যুক্তরাষ্ট্রের অশেষ যুদ্ধ

যুক্তরাষ্ট্রের অশেষ যুদ্ধ
ব্রহ্ম চেলানি | ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

image

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও শান্তিতে নোবেলজয়ী বারাকা ওবামা আবারও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার আল গাদ্দাফিকে অপসারণ এবং সোমালিয়া ও ইয়েমেনে বোমা বর্ষণের পর ওবামা এখন উত্তর ইরাকে বোমা হামলা শুরু করেছেন। এটা আদতে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। এর মাধ্যমে সিরিয়া ভেঙে যেতে পারে বা তার সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন ²হতে পারে। এরূপ হামলার জোশে মত্ত হয়ে ওবামা আবারও মার্কিন ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছেন; এই হামলার জন্য তিনি মার্কিন কংগ্রেস বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল—কারও কাছ থেকেই অনুমোদন নেননি।

ওবামার পূর্বসূরি জর্জ ডব্লিউ বুশ যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। তাঁর ভাষ্যে যে গোষ্ঠী ‘স্পেন থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত একটি ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়’, তাদের পরাজিত করতেই তিনি এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। কিন্তু বুশের ইরাক দখলের সিদ্ধান্ত এতটাই বিতর্কিত ছিল যে এর ফলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যে বৈশ্বিক মতৈক্য ছিল, সেটাই ভেঙে পড়ে। গুয়ানতানামো কারাগারে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নির্যাতন করা হয়েছে। ফলে, এই যুদ্ধে যে বাড়াবাড়ি হয়েছে, সেটা খুব পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে।

ওবামা ক্ষমতায় এসে এই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের একটা নমনীয় চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করেন। ২০০৯ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা যে ভাষা ব্যবহার করি, তাতে অনেক কিছুই যায়-আসে।’ তিনি এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নতুন নামকরণ করে রাখেন ‘সংগ্রাম’ ও ‘কৌশলগত চ্যালেঞ্জ’। কিন্তু এই ভাষার পরিবর্তনের কৌশলে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কারণ, ওবামা প্রশাসন নিছক নিরাপত্তা থেকে সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতাকে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণে কাজে লাগায়।

ফলে, ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর ঘটনাকে বুশের শুরু করা এই সন্ত্রাসবিরোধী ‘সংগ্রামের’ শীর্ষবিন্দু হিসেবে বিবেচনা না করে ওবামা প্রশাসন ‘ভালো’ বিদ্রোহীদের (যেমন লিবিয়ায়) মদদ দিয়ে ‘খারাপ’ বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে। এর অংশ হিসেবে তারা ‘সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ড’ শুরু করে। আর সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এরূপ রেখা টানা কঠিন হয়ে ওঠে।

যেমন বারাক ওবামা প্রাথমিক পর্যায়ে আইএসকে ভালো তালিকায় রেখেছিলেন। কারণ, তারা সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের শাসন এবং সিরিয়া ও ইরাকে ইরানের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করেছিল। এই আইএস ইরাকে কুর্দি-অধ্যুষিত অঞ্চলের রাজধানী আরবিল দখল করার হুমকি দিলে যুক্তরাষ্ট্র আইএস সম্পর্কে নিজেদের অবস্থান পাল্টায়। শহরটি ইরাকে, তাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, গোয়েন্দা, কূটনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তারপর দুজন মার্কিন সাংবাদিককে কতল করা হলে ওবামা প্রশাসন হঠাৎ করেই সুর পাল্টে ফেলে বুশ প্রশাসনের ভাষা ব্যবহার শুরু করে। তারা ঘোষণা করে, যুক্তরাষ্ট্র আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, ‘ঠিক যেভাবে আমরা আল–কায়েদা ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে দুনিয়াব্যাপী যুদ্ধ শুরু করেছিলাম।’

যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এ কারণে তার এই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এখন চিরস্থায়ী যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে। যেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেশটির নীতির কারণে তাদের অগোচরেই সৃষ্টি হয়েছে।

আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী বিদ্রোহীদের মদদ দেওয়ার কারণে আল-কায়েদার সৃষ্টি হয়, ওবামার প্রথম প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন তা স্বীকারও করেছিলেন। একইভাবে ২০১১ সালে সিরিয়ায় এই বিদ্রোহীদের উত্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে তাদের মদদ দিয়েছে, তার ফলেই এই আইএসের সৃষ্টি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ২০১১ সালে আফগানিস্তানে ফিরে যায় তার শেষ না হওয়া যুদ্ধ শেষ করতে। যেটা আগে বলেছি, তাদের নীতির কারণেই এই জিহাদি গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে। একইভাবে দেশটি এখন ইরাক ও সিরিয়ায় নতুন করে যুদ্ধ শুরু করেছে, যার সৃষ্টি হয়েছে মূলত বাগদাদে বুশের মসনদ পরিবর্তন ও সিরিয়ায় আসাদকে সরানোর ভুল পরিকল্পনার কারণে।
সময় হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এখন বুঝতে হবে তারা যে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু করেছিল, সেটা এখন ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে। আফগানিস্তান-পাকিস্তান অঞ্চল আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের ভিত্তিভূমিতে পরিণত হয়েছে। আর একসময়ের স্থিতিশীল রাষ্ট্র, যেমন: লিবিয়া, ইরাক ও সিরিয়া এই যুদ্ধের নতুন কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

সব নীতি বিসর্জন দিয়ে ওবামা আফগান তালেবানদের সঙ্গে যে চুক্তি করার চেষ্টা করছেন, তাতে বোঝা যায়, তিনি সন্ত্রাসবাদ পরাজিত করার বদলে তা মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান। এমনকি এর জন্য ভারতের ওপর দিয়ে যদি সন্ত্রাসবাদের ঝাপটা বয়ে যায়, তাতেও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু আসে-যায় না। উল্লিখিত তালেবান নেতারা পাকিস্তানে নিরাপত্তা পান। (আসলে পাকিস্তানের এই ভারতের বিরুদ্ধে পরিচালিত সন্ত্রাসবাদী যুদ্ধ আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সোভিয়েতবিরোধী অভিযান থেকেই শুরু হয়, আফগান বিদ্রোহী সরবরাহ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আইএসআইকে যে টাকা দিয়েছিল, তার বড় অংশ তারা সরিয়ে ফেলেছিল। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযান সিআইয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অভিযান)।

আইএসকে বাগে আনতে ওবামা যে কৌশল নিয়েছেন, তা মধ্যযুগের বর্বরতার সীমা স্পর্শ করেছে। এই গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ওবামা বলেছেন, তাঁর মূল লক্ষ্য হচ্ছে আইএসকে একটি ‘নিয়ন্ত্রণসাধ্য সমস্যায়’ পরিণত করা।

আরও খারাপ ব্যাপার হচ্ছে, ওবামা আইএসকে মোকাবিলা করতে যে কৌশল অবলম্বন করেছেন, সেই একই কৌশলের কারণে এই গোষ্ঠীর উদয় হয়েছিল: সিআইএকে দিয়ে এই অঞ্চলের ধনী তেল ব্যবসায়ী শেখদের টাকায় হাজার হাজার সিরীয় বিদ্রোহীর প্রশিক্ষণ দেওয়া। এদের হাতে উন্নত অস্ত্র তুলে দেওয়ার পরিণাম কী হবে, সেটা বোঝা খুব কঠিন কোনো ব্যাপার নয়।

যুক্তরাষ্ট্রে দুনিয়ার শীর্ষ চিন্তক ও অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষ রয়েছেন। কিন্তু তাঁরা কখনোই অতীত থেকে শিক্ষা নেন না। ফলে, একই ভুল বারবার করতে থাকেন। ইসলামি দুনিয়াবিষয়ক মার্কিন নীতির কারণে সভ্যতাগুলো পারস্পরিক যুদ্ধে জড়াচ্ছে না; বরং তাদের নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ লাগাতেই যুক্তরাষ্ট্র নিরন্তর চেষ্টা করছে। এ কারণে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ধরনে শত্রুদের বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধ বাধিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন বা দীর্ঘস্থায়ী ফলাফল অর্জন করা সম্ভব নয়। আইএসের বিরুদ্ধে বহু বছর যুদ্ধ চালানোর লক্ষ্যে মার্কিন প্রচেষ্টার প্রতি নরম-গরম আরব ও তুরস্ক যে সাড়া দিয়েছে, তাতেই এ ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি পরিষ্কার হয়ে যায়।

সাম্রাজ্যিক দম্ভের কারণে ইসলামি সন্ত্রাসের ঝুঁকি বেড়েছে, এই সন্ত্রাস একটা বাস্তব ব্যাপার। পশ্চিমারা এটা জন্ম না দিলেও তা সত্য।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
ব্রহ্ম চেলানি: নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক।