‘বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার দেশ কথাটা শুনলে আমার হাসি পায়’-জাকির তালুকদার

Logo_print
সূচীপএ : সাক্ষাৎকার

‘বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার দেশ কথাটা শুনলে আমার হাসি পায়’-জাকির তালুকদার

জাকির তালুকদার বাংলাদেশের তরুণ কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অগ্রগণ্য। উপন্যাসের পাশাপাশি লিখছেন ছোটগল্প ও প্রবন্ধ। প্রথম উপন্যাস কুরসিনামা। মুসলমানমঙ্গল উপন্যাসের মাধ্যমে পাঠকমহলে পরিচিতি পান। তার সর্বশেষ উপন্যাস পিতৃগণ সম্প্রতি জেমকন সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। এই সাক্ষাৎকারে তার লেখালেখি, বাংলাদেশের উপন্যাস, ভাষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্বকৃত নোমান


সাপ্তাহিক :
কথাসাহিত্য রচনায় উদ্বুদ্ধ হলেন কীভাবে, কখন?
জাকির তালুকদার : আমি আগে ছড়া লিখার চেষ্টা করতাম। পেশাগত জীবনে সরকারি চাকরির মোহ থেকে মুক্ত হয়ে আমি এক সময় একটা এনজিও’র হেলথ প্রোগ্রামে চাকরি নিয়ে গ্রামে চলে গেলাম। উত্তরবঙ্গের মঙ্গাপীড়িত গ্রামে। সেখানে এক বিচিত্র জীবন দেখার সুযোগ ঘটল। সেখানে সপ্তাহে ছয় দিনই হয়ত বিদ্যুৎ থাকত না। একেবারে অজগ্রাম। সেখানকার মানুষ আমার আগে হয়ত কোনো এমবিবিএস ডাক্তার দেখেনি। জীবনে বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম উপকরণ তাদের নেই, তারপরও তারা বাঁচে। বাঁচাটাকে তারা যৌক্তিক, অর্থবহ মনে করে। এদের এই জীবনকে ধরার জন্য কোনো কবিতা, ছড়া বা শিল্পের অন্য কোনো মাধ্যমে সম্ভব নয়। এই জীবনকে ধরা যেতে পারে একমাত্র কথাসাহিত্যের মাধ্যমে। তখন থেকেই আমি কথাসাহিত্যের প্রতি মনোযোগী হই।
সাপ্তাহিক : পেশাগতভাবে আপনি একজন ডাক্তার। লেখক এবং চিকিৎসকÑ এই দুইয়ের মধ্যে কোনো দ্বান্দ্বিকতার সৃষ্টি হয় কি না?
জাকির তালুকদার : যদি পেশাতে পরিপূর্ণ নিমগ্ন হয়ে যেতাম তাহলে তো ডাক্তারিই করতে হতো। তখন কেবল টাকা আসতেই থাকত। ডাক্তারদের যত অভিজ্ঞতা বাড়ে ততই টাকা আসতে থাকে। আমারও আসত। কিন্তু আমি লেখক, আমার প্রধান সত্তা লেখক সত্তা। লেখালেখি করে বাংলাদেশে জীবিকা নির্বাহ করা এখনো সম্ভব নয়, তাই আমাকে ডাক্তারি পেশাটাও রাখতে হয়েছে। কিন্তু আমি বেশি সময় দিই লেখালেখিতে। আমি আমার পরিবারের কাছে এক অর্থে কৃতজ্ঞ যে, অন্য ডাক্তারদের পরিবার যে ব্যয়বহুল জীবন যাপন করে, আমার পরিবার আমার কাছ থেকে তা আশা করে না।
সাপ্তাহিক : লেখক হিসেবে আপনি কি নিজেকে দেশ-বিদেশের বড় কোনো লেখক দ্বারা প্রভাবিত বলে মনে করেন?
জাকির তালুকদার : যে সময়টাতে আমি জন্মেছি কিংবা আজকের যে সময়টাতে এসে আমি লিখছি, তখন তো প্রভাবিত না হয়ে কিছু করতে পারব না। কেউ কিছু করতে পারবে না। কারণ আমাদের আগে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতেÑ বিশেষ করে উপন্যাসেÑ এত বড় বড় কাজ হয়ে গেছে যে, যেগুলো আমরা পড়েছি, প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে যেগুলোর প্রভাব আমাদের উপর পড়বেই। সেই প্রভাব-বিস্তারি লেখকদের মধ্যে একজন বা দুজন লেখকের কথা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। এমনও অছে যে, খুবই অখ্যাত লেখক, তার লেখার প্রভাবও আমার মধ্যে চলে আসতে পারে। সে অর্থে পূর্বসুরিদের প্রভাব তো থাকবেই। প্রভাবটা নিয়েই মৌলিক কিছু লেখা যায়।
সাপ্তাহিক : বাংলাদেশের সমকালীন উপন্যাস সম্পর্কে আপনার মন্তব্য? এ দেশের উপন্যাস আসলে কোনদিকে যাচ্ছে?
জাকির তালুকদার : আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ লেখা হয়ে যাওয়ার পরে প্রতি বছরই তো অনেক উপন্যাস বেরুচ্ছে। সেসব উপন্যাস মানুষ পড়ছেও। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে আমরাও পড়ছি। আপনি নিজেও জানেন যে, একেবারে মনের ভেতরে ছাপ ফেলে রাখবে এরকম উপন্যাস খুব বেশি লেখা হচ্ছে না। কিন্তু আবার লেখার চেষ্টাটা কিন্তু দেখা যায়। বর্তমানে যাঁরা উপন্যাস লিখছেন, সৈয়দ শামসুল হক থেকে শুরু করে স্বকৃত নোমান পর্যন্ত এই সময়ে যারা উপন্যাস লিখছেন, এদের একটা অংশের মধ্যে কিন্তু ভালো লেখার, বাংলা ভাষায় বাংলাদেশের উপন্যাস লেখার চেষ্টাটা আছে। তারা যা লিখছেন সেগুলোকে একেবারে বাংলাদেশের উপন্যাস বলা যেতে পারে। এ চেষ্টা অব্যাহত থাকলে সত্যিকারার্থে আমরা মহাকাব্যিক উপন্যাসের যুগের দিকে যাচ্ছি- এ কথা আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি।
সাপ্তাহিক : আপনার সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘পিতৃগণ’, যেটা কয়েকদিন আগে জেমকন সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে। এটা ইতিহাস আশ্রিত বা ঐতিহাসিক উপন্যাস বটে। এই উপন্যাস লেখার সময় ইতিহাসের প্রতি আপনি কতটা সৎ ছিলেন। ইতিহাসের প্রতি সৎ থাকা একজন ঔপন্যাসিকের কতটা জরুরি? সৎ থাকার আদৌ দরকার আছে কি না?
জাকির তালুকদার : ঐতিহাসিক উপন্যাস বলতে যা বোঝায়, আমি মনে করি না যে, আমি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছি। আমার উপন্যাসের সময়খ-টা বা চরিত্রগুলো হয়ত আগেকার, কিন্তু আমি মনে করছি ‘পিতৃগণ’ এই সময়েরই উপন্যাস। এটাকে আমি ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে অভিধা দিতে রাজি নই। দুই কারণে ঔপন্যাসিক আসলে এই জায়গায় যায়। প্রথমত, অতীতটা এতই উজ্জ্বল যে, বর্তমানের গতিটাকে সামনে ঠেলে দিতে অতীতকে দিয়ে ধাক্কা দেয়ার জন্য এ ধরনের লেখা লিখেন তারা। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে যেহেতু কিছুই হচ্ছে না সেহেতু অতীতে গিয়ে আশ্রয় নেয়া। অতীতের বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখতে গেলে এ দুটি প্রবণতার মধ্যে একটা কাজ করে। মানে বর্তমান সময়ে যদি কোনো আইকন না থাকে, তাহলে ইতিহাস থেকে ধার করে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু আমি সে উদ্দেশ্যে করিনি। আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন যে, আমি ইতিহাসের দলিল-দস্তাবেজ উপস্থাপন করিনি পিতৃগণে, আমি উপন্যাসই লিখেছি। আর ইতিহাসের প্রতি সৎ থাকার ব্যাপারটা হচ্ছে, কেউ যদি পলাশী যুদ্ধ নিয়ে উপন্যাস লিখে, তাহলে  সেখানে তার ইন্টারপিটিশনের ব্যাপার আছে। কারণ পলাশী যুদ্ধ নিয়ে দুই রকমের ইতিহাস আছে? আপনি কোনটা লিখবেন? তার মানে ইতিহাসটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন সেটা দেখার বিষয় আছে। ইতিহাসে খলনায়ক যারা তাদেরকে যদি আপনি হিরো বানিয়ে দিন, তাহলে আমি বলব যে, ইতিহাসের প্রতি আপনি অসৎ থেকেছেন। অর্থাৎ ইতিহাসের মৌলিক তথ্যটাকে বদলানো যাবে না, বাকিটা আপনি যা ইচ্ছে তাই করুন। আপনি সিরাজউদ্দৌলাকে তো মীরজাফর বানাতে পারবেন না!
সাপ্তাহিক : সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে ঔপন্যাসিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছেন যে, সমকালীন একটা বিষয়ের শুরুটা আমরা জানি, শেষটা জানি না। তাই সমকালীন বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখলে সেটা শক্তিশালী হয় না। আপনার কী অভিমত?
জাকির তালুকদার : লেখক তো পাঠকের কথা মাথায় রেখেই লিখেন। লেখকের দূরদর্শিতা এবং সক্ষমতা থাকলে সবকিছু নিয়েই তিনি লিখতে পারেন। সমকালীন বিষয় নিয়ে আমাদের ব্যর্থ উপন্যাস ভুরি ভুরি আছে। আপনারা পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় যেগুলো ছাপেন, সেগুলোর অধিকাংশই সমকালীন বিষয় নিয়ে লেখা। আবার একই সঙ্গে সমকালীন বিষয় নিয়ে অনেক ভালো উপন্যাসও আছে। বলজাকের উপন্যাসগুলোও কিন্তু সমকালীন বিষয় নিয়ে লেখা। তলস্তয়ের উপন্যাস সমগ্রের একটা বিশাল অংশ সমকালীন জীবনকে নিয়ে লেখা। সেখানে তো কোনো ক্ষতি হয়নি! সে হিসেবে আমি এটাকে দোষের কিছু বলে মনে করি না।
সাপ্তাহিক : আপনি বললেন যে, লেখক পাঠকের কথা মাথায় রেখেই লিখেন। কিন্তু যে লেখা পড়ে পাঠক কিছুই বুঝতে পারে না, যেমন কমলকুমার মজুমদারের লেখা, তাঁর লেখার বিরুদ্ধে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ, পাঠক তার লেখার সঙ্গে যেতে পারেন না। কিংবা নাম উল্লেখ না করেও এই সময়ের অনেক লেখকের লেখা সম্পর্কে এই কথা বলা যায়। কথা হচ্ছে, পাঠক হিসেবে আমি যে শিল্পের ভেতরে ঢুকতে পারছি না, শিল্প হিসেবে তা কতটা সার্থক?
জাকির তালুকদার : শিল্পের প্রথম শর্ত হচ্ছে সংযোগের একটা সেতু তৈরি করে নিতে হবে। কমলকুমার মজুমদার যদি ভেবে থাকেন যে, তিনি যে ভাষায় লিখেছেন ভাষা সেদিকে বিবর্তিত হবে, সাহিত্যের ভাষা হয়ত সেদিকে যাবে। এখন তার লেখা মানুষ বুঝতে না পারলেও তখন বুঝতে পারবে। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়ে গেছে। সাহিত্যের ভাষা সেদিকে যায়নি, কথ্য ভাষাও সেদিকে যায়নি।
সাপ্তাহিক : তাহলে ঔপন্যাসিক হিসেবে তো তিনি ব্যর্থ?
জাকির তালুকদার : আমি একেবারে এভাবে মোটাদাগে ফেলব না। তার চেষ্টাটাকে আমি গুরুত্ব দিব; যদি তার কাজকে উন্নাসিকতা বলা না যায়। অনেকে আবার উন্নাসিক হয়েও লিখেন। তবে অনেক ব্যর্থতা কিন্তু বড় আকাঙ্খার কাজ হতে পারে। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা পাওয়াটাও একটা ফলাফল।
সাপ্তাহিক : বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উপন্যাসে একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যেটা আপনার মুসলমানমঙ্গল উপন্যাসেও আছে। তা হচ্ছে উপন্যাস লিখতে গিয়ে লেখক পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ইতিহাস তুলে দিচ্ছেন। তথ্যের ভারে উপন্যাস নুব্জ্য। মুসলমানমঙ্গলেও দেখা যাচ্ছে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা কোরান-হাদিস থেকে উদৃতি দেয়া হয়েছে। এই প্রবণতাটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
জাকির তালুকদার : মুসলমানমঙ্গল আমি উপন্যাস হিসেবে লিখতে চাইনি, জাস্ট একটা লেখা হিসেবে লিখেছি।  গবেষণাধর্মী এই লেখা যদি লিখি, সেটা পাঠকের কাছে ওভাবে যাবে না। পাঠক এটার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার জন্য যদি কিছু চরিত্র পায়, তাহলে পড়তে সুবিধা হবে। সেজন্য আমি কিছু চরিত্র ঢুকিয়েছি। আমি এটাকে আসলে উপন্যাস বলে আখ্যায়িত করতে চাইনি। পরবর্তী সময়ে আমার লেখক বন্ধুরা বললেন যে, ননফিকশন ফিকশন বলে একটা ধারা আছে। তারা আমাকে দেখাল যে, টলস্টয়ের ওয়ার এন্ড পিস দেখ, সেখানে দলিল তুলে দেয়া হয়েছে। সুতরাং তুমি এটাকে উপন্যাস নাম দিতে পার। তাই আমি উপন্যাস নাম দিলাম। যেটাই হোক, তবে পাঠক এটাকে ভালোভাবেই নিয়েছে। যে সমালোচক সে হয়ত দ্বিধায় পড়বে যে, এটাকে কোন বর্গে ফেলবে। একজন লেখক হয়ত দ্বিধাগ্রস্ত হবে। কিন্তু পাঠক তো সেসব বোঝে না। এত পাঠক আমি আমার কোনো বইয়ের জন্য পাইনি। এই বইয়ের একজন পাঠক আরো পাঠক তৈরি করছে। ফলে আমার ক্ষোভের বা দুঃখের কোনো কারণ নেই। তবে কিছু উপন্যাস আছে, যেগুলোতে ইতিহাসের গায়ে কিছু হাড়মাংস লাগানোর জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। এগুলোকে এক অর্থে দুর্বল কাজই বলব আমি।
সাপ্তাহিক : প্রতি বছর বইমেলায় বইয়ের বিপুল সমাহার দেখা যায়। কিন্তু সেসব বইয়ের মধ্যে হয়ত দশ-বিশটা পড়ার মতো। এই বিপুল বই প্রকাশের ইতিবাচক-নেতিবাচক দিকটা যদি বলেন…।
জাকির তালুকদার : আপনি তো আইন করে কাউকে বলতে পারেন না যে, তুমি বই ছাপতে পারবে না। মুদ্রণ শিল্প এখন মানুষের করায়ত্বে। যার হাতে কিছু টাকা জমে গেছে সে-ই বই বের করছে। এগুলো যে উচ্চবিত্ত মানুষরা করছে তা নয়। ব্যবসায়ে সফল, ফুটবল প্লেয়ার হিসেবে, রাজনীতিবিদ হিসেবে বা অভিনয়ে সফলÑ সফল বলতে যারা, তারা সবাই লিখছেন। তারা মনে মনে ভাবছেন যে, সব কিছুতে যেহেতু তিনি সফল, লেখক হিসেবেও হয়ত তিনি সফল হয়ে যাবেন। কিন্তু ওখানে তিনি চল্লিশ বছর ব্যয় করে এসেছেন, অথচ লেখালেখির ক্ষেত্রে তিনি চল্লিশ দিনও ব্যয় করেননি। এখানেই একটা মানুষের পরিণতিবোধের অভাব। তিনি লিখে যাচ্ছেন। যা-ই লিখছেন, ভাবছেন সেটা মাস্টারপীসই লিখছেন। বিত্তশালী মৌসুমি লেখকদের নিয়ে একটা মুশকিল আছে। তারা প্রচুর বিজ্ঞাপন দেন পত্রিকায় টাকা খরচ করে। এভাবে পাঠকদের প্রভাবিত করেন, প্রতারিত করেন। এতে পাঠক বিভ্রান্ত হয়। এই অর্থে এটা প্রকৃত সাহিত্যের জন্য ক্ষতিকর। আবার অনেকেই আছেন, যিনি একেবারে গরিব মানুষ, জীবন সয়াহ্নে এসে তিনি ধার কর্জ করে একটি বের করলেন। সেটার কোনো সাহিত্যমূল্য নেই। এ ধরনের বই তার নিজের জন্য যেমন ক্ষতিকর, অন্যদের জন্যও ক্ষতিকর। সবাইকে বুঝতে হবে যে, অন্য সব কিছুর মতো লেখককেও দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং অধ্যাবসায়ের মধ্য দিয়ে লেখক হতে হয়। এই প্রস্তুতি এবং অধ্যাবসায় না থাকার কারণে যেনতেন প্রকারের লেখা লিখলে লেখক হিসেবে কখনোই স্বীকৃতি পাবে না। এ ব্যাপারে প্রকাশকরাও অদায়িত্বশীল। শিক্ষিত, রুচিশীল মানুষদের প্রকাশনায় আসা উচিত। কিন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকার বা রাষ্ট্র কোনো মানুষের দায়িত্ব নেবে না। যে যেভাবে পার করে খাও।
সাপ্তাহিক : পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় যা হয় আর কি…?
জাকির তালুকদার : পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার সবচেয়ে নগ্ন এবং বিকৃত রূপ হলো মুক্তবাজার অর্থনীতি। সেক্ষেত্রে রুচি, দেশাত্ববোধ যাদের আছে তারা মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে সামনে আসতে পারবে না।
সাপ্তাহিক : মুক্তবাজার অর্থনীতি তো সাহিত্যকেও পণ্য করে ফেলেছে?
জাকির তালুকদার : সাহিত্য আগেই পণ্য হয়ে গেছে। এখন এটাকে পুরোপুরি বাজারি পণ্য বানিয়ে ফেলেছে আরকি…।
সাপ্তাহিক : আপনি ঢাকার বাইরে থাকেন, জেলা শহর নাটোরে। সেই এলাকার মানুষ লেখক হিসেবে আপনাকে কতটা গুরুত্ব দেয়? একটা সময়ে জেলা শহরগুলো সাংস্কৃতিক দিক থেকে অনেক শক্তিশালী ছিল। এখন কী অবস্থা?
জাকির তালুকদার : আগের যেগুলো জেলা শহর বা মহকুমা শহর, সেগুলোতে একটা আলোকিত ক্লাস গড়ে উঠেছিল। এই শ্রেণীটা গড়ে উঠার সময়টা যদি দেখেন, কংগ্রেস তৈরি হওয়ারও আগে অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদেরকে কলকাতা শহরে লেখাপড়া শিখাত। কিন্তু দেশাত্ববোধের কারণে পরে নিজের এলাকায় গিয়ে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করে সেখানে শিক্ষকতা করেছে তারা। এটা নিছক দেশপ্রেম এবং কর্তব্যবোধ থেকে করা। এইভাবে একটা পরিম-ল মফস্বলগুলোতে গড়ে উঠেছিল। এই পরিম-লটা আরেকটু শক্তিশালী হয় যখন ধীরে ধীরে বাম আন্দোলনের প্রসার ঘটে। বামপন্থীরাও এভাবে নিজ এলাকায় চলে যেতেন। স্বাধীনতা উত্তর পাঁচ-সাত বছর পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা ছিল। এরপর আগে যে শ্রেণীটা সামাজিক সম্মান ভোগ করতেন, এটা চলে গেল নব্য টাকাওয়ালাদের হাতে, ব্যবসায়ীর হাতে। বিপ্লবী, দেশপ্রেমিক, নির্লোভ, শিক্ষক- যাকে দেখে আগে লোকে সালাম দিত, সম্মান দিত- তাকে তখন সম্মান না দিয়ে লোকে সম্মান দিতে শুরু করল টাকাওয়ালাকে। এর পর সম্মান দিতে শুরু করল ক্ষমতাসীনদেরকে। সে দুর্বৃত্ত হোক আর যা-ই হোক তাকে সম্মান দিচ্ছে। ভয়ে হোক বা যে কারণেই হোক তাকে সম্মান দিতে হচ্ছে। কেউ সম্মান না দেখালে তাকে আবার বিপদে ফেলতে পারে। ফলে আগের সেই ধারাটা শেষ হয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে একজন কথাসাহিত্যিক, কবি বা শিক্ষককে তো আগের মতো সেই সম্মান দেয়ার কথা নয়।
এর ভেতরে আরেকটা অংশ আছে। আমি পাবনায় গেলাম কবি ওমর আলীর বাড়িতে। দেখলাম তিনি যখন কলেজে এসে চা খাওয়ার পর দোকানে পান খেতে আসেন, দোকানদার তার কাছ থেকে প্রথম পানের দাম নেয় না। কবি সাহেবকে উপহার দেন। উনার বাড়ি থেকে আসতে এবং যেতে পদ্মার একটা শাখা নদীতে নৌকা পার হতে হয়। আমি তার সঙ্গে নদী পার হচ্ছিলাম। মাঝি কবির কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে না। বলছে, ‘কবি সাহেবের কেরায়া লাগে না।’ এই নি¤œবর্গের নি¤œবিত্ত মানুষগুলো কিন্তু সম্মানটা দিচ্ছে। সমাজের উচ্চবিত্তরা দিচ্ছে না।
আমার ক্ষেত্রে যেটা হচ্ছে, আমি যে লেখক সেটা এলাকার মানুষ জানে। আমার লেখা পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়, আমার সঙ্গে ঢাকার কবি-সাহিত্যিকদের যোগাযোগ আছে, সেটা তারা জানে। তবে আমি স্থানীয়ভাবে আরো কিছু সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। সংগঠক হিসেবে তারা আমাকে যতটা সম্মান দেন, লেখক হিসেবে আমাকে ততটা সম্মান দেন না হয়ত।
সাপ্তাহিক : বাংলা ভাষা নিয়ে নৈরাজ্য চলছে বলে বিতর্ক চলছে। ভাষা নৈরাজ্য নিয়ে আপনার মন্তব্য?
জাকির তালুকদার : কোনো ক্রিয়েটিভ লেখক যদি ভাষার ক্ষেত্রে নৈরাজ্য ঘটায়, আমি তার ব্যাপারে আপত্তি করি না। কারণ তার লেখা টিকবে কি টিকবে না সেটা ইতিহাস বলে দেবে। যেমন কমলকুমার মজুমদারের কথা বলেছি। কিন্তু আপত্তির জায়গাটা হবে তখন, যখন সে আমাকে বলে যে, তোমাকেও এই ভাষায় লিখতে হবে। যখন কেউ বলে, এটাই ইতিহাসের একমাত্র নির্ণায়ক ভাষা, এই ভাষাতে না লিখলে বাংলা ভাষায় লিখা হবে না- এই ফতোয়া যখন কেউ জারি করে তখন তার বিপক্ষে আমি দাঁড়াই। বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, যে জগাখিচুড়ি ভাষাটা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে, সার্বিক নৈরাজ্যের মতো এটাকেও ভাষানৈরাজ্য বলতে হবে। এটাকে শুভ লক্ষণ বলার কোনো কারণ নেই। সকল ভাষারই একটা শিল্পিত রূপ থাকতে হয়। বাড়িতে গহনার একটা বাক্স থাকে, গহনাগুলো কিন্তু প্রতিদিন পরে না মানুষ, তারপরও বাক্সটা রাখে। বাক্সটা পরিবারের কাছে একটা সম্পত্তি। ভাষার ক্ষেত্রেও সেটা প্রযোজ্য। ভাষারও শিল্পিত রূপ রক্ষা করতে হবে। সেই রক্ষার দায়িত্ব লেখকরা ছাড়া অন্য আর কে নেবে? তবে আমি মনে করি না ভাষা নিয়ে এই ডামাঢোল বেশিদিন থাকবে। এটাকে আমি ভাষা বিতর্ক বলে মনে করি না। এসব আগেও হয়েছে।
সাপ্তাহিক : আপনি মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মের সন্তান। স্বাধীনতার চল্লিশ বছরে বাংলাদেশ কতটা এগুলো। বাংলাদেশ রাষ্ট্র আসলে কোনদিকে যাচ্ছে?
জাকির তালুকদার : পৃথিবীতে অনেক জাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যেসব শর্তের কারণে ওই জাতিগুলো বিলুপ্ত হয়েছে, সেই শর্তগুলো আমাদের দেশ অনেক আগেই পূরণ করে ফেলেছে। ফলে এই দেশ বিলুপ্ত হবে না। না হওয়ার পেছনে একটা কারণ প্রযুক্তি। দ্বিতীয়ত, বাইরে থেকে কোনোভাবে জোড়াতালি দেয়ার যে চেষ্টা, সে কারণে বিলুপ্ত হবে না। তবে যারা বলে বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার দেশ, কেন কথাটা বলে তা বোঝা দরকার। বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার দেশ কথাটা শুনলে আমার হাসি পায়। অমিত সম্ভাবনা কাদের জন্য? মাত্র তিন পার্সেন্ট লোকের জন্য। পুঁজিবাদের দিকেই হাঁটছে বাংলাদেশ। রাষ্ট্রীয়ভাবে এটা ঠিক হয়ে গেছে। সকল বাজেট, অর্থ বরাদ্ধ দেখলে এটা বোঝা যায়। বাংলাদেশে পুঁজিবাদ বিকশিত হওয়ার শর্তটা হলো পুঁজিটা থাকতে হবে। ইংল্যান্ড বা পুঁজিবাদী দেশগুলো অন্যদেশ লুণ্ঠন করে পুঁজি সংগ্রহ করে। প্রত্যক্ষভাবে ডাকাতি, রাহাজানি করে পুঁজি সংগ্রহ করেছে তারা। বাংলাদেশে পুঁজিবাদের বিকাশের জন্য এই তিন পার্সেন্ট লোকের হাতে বাংলাদেশের খনি, বাংলাদেশের আকাস-বাতাস-পানি-মাটি এবং বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতি- সমস্ত কিছু লুণ্ঠনের অবাধ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সুযোগ দেয়া হয়েছে। অতএব বাংলাদেশ কোনদিকে যাবে- সাধারণ মানুষ হিসেবে আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই।
সাপ্তাহিক : সংস্কৃতি লুণ্ঠনের কথা বললেন। সংস্কৃতি লুণ্ঠিত হলে জাতি হিসেবে বাঙালির কোনো সঙ্কট সৃষ্টি হবে কিনা?
জাকির তালুকদার : বাঙালি সংস্কৃতির একটা উপাদান হচ্ছে, বাঙালি মাঝেমাঝে এমনভাবে জেগে ওঠে তাকে আর ঠেকানো যায় না। যে কারণে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে সাম্রাজাবাদীদের অনেক প্রকল্প ব্যর্থ হয়ে গেছে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায়নি বাংলাদেশ স্বাধীন হোক। প্রত্যক্ষ বিরোধীতা করেছে তারা। কিন্তু বাঙালি জেগে উঠেছিল বলে তাদের বিরোধিতা কাজে লাগেনি। এটাই হচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতির শক্তি।

সমতলের আদিবাসীদের জীবনচিত্র নির্মাণ

http://wp.me/p3NBfw-2Y8