রহমতের উৎসব

আবারও ফিরে এসেছে রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস পবিত্র রমজান। এই মাস আত্মশুদ্ধির মাস এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনসহ সারা জীবনের জন্য পাথেয় ও পরকালের সম্বল অর্জনের মাস।

জীবনকে উন্নত ও অর্থবহ করার প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্যও এই মাসের রোজাগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।  কারণ, এই মাসেই নাজিল হয়েছে পবিত্র কুরআন। এই মাসেই রয়েছে পবিত্র শবে ক্বদর বা লাইলাতুল ক্বাদর, আর ক্বাদরের রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের সমতুল্য।  পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন:

“হে মানুষ! নিঃসন্দেহে তোমাদের সামনে রয়েছে আল্লাহর বরকতপূর্ণ মাস। এ মাস বরকত,রহমত বা অনুগ্রহ ও ক্ষমার মাস। এ মাস মহান আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ মাস। এ মাসের দিনগুলো সবচেয়ে সেরা দিন,এর রাতগুলো শ্রেষ্ঠ রাত এবং এর ঘণ্টাগুলো শ্রেষ্ঠ ঘণ্টা। এ মাস এমন এক মাস যে মাসে তোমরা আমন্ত্রিত হয়েছো আল্লাহর মেহমান হতে তথা রোজা রাখতে ও প্রার্থনা করতে। তিনি তোমাদেরকে এ মাসের ভেতরে সম্মানিত করেছেন। এ মাসে তোমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস মহান আল্লাহর গুণগান করার বা জিকরের (সওয়াবের) সমতুল্য; এ মাসে তোমাদের ঘুম প্রার্থনার সমতুল্য,এ মাসে তোমাদের সৎকাজ এবং প্রার্থনা বা দোয়াগুলো কবুল করা হবে। তাই মহান আল্লাহর কাছে আন্তরিক ও (পাপ ও কলুষতামুক্ত) পবিত্র চিত্তে প্রার্থনা করো যে তিনি যেন তোমাদেরকে রোজা রাখার এবং কোরআন তিলাওয়াতের তৌফিক দান করেন।”

রমজানের ফজিলত সম্পর্কে মহানবী (সা.) আরো বলেছেন: “নিঃসন্দেহে সে ব্যক্তি প্রকৃতই দুর্ভাগা বা হতভাগ্য যে রমজান মাস পেয়েও মহান আল্লাহর ক্ষমা হতে বঞ্চিত হয়। এ মাসে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে কিয়ামত বা শেষ বিচার দিবসের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা স্মরণ কর। অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রদেরকে সাহায্য কর ও সদকা দাও। বয়স্ক ও বৃদ্ধদেরকে সম্মান কর এবং শিশু ও ছোটদেরকে আদর কর। (রক্তের সম্পর্কের) আত্মীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ রক্ষা কর। তোমাদের জিহ্বাকে অন্যায্য বা অনুপযোগী কথা বলা থেকে সংযত রাখ, নিষিদ্ধ বা হারাম দৃশ্য দেখা থেকে চোখকে আবৃত রাখ,যেসব কথা শোনা ঠিক নয় সেসব শোনা থেকে কানকে নিবৃত রাখ। ইয়াতিমদেরকে দয়া কর যাতে তোমার সন্তানরা যদি ইয়াতিম হয় তাহলে তারাও যেন দয়া পায়।”

রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.) আরো বলেছেন:

“রমজানে গোনাহর জন্যে অনুতপ্ত হও ও তওবা কর এবং নামাজের সময় মোনাজাতের জন্যে হাত উপরে তোলো,কারণ নামাজের সময় দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়,এ সময় মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকান, এ সময় কেউ তাঁর কাছে কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন, কেউ তাঁকে ডাকলে তিনি জবাব দেন,কেউ কাকতি-মিনতি করলে তার কাকতি মিনতি তিনি গ্রহণ করেন।

হে মানুষ! তোমরা তোমাদের বিবেককে নিজ কামনা-বাসনার দাসে পরিণত করেছো,আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে একে মুক্ত করো। তোমাদের পিঠ গোনাহর ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে আছে,তাই সিজদাহগুলোকে দীর্ঘ করে পিঠকে হালকা করো। জেনে রাখ মহান আল্লাহ নিজ সম্মানের শপথ করে বলেছেন, রমজান মাসে নামাজ আদায়কারী ও সিজদাহকারীদেরকে জবাবদিহিতার জন্য পাকড়াও করবেন না না এবং কিয়ামতের দিন তাদেরকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করবেন।”

রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.) আরো বলেছেন:

“হে মানুষেরা! তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো মুমিনের জন্য ইফতারের তথা দিনের রোজা শেষে যে খাদ্য গ্রহণ করা হয় তার  আয়োজন করে তাহলে আল্লাহ তাকে একজন গোলামকে মুক্ত করার সওয়াব বা পুণ্য দান করবেন এবং তার অতীতের সব গোনাহ মাফ করবেন।” বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন: কিন্তু আমাদের মধ্যে তো সবাই অন্যদেরকে ইফতার দেয়ার সামর্থ্য রাখেন না।

বিশ্বনবী (সা.) বললেন: “তোমরা নিজেদেরকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা কর, যদিও তা সম্ভব হয় একটি মাত্র খুরমার অর্ধেক অংশ কিংবা তাও যদি না থাকে তাহলে সামান্য পানি অন্য রোজাদারকে ইফতার হিসেবে আপ্যায়নের মাধ্যমে।”

রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.) আরো বলেছেন:

“হে মানুষেরা! যে কেউ এই মাসে সৎ আচরণের চর্চা করবে তথা নিজেকে সুন্দর আচরণকারী হিসেবে গড়ে তুলবে সে পুলসিরাত পার হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করবে সেই বিশেষ দিনটিতে তথা কিয়ামতের দিন যেদিন পাগুলো পিছলে যেতে চাইবে। (পুলসিরাত হল এমন এক সেতু যা দোযখের প্রান্ত বা ওপর দিয়ে বেহেশতের সঙ্গে যুক্ত) যে কেউ এই মাসে তার অধীনস্থ কর্মীদের কাজের বোঝা কমিয়ে দেবে আল্লাহ পরকালে তার হিসাব-নিকাশ সহজ করবেন এবং যে কেউ এই মাসে অন্যকে বিরক্ত করবে না মহান আল্লাহ তাকে কিয়ামত বা বিচার-দিবসের দিন নিজের ক্রোধ থেকে নিরাপদ রাখবেন। যে কেউ কোনো রমজান মাসে কোনো এক ইয়াতিমকে সম্মান করবে ও তার সঙ্গে দয়ার্দ্র আচরণ করবে মহান আল্লাহও বিচার-দিবসে তার প্রতি দয়ার দৃষ্টি দেবেন। যে এই মাসে নিজের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ভালো আচরণ করবে, মহান আল্লাহও বিচার-দিবসে তার প্রতি দয়া করবেন, আর যে এই মাসে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে খারাপ আচরণ করবে আল্লাহও তাকে নিজ দয়া বা রহমত থেকে দূরে রাখবেন।”

রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.) আরো বলেছেন:

‘যে রমজান মাসে (এ মাসের জন্য) নির্দেশিত বা নির্দিষ্ট ইবাদতগুলো করবে আল্লাহ তাকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। যে এই মাসে ফরজ বা অবশ্য পালনীয় ইবাদত বা দায়িত্বগুলো পালন করবে তাকে অন্য মাসে ওই একই কাজের পুরস্কারের চেয়ে সাতগুণ বেশি পুরস্কার দেয়া হবে। যে রমজান মাসে আমার ওপর সালাওয়াত বা দরুদ পাঠাবে আল্লাহ বিচার দিবসে তার ভাল কাজের পাল্লা ভারী করে দেবেন,অথচ অন্যদের পাল্লা হাল্কা থাকবে।

যে এই মাসে পবিত্র কুরআনের মাত্র এক আয়াত তিলাওয়াত করবে আল্লাহ তাকে এর বিনিময়ে এত সওয়াব দেবেন যে তা অন্য মাসে পুরো কুরআন তিলাওয়াতের সমান হবে।’

পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন:

“হে মানুষেরা! বেহেশতের দরজাগুলো এই মাসে তোমাদের জন্য খোলা থাকবে। আল্লাহর কাছে এমনভাবে প্রার্থনা কর যাতে তা তোমার জন্য বন্ধ হয়ে না যায়। রমজান মাসে দোযখ বা নরকের দরজাগুলো বন্ধ রয়েছে, আল্লাহর সমীপে এমনভাবে প্রার্থনা কর যাতে তা তোমার জন্য কখনও খুলে না যায়। এই মাসে শয়তানগুলোকে হাতকড়া পরিয়ে বন্দী রাখা হয়েছে, আল্লাহর কাছে এমনভাবে প্রার্থনা কর যাতে তারা তোমাদের ওপর কর্তৃত্ব করতে না পারে।”

এ পর্যায়ে আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)বললেন : আমি প্রশ্ন করলাম, ” হে আল্লাহর রাসূল,এই মাসে সবচেয়ে ভাল আমল বা কাজ কী?”

তিনি জবাবে বললেন,”হে আবুল হাসান,এই মাসে সবচেয়ে ভাল আমল বা কাজ হল আল্লাহ যা যা নিষিদ্ধ বা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা।”

পবিত্র রমজান উপলক্ষে ‘রহমতের উৎসব’ শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার গত পর্বে ও এই পর্বে এই পবিত্র মাসের ফজিলত সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.)’র  একটি ভাষণের অংশবিশেষ আপনাদের শোনানো হল। মহানবীর এই গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের নানা অংশ ব্যাখ্যা ও পর্যালোচনার দাবি রাখে। যেমন, তিনি বলেছেন, এই মাসে সবচেয়ে ভালো আমল বা কাজ হলো  আল্লাহ যা যা নিষিদ্ধ বা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা। তাই হারাম বা নিষিদ্ধ কাজগুলো সম্পর্কে পুরোপুরি বা অন্তত  ব্যাপক ধারণা অর্জন করা জরুরি। কারণ আমরা অনেক সময় অজ্ঞতার কারণে এমন অনেক কাজ করি যা বড় ধরনের পাপ। এইসব পাপের শাস্তি যে কত কঠিন বা ভয়াবহ এবং এইসব পাপ যে কত নিকৃষ্ট তা যদি আমরা জানতাম তাহলে আমরা কখনও এ ধরনের পাপে লিপ্ত হতাম না। যেমন, গিবত করা। আমরা অনেকেই গিবতের কদর্যতা ও এর ভয়াবহ শাস্তি সম্পর্কে ধারণা রাখি না। আবার অনেকে এটাও জানি না যে এই রোগের নানা ধরণ বা উপসর্গগুলো কী কী এবং সেগুলোর চিকিৎসার উপায়ও বা কী।

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনেক অনুমান বা সন্দেহ থেকে দূরে থাক। কারণ, কোনো কোনো ধারণা হচ্ছে পাপ এবং তোমরা অন্যের ওপর গোয়েন্দাগিরি বা গুপ্তচরবৃত্তিতে নিয়োজিত হয়ো না তথা অন্যের গোপন বিষয়ের সন্ধান করো না এবং একে-অপরের গিবত তথা পেছনে নিন্দা করো না, তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? বস্তুত: তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। (সুরা হুজুরাত-১২)

আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন, গিবত হল জাহান্নামের কুকুরদের খাদ্য এবং গিবত করা হল মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য।  বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন: তোমার ভাইয়ের (অনুপস্থিতিতে) তার কোনো বিষয়, কাজ বা বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করা যা সে পছন্দ করে না। আর ওই বিষয়টি যদি তার মধ্যে না থেকে থাকে তবে তার উল্লেখ করা হবে অপবাদ দেয়া বা তোহমৎ দেয়া।

মহানবী আরো বলেছেন: গিবত পরিহার করা দশ হাজার রাকাত মুস্তাহাব নামাজ আদায় করার চেয়েও আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।

মহানবী আরো বলেছেন: হে আবুজার, গিবত করো না, কারণ, গিবত জেনা বা ব্যভিচারের চেয়েও নোংরা ও বড় গোনাহ। কারণ, ব্যভিচারী তওবা করলে তার তওবা কবুল হয়, কিন্তু গিবতকারীর তওবা কবুল হবে না যতক্ষণ না গিবতের শিকার ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে।

বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য ইমাম জাফর আস সাদিক (আ.) বলেছেন: তোমার মুমিন ভাই তোমার ওপর কোনো জুলুম না করা সত্ত্বেও যদি তুমি তার গিবত কর তাহলে তুমি হলে শয়তানের শরিক।

হাদিস অনুযায়ী গিবত মানুষের সৎকর্মগুলোর ফল বা সাওয়াব ধ্বংস করে দেয় এবং এই সওয়াব দেয়া হয় গিবতের শিকার ব্যক্তিকে। আর গিবতের শিকার ব্যক্তির কোনো পুণ্য না থাকলে তার মন্দ কাজগুলোও গিবতকারীর পাপ হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়। ফলে বিচার দিবসে  এ ধরনের অনেক ব্যক্তি অবাক হয়ে যাবে এই ভেবে যে, এইসব জঘন্য পাপ আমি আবার কখন করলাম? অন্যদিকে অনেক  পাপী ব্যক্তি অবাক হবে এই ভেবে যে এত সৎকর্ম আমি আবার কখন করলাম!

মহানবীর হাদিস অনুযায়ী গিবত করার ফলে রোজা এবং ওজু ভেঙ্গে যায়; এ ছাড়াও কিয়ামতের দিন গিবতকারীর মুখ থেকে পচা-গলা লাশের চেয়েও বেশি দুর্গন্ধ বের হবে যা অন্যদের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

হাদিস অনুযায়ী গিবতের ফলে ৪০ দিন ও রাতের নামাজ-রোজা কবুল হয় না, যদি না গিবতের শিকার ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে। মহান আল্লাহ মুসা (আ.)-কে বলেছেন, গিবতকারী যদি তওবা করে তাহলে সে সবার শেষে বেহেশতে প্রবেশ করবে। আর যদি তওবা না করে তাহলে সে সবার আগে আগুনের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে। মহানবী (সা.) বলেছেন: ‘আল্লাহ যখন আমাকে মেরাজে নিলেন তখন একদলকে দেখলাম যে তারা তাদের তামার নখ দিয়ে নিজেদের মুখ ও বুকে আঁচড় দিচ্ছে। জিব্রাইলকে প্রশ্ন করে জানলাম যে এরা হল তারা যারা মানুষের গোশত খেত তথা গিবত করতো এবং তাদের সম্মানহানি করতো।’

গিবতের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই একে প্রতিরোধ বা নাকচ করতে হবে, তা না হলে যে কথাটি বাস্তবে গিবত নয় তাকে গিবত বলাটাও হবে অপবাদের শামিল। গিবতের জবাব এভাবে দেয়া যায় যে, অমুক ব্যক্তি ভীরু নয়, বরং তার সাহসের অনেক দৃষ্টান্ত আমি দেখেছি। অথবা এভাবে প্রতিরোধ বা নাকচ করা সম্ভব না হলে গিবতের মজলিশ ত্যাগ করতে হবে কিংবা মনকে পুরোপুরি অন্য কাজে বা চিন্তায় মশগুল করেও গিবতে শরিক হওয়ার পাপ এড়ানো যায়। যে গিবতে সহ্য করে বা প্রশ্রয় দেয় তার পাপ গিবতকারীর চেয়ে বহুগুণ বেশি বলে হাদিসে বলা হয়েছে।

হাদিস অনুযায়ী গিবত যে শোনে সেও এর শরিক হিসেবে শাস্তি পাবে। আর যে তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে করা গিবতকে নাকচ করে দেয় আল্লাহ তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের এক হাজার অনিষ্টের দরজা বন্ধ করে দেন। এ ছাড়াও আল্লাহ ও বিচার দিবসের প্রতি ঈমানের শর্ত হল ইমাম ও ইসলামী শাসকের বা মুমিনের গিবত শুনলে তা সহ্য না করা বা নীরবে হজম না করা। গিবত প্রতিরোধের শক্তি থাকা সত্ত্বেও যে গিবতের শিকার ব্যক্তির সহায়তায় এগিয়ে আসবে না তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করা হবে। যে তার মুমিন ভাইয়ের সম্মান রক্ষা করবে তা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষার মাধ্যম হয়ে যাবে।

কোন কোন ক্ষেত্রে পেছনে সমালোচনা বৈধ এবং গিবতের কাফফারা কি বা কিভাবে গিবতের প্রায়শ্চিত্ত করা যায়। অর্থসহ দ্বিতীয় রোজার দোয়া:

২য় রমজানের দোয়া
اليوم الثّاني : اَللّـهُمَّ قَرِّبْني فيهِ اِلى مَرْضاتِكَ، وَجَنِّبْني فيهِ مِنْ سَخَطِكَ وَنَقِماتِكَ، وَوَفِّقْني فيهِ لِقِرآءَةِ ايـاتِكَ بِرَحْمَتِكَ يا اَرْحَمَ الرّاحِمينَ .
হে আল্লাহ! তোমার রহমতের উসিলায় আজ আমাকে তোমার সন্তুষ্টির কাছাকাছি নিয়ে যাও। দূরে সরিয়ে দাও তোমার ক্রোধ আর গজব থেকে । আমাকে তৌফিক দাও তোমার পবিত্র কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করার । হে দয়াবানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়াময়।
গিবত একটি নিকৃষ্ট মহাপাপ। কারো গিবত করার অর্থ হল তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা বা তাকে পেছন থেকে কাপুরুষের মত আঘাত করা। গিবতের শিকার ব্যক্তি সামাজিকভাবে নিন্দিত হয়ে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে পারেন এবং হতাশার শিকার হয়ে নিজের স্বাভাবিক উন্নতি ও অগ্রগতি হতে বঞ্চিত হতে পারেন। এভাবে গিবতের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোটা সমাজ।

গিবতের মত মহাপাপ থেকে দূরে থাকার জন্য হিংসা, ক্রোধ বা বদমেজাজ, গুজব বা সন্দেহপরায়নতায় কান দেয়া, ঠাট্টা ও পরিহাসকামীতা, অহংকার বা নিজেকে বড় ভাবা, ছিদ্রান্বেষণ, পক্ষপাতিত্ব, অন্যদের ব্যাপারে ক্লান্তিবোধ, অন্যদের ব্যাপারে কৌতুহল, জিঘাংসা বা প্রতিশোধকামীতা, লোভ এবং পরশ্রীকাতরতার মত রোগগুলোর চিকিৎসা করা জরুরি। আমানতদারী, পারস্পরিক সম্মানবোধ ও গঠনমূলক সমালোচনা মেনে নেয়ার মানসিকতা জোরদারও মুসলিম সমাজ থেকে গিবতের শেকড় নির্মূলের জন্য অপরিহার্য।

গিবতের মত মহাপাপের কাফফারা বা প্রায়শ্চিত্ত হল, সম্ভব হলে গিবতের শিকার ভাইয়ের কাছে সরাসরি ক্ষমা চাওয়া। তবে গিবতের জন্য ক্ষমা চাইতে গেলে যদি বড় ধরনের ফ্যাসাদ বা ঝগড়া বাধার আশঙ্কা থাকে তাহলে যে কোনো অজুহাতে বা উপলক্ষে তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। যেমন, ভাই মক্কায় যাচ্ছি আপনার ওপর কোনো জুলুম বা অন্যায় করে থাকলে দয়া করে ক্ষমা কোরে দিন। কিংবা ভাই বহু দূরে সফরে যাচ্ছি  দয়া করে আমার সব অন্যায় আচরণ ও দেনা হালাল করে দিন।

গিবতের পরোক্ষ কাফফারা হল গিবতের শিকার ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, তার নামে সাদাকা দেয়া, নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও দরুদ পাঠের মত যে কোনো ভালো কাজের পর ওই কাজের সাওয়াব গিবতের শিকার ব্যক্তির নামে উৎসর্গ করা ইত্যাদি। মোট কথা গিবতের শিকার ব্যক্তি মারা যাওয়ার আগেই তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে বা তাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সন্তুষ্ট করতে হবে। গিবতের শিকার ব্যক্তিকে বস্তুগত বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা নানা উপহার দিয়ে এবং সমাজে তার প্রশংসা ছড়িয়ে দিয়ে গিবতের পাপ মোচনের চেষ্ট করতে হবে। অন্যদের বিষয়ে মাথা না ঘামিয়ে নিজের দুর্বলতা ও আল্লাহ সম্পর্কে বেশি বেশি চিন্তাও মানুষকে গিবত থেকে দূরে রাখতে সহায়তা করে।

তবে গিবতের মত কাজেরও কিছু বৈধ ক্ষেত্র রয়েছে। যেমন, জালিম শাসকের গিবতা করা বৈধ। যে প্রকাশ্যে পাপ করে বেড়ায় বা নিজেই নিজের পাপের কথা গর্বভরে উল্লেখ করে তার গিবত করা বৈধ। আদালতে সত্য কথা বলতে গিয়ে গিবত করা অবৈধ নয়। বিয়ের পাত্র-পাত্রীর নানা দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে  সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানী পক্ষের প্রশ্নের জবাবে সত্য কথা বলা বৈধ যদিও তাতে গিবত হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে গিবত থেকে দূরে থাকার তৌফিক দিন।

উল্লেখ্য, ইসলামী সংজ্ঞা অনুযায়ী গিবত হয় কয়েকটি শর্ত বা অবস্থার ক্ষেত্রে। এই শর্তগুলো হল: ১. ব্যক্তির দোষ বা ত্রুটি উল্লেখ বা স্মরণ করিয়ে দেয়া,

২. আর তা ব্যক্তির পেছনে বা অনুপস্থিতিতে উল্লেখ করা,

৩. ওই ব্যক্তি হতে হবে মু’মিন, মু’মিন না হলে তার দোষ-ত্রুটির উল্লেখ গিবত হবে না,

৪.উল্লেখিত বিষয় যদি দোষ-ত্রুটির বিষয় না হয় বা প্রশংসা হয় তাহলে তাও গিবত হবে না।

৫. কোনো নেতা বা ব্যক্তির নীতির প্রতিবাদ বা সমালোচনাও গিবত নয় ।

মহানবী (সা.) বলেছেন: একজন মু’মিনের ওপর আরেক মু’মিনের ৭টি অধিকার রয়েছে: ১. যখন তিনি হাজির নন তখনও তাকে সম্মান করা। ২. আন্তরিক বন্ধুত্ব রাখা। ৩. নিজের সম্পদে তাকে শরিক করা ৪. তার গিবত করাকে হারাম মনে করা ৫. অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া। ৬.তার লাশ দাফন করা এবং ৭. মৃত্যুর পর তার ভালো দিক ছাড়া অন্য কিছু উল্লেখ না করা।

আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেয়া, দরিদ্র ও ইয়াতিমদের সাহায্য করা এবং বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা সব সময়ই বড় ধরনের পূণ্যের কাজ। তবে পবিত্র রমজান মাসে এ ধরনের তৎপরতার গুরুত্ব আরো অনেক বেশি।

পবিত্র রমজান মাসে কুরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব ও এর ব্যাপক সাওয়াব সম্পর্কে আমরা অনেকেই অবহিত। তবে কুরআনকে ভালোভাবে বোঝার জন্য ও সে অনুযায়ী আমল করার জন্য বিশ্বনবী (সা.)’র দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের অনুসরণও জরুরি। মহান আল্লাহ ও বিশ্বনবী (সা.)-কে ভালোভাবে জানা এবং আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রেমময় সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য আহলে বাইতের দিক-নির্দেশনাই সবচেয়ে মোক্ষম।  কারণ, তাঁরাই হলেন কুরআনের  শিক্ষার প্রকৃত সংরক্ষক, বাস্তবায়নকারী এবং কুরআন সংক্রান্ত বিষয়সহ ইসলামের সব বিষয়ে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী। জাগতিক যে কোনো বিষয়েও বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইত সবচেয়ে বেশি জ্ঞান রাখেন।

পবিত্র শা’বান মাসের একটি বিশেষ দোয়ায় বলা হয়েছে:

‘হে আল্লাহ,আপনার দরুদ ও শান্তি বর্ষিত হোক মুহাম্মদ ও তাঁর বংশের ওপর যারা নবুওতের বৃক্ষস্বরূপ,যারা ফেরেশতাগণের আসা-যাওয়ার কেন্দ্র;যারা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার খনি এবং যারা আল্লাহর প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত মহা পুরুষগণের পবিত্র বংশ। হে আল্লাহ আপনার দরুদ বা শান্তি বর্ষিত হোক মুহাম্মদ ও তাঁর বংশের ওপর যারা মারেফাত বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান সাগরের জাহাজস্বরূপ। আর যারা ঐ জাহাজে আরোহণ করবে, তারা ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে,আর যারাই এই জাহাজে আরোহণ করবে না তারা ধ্বংসের সাগরে নিমজ্জিত হবে। যে কেউ তাঁদের অর্থাৎ আহলে বাইতের চেয়ে আগ বাড়িয়ে চলার চেষ্টা করবে সে ধর্ম থেকে বের হয়ে যাবে,আর যে কেউ তাদের থেকে পিছনে থাকবে তার প্রচেষ্টা পণ্ডশ্রমে পরিণত হবে,আর যে কেউ মহানবীর (সা.) আহলে বাইতের আদর্শের পথে থাকবে সে তাঁদের সাথে মিলিত হবে। হে আল্লাহ আপনার দরুদ বা শান্তি বর্ষিত হোক মুহাম্মদ ও তাঁর বংশের ওপর,যারা নিরাপত্তার সুদৃঢ় দুর্গ বা বেষ্টনী,অসহায় দু:স্থ ও আশ্রয়প্রার্থী লোকদের ফরিয়াদে সাড়া দানকারী এবং যারা চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষায় আগ্রহী ব্যক্তিদের প্রহরী।’

বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইতগণ পবিত্র কুরআনের ধারক-বাহক।  হাদিসে বলা হয়, তাঁরা কুরআনের এমন কিছু আয়াত জানেন যে যা তিলাওয়াতের মাধ্যমে তারা মানুষের দৃষ্টি থেকে  আড়াল বা অদৃশ্য হতে পারেন, মৃতকে জীবিত করতে পারেন এবং মুহূর্তের মধ্যে এক স্থান থেকে বহু দূরে চলে যেতে পারেন। এ ছাড়াও দেখাতে পারেন আরো অনেক মু’জেজা। (তাফসিরে নুরুস সাক্বালাইন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫০৭)

তাই এটা স্পষ্ট যে বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইত (আ.) পবিত্র কুরআনের সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠ এবং কেন বিশ্বনবী (সা.)’র হাদিসে বলা হয়েছে, পবিত্র কুরআন ও আহলে বাইত কখনও বিচ্ছিন্ন হবে না।

বাংলা অর্থসহ তৃতীয় রমজানের দোয়া:

اليوم الثّالث : اَللّـهُمَّ ارْزُقْني فيهِ الذِّهْنَ وَالتَّنْبيهَ، وَباعِدْني فيهِ مِنَ السَّفاهَةِ وَالَّتمْويهِ، وَاجْعَلْ لى نَصيباً مِنْ كُلِّ خَيْر تُنْزِلُ فيهِ، بِجُودِكَ يا اَجْوَدَ الاَْجْوَدينَ .
হে আল্লাহ ! আজকের দিনে আমাকে সচেতনতা ও বিচক্ষণতা দান কর। আমাকে দূরে রাখ অজ্ঞতা,নির্বুদ্ধিতা ও ভ্রান্ত কাজ-কর্ম থেকে। এ দিনে যত ধরণের কল্যাণ দান করবে তার প্রত্যেকটি থেকে তোমার দয়ার উসিলায় আমাকে উপকৃত কর। হে দানশীলদের মধ্যে সর্বোত্তম দানশীল।