ফোবানা নিয়ে সাজসাজ রব

গত শতকের সত্তর-আশির দশকে অর্থনৈতিক কারণে বাঙালিদের যে বিদেশযাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটি এখন আর তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক নিরাপত্তা, উন্নত জীবনযাপন আর উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য প্রতিনিয়ত বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন বাঙালিরা। এ ছাড়া উন্নত বিশ্বে জনসংখ্যার হার তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়ার কারণে কয়েকটি দেশ তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের পাশাপাশি মেধাবী ও অভিজ্ঞ নতুন প্রজন্মের তারুণ্যে ভরপুর যুবসমাজ এবং অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল মানুষদের বিভিন্নভাবে নিয়ে আসার প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। এই অবাধ অভিবাসনের কারণে উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বাঙালিদের সংখ্যা এখন ৫০ লাখের ওপরে। কয়েক দশক আগেও বাঙালিদের আধিক্য বলতে যেখানে ইউরোপকে বোঝাত, সেখানে এখন আমেরিকা-কানাডায়ও বাঙালিদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। পাঁচ লাখের ওপরে।

কানাডা-আমেরিকায় বাঙালিদের ব্যাপক হারে গোড়াপত্তন বেশি দিনের নয়। আশির দশকের শুরু থেকে বাঙালিরা আমেরিকা-কানাডায় বিপুলভাবে আসতে শুরু করেন। ইতিহাস বলে, বাঙালিরা যেখানেই বসতি স্থাপন করেছেন, সেখানেই তাঁরা স্বকীয় সংস্কৃতিকে লালন করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় আমেরিকা ও কানাডায় বাংলাদেশি সংগঠনগুলো ১৯৮৭ সালের ৩১ অক্টোবর যৌথভাবে ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ সম্মেলন আয়োজন করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল, উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি পরিচর্যা, প্রচার, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে যোগাযোগ এবং মূলধারার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন। বাংলাদেশ সম্মেলন নামে শুরু হওয়া বাঙালিদের মিলনমেলা কালের পরিক্রমায় এখন ফোবানা (ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন্স ইন নর্থ আমেরিকা) নামেই পরিচিত।

Untitled-15কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মুষ্টিমেয় কিছু প্রবাসীর উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে ফোবানা এখন দুই ভাগে বিভক্ত। উত্তর আমেরিকায় বাঙালিদের বড় সংগঠন ফোবানা এ বছর ২৭তম সম্মেলন করছে। গত ১৪ বছরের মতো এবারও পাল্টাপাল্টি দুটি সম্মেলনই অনুষ্ঠিত হবে। একটি কানাডার মন্ট্রিয়েল এবং অন্যটি আমেরিকার আটলান্টাতে। ইতিপূর্বে কানাডায় নয়টি ফোবানা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। চারটি টরন্টো ও পাঁচটি মন্ট্রিয়েল শহরে।এবার মন্ট্রিয়েলে এক টুকরো বাংলাদেশ স্লোগানে আগামী ৩১ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর ফোবানার ২৭তম সম্মেলন পিয়ার সারবনো সেন্টারে অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে ১০০ দিনের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে গত ১৯ মে। এ উপলক্ষে সেদিন বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে স্থানীয় লাকাডিসংলগ্ন বুমন্ট পার্কিং লট থেকে একটি মোটরগাড়ি শোভাযাত্রা শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে।উত্তর আমেরিকায় অন্য অভিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বাঙালি অভিবাসীদের অস্তিত্ব-সংকট প্রকট। এই ক্রান্তিকালে ফোবানার মতো সংগঠন অভিবাসী বাঙালিদের স্বার্থ রক্ষা এবং মর্যাদা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু আমাদের নিয়তির লিখন এমনই যে কোথাও আমরা এক হতে পারি না কখনো। অথচ আমাদেরই পার্শ্ববর্তী ভারতসহ অন্য দেশগুলোর অভিবাসীরা তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ইতিমধ্যেই এখানে একটি মর্যাদার আসন সৃষ্টি করেছেন। উত্তর আমেরিকায় একই সংগঠন ফোবানার দুটি সম্মেলন নিয়ে এখন হুলুস্থুল কাণ্ড। চারদিকে সাজসাজ রব। আয়োজকেরা জোরেশোরে তাঁদের প্রচারণায় ব্যস্ত। এমন অবস্থায় আমরা সাধারণ বাঙালি অভিবাসীরা কোথায় যাব? মনের ভেতরের এই সুপ্ত প্রশ্নটি নিয়ে সম্প্রতি আমি মন্ট্রিয়েল ফোবানা সম্মেলনের আহ্বায়ক এজাজ আকতারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি কানাডা তথা উত্তর আমেরিকার একজন নিবেদিতপ্রাণ সংস্কৃতিকর্মী ও সফল সংগঠক। ১৯৯৫ সালে তিনি মন্ট্রিয়েলে অনুষ্ঠিত ফোবানার সম্মেলনে সদস্যসচিব এবং ২০০১ সালে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কানাডায় অভিবাসী বাঙালি হিসেবে তাঁকে জিজ্ঞেস করি, আর কত দিন এভাবে আমরা বিভক্ত থাকব। আমরা কোথায় যাব, জর্জিয়া না মন্ট্রিয়েলে? আমাদের জায়গায় আপনি হলে কোন সম্মেলনে যেতেন? দুটোই তো আমাদের। আমার কথার জবাবে এজাজ আকতার জানান, উত্তর আমেরিকায় যাতে একটি ফোবানা করা যায়, সে লক্ষ্যে তাঁরা কাজ করছেন। ভবিষ্যতে একটি সম্মেলন হওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

এখন ব্যক্তিগত এক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ না করে পারছি না। ১৯৯৪ সালের কথা। প্রায় পাঁচ বছর পর বাংলাদেশে যাচ্ছি। বিমানের কাচের জানালায় একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। চোখের সামনে খোলা আকাশ। নিচে পেজা মেঘের পাহাড়। মেঘের ওপরে সূর্যের বিচ্চুরিত আলোকরশ্মি। রং-তুলিতে মনের ভেতর ছবি আঁকছি। একদিকে দেশে যাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে বাইরের এই স্বপ্নময় ভুবনে কতক্ষণ কাটিয়েছিলাম মনে নেই। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যখন আসন ছেড়ে শৌচাগারের দিকে যাচ্ছি, তখন সারি সারি আসনের ভেতর একজন চেনামানুষের মুখ দেখে থমকে দাঁড়াই। একটি আসনে বসা টেলিভিশনের বহুল প্রচারিত ও জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’খ্যাত হানিফ সংকেত। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে খুব ইচ্ছা হলো। কিন্তু প্রকৃতির ডাক অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা ছিল না আমার। তাই কিছু না বলেই চলে যাই। মনে মনে সংকল্প করি, ফেরার সময় তাঁকে হ্যালো বলব।

ফেরার পথে হানিফ সংকেতের আসনের পাশে আমি দাঁড়াই। একটি ম্যাগাজিন পড়ছিলেন তিনি। সালাম দিয়ে কুশল জিজ্ঞেস করি, কেমন আছেন আপনি? জবাব দিলেন, ভালো। তাঁর সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে জানলাম, ফোবানা সম্মেলনে একজন অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। কিন্তু সুখকর কোনো অভিজ্ঞতার কথা বললেন না। শুধু আক্ষেপ করলেন ফোবানার দুটি সম্মেলন অনুষ্ঠানের বিষয়ে। দুঃখ করে বললেন, এ রকম দ্বিখণ্ডিত ফোবানা সম্মেলনে আর আসবেন না! তাঁর কথা শুনে একজন অভিবাসী হিসেবে আমার মন খারাপ হলো। মনে মনে লজ্জিত ও পীড়িত হলাম। ভাবলাম, এই দ্বিধাবিভক্তির দায় তো আমাদের সবার।

হানিফ সংকেত তাঁর কথা রেখেছেন। ১৯৯৪ সালের পরে ফোবানার কোনো সম্মেলনে তিনি এসেছেন বলে শুনিনি। তিনি বা তাঁর মতো অন্যরা মনের ক্ষোভে ফোবানা সম্মেলনে না এলেও তাঁদের কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না। কিন্তু আমরা যারা অভিবাসী, তাদের জন্য এটা বিষময় এক অভিজ্ঞতা। আমরা শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থায় বেসামাল। কোনো সম্মেলনেই মনের আনন্দ নিয়ে অংশগ্রহণ করতে পারি না। প্রতিবছর ফোবানার এই দ্বিধাবিভক্তির কারণে আমরা অভিবাসীরা আমাদের আকাঙ্ক্ষার স্থানটিতে পৌঁছাতে পারছি না। অথচ এই সংগঠনটি উত্তর আমেরিকায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রতীক হতে পারত। এই সম্ভাবনা এখনো আছে। এই আশার বাণী উত্তর আমেরিকা অভিবাসী বাঙালিদের প্রাণের প্রতিধ্বনি।
অটোয়া, কানাডা।
কবির চৌধুরী | আপডেট: ২৩:২৫, জুলাই ২৫, ২০১৩
mashik_ashram@hotmail.com