কে আসলে শিশু?

কে আসলে শিশু?

প্রিয়লাল সাহা, বাংলামেইল২৪ডটকম

ঢাকা: বাংলাদেশে বিদ্যমান বিভিন্ন আইনে কোনো সমন্বয় না থাকায় শিশুর বয়সসীমা নির্ধারণ করতে চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়তে হয়। কোনো অপরাধীর বয়স ১৮ বছরের নিচে হলে তাকে নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন আদালত। বিভিন্ন আইনে বিভিন্ন বয়সসীমা উল্লেখ থাকায় অভিযুক্তের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়া ‍দুষ্কর হয়ে পড়ে। এ কারণে সবক্ষেত্রে অনুসরণযোগ্য একটি সাধারণ শিশুআইন প্রণয়নে আইন প্রণেতারা বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেই মনে করা হয়। এ জন্য একটি পরিপূর্ণ ও সমন্বিত শিশু আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

বিভিন্ন আইনে শিশুর বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে বিভিন্ন। যেমন: শিশু আইন-১৯৭৪ অনুযায়ী ১৬ বছরের কম বয়সী সবাই শিশু। এই আইনের বিধান মোতাবেক ১৫ বছর ৩৬৪ দিন বয়সী ব্যক্তি শিশু হিসেবে গণ্য হবে।

শ্রম আইন মোতাবেক ১৪ বছরের কম বয়সীদেরকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। এই আইনের বিধান মোতাবেক ১৪ বছর বা তদোর্ধ্ব ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচিত।

অর্থ্যাৎ শ্রম আইনে যে প্রাপ্তবয়স্ক শিশু আইনের বিধানে সে শিশু হিসেবেই বিবেচিত হয়।

আবার খনি আইনে ১৫ বছরের কম বয়স্ক সবাই শিশু হিসেবে বিবেচিত। এই আইনের বিধান মোতাবেক শ্রম আইনে যে প্রাপ্তবয়স্ক খনি আইনে এবং শিশু আইনে সে শিশু হিসেবে স্বীকৃত।

এছাড়া সাবালক আইন এবং চুক্তি আইনের বিধান মোতাবেক ১৮ বছরের কম বয়স্ক মানুষ শিশু হিসেবে গণ্য হবে।

শিশু আইন, শ্রম আইন এবং খনি আইনের বিধান মোতাবেক প্রাপ্ত বয়স্করা (যদি ১৮ বছরের কম হয়) সাবালক আইন ও চুক্তি আইনের বিধান মোতাবেক কোনো ধরনের চুক্তি করতে অক্ষম। এ দুই আইনে এর নাবালক।

আবার, দোকান ও প্রতিষ্ঠান আইনে ১২ বছর পর্যন্ত বয়সসীমার মধ্যে সবাইকে শিশু বলে গণ্য করা হয়। অর্থ্যাৎ ১২ বছর ১ দিন পূর্ণ হলে এ আইনের বিধান মোতাবেক সবাই প্রাপ্তবয়স্ক। এ আইনে স্বীকৃত প্রাপ্তবয়স্করা শিশু আইন অনুযায়ী ১৬ বছর না হলে, শ্রম আইন অনুযায়ী ১৪ বছর না হলে, খনি আইন অনুযায়ী ১৫ বছর না হলে এবং সাবালক আইন ও চুক্তি আইন অনুযায়ী ১৮ বছর না হলে এসব আইনের আওতাভুক্ত যেকোন কাজে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। কারণ এরা শিশু।

ফ্যাক্টরি (কারখানা) আইনে শিশুর বয়স ১৬ বছর ধরা হয়েছে। অর্থ্যাৎ ১৬ বছর ১ দিন হলেই যেকোন ব্যক্তি ফ্যাক্টরিতে কাজের যোগ্য। এখানে দেখা যাচ্ছে যে, ফ্যাক্টরি আইনের শিশু এবং শিশু আইনের শিশুর মধ্যে বয়সসীমার পার্থক্য কেবল ২ দিনের।

এদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর বিধান মোতাবেক ১৬ বছর পর্যন্ত সবাইকে শিশু বলেই গণ্য করা হয়েছে। এ আইন ও ফ্যাক্টরি আইনে শিশুর বয়সসীমা একই।

জাতীয় শিশু নীতিমালা অনুযায়ী ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত সবাই শিশু। এখানে দেখা যাচ্ছে যে, জাতীয় শিশু নীতিমালার প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শিশু আইন-১৯৭৪ এ শিশু হিসেবে বিবেচ্য।

অপরদিকে জাতিসংঘ শিশু সনদে ১৮ বছরের কম বয়স্ক সবাইকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘ শিশু সনদকে অস্বীকার করতে পারে না।

দেশে প্রণীত ও প্রচলিত এসব আইন অনেক ক্ষেত্রে কার্যত একে অপরকে নাকচ করে দেয়। একটিতে যা স্বীকৃত অন্যটিতে তা অস্বীকৃত। এ অবস্থাকে আইনগত নৈরাজ্য বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞ।

উপরোক্ত আইনগুলোতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে সর্বজনীন অনুসরণযোগ্য শিশুর কোনো বয়সসীমা নির্ধারিত হয়নি। একেক আইনে একেক বয়সসীমা শিশুদের বা রাষ্ট্রের কী ধরনের স্বার্থ রক্ষা করে তা জানা না গেলেও নানা ধরনের আইনি জটিলতা যে সৃষ্টি করে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাছাড়া বিভিন্ন আইনে শিশুদের বিভিন্ন বয়সসীমা রাষ্ট্রের আইন প্রণেতাদের অদূরদর্শিতা ও চিন্তার দীনতাকে নগ্নভাবে তুলে ধরেছে।

নগর সভ্যতার অব্যাহত অসম বিকাশের ফলে ক্রমবর্ধমান হারে শিশুরা নানামাত্রিক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এসব অপরাধে অভিযুক্ত শিশুদেরকে আইনের আওতায় যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংশোধন ও পুনর্বাসনের জন্য সমন্বিত শিশু আইন একান্তই আবশ্যক। তাই যথাশীঘ্র বিদ্যমান আইনগুলো ও বাস্তবতার আলোকে জাতিসংঘ শিশু সনদকে বিবেচনায় নিয়ে একটি সর্বজনীন শিশু আইন প্রণয়ন করা দরকার।

আইন বিশেজ্ঞরা বলছেন, নতুন আইনটি এমন বিধান রেখে এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে যা এই আইনে শিশুর জন্য নির্ধারিত বয়স বাংলাদেশ পূর্বে প্রণীত ও প্রচলিত সব আইনে শিশুর জন্য নির্ধারিত বয়সকে প্রতিস্থাপন করবে। এছাড়া ভবিষ্যতে প্রণীত যেকোন আইন শিশুদের বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ আইনকে যাতে অনুসরণ করতে পারে সে দিকটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।