‘প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক-২০১৪’ পেলেন আইনুন নিশাত

‘প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক-২০১৪’ পেলেন আইনুন নিশাত
উত্তম সরকার : সবুজের শাড়িতে সেজেছে চারপাশ। সারিবদ্ধ নানা প্রজাতির ছোট ছোট গাছ। মৃদু বাতাসে থর থর কাঁপছে গাছের পাতা। ভালো করে কান পাতলে শোনা যায় কবিতার ছন্দ ও তাল। গাছের ফাঁকে সবুজ আলোর লুকোচুরি খেলা যোগ করেছে ভালো লাগার নতুন মাত্রা। মঞ্চটাও সবুজে মোড়ানো। আঁকা-বাঁকা ডালপালা ছড়িয়ে হঠাত্ করে মঞ্চটাকে দেখলে যে কারো গভীর অরণ্য বলে ভ্রম হতে পারে। পায়ের নিচের সবুজের গালিচা। অতিথিদের বসার স্থানগুলোতেও রয়েছে সবুজের বৈচিত্রতা। এক কথায় প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন-চ্যানেল আই ‘প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক-২০১৪’-এর মঞ্চ ছিল মানুষের যত্নে গড়া একখণ্ড সবুজ বাগান। সবুজের চোখ জুড়ানো মায়াময় স্নিগ্ধতা পান করে যে কেউ মেটাতে পারে মনের ক্ষুধা। গত ৮ নভেম্বর চ্যানেল আই ছাদ বারান্দায় খোলা আকাশের নিচে সবুজে সাজানো আঙিনায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিশেষ অবদান রাখার জন্য পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ও প্রকৃতিবিদ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাতকে প্রদান করা হয় ‘প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক—২০১৪’।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও পানিসম্পদ গবেষণার অন্যতম পথিকৃত আইনুন নিশাত নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়সহ বিভিন্ন জলাভূমি পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার কাজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। বলতে গেলে বাংলাদেশে পানিসম্পদ গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে ড. আইনুন নিশাতের হাত ধরে। আইনুন নিশাত শিক্ষা জীবন শুরু হয় ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে। এরপর ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক, ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ১৯৬৯ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮১ সালে যুক্তরাজ্যের স্ট্র্যাথক্লাইড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই গুণী মানুষটি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৭০ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ ২৬ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শেষে ১৯৯৮ সালে অবসরে যান। কিন্তু কাজ পাগল এই মানুষটি একই সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দি কনজারভেশন অব ন্যাচার অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস (আইইউসিএন) এর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে যোগ দেন। ১১ বছর সফলভাবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৯ সালে আইইউসিএন থেকে অবসর নিয়ে যোগদান করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে। ২০১৪ সালে উপাচার্য পদ থেকে অবসর নিয়ে বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন।
বাংলাদেশের পানিসম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণে ড. আইনুন নিশাত সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করেন। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দেশের বিভিন্ন বড় বড় স্থাপনা নির্মাণের কারণে পরিবেশের ওপর এর প্রভাব নিয়ে তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশে প্রথম গবেষণা কাজ শুরু হয়। আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন তিনি বাংলাদেশের জলাভূমি, বনভূমি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পে নেতৃত্ব দেন। ড. নিশাত বাংলাদেশের প্রকৃতি সংরক্ষণে প্রণয়নকৃত জাতীয় সংরক্ষণ নীতিমালা ও জাতীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কৌশলপত্র তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পানিসম্পদ ও জলাভূমি সংরক্ষণের পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় এবং উন্নত বিশ্বের কাছ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়েরও পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
পানিসম্পদ ও প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা এই কর্মবীরের হাতে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন-চ্যানেল আই ‘প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক-২০১৪’ তুলে দেন প্রধান অতিথি পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, বিশেষ অতিথি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের উপ-মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলা জ্যাকব, ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড, চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু ও ইমপ্রেস গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য জহিরউদ্দিন মাহমুদ মামুন, রিয়াজ আহমেদ খান।

ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের পক্ষ থেকে পরিচালক হাসনিন মুক্তাদির ড. আইনুন নিশাতকে ১ লাখ টাকার সন্মাননা চেক এবং ডা. সরদার এ নাঈম জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের পক্ষ থেকে তাকে আজীবন বিনামূল্যে চিকিত্সা সেবা দেয়ার সনদপত্র প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশবিদ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে  শুভেচ্ছা ও স্বাগত বক্তব্য দেন চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর এবং প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু।

বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, সৃষ্টির সূচনা থেকে প্রকৃতির পরিবর্তন হয়ে আসছে। তবে প্রকৃতির সমস্যা সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে। এই বিরাট সমস্যাকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। আমাদের আশাবাদী হতে হবে। সব সীমাবদ্ধতার ভিতরও এগিয়ে যেতে হবে। আইনুন নিশাত সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, অধ্যাপক আইনুন নিশাতকে আমি অনেক আগে থেকেই চিনি। বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের সময় তার সঙ্গে কাজ করেছি। তার জ্ঞানের গভীরতা জানি। বঙ্গবন্ধু সেতুর কাজের সময় তিনি যখন কথা বলতেন তখন বিদেশি পরামর্শকরা তার কথা মনোযোগ সহকারে শুনতেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপ-মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব বলেন, আমরা সচেতনভাবে নিজেদের দায়িত্ব যদি পালন করি তবে আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ উপহার দিতে পারব। তিনি আরও বলেন, দেশের জন্য নিরবে-নিভৃতে যে ক’জন গুণী ব্যক্তি কাজ করে চলেছেন তাদের মধ্যে ড. আইনুন নিশাত একজন অনন্য ব্যক্তি। আমি তার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করি।

পদক গ্রহণের পর আইনুন নিশাত তার অনুভূতি জানাতে গিয়ে বলেন, এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। আগামী প্রজন্মের কল্যাণে এখনো কাজ করে যাচ্ছি। পরিবেশ ও বনমন্ত্রীসহ অনেকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা যারা পরিবেশ নিয়ে কাজ করি তারা অনেক সময় তাত্ত্বিক কথা বলি। এক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত কথা বলার চেষ্টা করতে হবে। মানুষকে বাদ দিয়ে প্রকৃতি নয়। প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে মানুষ নয়। এর মধ্যে সমন্বয় করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। তরুণ প্রজন্মকেও বিষয়টি মনে রাখতে হবে।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে ফরিদুর রেজা সাগর বলেন, আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর পৃথিবী গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, যিনি নদী ও পানিসম্পদ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, তাকে সম্মানিত করতে পেরে আমরা আনন্দিত। তিনি আরও বলেন, প্রকৃতি তার মতো করে আচরণ করছে। আর সেই আচরণ আমাদের কাছে বৈরী মনে হচ্ছে। তাই প্রকৃতি সম্পর্কে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। সবুজ বাংলাকে ফিরিয়ে আনতে কাজ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের কর্মকাণ্ড এবং ড. আইনুন নিশাতের জীবনী নিয়ে দুটি সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র দেখানো হয়। পাশাপাশি প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম জীববৈচিত্র্য, তত্ত্ব ও তথ্য সংবলিত, শিক্ষামূলক ও পরিবেশবিষয়ক ধারাবাহিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘প্রকৃতি ও জীবন’-এর ‘ডিভিডি-২০১৪’ এবং ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু রচিত ২০১৩-১৪ সালের বিভিন্ন সময় জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ নিয়ে ‘আমার অনেক ঋণ আছে’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এছাড়া সংগীত পরিবেশন করেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, কোনাল ও উদয়।

২০১০ সালের ১ আগস্ট থেকে শুরু হয় ‘প্রকৃতি ও জীবন’ অনুষ্ঠানের পথচলা। প্রকৃতি সংরক্ষণের নানা উদ্যোগকে মূল্যায়ন করতে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন ২০১১ সাল থেকে সিদ্ধান্ত নেয় ‘প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন-চ্যানেল আই ‘প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক’। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম পদক তুলে দেয়া হয় নিসর্গপ্রেমী অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার হাতে। এরপর ২০১২ সালে পদক প্রদান করা হয় বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. রেজা খানকে। পাখি অন্তঃপ্রাণ ইনাম আল হক পদক পান ২০১৩ সালে।