তরল দুধে ভেজাল

তরল দুধে ভেজাল
মেশানো হচ্ছে ফরমালিন সোডিয়াম-বরিক-সোডা
সাইদ শাহীন | তারিখ: ১৬-০৮-২০১৩
বাড়িতে বাড়িতে দুবেলা গাভীর দুধ দোয়ানোর দৃশ্য এখন অহরহ চোখে পড়ে না। গ্রামের হাটবাজারে জগে-মগে দুধ বেচার চিত্রও পাল্টে গেছে। এসেছে বড় আকারের নানা পাত্র। পরিবর্তন এসেছে দুধ সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায়ও। খেজুর কিংবা কলার পাতা, কচুরিপানার বদলে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ— ফরমালিন, সোডিয়াম, বরিক পাউডার ও সোডা। আর পরিমাণ বাড়াতে পানি, স্টার্চ, চিনি কিংবা গুঁড়ো দুধের ব্যবহার তো পুরনোই।

দুধ সংগ্রহের পর তা আশপাশের বাড়ি কিংবা হাটবাজারে তাত্ক্ষণিক বিক্রির দীর্ঘদিনের গ্রামীণ পদ্ধতি এখন আর নেই। প্রক্রিয়াজাত কোম্পানিগুলোর চাহিদা মেটাতে স্থানীয় এজেন্টরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে তরল দুধ সংগ্রহ করে। এতে লম্বা সময় ধরে দুধ টাটকা রাখতে মেশানো হয় রাসায়নিক পদার্থ। দুধের তীব্র ঘাটতি, অতি মুনাফার প্রবণতার সঙ্গে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা, দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত শীতলীকরণ কেন্দ্রসহ তদারকির অভাবে এসব ভেজাল তরল দুধ বাড়াছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ এক জরিপ থেকে দুধে কী মেশানো হচ্ছে তার চিত্র পাওয়া যায়। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘এডালটারেশন অব র মিল্ক ইন দ্য রুরাল এরিয়াস অব বরিশাল ডিস্ট্রিক্ট’ শীর্ষক ওই গবেষণায় দেখা যায়— দোয়ানোর পর বাজারে আনার আগ পর্যন্ত বরিশাল অঞ্চলে গড়ে ১০ শতাংশ দুধে ফরমালিন এবং ২০ শতাংশে সোডিয়াম বাইকার্বোনেট মেশানো হয়। শতভাগ দুধেই মেশানো হয় পানি। এছাড়া চিনি ২৬, গুঁড়ো দুধ ১৪ এবং স্টার্চ মেশানো হয় ১২ শতাংশ দুধে।

ওই জরিপের সংশ্লিষ্ট গবেষক পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি অ্যান্ড পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তন্বী চন্দ বণিক বার্তাকে বলেন, দ্রুত পচনশীল পণ্যটির জন্য উন্নত বাজার ব্যবস্থার প্রয়োজন। কিন্তু গ্রামপর্যায়ে তা না থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দুধ আনতে অবাধে মেশানো হচ্ছে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ। কখন কী পরিমাণ মেশানো হবে সেটি আবার আবহাওয়া ও বাজারে দুধের চাহিদার ওপর নির্ভর করে। তাই কৃষকপর্যায়ে শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে ভেজাল কিছুটা রোধ করা সম্ভব।

শুধু বরিশাল নয়, দেশে তরল দুধের অন্যতম উত্পাদনকারী অঞ্চল সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় দুধ ঘন কিংবা স্থায়িত্ব বাড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে সোডা ও বরিক পাউডার। এ দুই জেলা থেকে প্রতিদিন দুধ সরবরাহ হয় প্রায় সাড়ে তিন লাখ লিটার। দেশের বেসরকারি দুধ প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত চাহিদা বাড়ালেও বাণিজ্যিকভাবে গাভী পালনে তাদের উদ্যোগ নেই। এদিকে বাড়তি চাহিদা পূরণে দুধে বিভিন্নভাবে রাসায়নিক পদার্থ মেশাচ্ছেন কৃষক।

রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর কারণে দুধের স্বাভাবিক গুণাগুণ ঠিক থাকে না উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. গোলাম মওলা বলেন, এসব ভেজাল দুধ পান করলে খাদ্যনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাথমিকভাবে শ্বাসকষ্ট, বিশেষ করে অ্যাজমায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি লিভার ও কিডনি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ জন্য দুধে ভেজাল বন্ধে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মানদণ্ড অনুযায়ী ভালো মানের দুধে সাধারণত ৪ শতাংশ ফ্যাট ও ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ ল্যাকটোজ থাকার কথা। এছাড়া ৪ দশমিক ১০ শতাংশ প্রোটিন, ৮ দশমিক ২ শতাংশ এসএনএফ এবং সাড়ে ১২ শতাংশ টোটাল সলিড ও শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ এসিডিটির উপস্থিতি থাকবে মানসম্পন্ন তরল দুধে। যেকোনো রাসায়নিক পদার্থ মেশালে দুধে এসব উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়; যা সুস্বাস্থের জন্য উপযোগী নয়।

সরকারি তথ্যমতে, দেশে প্রতিদিনের চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২২ শতাংশ দুধ উত্পাদন করা সম্ভব হচ্ছে। প্রতিদিন একজন মানুষের দুধের চাহিদা রয়েছে ২৫০ মিলিলিটার, যা বছরে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টন। অথচ প্রতিদিন সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৫৫ মিলি বা বছরে প্রায় ২৯ লাখ ৫০ হাজার টন। সে হিসাবে বর্তমানে বছরে ঘাটতির পরিমাণ ১ কোটি ৩ লাখ ৫০ হাজার টন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) মহাপরিচালক ড. মো. নজরুল ইসলাম খান বলেন, দেশের মানুষের খাদ্যের পাশাপাশি পুষ্টির চাহিদা পূরণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আর এক্ষেত্রে ডেইরি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাণিজ্যিকভাবে পশুপালন উত্সাহিত করতে বেসরকারি বিনিয়োগে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি প্রণোদনা দেয়া, কৃষকপর্যায়ে ঋণ প্রদান, সচেতনতা ও তদারকি বাড়ানোর মাধ্যমে ভেজাল রোধে উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন দুধ গ্রহণের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এ তালিকায় পাকিস্তানের অবস্থান সবার ওপরে। দেশটির একজনের গড় দুধ গ্রহণের পরিমাণ ৫২০ মিমি। এর পরই রয়েছে ভারত ২২৭ মিমি, মালদ্বীপ ১৮৮, শ্রীলঙ্কা ১৪২ ও নেপাল ১৪০ মিমি।
সূত্রঃ বনিক বার্তা