রাজউকের প্লট বরাদ্দে মহোৎসব

রাজউকের প্লট বরাদ্দে মহোৎসব

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সংরক্ষিত কোটায় আবারও নতুন করে প্লট বরাদ্দের মহোৎসব চলছেই। মূলত দেশ গড়ায় বিশেষ অবদানের জন্য যাঁরা প্লট বরাদ্দ পাওয়ার কথা ছিল, তাঁরা যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করে প্লট বরাদ্দ পাচ্ছেন না। বরং প্লট বরাদ্দের তালিকায় প্রাধান্য পেয়েছেন দেশের রাঘববোয়ালরা। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প, উত্তরা তৃতীয় পর্যায় প্রকল্প এবং ঝিলমিল প্রকল্পে এ কোটায় প্লট খালি না থাকার তথ্য গেল মহাজোট সরকারের আমলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল রাজউক। এরপরও গত ১৭ জুলাই সংরক্ষিত কোটায় ৩৪ জনকে প্লট বরাদ্দ দিতে তাঁদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি এখন রাজউকের বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অপেক্ষাধীন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্লট বরাদ্দ পাওয়ার তালিকায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের রয়েছেন ৮ কর্মকর্তা। এর মধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর পিএস এবং সচিবের পিএসের পাশাপাশি রয়েছেন দুজন যুগ্ম সচিব এবং বাকিরা সবাই উপসচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। এর মধ্যে দুজনকে পাঁচ কাঠার প্লট, বাকিদের প্রত্যেককে ৩ কাঠার প্লট বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বাকি ২৬ প্লট প্রাপকের মধ্যে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং সাবেক এমপিসহ কিছু অপরিচিত ব্যক্তিও রয়েছেন। অনুশাসন করা প্লট বরাদ্দ দিলে পূর্বাচল প্রকল্প থেকে ৬০ কাঠা, উত্তরা তৃতীয় পর্যায় প্রকল্প থেকে ৮১ কাঠা এবং ঝিলমিল প্রকল্প থেকে ১৫ কাঠা জমির প্রয়োজন হবে। সব মিলিয়ে রাজউককে ১৫৬ কাঠার প্লট বরাদ্দ দিতে হবে। ওদিকে প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত আদেশের চিঠি রাজউকে পাঠানোর পর প্রশাসন ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে পূর্ত মন্ত্রণালয়ে পোস্টিং পাওয়ার জন্য জোর তদবির শুরু করেছেন। পোস্টিং পাওয়ার যুক্তি হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ‘পূর্ত মন্ত্রণালয়ে পোস্টিং পাওয়ার কম সময়ের মধ্যে প্লট বরাদ্দ পাওয়া যায়। এমনকি একজন সিনিয়র সহকারী সচিব মাত্র দু’মাস দায়িত্ব পালন করেই ৩ কাঠার প্লট বাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। তাই এ ধরনের বিশাল সুযোগ তাঁরা কেউ হাতছাড়া করতে চান না। এর মধ্যেই কেউ কেউ পূর্ত মন্ত্রণালয়ে পোস্টিং নিতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, রাজউকের বরাদ্দবিধির ১৩/এ ধারায় এই সংরক্ষিত কোটা সৃষ্টি করা হয় সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচএম এরশাদের সময়ে। জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ অবদান রেখেছেন কিন্তু রাজধানীতে থাকার মতো বাড়ি বা জমি নেই- এমন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্লট দিতে এই ধারা সংযোজন করা হয়েছিল। কিন্তু ৩৪ জনের তালিকায় ওই ধরনের কোনো কিছুর ছাপ নেই। ১৩/এ ধারার বিশেষ কোটা থেকে কর্মকর্তাদের অনুকূলে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার নিয়ম নেই। ১৩/এ ধারায় কর্মকর্তাদের প্লট দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ভোরের পাতাকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘১৩/এ ধারায় কর্মকর্তাদের প্লট পাওয়ার সুযোগ নেই। তবে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী চাইলে প্লট বরাদ্দ দিতে পারেন। এ বিষয়ে বিধিতে মন্ত্রীকে ক্ষমতা দেওয়া আছে। প্লট বরাদ্দের অনুশাসনের চিঠিতে মন্ত্রীর সম্মতির কথা বলাও হয়েছে।’
প্লট বরাদ্দ তালিকায় যাঁরা রয়েছেন :সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন পেশার ৩৪ জনকে প্লট বরাদ্দ দিতে অনুশাসন দিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে উত্তরায় তিন কাঠা আয়তনের ১৭টি ও ৫ কাঠা আয়তনের ছয়টি, পূর্বাচলে ১০ কাঠা আয়তনের একটি, সাড়ে ৭ কাঠা আয়তনের ছয়টি ও ৫ কাঠা আয়তনের একটি এবং ঝিলমিল প্রকল্পে তিনটি ৫ কাঠা আয়তনের প্লট বরাদ্দ দিতে বলা হয়েছে। প্লট বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া অনুশাসন করা নামের তালিকায় রয়েছেন- ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার তারিক এ করিম (পূর্বাচলে সাড়ে ৭ কাঠা), বেগম আফিয়া খানম চৌধুরী (পূর্বাচলে সাড়ে ৭ কাঠা), মনোরঞ্জন ঘোষাল (উত্তরায় ৩ কাঠা), আজহারুল ইসলাম (উত্তরায় ৩ কাঠা), আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ সাকীব বাদশা (উত্তরায় ৩ কাঠা), গাজী আবু সাঈদ (উত্তরায় ৩ কাঠা), সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং সিইও প্রদীপ কুমার দত্ত (পূর্বাচলে সাড়ে ৭ কাঠা), রাসেল আহমেদ (পূর্বাচলে ১০ কাঠা), স্বর্ণা হামিদ (পূর্বাচলে সাড়ে ৭ কাঠা), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এটিএম মুর্তজা রেজা চৌধুরী (ঝিলমিলে ৫ কাঠা), ইউনুস গনি চৌধুরী (উত্তরায় ৩ কাঠা), মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন (উত্তরায় ৩ কাঠা), মোহাম্মদ মীর আলম (উত্তরায় ৩ কাঠা), গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এসএম আরিফ-উর-রহমান (উত্তরায় ৫ কাঠা), একই মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. আহসান হাবীব তালুকদার (উত্তরায় ৫ কাঠা), উপ-সচিব জিল্লুর রহীম শাহরিয়ার (উত্তরায় ৩ কাঠা), সাবিহা পারভীন (উত্তরায় ৩ কাঠা), সায়লা ফারজানা (উত্তরায় ৩ কাঠা), গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) ফয়েজ আহাম্মদ (উত্তরায় ৫ কাঠা), গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব শ্যামলী নবী (উত্তরায় ৩ কাঠা), গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিবের একান্ত সচিব (সিনিয়র সহকারী সচিব) মনোয়ার মোর্শেদ (উত্তরায় ৩ কাঠা), নূরুল হুদা (উত্তরায় ৩ কাঠা), ফরিদা আক্তার কাউসার (উত্তরায় ৩ কাঠা), জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী (উত্তরায় ৩ কাঠা), সাবেক এমপি ও নড়াইল জেলা মুজিব বাহিনীর প্রধান শরীফ খসরুজ্জামান (উত্তরায় ৫ কাঠা), আবুল বশর (পূর্বাচলে ৫ কাঠা), এসএম মুস্তফা রশীদ (উত্তরায় ৫ কাঠা), মো. জামাল উল্লাহ (ঝিলমিলে ৫ কাঠা), সেরনিয়াবাত আশিক আবদুল্লাহ (উত্তরায় ৩ কাঠা), শেখ ফজলুর রহমান মারুফ (পূর্বাচলে সাড়ে ৭ কাঠা), শেখ বেলাল উদ্দিন (পূর্বাচলে সাড়ে ৭ কাঠা), নিজাম উদ্দিন চৌধুরী (ঝিলমিলে ৫ কাঠা), আবছার উদ্দিন আহম্মদ খান (উত্তরায় ৫ কাঠা) এবং সেরনিয়াবাত মঈন আবদুল্লাহ (উত্তরায় ৩ কাঠা)।
সংরক্ষিত কোটায় ৩৪ জনকে প্লট বরাদ্দ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান জিএম জয়নাল আবেদীন ভোরের পাতাকে জানান, ‘সরকারি বিধি মোতাবেক সংরক্ষিত কোটায় আমরা রাজউকের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ৩৪ জনকে প্লট বরাদ্দ দিতে যাচ্ছি।’
১৩/এ ধারার বিশেষ কোটা থেকে কর্মকর্তাদের অনুকূলে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার নিয়ম থাকা না সত্ত্বেও উপরোক্ত ব্যক্তিরা কী করে প্লট বরাদ্দ পাচ্ছেন, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সকল বিধি মোতাবেক ও সরকারের অনুমতিক্রমে তাদের প্লট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে রাজউক সরকারের নির্দেশ পালন করছে।’