বিআরটিএতে উড়ছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা

বিআরটিএতে উড়ছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা
সিরাজুল ইসলাম : রাজধানীর পোস্তগোলা ব্রিজে মোটরসাইকেল আরোহী দীন মোহাম্মদ মাহিদকে আটকালেন পুলিশ। তার গাড়ি নম্বর, ঢাকা মেট্রো-ল ২১-৪৮০৩। পুলিশ তার লাইসেন্সকে নকল লাইসেন্স হিসেবে চিহ্নিত করলেন। একপর্যায়ে মাহিদ স্বীকার করলেন, ইকুরিয়া বিআরটিএর ইন্সপেক্টর আব্দুল জলিলের মাধ্যমে ১২ হাজার টাকার বিনিময়ে এই লাইন্সেস তৈরি করা হয়েছে। কয়েকদিন আগের ঘটনা এটি।

কেবল একটি বা দুটি ঘটনাই নয়, নানা অজুহাতে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) কর্মকর্তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের টাকা। পরিদর্শক পদমর্যদার এক কর্মকর্তা মাসে আয় করছেন ৫০ থেকে ৮০ লাখ টাকা। বর্তমানের অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিরপুর এবং ইকুরিয়া (কেরানীগঞ্জ) অফিসের রেজিস্ট্রেশন, রুট পারমিট, ফিটনেস এবং মালিকানা বদলি শাখার ৬ কর্মকর্তা ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। ঘুষের টাকায় তারা বানিয়েছেন অত্যাধুনিক বাড়ি। কিনেছেন বিলাশবহুল গাড়ি। এই ছয় কর্মকর্তার মধ্যে রয়েছেন— ইন্সপেক্টর আব্দুল জলিল, আবুল বাশার, মোবারক হোসেন, শামসুল কবীর, কামরুল হোসেন ও মোহাম্মদ তুহিন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ইকুরিয়া এবং সাভারের দায়িত্বে থাকা ইন্সপেক্টর আব্দুল জলিল মিরপুর বিআরটিএ অফিসের উল্টো পাশে গ্লোরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৭ তলা একটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন। বাড়িটির হোল্ডিং নম্বর ১/২ হলেও তিনি ওই বাড়িতে নম্বর প্লেট ব্যবহার করেন না। তার নিজ নামে সাদা রঙের একটি দামি প্রাইভেট কার আছে। আব্দুল জলিল সপ্তাহে চারদিন ড্রাইভিং লাইন্সসের ওপর পরীক্ষা নেন। চারদিনে প্রায় ৪০০ চালকের পরীক্ষা নেন তিনি। পরীক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ ফেল করলে ৫ হাজার টাকা দিলেই ওই পরীক্ষার্থী পাস করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার ভালো পরীক্ষা দিয়েও অনেকে ফেল করেন। পরে বনিবনা হলে তাদের পাস দেখানো হয়। জানা যায়, ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে জনপ্রতি আট হাজার থেকে দশ হাজার টাকা করে নেয়া হয়। অথচ ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে সরকারি ফি তিন হাজার টাকারও কম। এতে একজন ইন্সপেক্টরের প্রতি মাসে গড় আয় প্রায় ৮০ লাখ টাকা।

আব্দুল জলিলের স্ত্রীর বড় ভাই আবুল কালাম জানান, একটি দরিদ্র পরিবারে জলিলের জন্ম। ৬ ভাইয়ের মধ্যে জলিল বড়। তার চার ভাইয়ের লেখা-পড়ার খরচসহ পরিবারের পুরো দায়িত্ব জলিলের ওপর। এরপরও জলিল মিরপুরে জায়গা কিনে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। তার গ্রামের বাড়ি পাবনার ফরিদপুর থানার বেরহাউলিয়া গ্রামে কয়েক একর জমি কিনেছেন। ছোট দুই ভাইকে ডেইরি ফার্ম করে দিয়েছেন। আব্দুল জলিল বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতির টাকায় আমার বাড়ি-গাড়ি নয়, যা কিছু করেছি সবই বৈধ টাকায়।

জানা যায়, ইকুরিয়া শাখায় মালিকানা বদলি এবং রেজিস্ট্রেশন শাখায় সপ্তাহে ২০ থেকে ২৫টি ফাইল আসে। সূত্র মতে, অনেকেই গাড়ি বিক্রি করে মালিকানা পরিবর্তন না করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ক্রেতাকে বুঝিয়ে দিয়ে পরিবার নিয়ে বিদেশে চলে যান। পরে রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের ঝামেলা পোহাতে হয় ক্রেতাকে। ট্রাফিক ঝামেলা এড়াতে নিজের নামে মালিকানা নিতে বিআরটিএর এই দপ্তরে অসেন অনেকে। কাগজপত্র দেখেই বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশ্ন— আসল মালিক কোথায়? তাকে হাজির করেন। বেশির ভাগ ক্রেতাই সরল মনে বলে ফেলেন— তিনি দেশের বাইরে আছেন। এর পরই শুরু হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নানা অজুহাত। ওই কর্মকর্তা বলেন, মালিককে ছাড়া হবে না। তাকে হাজির করতে না পারলে তিনি যে দেশে আছেন সে দেশে কাগজপত্র পাঠিয়ে দেন। অথবা তার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি লিখিয়ে নিয়ে আসেন। ঝামেলা এড়াতে গাড়ির নতুন ক্রেতা বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই মালিকানা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিদর্শক সরেজমিন গিয়ে গাড়ি পরিদর্শন করেন। ওই গাড়ির কোনো সমস্যা চোখে পড়লেই পরিদর্শকের চোখ ছনাবড়া হয়ে যায়। ওই পরিদর্শকের ভূমিকা দেখে মনে হয়, যেন গাড়িটি আর কোনো দিন রেজিস্ট্রেশন হবে না। পরে টেবিলের নিচে হাত বাড়িয়ে দিলেই কাজ হয়ে যায়।

এসব বিষয়ে জানাতে চাইলে সংশ্লিষ্ট শাখার পরিদর্শক আবুল বাশার জানান, আগের পরিবেশ আর এখন নেই। এখন সময় বদলেছে। আমাদের আয়ও কমে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইকুরিয়া রুটপারমিট শাখায় প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০টি নতুন ফাইল আসে। রুটপামিটের জন্য সরকারী ফি পরিবহন কর্তৃপক্ষ নিজেরাই ব্যাংকে জমা দেন। এর পরও প্রতিটি ফাইলের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে খুশি করতে হয়। এজন্য অতিরিক্ত ১ থেকে দেড় হাজার টাকা করে গুণতে হয়।

সূত্র জানায়, মিরপুর বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক মোবারক হোসেন প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০টি পরিবহন পরিদর্শন করে থাকেন। বিআরটিএর নীতিমালায় বলা আছে— গাড়ির ব্যাকলাইট ভাঙা, সিগন্যাল লাইট না জ্বললে, গাড়ির কোথাও রং নষ্ট হলে বা যন্ত্রাংশের কোনো সমস্যা, কোম্পানির তৈরি করা গাড়ি বাংলাদেশে আসার পর ওই গাড়িটিকে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা হয়েছে কি না— এসব দেখতে হবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয়া হবে; কিন্তু নানা সমস্যায় জর্জড়িত থাকা পিকআপ ভ্যান ও প্রাইভেটকারসহ নানা ধরনের গাড়ি ‘ওকে রিপোর্ট’ দিচ্ছেন পরিদর্শক মোবারক হোসেন। ঢাকা-মেট্রো-২১-৬৩৬৬, ঢাকা-মেট্রো, খ-১১-১১৯০, ঢাকা-মেট্রো গ-২০-৭২৪৬, ঢাকা অ-৪৮০, ঢাকা-মেট্রো গ-১১-১১১৯ এবং ঢাকা-মেট্রো ১১-০৭৪০সহ বেশকিছু গাড়ির মালিক জানিয়েছেন তারা টাকার বিনিময়ে ফিটনেস সার্টিফিকেট নিয়েছেন।

মোটরযান পরিদর্শক মো. শামসুল কবীরের বিষয়ে অনেক কথা বর্ণনা করলেন তার দপ্তরের এক কর্মচারী। তিনি জানান, শামসুল সাহেব যখন এই দপ্তরের দায়িত্ব নেন তখন ফাইলে একটি অক্ষর ভুল থাকলেও সেটি সংশোধন করে তাতে স্বাক্ষর করতেন। কোনো ঘুষ নিতেন না। কয়েক মাস পর তিনি পরিবর্তন হয়ে গেলেন। এখন টাকা ছাড়া কোনো ফাইল সই করেন না। কাগজপত্র সবই ঠিকঠাক থাকলেও নানা অজুহাতে গ্রাহকদের মাসের পর মাস ঘুরাতে থাকেন। সরকারি ফি ছাড়াও তাকে তিন-চার হাজার টাকা ঘুষ না দিয়ে কেউ কাজ করাতে পারেন না।