পুঁজিবাজার বিকাশের বড় বাধা অস্বচ্ছ নিরীক্ষা প্রতিবেদন

image

পুঁজিবাজার বিকাশে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা। ফলে পুঁজিবাজার এখনো মূলধন উত্তোলনকারী ও মূলধনের যোগানদাতা উভয়ের লাভবান হওয়ার ক্ষেত্রে পরিণত হয়নি। বরং দিনে দিনে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ লোপাটের পথ প্রশস্ত হয়েছে। তাই স্বচ্ছ নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরিতে নিরীক্ষক এবং তা প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সচেতনতা জরুরি বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পুঁজিবাজার থেকে টাকা উত্তোলনের জন্য তৈরি করা বিবরণীতে সঠিক হিসাব দেখানো কোম্পানির সংখ্যা কম। বরং বেশিরভাগ কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আগে সম্পদ ও মুনাফা বেশি দেখায়। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ঋণ পরিশোধের কথা বলে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করলেও মুনাফার হার কমছে অনেক কোম্পানির।

২০১২ সালে পুঁজিবাজার থেকে টাকা উত্তোলন করেছে ৯টি কোম্পানি (মিউচ্যুয়াল ফান্ড ছাড়া)। প্রিমিয়ামসহ কোম্পানিগুলো ৭৬২ কোটি ২৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা উত্তোলন করে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর এ সব কোম্পানির বেশির ভাগেরই মুনাফার হার কমেছে। এর মধ্যে রয়েছে এনভয় টেক্সটাইল, আমরা টেকনোলজিস, ইউনিক হোটেল এ্যান্ড রিসোর্টস, সায়হাম কটন, জিবিবি পাওয়ার, জিপিএইচ ইস্পাত, জিএসপি ফাইন্যান্স, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস কোম্পানি। মুনাফা ও সম্পদের পরিমাণ বেশি দেখিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির কারণে পরবর্তী সময়ে এ সব কোম্পানির মুনাফা কমেছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ এ বিষয়ে দ্য রিপোর্টকে বলেন, পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সবকিছু বিএসইসির যাছাই করে নেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে শুধু ইস্যু ম্যানেজারের তৈরি পেপারের ওপর নির্ভর করা যাবে না। সরেজমিন কোম্পানিগুলোর সার্বিক অবস্থা পরিদর্শন করে দেখতে হবে।

মুনাফা ও সম্পদের পরিমাণ বেশি দেখিয়ে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল পুঁজিবাজার থেকে টাকা উত্তোলন করেছে। প্রসপেক্টাস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে যোগ হওয়া সম্পদের ওপর অবচয় না ধরে ২ কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৪ টাকার মুনাফা বেশি দেখিয়েছে কোম্পানিটি। শেষ ৬ মাসে যোগ হওয়া বিল্ডিং, প্ল্যান্ট মেশিনারি ও ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলমেন্টের ওপর অবচয় না ধরে এই পরিমাণ মুনাফা ও সম্পদ বেশি দেখানো হয়েছে। অথচ যোগ হওয়া অন্যসব সম্পদের ওপর ও যার অবচয় কম হয় সে সব সম্পদের ওপর অবচয় ধরা হয়েছে। এ ছাড়া একই পরিমাণ সম্পদও বেশি দেখানো হয়েছে। যা বাংলাদেশ এ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড (বিএএস)-১৬ এর পরিপন্থী।

ইপিএস ২.৩৯ টাকার স্থলে ২.৭৯ টাকা দেখিয়ে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন তুলেছে ন্যাশনাল ফিড। বিএএস অনুযায়ী বোনাস শেয়ারের ওপর পূর্ণ বছরের ইপিএস গণনা করতে হয়। সে হিসাবে ২০১২ অর্থবছরে ন্যাশনাল ফিডের ইপিএস হয় ২.৩৯ টাকা। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বোনাস শেয়ারকে ওয়েটেড পদ্ধতিতে হিসাব করে ইপিএস বাড়িয়ে ২.৭৯ টাকা দেখিয়েছে।

এ ছাড়া অন্য কোম্পানির ঋণ নিজ কোম্পানির নামে দেখিয়ে প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে খুলনা প্রিন্টিং পুঁজিবাজার থেকে টাকা উত্তোলন করেছে।

আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর চেয়েও আইপিওতে আসার সময় দুর্বল কোম্পানির মুনাফা বেশি হয়ে থাকে, যা সম্ভব না। এ ক্ষেত্রে এ সব কোম্পানির মুনাফা খতিয়ে দেখলে কারণ নির্ণয় করা সম্ভব বলে জানান তিনি।

পেনিনসুলা চিটাগাং লিমিটেড সর্বশেষ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ওয়েটেড পদ্ধতিতে এনএভিপিএস ৫৪.৭৫ টাকা প্রকাশ করেছে। বেসিক পদ্ধতি অনুযায়ী এনএভিপিএস ৩২.৬৩ টাকা। আর ওয়েটেড পদ্ধতিতে ইপিএস ২.৭০ টাকা দেখানো হলেও বেসিক পদ্ধতিতে তা হবে ১.৬১ টাকা। গত ৯ সেপ্টেম্বর লভ্যাংশসহ আর্থিক তথ্য স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হলেও এনএভিপিএস ও ইপিএস বেসিক না ওয়েটেড তা উল্লেখ করেনি পেনিনসুলা কর্তৃপক্ষ। ফলে এ নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়েছে বিনিয়োগকারীসহ বাজার সংশ্লিষ্টদের। এছাড়া ওয়েটেড হিসাব প্রকাশ করার কারণে কোম্পানির সঠিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাননি বিনিয়োগকারীরা।

বিকন ফার্মা বিএএস-৩৯ এর প্যারা ৪৬ ও ৫৫ পরিপালন না করে মুনাফা ও প্রতি শেয়ারে আয় (ইপিএস) বেশি দেখিয়েছে। কোম্পানিটি একটিভ ফাইনের ২ লাখ শেয়ার কেনে এবং লভ্যাংশ হিসেবে ১ লাখ ৪৫ হাজার বোনাস শেয়ার পায়, যা বিএএস অনুযায়ী মূল্যায়ন না করে মুনাফা বেশি দেখানো হয়েছে।

বিকন ফার্মা ২০১৩ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে আইপিও ব্যয়কে চলতি সম্পদ হিসেবে দেখিয়েছে, যা বিলম্বিত আইপিও ব্যয় শিরোনামে রাখা হয়েছে। যে কারণে সম্পদের পরিমাণ বেশি হয়েছে। কিন্তু বিএএস-৩২ এর প্যারা ৩৭ অনুযায়ী, ওই ব্যয়কে চলতি সম্পদ হিসেবে দেখানো বিধিসম্মত নয়। বিএএস-১২ এর প্যারা-১৫ অনুযায়ী, এ্যাকাউন্টিং বেসিস ও ট্যাক্স বেসিসে স্বল্পমেয়াদি পার্থক্যের ওপর বিলম্বিত কর গণনা করার নিয়ম থাকলেও কোম্পানিটিতে তা করা হয়নি।

হিসাব মান উপেক্ষা করে মুনাফা বেশি দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওরিয়ন ইনফিউশনের বিরুদ্ধে। কোম্পানি সর্বশেষ অর্থবছরে সাড়ে ১১ লাখ টাকা অতিরিক্ত মুনাফা দেখিয়েছে।

সর্বশেষ ২০১২-১৩ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে জানা গেছে, বাংলাদেশ এ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড (বিএএস), কোম্পানি আইন ও করপোরেট গভর্নেন্স গাইডলাইনস (সিজিজি) পরিপালন করে না ওরিয়ন ইনফিউশন। বাংলাদেশ এ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড (বিএএস)-১৬ অনুযায়ী আসবাবপত্র ও যানবাহনে অবচয় কম ধার্য করে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকার সমপরিমাণ সম্পদ ও মুনাফা বেশি দেখিয়েছে ওরিয়ন ইনফিউশন।

ওয়াটা কেমিক্যালের সর্বশেষ ২০১৩ সালের আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে ৭ আপত্তি ‍তুলেছে নিরীক্ষক জামান হক এ্যান্ড কোং। যেখানে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ মুনাফা ও সম্পদের পরিমাণ বেশি দেখানোসহ নানা অসঙ্গতিপূর্ণ কাজ করেছে। আর্থিক প্রতিবেদনের ২৩নং নোট অনুযায়ী, ওয়াটা কেমিক্যাল কর্তৃপক্ষ ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) কাছ থেকে ১২ কোটি টাকার ডিবেঞ্চার (ঋণ) নিয়েছে ১৫ শতাংশ সুদে। যা বছরে ২ কিস্তি অনুযায়ী মোট ১০ কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য। এর মধ্যে ২০১৩ সালে কোম্পানিটি প্রথম কিস্তি পরিশোধ করেছে। আর এই ঋণের বিপরীতে কোম্পানিটির সব স্পর্শনীয় সম্পদ আইসিবির কাছে আইনসঙ্গত দাবি (লিয়েন) হিসেবে দিয়েছে।

নিরীক্ষকের মতে, ওয়াটা কেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে। আর ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও ২ কোটি ২ লাখ টাকা সুদবিহীন ঋণ রয়েছে। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ আর্থিক হিসাবে ২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পরিশোধ ও ২ কোটি ৭০ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে।

কোম্পানিতে পুনর্মূল্যায়নের কারণে (জমি ছাড়া) ৪০ কোটি ৭৯ লাখ টাকার সম্পদ বেড়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ মাত্র ১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকার উপরে অবচয় ধার্য করেছে। এতে করে কোম্পানি একদিকে ব্যয় কম দেখিয়েছে অন্যদিকে মুনাফা ও সম্পদের পরিমাণ বেশি দেখিয়েছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির চিত্র একই। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে বিএসইসিকে প্রত্যকটি কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে নিরীক্ষকদের দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, একটি কোম্পানি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার ক্ষেত্র আর্থিক প্রতিবেদন, যার ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। আর এই আর্থিক প্রতিবেদনের সত্যতা যাছাই করে অডিটর। সুতরাং পুঁজিবাজারের উন্নয়নের জন্য সঠিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত অডিট হওয়া দরকার।

এ ব্যাপারে কয়েকজন অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীর সঙ্গে কথা বললে তারা দ্য রিপোর্টকে জানান, অধিকাংশ বিনিয়োগকারী কোম্পানির ইপিএস দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু কোম্পানিগুলো যদি ভুয়া ইপিএস দেখা তাহলে তার পরিণাম ভোগ করতে হয় বিনিয়োগকারীদের। ভুয়া ইপিএসের কারণে অনেক সময় কিছু কিছু কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি হয়। আর নামি দামি কোম্পানিগুলোর শেয়ারগুলোর প্রতি আগ্রহ বাড়ে। ফলে ওসব শেয়ারের দর আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে।

(দ্য রিপোর্ট/ডিসেম্বর ০৭, ২০১৪)