অনুমোদনহীন প্রকল্প গ্রাস করছে জলাভূমি

ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দুই পাশ

অনুমোদনহীন প্রকল্প গ্রাস করছে জলাভূমি

মেহেদী আল আমিন |

ঢাকা-মাওয়া, বুড়িগঙ্গা, ঝিলমিল, প্রিয়প্রাঙ্গণ, পশ্চিমদী মডেল টাউন, কেরানীগঞ্জ মডেল টাউন, সবুজ ছায়া আবাসন প্রকল্প, রিভার ভিউ, সাউথ টাউন প্রকল্প, এভার সাইন সিঙ্গাপুর সিটি , ভূঁইয়া আবাসিক প্রকল্প, রাজউক, ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান, ড্যাপ,

ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দুই পাশ। বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল তথা বর্ষায় জীববৈচিত্র্যপূর্ণ জলাভূমি। উর্বর কৃষিজমি হিসেবেও রয়েছে এর ব্যবহার। এসবই বদলে যাচ্ছে। একের পর এক আবাসন প্রকল্পের দখলে চলে যাচ্ছে মহাসড়কটির দুই পাশ। চলতি বর্ষায় পানিতে তলিয়ে যাওয়া কৃষিজমিতে শোভা পাচ্ছে অর্ধশতাধিক প্রকল্পের সাইনবোর্ড। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রকল্পের মাটি ভরাটের কাজও শেষ হয়েছে। অথচ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন কিংবা পরিবেশ অধিদফতরের অবস্থানগত ছাড়পত্র নেই অধিকাংশ প্রকল্পের। এতে জলা-কৃষিজমিসহ বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল সংকুচিত হচ্ছে, বাড়ছে স্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি।

সরেজমিনে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গা সেতুর দক্ষিণে কেরানীগঞ্জ থেকে কুচিয়ামোড়া ধলেশ্বরী সেতু পর্যন্ত রাজউকের সীমানার মধ্যে রাস্তার দুই পাশে ঝিলমিল, প্রিয়প্রাঙ্গণ, পশ্চিমদী মডেল টাউন, কেরানীগঞ্জ মডেল টাউন, সবুজ ছায়া আবাসন প্রকল্প, রিভার ভিউ, সাউথ টাউন প্রকল্প, এভার সাইন সিঙ্গাপুর সিটিভূঁইয়া আবাসিক প্রকল্পে মাটি ভরাট করা হয়েছে। এর মধ্যে ঝিলমিল ছাড়া কোনো প্রকল্পেরই নেই রাজউকের অনুমোদন। আবার পরিবেশ অধিদফতরের অবস্থানগত ছাড়পত্র ছাড়াই মাটি ভরাট করেছে ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্প, পশ্চিমদী মডেল টাউন, কেরানীগঞ্জ মডেল টাউন, এভার সাইন সিঙ্গাপুর সিটি ও ভূঁইয়া আসাবিক প্রকল্প। এছাড়া পানির মধ্যে সাইনবোর্ড রয়েছে রিডিম রিভার সিটি, জমিদার সিটি, নিউ ভিশন, সুমনা মডেল টাউন, সাউথ ঢাকা সিটি ও রূপান্তর ঝিলমিল গ্রিন সিটি প্রকল্পের।

এ অঞ্চলের জমিগুলো সবই রাজউকের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। সরেজমিনেও একই চিত্র পাওয়া গেছে গত দুইদিনে। পুরো এলাকাই পানির নিচে; যা বন্যা ও বৃষ্টির পানি ধরে রেখেছে। এক্ষেত্রে যথাযথ জাতীয় স্বার্থ ব্যতীত জলাশয় ভরাট ও শ্রেণী পরিবর্তনের জন্য অবস্থানগত ছাড়পত্র দেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০১০ সালে সংশোধিত পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে পরিবেশগত ছাড়পত্র ব্যতীত জলাধার ভরাট বা অন্যভাবে শ্রেণী পরিবর্তন করলে প্রথমবার ২ লাখ টাকা বা দুই বছর কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড আর পরবর্তী সময়ে একই অপরাধ করলে ২ থেকে ১০ বছর কারাদণ্ড বা ২ থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বণিক বার্তাকে বলেন, পদক্ষেপ নেয়ায় নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও কেউ পার পাবেন না। যারা এসব করছেন, তারা এরই মধ্যে উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন যে, পার পাওয়া যাবে না।

এক মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে সাড়া দিতে অন্য মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘসূত্রতা বড় সমস্যা উল্লেখ করে সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, প্রয়োজনীয় লোকবল, পরিবহন ও অর্থ নেই। একদিকে যারা এসব প্রকল্প গ্রহণ করেন, তারা রাঘববোয়াল। অন্যদিকে কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা শক্ত অবস্থান নেন, তাদের ভয় দেখানো হয়, বদলি করা হয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও রয়েছে। তার পরও নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, অবস্থানগত ছাড়পত্র না নিয়ে মাটি ভরাট করায় ২০১২ সালে ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় সবুজ ছায়া আবাসন প্রকল্পকে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মো. আলমগীর বলেন, ‘অভিযোগ পেয়ে সবুজ ছায়া আবাসন প্রকল্পকে জরিমানা করা হয়েছে। অন্যান্য প্রকল্পের মাটি ভরাট বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি।’

তবে লোকবলস্বল্পতায় সবকিছু নজরে আসে না উল্লেখ করে পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (ঢাকা অঞ্চল) মো. তৌফিকুল আরিফ বলেন, শিগগিরই ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের উভয় পাশের প্রকল্পগুলো পরিদর্শন করা হবে। নিয়মবহির্ভূত কোনো কর্মকাণ্ড পাওয়া গেলে এনফোর্সমেন্টকে তা জানানো হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য।

এদিকে বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে মাটি ভরাট করা যাবে না বলে ২০১২ সালের ৭ আগস্ট এক রায়ে সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রাজধানীর অদূরে আমিনবাজারের মধুমতি আবাসিক প্রকল্পের ভরাট করা মাটি সরিয়ে স্থানটিকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন। আপিল বিভাগের এমন রায় থাকায় কেরানীগঞ্জে মাটি ভরাট হওয়া এ প্রকল্পগুলোরও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলে মনে করছেন পরিবেশবাদী ব্যক্তি ও সংগঠন। তারা মনে করছেন, এতে ঝুঁকিতে পড়বেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আইন অনুযায়ী বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে রাজউক অনুমোদন দিতে পারবে না। অননুমোদিত প্রকল্পে পরিবেশ অধিদফতরের অবস্থানগত ছাড়পত্র দেয়ায় কিছু আসে-যায় না। আর রাজউক অনুমোদন দিক বা না দিক, কখনো আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলে এ প্রকল্পগুলো টিকবে না।

ঝিলমিল ছাড়া কোনো প্রকল্পকে অনুমোদন দেয়া হয়নি উল্লেখ করে এ বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া দাবি করেন, সম্প্রতি এ বিষয়ে রাজউক তত্পর হয়েছে। অননুমোদিত প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে নোটিস দেয়াসহ বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার পরও যদি বন্ধ না হয়, এ প্রকল্পগুলোর পরিণতিও মধুমতি আবাসিক প্রকল্পের মতোই হবে।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের মতো একই অবস্থা মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান ও শ্রীনগর উপজেলায় মহাসড়কের উভয় পাশে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাওয়া-কাওড়াকান্দি পয়েন্টে পদ্মা সেতু হবে জানার পর এদিকে নজর পড়ে আবাসন প্রকল্পগুলোর। গত ৮-১০ বছরের ব্যবধানে মহাসড়কের উভয় পাশে জমির দামও হয়েছে তিন-চার গুণ। আবাসন কোম্পানিগুলোর নজর পড়ায় জমি দখল হয়ে যাওয়ার আতঙ্কও বিরাজ করছে এলাকাবাসীর মধ্যে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ধলেশ্বরী সেতু পার হয়ে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার সীমানায় আমিন মোহাম্মদ সিটি, আল মুসলিম গ্রুপ, বিডি প্রপার্টিজ, পদ্মা ফিউচার পার্ক, ডেসটিনি হাউসিং, এশিয়ান টাউন, আনিকা পদ্মা সিটি, পদ্মা সিটি ও সিলভার গ্রিন সিটির সাইনবোর্ড ঝুলছে। পরিবেশ অধিদফতরের অবস্থানগত ছাড়পত্র ছাড়াই জলাভূমি ও কৃষিজমিতে মাটি ভরাট করায় চলতি বছর দুই দফায় প্রায় ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় আমিন মোহাম্মদ সিটিকে। তার পরও তারা পেয়েছে পরিবেশ অধিদফতরের অবস্থানগত ছাড়পত্র। এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলার দায়িত্বে থাকা পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. নুর আলম বলেন, জলাভূমি ভরাট করায় আমিন মোহাম্মদ সিটিকে জরিমানা করা হয়েছে। পরে তাদের শর্তসাপেক্ষে অবস্থানগত ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। শর্ত ভঙ্গ করলে তা বাতিল করা হবে।

একই জেলার (মুন্সীগঞ্জ) শ্রীনগর উপজেলায় সড়কের দুই পাশে তানসির প্রপার্টিজের দখিনাচল প্রকল্প, দ্য মেক্সিম গ্রুপ ও স্বপ্নধরা সাইনবোর্ড বসিয়েছে। প্লট আকারে জমি বিক্রির জন্য এককভাবে আবাসন মেলাও করেছে স্বপ্নধরা। শ্রীনগর থেকে মাওয়ার দূরত্ব মাত্র আট কিলোমিটার। এ জায়গাটুকুতেও ছোট আকারের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাটি ভরাট করে প্লট বিক্রি করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এ জমিগুলো সবই বর্তমানে পানির নিচে, যা বছরের অর্ধেক সময় পানিতেই তলিয়ে থাকে। সম্প্রতি স্থানীয় জনগণ প্রতিষ্ঠা করেছে ভূমি রক্ষা কমিটি। তারা স্বপ্নধারার সাইনবোর্ড উপড়ে ফেলার পাশাপাশি জমি দখলের প্রতিবাদে মহাসড়কে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছেন।

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সাইফুল হাসান বাদল বলেন, ‘মহাসড়কের দুই পাশে সাইনবোর্ড দেয়া আবাসন প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে আমাদের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। কিছুসংখ্যক সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলা হয়েছে। বাকিদের নোটিস দেয়া হয়েছে। নিয়ম ভেঙে জলা ও কৃষিজমির ওপর অবৈধ আবাসন প্রকল্পরোধে জেলা প্রশাসন সচেতন রয়েছে।