খেমাররুজ দুঃশাসনের দিনলিপি

খেমাররুজ দুঃশাসনের দিনলিপি
অনলাইন ডেস্ক | ১২ আগস্ট, ২০১৪

image
Pic: AP/PRI.org

‘আমাকে এখানে কেন বিড়াল বা কুকুরের মতো মরতে হবে…কোনো কারণ ছাড়া, কোনো অর্থ ছাড়া?’
স্পাইরালে বাঁধানো নোট বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় এই প্রশ্ন তুলেছেন কম্বোডিয়ায় খেমাররুজ শাসনামলে নিপীড়নের শিকার হয়ে মারা যাওয়া স্কুল পরিদর্শক পোচ ইউনলি। তাঁর তোলা এই প্রশ্নের উত্তর আজও খুঁজে বেড়ায় কম্বোডিয়ায় মানুষ।
মার্ক্সবাদী নেতা পল পটের নেতৃত্বে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত কম্বোডিয়াকে শাসন করেছিল খেমাররুজ। এই সময়ে শহরের লাখ লাখ মানুষকে গ্রামাঞ্চলে পাঠিয়ে কৃষিকাজ করতে বাধ্য করে শাসকগোষ্ঠী। গণহত্যা, নির্যাতন, অনাহার, রোগ-জ্বরা ও অতি শ্রমের কারণে প্রায় ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

চার বছরে সংগঠনটির বর্বর শাসনের জীবন্ত চিত্র উঠেছে এসেছে ইউনলির দিনলিপিতে। এটি গত বছর প্রথম জনসম্মুখে আনা হয়। খেমাররুজ দুঃশাসনের শিকার কোনো প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগীর লেখা এই দিনলিপিটিকে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও বিরল বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্বামীর নির্দেশনায় প্রায় দুই দশক ধরে দিনলিপিটি সযত্নে সংরক্ষণ করেন ইউনলির স্ত্রী সোম সেং আথ। পরে তিনি সেটি তাঁর এক মেয়ের কাছে তা দেন। দিনলিপিটি কম্বোডিয়ার দলিল সংরক্ষণ কেন্দ্রে দেওয়ার পরামর্শ দেন মেয়ের স্বামী।
দিনলিপিটি সম্পর্কে দলিল সংরক্ষণ কেন্দ্রটির কর্মকর্তা ইয়োক চ্যাঙ বলেন, ‘আমরা যাঁরা বেঁচে আছি, এটা সবার গল্প।’

খেমাররুজ শাসনামলে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে দিনলিপি লিখেছেন ইউনলি। ১০০ পৃষ্ঠার দিনলিপিটি দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে ইউনলির পারিবারিক ইতিহাস লেখা। আর দ্বিতীয় অংশে রয়েছে সন্তানদের উদ্দেশে লেখা চিঠি। ওই চিঠিতেই খেমাররুজ শাসনামলের জীবনচিত্র উঠে এসেছে।

ইউনলি দম্পতি তাঁদের আট সন্তান নিয়ে একটি শহরে বাস করতেন। খেমাররুজরা এসে অন্যদের মতো এই দম্পতিকেও গ্রামাঞ্চলে যেতে বাধ্য করে। সন্তানদের থেকে বাবা-মাকে আলাদা করা হয়। লাগিয়ে দেওয়া হয় কঠোর শ্রমে। ইউনলি লিখেছেন, ‘আমরা দৈনিক ১০-১৩ ঘণ্টা কাজ করতাম।’

একপর্যায়ে মাত্রাতিরিক্ত কাজে অসুস্থ হয়ে পড়েন ইউনলি। তিনি কাজ করতে পারতেন না। তবে গোপনে দিনলিপি লিখে যাচ্ছিলেন। আরও কয়েক মাস পরে তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর দিন ফুরিয়ে আসছে।
ইউনলি লিখেছেন, ‘এখন আমার শরীর দেখতে মরদেহের মতো। পাতলা শরীরে কেবল হাড্ডি ও চামড়া আছে। আমার কোনো উদ্যম নেই। আমার হাত ও পা কাঁপে। শক্তি নেই, সামর্থ্য নেই। আমি বেশি দূর হাঁটতে পারি বা কোনো ভারি কাজ করতে পারি না। সবাই পশুর মতো, যন্ত্রের মতো কাজ করে। কোনো মূল্য ছাড়া, ভবিষ্যতে কোনো আশা ছাড়া।’

সন্তানদের দেখতে না পেরে খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন ইউনলি। তিনি লিখেছেন, ‘আমাকে মরতে দাও। ভাগ্য আমাকে ইচ্ছা যেখানে সেখানে নিয়ে যাক। আমার বাচ্চারা, আমি তোমাদের অনুভব করি। আমি তোমাদের ভালোবাসি।’

নোটবুকের শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত লিখেছেন ইউনলি। ১৯৭৬ সালের ১ আগস্ট পরিশিষ্টে দিনলিপিটি যত্নে রাখার জন্য পরিবারের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি। এর কয়েক ঘণ্টা পর তাঁকে কাজের জন্য নিয়ে যায় শাসকেরা। কয়েক সপ্তাহ পরে কারাগারে মারা যান তিনি।
খেমাররুজ শাসনামলের গণহত্যার দায়ে গত সপ্তাহে দুই শীর্ষ খেমাররুজ নেতা নুয়ান চিয়া (৮৮) ও খিউ সাম্ফানকে (৮৩) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন জাতিসংঘ সমর্থিত সে দেশের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল।
ষাটের দশকে কম্বোডিয়ায় খেমাররুজের উত্থান। শুরুতে এটা ছিল কমিউনিস্ট পার্টি অব কম্পুচিয়ার (কম্বোডিয়ার কমিউনিস্টদের ব্যবহার করা নাম) সশস্ত্র শাখা। ১৯৭০ সালে ডানপন্থীদের সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপ্রধান প্রিন্স নরোদম সিহানুক উত্খাত হওয়ার পর পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। খেমাররুজ তখন সিহানুকের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট করে। পাঁচ বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলাকালে খেমাররুজ প্রথমে ধীরে ধীরে দেশের গ্রামাঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ পোক্ত করে। চূড়ান্তভাবে ১৯৭৫ সালে রাজধানী নমপেন তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

খেমাররুজ নেতা পল পট ক্ষমতায় আসার পর কম্বোডিয়াকে কৃষিনিভর ‘ইউটোপিয়া’ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার মিশন শুরু করেন। তিনি ঘোষণা দেন, দেশ ‘শূন্য বছর’ থেকে ফের যাত্রা শুরু করবে। তিনি দেশের জনগণকে বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে শহরগুলো খালি করার উদ্যোগ নেন। তিনি মুদ্রার ব্যবহার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং ধর্মপালন নিষিদ্ধ করেন। প্রতিষ্ঠা করেন গ্রামীণ যৌথ খামার।

শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির লাখ লাখ লোককে বিশেষ কেন্দ্রগুলোতে নিয়ে নির্যাতন ও হত্যা করা হতো। এর মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত কেন্দ্রটির নাম ছিল এস-২১ কারাগার, যার অবস্থান ছিল নমপেনে।

খেমাররুজের চূড়ান্তভাবে পতন হয় ১৯৭৯ সালে। ভিয়েতনামের সঙ্গে সীমান্তে একের পর এক সংঘাতের পর ওই বছর ভিয়েতনামের সেনারা কম্বোডিয়া আক্রমণ করলে খেমাররুজের শীর্ষস্থানীয় নেতারা গা-ঢাকা দেন। ধীরে ধীরে সংগঠনটি দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রথম আলো।