জেলা পরিষদ :: একটি শূন্য উদ্যান বা ঝুলন্ত সেতু

জেলা পরিষদ :: একটি শূন্য উদ্যান বা ঝুলন্ত সেতু

ড. তোফায়েল আহমেদ

last 4এক সময় সপ্তাচার্য হিসাবে ব্যবিলনের ‘শূন্য উদ্যানে’র কথা পড়েছি। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার বর্তমান সময়ে শূন্যে উদ্যান সৃষ্টি খুবই সম্ভব। গ্রামে-গঞ্জে প্রকৌশলী ও রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতার সৌধ প্রতীক হিসাবে কিছু পরিত্যক্ত সেতু দেখা যায়। সেতুর দুই পাশে কোন সংযোগ সড়ক নেই। শুধু শূন্যে একটি সেতু ঝুলে আছে। মানুষ সেতুর পাশের হাটা পথে যাতায়াত করে। সেতুটি ব্যর্থ সিদ্ধান্তের প্রতীক হিসাবে দাড়িয়ে থাকে। বাংলাদেশের বর্তমান জেলা পরিষদটি গণতন্ত্রের একটি শূন্য উদ্যান। একদিকে এটি শূন্যে স্থাপিত,অপরদিকে জনপ্রতিনিধি শূন্য। এটি একটি সংযোগ সড়কবিহীন পরিত্যক্ত ‘ঝুলন্ত সেতু’ও বটে। যেখানে পারাপারের ব্যবস্থা নেই। কিন্তু সেতুর মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণের বড় অংকের খাই – খরচা আছে।

জেলা পরিষদ বাংলাদেশের শুধু নয়, উপমহাদেশের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। বৃটিশ থেকে পাকিস্তান সময়কাল প্রায় ১৪০ বছর এ প্রতিষ্ঠানটি নানাভাবে বিবর্তিত হয়ে একটি শক্তিশালী কাঠামো এবং কার্যপ্রণালীগত রূপরেখায় সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর বানরের পিঠা ভাগের সংকীর্ণ রাজনীতি এবং আমলাতন্ত্রের সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্রের বলি হয় জেলা পরিষদ। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো ‘শর্টকাট’ পদ্ধতিতে পদলাভের এবং দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে জেলাকে নিয়ে নানা অসাংবিধানিক খেলায় মেতে উঠে। কখনো ‘জেলা গভর্নর’, (আওয়ামী লীগ) কখনো ‘জেলা উন্নয়ন সমন্বয়ক’ (বিএনপি), কখনো এমপিদের মধ্য থেকে ‘জেলা পরিষদ সভাপতি’ (জাপা), কখনো বা ‘জেলামন্ত্রী’ এভাবে নানা টালবাহানা চলতে থাকে। তার মধ্যে সর্বশেষ যুক্ত হলো ‘প্রশাসক’। আমলাতন্ত্র সুকৌশলে এ সব কাজে যখন যে সরকার ক্ষমতায় ছিল তাদের মদদ দিয়ে গেছে, যাতে জেলায় পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিত্বশীল কোন শাসন কাঠামো গড়ে না উঠে। জেলায় ‘ডেপুটি কমিশনার’ এবং বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক সাম্রাজ্য সব সময়ই অক্ষুণœ রাখার বন্দোবস্ত পাকাপোক্ত থাকে। আমলাতন্ত্র কখনই জেলায় অন্য কোন নিয়ন্ত্রণ চায় না। ‘জেলা প্রশাসক’ নামক অলীক একটি ‘স্বপ্ন’ ধরে রাখতে চায় তারা যেকোনো মূল্যে। এমন কি সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে হলেও তা করতে কারও কোনো দ্বিধা নেই।

বর্তমান সময়ে বিভাগ ও জেলার প্রশাসন ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। ডেপুটি কমিশনার কার্যালয়ের বৃটিশ কাঠামো রক্ষা করা হলেও তার কাজকর্মে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। সর্বময় ক্ষমতাধর রাজ প্রতিনিধি হিসাবে শাসন, বিচার, উন্নয়ন ও সকল সেবাকর্মের নিয়ন্তা জেলা প্রশাসকের কাজ, ক্ষমতা ও প্রয়োজন এখন অনেকটা ভিন্ন। এখন জেলার সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং দফতর-অধিদফতর কার্যত স্বাধীন। পৃথক হয়েছে বিচার ব্যবস্থা। তাই জেলার সাধারণ প্রশাসনের কর্মপরিধি ও কর্মপ্রকৃতিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এ পরিবর্তনের আরও অনেক উপাদান রয়েছে। বিশেষত বস্তুগত ও তথ্য প্রযুক্তির আধুনিকায়নের কারণে পূর্বতন ‘বিভাগ’ পদ্ধতির ধারাবাহিকতাও সময়ের নিরিখে অপচয়ী, অপ্রয়োজনীয় ও বাড়তি হিসাবে প্রতীয়মান। এক্ষেত্রে দেশের প্রতিটি জেলায় অবকাঠামো, পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুকূল থাকা সত্ত্বেও পূর্ণাঙ্গ জেলা পরিষদ গঠিত না হওয়ার কোনো কারণ নেই। জেলা পরিষদ উপমহাদেশের সর্বত্র রয়েছে। ভারতে জেলা পরিষদ বেশ ভালো ভাবেই কাজ করছে। জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ,রাজ্যসভা, লোকসভা ও বিধান সভার সরকারী ও বিরোধী দলীয় সদস্য কারো সাথে কোথাও বিনাশী সংঘাত নেই। রাজনৈতিক মতদ্বৈততা স্বাভাবিকভাবেই থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে আমরা সৃষ্টি ছাড়া প্রথা ও পদ্ধতি সৃষ্টি করে চলেছি। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্মমূলে কুঠারাঘাত করে চলেছি। ‘জেলা পরিষদ আইন ২০০০’-এর ধারা ৮২ বলে জেলা পরিষদে ‘প্রশাসক’ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রশাসক নিয়োগ একটি স্বল্পকালীন অন্তবর্তী ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু এ ব্যবস্থাই যেন পাকাপোক্ত ব্যবস্থা। এখন সে প্রশাসকরা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা চান। কিন্তু নির্বাচন চান না। তারা সবাই পেশায় রাজনীতিবিদ। এই-ই যদি রাজনীতি হয়, তাহলে সংবিধানের দরকার কি? ‘প্রশাসক’গণের মন্ত্রীর মর্যাদা চাওয়ার বিষয়টি শুনে মনে হলো ‘চটি জুতার আবার ফিতে’ চাই কিংবা লুঙ্গিতে পকেট সংযোজনের কথা। এসব ভ্রান্তি-বিলাস পরিহার করে নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ এবং সুস্থির ও সুদূরপ্রসারী প্রচেষ্টা হিসাবে প্রয়োজন বিভাগ ও জেলায় প্রশাসনিক সংস্কার এবং নির্বাচিত ও সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীল একটি জেলা পরিষদ।

সরকার যা খুশি করছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, দেশের সংসদ ও সংসদের বাইরের বিরোধী দলগুলোর এসব বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই। নেই কোনো সুদূরপ্রসারী চিন্তা। বিষয়গুলো অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে সকল রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় চিন্তা-ভাবনা প্রয়োজন।।

লেখক :: ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গর্ভানেন্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।
সূত্রঃ আমাদের বুধবার
প্রকাশক: আমাদের বুধবার, তারিখ: