বেশি বিদেশি ঋণ ‘ভালো নয়’

‘সতর্ক ও বিনিয়োগবান্ধব’ মুদ্রানীতি

image

মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

তারল্য স্ফীতি কমিয়ে ও বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তি সহজ করে ঘোষণা করা এই মুদ্রানীতিকে গতবারের মতোই সতর্ক ও বিনিয়োগবান্ধব মুদ্রানীতি হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে।

শনিবার সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে গভর্নর আতিউর রহমান এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন।

নতুন মুদ্রানীতিতে অতিরিক্ত তারল্য কমানোর জন্য ব্যাংকে রক্ষিত নগদ জমার স্থিতি (সিআরআর) ছয় শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ছয় শতাংশ করা হয়েছে।

আর বিনিয়োগ বাড়াতে সাশ্রয়ী বৈদেশিক বাণিজ্যিক ঋণ সহজতর করার কথা বলা হয়েছে এই নীতিতে।

এ ছাড়া মুদ্রানীতিতে পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর।

তিনি বলেন, “যেসব ব্যাংক ২৫ শতাংশের বেশি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছে তাদের নমনীয়ভাবে দেখা হচ্ছে। যেসব ব্যাংকের ২৫ শতাংশের কম বিনিয়োগ রয়েছে তাদের বিনিয়োগে উৎসাহী করা হবে। আর এবারের মুদ্রানীতি বিগত মুদ্রানীতির মতোই বিনিয়োগবান্ধব।”

মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে (প্রক্ষেপণ) সাড়ে ১৬ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ।

নতুন মুদ্রানীতি প্রসঙ্গে আতিউর রহমান বলেন, “এবারের মুদ্রানীতির ভঙ্গিটিও হবে বিগত মুদ্রানীতির মতোই সতর্ক ও বিনিয়োগবান্ধব।

“নতুন নতুন মুদ্রানীতি মুদ্রা ও পুঁজিবাজারে স্বস্তিকর স্থিতিশীলতা বজায় রেখে এবং মূল্যস্ফীতি সহনীয় মাত্রায় স্থিতিশীল রেখে দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন প্রয়াসে আস্থা ও উৎসাহ যোগানে অবদান রাখবে বলে আমি আশা করি।”

একইসঙ্গে জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের মুদ্রানীতির মাধ্যমে গড় মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান আতিউর রহমান।

চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। আর গড় মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নীচে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

নতুন মুদ্রানীতিতে বৈদেশিক উৎসের আমদানি অর্থায়নসহ বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে আতিউর রহমান বলেন, “বেসরকারি খাতের ঋণের এই প্রবৃদ্ধি জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে কোনো বাস্তবসম্মত উচ্চতর মাত্রা অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত।”

নতুন মুদ্রানীতিতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ।

বিনিয়োগবান্ধব মুদ্রানীতির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে আতিউর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে সরকারের আর্থিক নীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির যথাযথ সমন্বয়ের জন্য নিয়মিত আলোচনা কার্যক্রম প্রথাগতভাবেই অব্যাহত থাকবে।

“তবে বেসরকারি খাতের জন্য বৈদেশিক উৎসের বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণ উন্মুক্ত থাকায় এবং ব্যাংকগুলোর কেনা টাকা-ট্রেজারি বন্ডের বৈদেশিক চাহিদা সৃষ্টি হওয়ায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার কারণে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ যোগান অপর্যাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা বস্তুত আর নেই।

“রপ্তানি উৎপাদনের উপকরণাদি সংগ্রহে অর্থায়নের জন্য সম্প্রতি রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) পরিমাণ ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার করা হয়েছে। চাহিদা বাড়লে ভবিষ্যতে এই তহবিলের পরিমাণ আরো বাড়ানো হবে।”

এছাড়া দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিদেশি মালিকানার শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্থানীয় মুদ্রাবাজার থেকে চলতি মূলধনের পাশাপাশি মেয়াদি ঋণ গ্রহণও উন্মুক্ত করা হয়েছে বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান।

“এসব কিছুই করা হয়েছে বিনিয়োগকে উৎসাহ দেবার লক্ষ্যে। পাশাপাশি এসব ঋণের ব্যবহার যথার্থ হচ্ছে কি না তাও বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট কর্তৃক নিয়মিত মনিটর করা হচ্ছে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংকও মনিটর করবে।”

বিদেশি ঋণ প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, “সামনে অনেক বড় বড় প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। জাপান,চায়নাসহ অনেক দেশ বিনিয়োগ করবে। এসব প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরু হলে বিনিয়োগ বেড়ে যাবে।

“তখন বিদেশির পাশাপাশি দেশীয় ঋণও বাড়বে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।অবকাঠামো উন্নয়ন শুরু হলেই আরো বেশি ঋণের প্রয়োজন পড়বে।”

বেশি বিদেশি ঋণ ‘ভালো নয়’

আবদুর রহিম হারমাছি, প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিবেদক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতিতে বিদেশি ঋণ উৎসাহিতকে ভালো চোখে দেখছেন না বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।

তারা বলছেন, বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানোর উদ্যোগ না নিয়ে বিদেশি ঋণের অবাধ সুযোগ দিলে ‘হিতে বিপরীত’ হতে পারে।

দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে ‘এ উদ্যোগ’ খুব একটা কাজে আসবে বলেও মনে করেন না তারা।

অর্থনীতির গবেষক জায়েদ বখত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিদেশি ঋণ ডলারে পরিশোধ করতে হয়। যখন সুদ-আসলসহ এই ঋণ শোধ করতে হবে তখন সমস্যা হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়বে।”

সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দেশে বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি না করে বিদেশি উৎস থেকে ঋণগ্রহণ মোটেই ভালো বিষয় নয়।

বিদেশি ঋণকে উৎসাহিত করায় স্থানীয় ঋণ চাপে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমদ চৌধুরী।

শনিবার ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যাতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর মধ্যে ২ দশমিক ৫ শতাংশ আসবে বিদেশি ঋণ থেকে।

প্রথমবারের মতো মুদ্রানীতিতে বিদেশি ঋণকে যুক্ত করে বেসরকারি খাতের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অর্থাৎ নতুন মুদ্রানীতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হবে সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ।

গত জানুয়ারি-জুন মেয়াদের মুদ্রানীতিতে বিদেশি ঋণ বাদেই বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল সাড়ে ১৬ শতাংশ, যাতে মে পর্যন্ত অর্জন হয়েছে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। আর বৈদেশিক ঋণ যুক্ত করলে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় বিদেশি ঋণ প্রসঙ্গে গভর্নর আতিউর রহমান বলেন, “সামনে অনেক বড় বড় প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। জাপান, চায়নাসহ অনেক দেশ বিনিয়োগ করবে। এসব প্রকল্পের কাজ শুরু হলে বিনিয়োগ বেড়ে যাবে। তখন বিদেশির পাশাপাশি দেশীয় ঋণও বাড়বে।

“এনিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। অবকাঠামো উন্নয়ন শুরু হলেই আরো বেশি ঋণের প্রয়োজন পড়বে।”

নতুন মুদ্রানীতির বিষয়ে সাবেক গভর্নর  সালেহ উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নতুন এ মুদ্রানীতি গতানুগতিক। নতুন কোনো বিষয় এতে নেই।

“দেশে বিনিয়োগ নেই বলেই চলে। ব্যাংকগুলো আমানত নেয়া কমিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি উৎস থেকে ঋণগ্রহণ খুব একটা ভাল বিষয় নয়।

“আমাদের ব্যাংকগুলোতে প্রচুর অলস অর্থ (বিনিয়োগ হয় না এমন অর্থ) পড়ে আছে। অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি করে এই অর্থ বিনিয়োগে নিয়ে আসাই হবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে উত্তম পথ।”

‘আবারও দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে’ মন্তব্য করে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সতর্ক এবং দক্ষতার সঙ্গে পরিকল্পনা প্রণয়নের পরামার্শ দিয়েছেন সালেহউদ্দিন।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখত বলেন, “নতুন মুদ্রানীতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সে চেষ্টা খুব একটা সফল হবে বলে মনে হয় না।”

এর কারণ ব্যাখা করে তিনি বলেন, “নতুন মুদ্রানীতিতে বিদেশি ঋণ বাড়িয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে এটা সমস্যা হতে পারে। কেননা, এই ঋণ ডলারে শোধ করতে হবে। যখন সুদ-আসলে একসঙ্গে অনেক ঋণ শোধ করতে হবে তখন আমাদের রিজার্ভে চাপ পড়বে।”

প্রচুর খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদের হার কমাতে পারছে না জানিয়ে জায়েদ বখত বলেন, “স্থানীয় ঋণের সুদের হার কম হলে আমাদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি ঋণ নেবে না।”

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যসোসিয়শন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, “বিদেশি ঋণকে উৎসাহিত করায় স্থানীয় ঋণ চাপে থাকবে।”

স্থানীয় ঋণের সঙ্গে বিদেশি ঋণের একটা সমন্বয় করার পরামর্শ দেন তিনি।

বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ প্রবাহ বেড়েই চলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে (২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল) সব মিলে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ এসেছে ৫৫০ কোটি ডলার, স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪১ কোটি ২৬ লাখ ডলার। ২০১০ সালে ৩০ কোটি ২৭ লাখ; ২০১১ সালে ৯৩ কোটি ৬৩ লাখ ডলার।

২০১২ সালে তা বেড়ে ১৫৮ কোটি ডলারে গিয়ে ঠেকে। ২০১৩ সালে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৫৫ কোটি ৫৩ লাখ ডলার।

কম সুদ হওয়ার কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি ঋণের দিকে ঝুঁকছে। স্থানীয় কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে সুদের হার ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ পর‌্যন্ত পড়ে যায়। সেখানে বিদেশি কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে সুদের হার (লাইবর রেটের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট হার যোগ করে) সর্বোচ্চ ৮ শতাংশের মত পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি অর্থবছরের জন্য দু’বার মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে পরবর্তী ছয় মাসে অভ্যন্তরীণ ঋণ, মুদ্রা সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ, বৈদেশিক সম্পদ কতটুকু বাড়বে বা কমবে তার একটি প্রক্ষেপণ করা হয়।