গার্মেন্টের কর্মপরিবেশ উন্নতির প্রশংসায় মার্কিন ক্রেতারা

পোশাক শ্রমিকদের নিরাপত্তায় অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য ও প্রশংসনীয়

বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিক ও কারখানার নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশের ‘উল্লেখযোগ্য ও প্রশংসনীয়’ অগ্রগতি হয়েছে।

বাংলাদেশের শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে গঠিত জোট ‘অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেইফটি’র (অ্যালায়েন্স) বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ তথ্য জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাইপার্টিজান পলিসি সেন্টারের (বিপিসি) সহ-প্রতিষ্ঠাতা জর্জ মিচেল ও সিনিয়র ফেলো অলিম্পিয়া স্নোয়ি গত এক বছরে অ্যালায়েন্সের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এই মত দেন।

তারা বলেন, অ্যালায়েন্সের কার্যক্রমে গত এক বছরে বাংলাদেশের পোশাক কারাখানাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ‘উল্লেখযোগ্য ও প্রশংসনীয়’ অগ্রগতি হয়েছে।

সভায় যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, অ্যালায়েন্স বোর্ডের সভাপতি এলেন টাউসার, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, বাংলাদেশের শ্রমিক নেতা, অ্যালায়েন্স নেতৃবৃন্দ এবং অন্যান্য সহযোগীরা উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় অ্যালায়েন্সের গত এক বছরের কার্যক্রম তুলে ধরেন এলেন টাউসার।

বাংলাদেশের পোশাক খাতের ওপর দেশটির ৪০ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল‑ উল্লেখ করে টাউসার বলেন, ‘এ খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের ৮০ শতাংশই নারী। এই পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তি, বাংলাদেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশই আসে এই খাত থেকে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটা সময়ে বসবাস করছি যখন কাউকে কাজে যাওয়ার জন্য এবং এর মাধ্যমে পরিবারকে সহায়তা করার জন্য তার জীবন হুমকির মুখে ফেলার কোনো সুযোগ নেই, তা তিনি যে দেশের নাগরিকই হোন না কেন। এ কারণেই সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিয়ে মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অন্তর্গত বিষয় হিসেবে এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে অ্যালায়েন্স।

বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এক বছর আগে অ্যালায়েন্স কাজ শুরু করে জানিয়ে টাউসার বলেন, ‘বাংলাদেশের পোশাক খাতের নিরাপত্তা নিয়ে মার্কিন সরকার, আমাদের বেসরকারি খাত ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে এক বছর আগে সিনেটর মিচেল ও স্নোয়ি বাংলাদেশে পোশাকশিল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্গঠন বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন এবং অ্যালায়েন্স গঠনে নেতৃত্ব দেন।’

তিনি জানান, শুরু থেকেই শ্রমিক নিরাপত্তা তহবিলে পাঁচ কোটি ডলার দেওয়ার ব্যাপারে অ্যালায়েন্সের সদস্য কোম্পানিগুলো প্রতিশ্র“তিবদ্ধ ছিল। এর পাশাপাশি কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে তারা আরও ১০ কোটি ডলারের একটি তহবিলের যোগান দিয়েছে। এছাড়াও কারখানা মালিকদের সহায়তায় তাদের স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য সম্প্রতি দুই কোটি ডলারের আরেকটি তহবিল অনুমোদন করা হয়েছে।

অ্যালায়েন্স বোর্ড সভাপতি বলেন, ‘আমাদের কার্যক্রম শুরুর ১৪ মাস পর আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, অ্যালায়েন্স ও তার সদস্য কোম্পানিগুলোর প্রচেষ্টা সফলতার পথেই রয়েছে। বিশ্ববাজারে নিজেরা একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া সত্ত্বেও এই কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করতে তাদের সামর্থ্য ও দক্ষতা নিয়ে একজোট হয়েছে।’

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের পোশাককর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা যখন কাজ শুরু করি তখনও দেশটির পোশাকখাত ‘রানা প্লাজা’ দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত। এই অবস্থায় আমাদের প্রথম পদক্ষেপ ছিল বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনের জন্য সমন্বিত একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ বিষয়ে আমাদের কার্যক্রম শুধু আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, আমাদের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা মান নির্ধারিত হয়েছে, যা এখন প্রয়োগও হচ্ছে।

এলেন টাউসার বলেন, ‘শুরুর দিকে অ্যালায়েন্স এক বছরের জন্য বেশকিছু কর্মসূচি ঠিক করেছিল, যা ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে‑ অ্যালায়েন্সের সদস্য কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের যেসব কারখানা থেকে পোশাক সংগ্রহ করে তার সবগুলো কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন করা (মোট ৫৮৭টি কারখানা); নিরাপত্তা বিষয়ে কারখানার ব্যবস্থাপক, কর্মী ও নিরাপত্তা কর্মীসহ ১১ লাখেরও বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া।’

তিনি জানান, কারখানা কর্মীদের মধ্যে জরিপ করে দেখা গেছে এই প্রশিক্ষণের ফলে তাদের অগ্নি নিরাপত্তাজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

অ্যালায়েন্স বোর্ড সভাপতি টাউসার বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আগুন ও ভবনের নিরাপত্তার ওপর আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। নিরাপত্তা সরঞ্জামের সহজলভ্যতা নিশ্চিত ও এ বিষয়ে কারখানার মালিক ও ব্যবস্থাপকদের অবহিত করতেই এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। এই প্রদর্শনী এতোটাই সফল ছিল যে আগামী ডিসেম্বরে এ ধরনের আরেকটি প্রদর্শনী আয়োজনের পরিকল্পনা চলছে, যাতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’

পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নিরাপত্তা সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক কমানোর প্রচেষ্টাতেও অ্যালায়েন্স সফল হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি জানান, এছাড়া বিশ্বব্যাপী অগ্নিনির্বাপন কর্মকাণ্ডে যে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় বাংলাদেশেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করার বিষয়েও অ্যালায়েন্স যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় অগ্নিনির্বাপনী সংস্থার সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে।

এলেন টাউসার বলেন, ‘পাঁচ বছরের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছিলাম। এর মাত্র এক বছর অতিবাহিত হয়েছে এবং কঠিন বিষয়গুলো এখনও আমাদের সামনে রয়ে গেছে। তবে বিগত এক বছরে আমাদের কার্যক্রমের অগ্রগতিতে আমরা সন্তুষ্ট। আমরা বিশ্বাস করি, সঠিক পরিকল্পনা ও সহযোগীদের নিয়ে আমরা আমাদের কাজের গতি ধরে রাখতে পারবো এবং এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসবে।

প্রসঙ্গত, গত বছরের এপ্রিলে ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে গঠিত হয় ‘অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেইফটি’ নামের এই জোট। বাংলাদেশের পোশাক ক্রয়কারী বিশ্বের ২৬টি পোশাক বিক্রেতা কোম্পানি এই জোটের সদস্য।