প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ * নির্দেশ মানছে না সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও প্রতিষ্ঠান ঃ বিপাকে অর্থমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ * নির্দেশ মানছে না সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও প্রতিষ্ঠান
বিপাকে অর্থমন্ত্রী
হারুন-অর-রশিদ
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী তিনি। সরকার পরিচালনার রসদ জোগান দেয় তার মন্ত্রণালয়। যখন-তখন যাকে-তাকে ধমকাতেও তার জুড়ি মেলা ভার। অথচ তিনিই আছেন বিপাকে। তার নির্দেশ মানছে না অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভাগগুলো ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এতে জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে সরকারের বাজেট বাস্তবায়ন ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে। এমনকি প্রশাসনিক শৃঙ্খলাও ভেঙে পড়ছে। ফলে বাধ্য হয়েই এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তিনি নালিশ করেছেন বলে জানিয়েছে সূত্র। তার নালিশের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টদের মন্ত্রীর আদেশ মানতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে।এদিকে সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, অর্থমন্ত্রীর লাগামছাড়া বক্তব্য ও ক্ষেত্রবিশেষে দুর্ব্যবহারই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে সংসদ ও সংসদের বাইরে মতপ্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অল আর রাবিশ’। সে সময় এ বিষয়টি নিয়ে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি ভ্যাট আইন, ২০১২ বাস্তবায়ন নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সেমিনারে এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দীন আহমদকে ধমকান তিনি। ফলে সবকিছু মিলিয়েই তার ওপর অনেকেই বীতশ্রদ্ধ।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এনবিআর, ইআরডি, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আমলে নিচ্ছে না। উল্লেখ্য এনবিআরের রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি কাংখিত ল্ক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো চলছে নিজেদের ইচ্ছামতো। ফলে দিন দিন ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে মনে করে অর্থ মন্ত্রণালয়। সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক, হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন, উভয় স্টক এক্সচেঞ্জ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), ইআরডির বিভিন্ন বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে চলছে না। ক্ষেত্রবিশেষে রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো কোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বাইরে পর্ষদকে পাশ কাটিয়ে ইচ্ছামাফিক ব্যাংক পরিচালনা করছেন। এতে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি প্রশাসনিক শৃঙ্খলায়ও ছেদ পড়ছে।

জানা গেছে, অর্থ খাতে এ ধরনের হ-য-ব-র-ল অবস্থায় সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ওই নির্দেশের কপি অর্থ সচিব, এনবিআর সচিব, ইআরডি সচিব ও ব্যাংকিং সচিবের বরাবরও পাঠানো হয়েছে। এছাড়া এ চিঠি পাওয়ার পর অর্থমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়কে।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও সিনিয়র মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি তৃতীয়বারের মতো অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি ব্যাংকগুলো অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত। কিন্তু ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক ও এমডি নিয়োগের যোগ্যতার তুলনায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিতে হয় বলে ক্ষোভ রয়েছে অর্থমন্ত্রীর। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাত সরাসরি অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। অর্থমন্ত্রীর নির্দেশ পরিপালন না করায় এই দ্বন্দ্ব বেধেছে বলে জানিয়েছেন স্বয়ং বারকাত। এছাড়া বেসিক ব্যাংকের জালিয়াতির বিষয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু সে নির্দেশও হালে পানি পায়নি।

এদিকে সরকারি ব্যাংকের পরিচালকরা যেন সভা ছাড়া ব্যাংকে ঢুকতে না পারেন, সে বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু তার এ কথা কানে তুলছেন না কেউ। সূত্রমতে, এসব ব্যাংকের পরিচালকরা রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত। তারা কেউ কেউ অর্থমন্ত্রীর অনুগত হলেও অনেকে তার চেয়ে বড় কারও অনুসারী। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে পরিচালকরা হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণের নামে লুটপাটে সাহায্য করছেন। তাছাড়া নিয়োগ ও পদোন্নতিতে নিয়ম মানার নির্দেশনা দিলেও তা মানা হচ্ছে না। কোনো কোনো পরিচালক অর্থের বিনিময়ে এসব করিয়ে দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

একটি সূত্র জানায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এসব বিভাগে কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। একপক্ষ অর্থমন্ত্রীর অনুগত, অন্যটি সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুগত। একজন উপদেষ্টার নির্দেশে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলেও জানা গেছে।
এছাড়া একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার সিন্ডিকেট রয়েছে এ খাতে। সরকারের খুব কাছের লোক হিসেবে তারা নিজেদের পরিচয় দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশেরই তোয়াক্কা করেন না। বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে গাড়িসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে কোনো নির্দেশনা মানা হচ্ছে না বলে সূত্র জানিয়েছে। কতিপয় মতাশালী আমদানিকারক এনবিআর কর্মকর্তাদের সহায়তায় মন্ত্রীর সিদ্ধান্ত পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। ফলে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।২০১৩ সালে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দিন। সে সময় প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন দুজনে। পরে মো. নাসির উদ্দিনকে অপসারণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হয়।