমার বাবা’, শুদ্ধস্বর এনেছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘এখন তখন মানিক রতন’, অন্যপ্রকাশ এনেছে নাসরীন জাহানের ‘এক অদ্ভুত লজ্জা’, আমীরুল ইসলামের ‘নির্বাচিত ১০০ ছড়া’, প্রতীক এনেছে সাগর চৌধুরীর ‘জীবনজুয়ার বাজি’, অবসর এনেছে বেগম আকতার কামালের ‘রবীন্দ্রনাথ যেথায় কত আলো’, রয়েল এনেছে সৈয়দ ইকবালের ‘মায়ালিসা’ এবং অন্যান্য এনেছে ড. সফিউদ্দিন আহমদের অনুবাদ-সমগ্র ও রকিবুল ইসলাম মৃদুলের ‘পরী’ প্রভৃতি।

গতকালের মেলামঞ্চ : মেলামঞ্চে ছিল ‘গণতন্ত্রের তিন শত্রু : দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয়/জাতিগত জঙ্গিবাদ এবং গণতন্ত্র ও সুশাসনের তিন শত্রু : দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয়/জাতিগত জঙ্গিবাদ’ শীর্ষক আলোচনা। অনুষ্ঠানে পৃথক দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যথাক্রমে মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ এবং মাসুদা ভাট্টি। আলোচক ছিলেন অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার ও মোহাম্মদ এ আরাফাত। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। সাংস্কৃতিক পর্বে দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন আবদুল জব্বার, ফকির আলমগীর, তিমির নন্দী, নমিতা ঘোষ, শিবু রায়, কফিল আহমেদ এবং স্বর্ণময়ী ম ল।
এসএম মুন্না Source:  Samakal