নারায়ণগঞ্জে উত্তেজনা : আড়ালে ‘বড় ভাইরা’

নারায়ণগঞ্জে উত্তেজনা : আড়ালে ‘বড় ভাইরা’

আনিস রায়হান

Toki Murder Case - Ekush.info

নারায়ণগঞ্জে একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে। জাতীয় রাজনীতির নানা ইস্যু একটাকে কিছুটা চাপিয়ে দিতে না দিতেই কয়েক দিনের ব্যবধানে ঘটছে নতুন কোনো ঘটনা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুই অংশের দ্বন্দ্ব, বামপন্থি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মীদের সরাসরি আওয়ামী লীগের একাংশের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান এবং ত্বকী হত্যাকাণ্ড ঘিরে সারা দেশের মানুষের উদ্বেগ এখানকার রাজনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। মুখোমুখি পক্ষগুলো উত্তেজনার বশে একের পর এক এসব ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে ক্ষমতার খেলা।

ঘটনা যাই ঘটুক জন্ম দিচ্ছে প্রচণ্ড উত্তেজনার। মানুষ উত্তেজিত, আতঙ্কিত। কিন্তু দিন শেষে সবকিছু গিয়ে এক নদীতেই মিলছে। তা হচ্ছে, কোনো না কোনোভাবে রক্ষা করার চেষ্টা করা হচ্ছে শামীম ওসমানকে। কিছুদিন আগেই ১০ দিনের মধ্যে তিন জনের গুম হওয়ার ঘটনায় মানুষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কেউ ভেবেছিল মাঠ গরম করে নিজের পক্ষে নিতে শামীম ওসমান এসব করাচ্ছেন। কেউ মনে করেছেন এগুলো আসলেই প্রশাসনের কাজ। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত শামীম ওসমানের দিকেই গেল।

ঘটনাবলীর মোড় হঠাৎ ঘুরিয়ে দিয়েছে আসামি লিটনের জবানবন্দী। ত্বকী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে ডিবি পুলিশ গত ২৯ এপ্রিল লিটনকে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানা এলাকার এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। এরপর থেকে লিটন নারায়ণগঞ্জ কারাগারে ছিল। গত ১৫ জুলাই উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে নারায়ণগঞ্জ কারাগার থেকে বের হওয়ার পর লিটনকে র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়। ১৪ দিন পর লিটনকে ত্বকী হত্যা মামলায় আটক না দেখিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় হওয়া একটি মাদক মামলায় আদালতে হাজির করা হয়। ওই মামলায় লিটনকে ৫০ পিস ইয়াবাসহ আটক দেখানো হয়। তবে কোথা থেকে ও কখন তাকে আটক করা হয়েছে, তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-১১-এর এএসপি রবিউল ইসলাম।

Toki-Ekush.info২৯ জুলাই সন্ধ্যার পর তাকে নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট যাবিদ হোসেনের আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে লিটনের দেয়া জবানবন্দীটি নিয়ে এখন সবাই দ্বিধাদ্বন্দ্বে। স্থানীয় কিছু সূত্র জানায়, লিটন জবানবন্দীর আগে স্বীকারোক্তিতে অনেকের নাম বলেছে। যা জবানবন্দীতে আর আসেনি। জবানবন্দীতে লিটন বলেছে, সে বন্ধু রাজিবের খোঁজে রিপন সাহেবের বাড়িতে যায়। জাপা নেতা রিপনের বাড়িতে গিয়ে সে অফিসের একটি কক্ষে ত্বকীকে হাত-পা ও মুখ বেঁধে পেটাতে দেখে। ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত হাজি রিপন। তার বাড়িতেই ঘটেছে হত্যাকাণ্ড। তিনি নিজেকে জেলা জাতীয় শ্রমিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও নগর জাপার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। তার ছেলে সালেহ রহমান সীমান্ত হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ইউসুফের জবানবন্দীতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকা যে কয়জনের নাম এসেছে তারা হচ্ছেন- রাজিব, অপু, ভ্রমর, কালাম শিকদার, সীমান্ত, সে নিজে ও অজ্ঞাত আরও একজন। এরা সবাই ওসমান পরিবারের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত।

লিটন জবানবন্দী দিতে গিয়ে বলে, ওই ৫-৭ যুবকের সঙ্গে সে নিজেও ত্বকীকে মারধর করে। এ সময় ত্বকী অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছিল। এক পর্যায়ে কালাম শিকদার ত্বকীকে গলা টিপে হত্যা করে। এরপর লাশ ফেলে দেয়ার জন্য একটি বড় ব্যাগ আনা হয়। ওই ব্যাগে ত্বকীর লাশ ভরে একটি প্রাইভেট কারে শহরের কালীরবাজার দেলোয়ার টাওয়ারের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই সময় দেলোয়ার টাওয়ারের পূর্ব পাশে শীতলক্ষ্যা নদীতে একটি নৌকা অপেক্ষায় ছিল। ওই নৌকায় লিটন ও সীমান্তসহ ৩ জন ত্বকীর লাশ নিয়ে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের তীরে গিয়ে ব্যাগ থেকে লাশ ফেলে দিয়ে চলে আসে।

তবে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, জবানবন্দীতে অনেক কিছু চেপে গেলেও এর আগে স্বীকারোক্তি দেয়ার সময় লিটন একজন বড় ভাইয়ের কথা বলেছিলেন। সেখানে সে সবার নামই স্বীকার করে। কিন্তু জবানবন্দীতে তা আর স্বীকার না করায় আড়ালে চলে গেছেন বড় ভাইরা।

গত ৬ মার্চ শহরের পুরাতন কোর্টের বাসা থেকে বের হয়ে ত্বকী নিখোঁজ হয়। পরে ৮ মার্চ সকালে তার লাশ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের তীর থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিনই ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বী কারও নাম উল্লেখ না করে সদর মডেল থানায় মামলা করেন। তবে তার অভিযোগ, শামীম ওসমান তার ভাই, ছেলে ও তাদের সংশ্লিষ্ট লোকজনই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত।

লিটনের জবানবন্দীর পর একটু চাঙা হয়েছেন শামীম ওসমান। তার দাবি লিটনের দেয়া জবানবন্দীর কোথাও শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, যুবলীগ নেতা জহিরুল ইসলাম পারভেজের নাম নেই। শামীম ওসমানের সমর্থকরা এই জবানবন্দীর ওপর ভিত্তি করে ক্ষোভ দেখাচ্ছেন। তারা বলছেন এ থেকে প্রমাণিত হয় এতদিন লাশের রাজনীতি চলছিল। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ক্যাঙ্গারু পারভেজকেও হয়ত আটক করা হয়ে থাকতে পারে।

এর আগে এক মাসে ক্ষমতাসীন দলের তিনজন গুম হয়। প্রথমেই গুম হওয়া যুবলীগ ক্যাডার ক্যাঙ্গারু পারভেজকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হতে না হতেই আবার একই গ্রুপের আরও দুই জনের গুমের অভিযোগ করে তাদের পরিবার। এদের মধ্যে একজন জাতীয় পার্টির অন্যতম সহযোগী সংগঠন জাতীয় যুব সংহতির নামধারী নেতা এবং অপরজন হলেন স্থানীয় এমপি নাসিম ওসমানের একমাত্র ছেলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। গুম হওয়া প্রত্যেককেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার ধরনও ছিল একইরকম। কিন্তু পরবর্তীতে লিটনের জবানবন্দীর আগ পর্যন্ত কোনো সংস্থাই গুম হওয়াদের আটক বা গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।

গত ৬ জুলাই বিকেলে রাজধানীর গুলশান-২ থেকে ডিবি পরিচয়ে ১০-১২ অস্ত্রধারী নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবলীগের বহিষ্কৃত প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া পারভেজকে (ক্যাঙ্গারু পারভেজ) তুলে নিয়ে যায়। এ সময় পারভেজের সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী সোহানা আক্তার। এ ঘটনায় সেদিন সন্ধ্যায় পারভেজের স্ত্রী গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পারভেজ নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ঘটনায় একটি চার্জশিটে অভিযুক্ত।

গত ১৫ জুন বিকেলে ত্বকী হত্যার আরেক সন্দেহভাজন আটক ইউসুফ আহমেদ লিটনকে একই পন্থায় র‌্যাব পরিচয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের রাস্তার সামনে থেকে তুলে নিয়ে যায়। লিটন ত্বকী হত্যায় উচ্চ আদালতে ৬ মাসের জামিন নিয়ে সোমবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ কারাগার থেকে বের হয়। এ সময় দুটি সিলভার রঙের মাইক্রোবাসে থাকা সাদা পোশাকধারী ১০-১২ জন অস্ত্রধারী তুলে নিয়ে যায় লিটনকে। পরবর্তীতে বিষয়টি থানায় অভিযোগ করা হলে নারায়ণগঞ্জ র‌্যাব-১১-এর কর্মকর্তারা লিটনকে আটকের কথা অস্বীকার করেন। যদিও শেষ পর্যন্ত র‌্যাবই লিটনকে আদালতে হাজির করেছে। তবে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে অনেক পরে।

তবে ১৫ জুন সন্ধ্যায় ফের স্ত্রীর সামনে থেকে প্রশাসনের লোক পরিচয়ে ৭-৮ পোশাকধারী নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি নাসিম ওসমানের একমাত্র ছেলে আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমরকে তুলে নিয়ে গেছে। সোমবার সন্ধ্যায় কেরানীগঞ্জের একটি গ্যারেজে এ ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে ভ্রমরের স্ত্রী তানিয়া আক্তার বাদী হয়ে কেরানীগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। পরবর্তীতে কোনো সংস্থাই ভ্রমরকে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেনি।

এ থেকে প্রশ্ন উঠেছিল প্রশাসন এদের তুলে নিচ্ছে নাকি সত্যি এরা গুম হচ্ছে। একের পর এক গুমের মতো ঘটনা ঘটলেও নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ এটাকে খুব একটা গায়ে লাগাচ্ছেন না। নারায়ণগঞ্জবাসী অনেকেই মনে করেন, যারা গুম হচ্ছে সবাই শামীম ওসমান গ্রুপের। সাম্প্রতিক অবস্থায় চাপের মধ্যে থাকা শামীম ওসমান নিজেকে চাপমুক্ত করতে এ কৌশল নিয়েছেন। বিরোধীদের এই ইস্যুতে শায়েস্তা করে নিজের ইমেজ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।

শহরের আইলপাড়ার বাসিন্দা বঙ্কিম প্রামানিক বলেন, ‘ক্যাঙ্গারু পারভেজ হলো শামীম ওসমানের সর্বশেষ সেনাপতি। তাকে হারিয়ে প্রথমে খুব উত্তেজনা ছড়িয়েছিল শামীম ওসমান। কিন্তু এখন কেমন যেন মিইয়ে গেছে। এমনকি পারভেজকে নিয়ে তার পরিবারেও আহাজারি নেই। তার স্ত্রী সোহানা প্রথমে রাস্তাঘাটে বের হলেও এখন এ নিয়ে একদম চুপ। আমার মনে হয়, পুরো ঘটনা সাজানো ছিল। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর হয়ত ধমক টমক দিয়েছে। তাই এখন সব চুপ।’

উত্তর চাষাঢ়া এলাকার সাংস্কৃতিক কর্মী হেলাল বলেন, ‘পারভেজ গুম হওয়ার দুদিন পর শামীম ওসমান বিদেশ থেকে ফিরে শহরে হুঙ্কার দেন, আইভী-রাব্বি এ ঘটনায় দায়ী। তিনি ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে বলেন, আগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে পারভেজকে ফিরে পাওয়া না গেলে প্রধানমন্ত্রী দেশে এলে তার পা ছুঁয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে গুডবাই জানাবেন। কিন্তু রাজনীতিকে গুডবাই তিনি এখনো জানাননি। আমার ধারণা তাদের পরিকল্পনা কাজে লাগেনি। তাই এখন তারা চুপ করে নতুন পরিকল্পনা করছে। এখন পারভেজকে কিভাবে উপস্থাপন করবে তা নিয়ে কাজ চালাচ্ছে।’

নারায়ণগঞ্জের অনেকের মতে, ক্যাঙ্গারু পারভেজ বা অন্য যারা গুম হচ্ছে, এদের গুম হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। অপরাধী হিসেবে পুলিশ এদের ধরে নিয়ে যেতে পারে। যদি পুলিশ তাদের না নেয়, তাহলে নিজের লোকদের গুম করে শামীম ওসমান নাটক সাজাচ্ছেন।

নারায়ণগঞ্জ উদীচীর জেলা সংসদের সভাপতি জাহিদুল হক ভূইয়া দিপু বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শামীম ওসমান কিছুটা চাপের মধ্যে আছেন। তার পরিবারের ওপর মানুষের ঘৃণা বাড়ছেই। ত্বকী হত্যার পর তার কিছু না হলেও তার ওপর চাপটা রয়েছে। সামনে নির্বাচন আসছে। এরকম পরিস্থিতি চলতে থাকলে তাদের পুরো পরিবার বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। তাই পরিস্থিতি নিজের পক্ষে আনার জন্য তার কিছু করা দরকার ছিল। মাদকাসক্ত ক্যাঙ্গারু পারভেজ যখন মাদকাসক্তি পুনর্বাসন থেকে বাড়ি ফিরছিল তখন তাকে গুমের নাটক সাজিয়ে দলের মধ্যে নিজের অবস্থানটা কিছুটা পাকাপোক্ত করার উদ্যোগ নেন তিনি। ভেবেছিলেন মানুষের সহানুভূতি মিলবে। কিছুই মেলেনি। তাই একের পর এক নাটক সাজিয়ে যাচ্ছেন।’

গুম নাটকের পাশাপাশি অনেকের ধারণা যাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না তারা কেউ কেউ মারা পড়তে পারেন। ওসমান পরিবার অপরাধের সাক্ষী রাখে না। তাই এদেরকে খুন করা হচ্ছে। নগরীর বন্দর এলাকার একজন শ্রমিক বলেন, ‘তারা খুব ডেঞ্জারাস। দলের লোক হোক আর যেই হোক কাউরে ছাড় দেয় না। কাজ শেষ হইলেই মারি ফালাইব।’

জনগণের এ আশঙ্কা আসলে উস্কে দিয়েছে অতীতের কিছু ঘটনা। ওসমান পরিবারের নির্দেশে শহরে এ পর্যন্ত বেশ কটি হত্যাকাণ্ড ঘটার অভিযোগ আছে। এমনকি পরে হত্যাকারী গুম হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মানুষের ধারণা, সাক্ষী না রাখার জন্য ওসমান পরিবারের লোকজনই খুন করেছে হত্যাকারীদের।

স্থানীয় অনেকেই ব্যবসায়ী আশিক ইসলাম হত্যাকাণ্ডের কথা জানিয়ে বলেছেন, ২০১১ সালের ১১ মে আশিক নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর পরিবার শামীম ওসমানের সহযোগী সিজার ও সিদ্দিকের বিরুদ্ধে মামলা করে। নিখোঁজ হওয়ার দু-একদিন পর আশিকের লাশ পাওয়া যায়। এর পর থেকেই নিখোঁজ সিদ্দিক। ২০১২ সালে মিঠু নামের আরেক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগে সিজার ও আমিনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। মিঠু হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন পর কক্সবাজারে একটি হোটেলের কক্ষ থেকে আমিনের লাশ উদ্ধার হয়।

স্থানীয়দের মতে, আগের মতোই এবারও কাজ হচ্ছে। ত্বকী হত্যার ঘটনায় শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান ও ক্যাঙ্গারু পারভেজ অন্যতম আসামি। শামীম ওসমান ত্বকী হত্যাকাণ্ড থেকে নিজে বাঁচতে ও অন্যদের বাঁচাতে এই নাটক সাজিয়েছেন।

মানুষের মধ্যে তাই গুম হওয়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ খুন হওয়ার বধ্যমূল ধারণা জন্মেছে। প্রতিদিনই নারায়ণগঞ্জে গুজব ছড়িয়ে পড়ছে লাশ পাওয়ার। মানুষ ছুটে যাচ্ছে নদীর পাড়ে। বন্দরের আশেপাশে হঠাৎই জমছে মানুষের জটলা। এরকম অন্তত ছয়টি ঘটনা ঘটেছে গত কয়েকদিনে। ৮ জুলাই সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জ শহরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, যুবলীগ ক্যাডার পারভেজের লাশ পাওয়া গেছে। কেউ বলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে, কেউবা নরসিংদী; আবার কেউবা ধলেশ্বরী নদীতে পারভেজের লাশ পাওয়ার খবর দেন। কিন্তু কারও দেয়া তথ্যেরই কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। ১০ জুলাই রটে যায়, একটি সেপটি ট্যাঙ্কের ভেতর লাশ পাওয়া গেছে। কিন্তু পরে এরও কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। স্থানীরা বলছেন, মানুষের বদ্ধ্যমূল ধারণা, এদের মেরে ফেলা হয়েছে। এজন্যই লাশের গুজব রটছে প্রতিদিন।

পাল্টাপাল্টি দুই পক্ষ

IVE-shamim-Ekush.infoক্যাঙ্গারু পারভেজ গুমের অভিযোগের পর থেকে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি উত্তপ্ত। পারভেজ গুমের পর পরই তার স্ত্রী মেয়র আইভী ও ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বিকে দায়ী করে বিবৃতি দেন। এরপর থেকে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মহড়া ও উত্তেজনা ছড়ানো।
শামীম ওসমান হুঙ্কার দেন বিরোধীদের বাড়িঘরের ইট-সুরকি খুলে নেবেন। এর জবাবে আইভী বলেন, শামীম অপরাজনীতি শুরু করেছে। রফিউর রাব্বী পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেন, কোনো বাড়িতে যদি হামলা হয়, কারো বাড়ি থেকে যদি কাউকে তুলে আনার চেষ্টা হয় তাহলে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ নিয়ে সন্ত্রাসীদের জ্যান্ত কবর দেয়া হবে।
এর পরপরই শামীম ওসমান জানান দেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে তিনি দল থেকে পদত্যাগ করে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামবেন। যদিও তার এ হম্বিতম্বি প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর অনেকটাই বন্ধ। যদিও তার পক্ষে আওয়ামী লীগের একাংশ প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। পাল্টা বক্তব্য দিয়ে চলেছে বামপন্থিরা এবং আইভীর পক্ষ থেকেও জোর গলায় বক্তব্য রাখছেন অনেকে।
এসব পরিস্থিতি একটু মিইয়ে আসতেই এলো লিটনের জবানবন্দী। লিটনের জবানবন্দীর ফলে শামীম ওসমান পক্ষ আবার কিছুটা চাঙা হলো। এই পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হলো এই শেষ না। আরও তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বের হবে। এ নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের ফলাফল, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক।

কিছু একটা ঘটবে!
সাধারণ মানুষ, এতসব ঘটনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে খেই হারিয়ে ফেলছেন। প্রতিদিনই বদলাচ্ছে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি। কোথা থেকে কি ঘটতে যাচ্ছে কেউই কিছু বুঝতে পারছেন না। তবে সবার মধ্যেই একটা আশঙ্কা। খুব খারাপ কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। অনেকে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্বের আশঙ্কা করছেন। অনেকের আশঙ্কা বড় কোনো আচমকা হামলা ঘটে যেতে পারে যে কারো ইন্ধনে।
এক্ষেত্রে শামীম ওসমানকেই সন্দেহের চোখে দেখছেন সবাই। মানুষের ধারণা, খুব দ্রুত কিছু একটা ঘটাতে যাচ্ছেন তিনি। যার জন্য এত আয়োজন। সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী আল আমিন বলেন, ‘শামীম ওসমান সবসময়ই হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন। মানুষ এখন আর এসবের পরোয়া করে না। কিন্তু গত কয়েকদিনে একের পর এক এতসব ঘটনা ঘটছে যে, মনে হচ্ছে অনেক বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সে। হেফাজতকে তার সমর্থন দেয়ার পর থেকেই এখানকার প্রগতিশীলদের সঙ্গে তার বিশেষ বিরোধ তৈরি হয়েছে। সবাইকে নারায়ণগঞ্জ থেকে বের করার কথা সে আগেই বলেছিল। এখন হয়ত সেই পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে।’

নারায়ণগঞ্জের ঘোলাটে এই রাজনৈতিক অবস্থা জনগণকে আতঙ্কিত করে রেখেছে। কোনো পক্ষই চুপ নেই। যে যাকে যেভাবে পারছে আক্রমণ করছে। স্থানীয় পত্রিকাগুলো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে শামীম ওসমানের পক্ষে বিপক্ষে সংবাদ প্রচার করে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রশাসনের কোনো ভূমিকাও চোখে পড়ছে না। প্রশাসনকে প্রশ্ন করা হলে তারা বলছে আমরা অপহৃতদের উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছি। কিন্তু এই পরিস্থিতির অবসান চায় জনগণ।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা মনে করে, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপই পারে এই অবস্থার অবসান ঘটাতে। আর সাধারণ মানুষ চায় অধিকতর তদন্তের ভিত্তিতে প্রকৃত সত্য বের করে আনা হোক। আসামিদের শাস্তি দেয়া হোক। আবার অনেকের দাবি শামীম ওসমানকে বিচারের আওতায় আনলেই সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে। এতে নারায়ণগঞ্জে শান্তি আসবে বলে মনে করেন তারা। তাতেও দরকার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। ত্বকীর ঘটনার পুনরাবৃত্তি নারায়ণগঞ্জের মানুষ আর দেখতে চায় না।

Selina Ivy - Ekush.info‘লেজ বেরিয়েছে মাথাও বের হবে’
ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী
মেয়র, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন

সাপ্তাহিক : লিটনের জবানবন্দী কিভাবে দেখছেন?
ডা. আইভী : একটি কথাই বলব। লেজ বেরিয়েছে, মাথাও বের হবে। যাদের নাম এসেছে তারা সবাই শামীম ওসমানের লোক।
সাপ্তাহিক : পারভেজকে গুমের অভিযোগ এসেছে আপনার বিরুদ্ধে।
ডা. আইভী : পারভেজ তারই রাজনীতি করে। এগুলো পারভেজ আর সে করত। আমাদের নামের পাশে কখনো এ ধরনের অভিযোগ লেখা থাকবে না। বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি এখন নতুন খেলায় মেতেছেন।
তিনি যুবলীগের একজন বহিষ্কৃত সন্ত্রাসীর জন্য সড়ক অবরোধ, মশাল মিছিল করে শহরে যেভাবে বাড়াবাড়ি করছেন তাতে করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। তার নির্দেশে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। দলের অনুগত নেতাকর্মীদের সুনাম ক্ষুণেœর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। পারভেজের কাজই প্রমাণ দেয় শামীম ওসমান রাজনীতিতে কেমন ধরনের কর্মী তৈরি করেছেন। তার বেশিরভাগ কর্মীর বিরুদ্ধেই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
সাপ্তাহিক : এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের শেষ পরিণতি কি?
ডা. আইভী : আমরা সন্ত্রাসী রাজনীতির অবসান চাই। কোনো সন্ত্রাসীকে রাজনীতিতে দেখতে চাই না। আমি চাই সাধারণ মানুষ জেগে উঠে এদের হটিয়ে দিক। এরা চলে যাওয়ার হুমকি দেয় কিন্তু ঠিকই ঘাপটি মেরে বসে থাকে। এরা দলে থাকে সুবিধার জন্য। দলের জন্য কিছু করে না। তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিলে আওয়ামী লীগ বেঁচে যাবে।
তিনি ও তার ছেলে ত্বকী হত্যা মামলায় অভিযুক্ত। মূলত এই হত্যা মামলা থেকে রেহাই পেতেই ক্যাঙ্গারু পারভেজকে নিয়ে তিনি গুম নাটক সাজিয়েছেন। ক্যাঙ্গারু পারভেজকে হয়ত পাশের কোনো দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। গডফাদাররা কখনো দলের জন্য শুভ কিছু বয়ে আনতে পারেনি। তারা দলকে ডোবাচ্ছে। শামীম ওসমানরা সবসময়ই দলের জন্য বোঝা।

Shamim-Osman_Ekush.info‘আস্তে আস্তে প্রমাণ হচ্ছে সব অপপ্রচার’
শামীম ওসমান
আওয়ামী লীগ নেতা, সাবেক সাংসদ
সাপ্তাহিক : লিটনের জবানবন্দী কিভাবে দেখছেন?
শামীম ওসমান : আমি বরাবরই বলে এসেছি এসবের সঙ্গে আমার পরিবার জড়িত না। কে বা কারা জড়িত তাও আমরা জানি না। আমাকে ফাঁসানোর জন্য বিরাট পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে একটা মহল। তবে লিটনের জবানবন্দী এটা স্পষ্ট করেছে যে, এর সঙ্গে আমাদের কোনো যোগসূত্র নেই। আস্তে আস্তে প্রমাণ হচ্ছে সব অপপ্রচার।
সাপ্তাহিক : যারা খুনে জড়িত ছিল সবাই তো আপনার লোক।
শামীম ওসমান : বাজে কথা বলবেন না। আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় থাকলেই কি আপনি যা করবেন তার জন্য আমি দায়ী থাকব নাকি। আমি জননেতা। নারায়ণগঞ্জের সবাই আমার পরিচিত। সবাই কম বেশি আমার কাছে আসে। কেউ কম আসে। কেউ বেশি। এটা হবেই।
সাপ্তাহিক : অভিযোগ উঠেছে আপনি নিজেই পারভেজকে গুম করেছেন। অতীতেও এ ধরনের কাজ করেছেন বলে নারায়ণগঞ্জবাসীর দাবি?
শামীম ওসমান : এসব কথা আমার বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকেই বলা হচ্ছে। ওসমান পরিবার নারায়ণগঞ্জের মানুষের ভালোবাসা নিয়েই টিকে আছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে মানুষ আমাদের পাশে দাঁড়াত না। যারা গুম করিয়েছে তারা এখন আমার বিরুদ্ধে এসব রটাচ্ছে। তারা ভালো মানুষের মুখোশ পরে একের পর এক কুকর্ম করে যাচ্ছে।
সাপ্তাহিক : আপনার কেন মনে হয়, রফিউর রাব্বি ও আইভী পারভেজকে গুম করেছে?
শামীম ওসমান : দীর্ঘদিন থেকে তারা আমার বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছে। আমাকে হত্যা করতে না পেরে আমার কাছের মানুষগুলোকে টার্গেট করেছে। আমি শতভাগ নিশ্চিত পারভেজকে সিটি মেয়র আইভী ও রফিউর রাব্বি মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে চুক্তির মাধ্যমে খুনের উদ্দেশ্যে গুম করেছে।
সাপ্তাহিক : খুনি হিসেবে তো তাদের কোনো পরিচয় নেই। বরং আপনার আছে।
শামীম ওসমান : তাহলে আমার কাছে এসেছেন কেন? তাদের কাছে যান। তারা টাকা দিয়ে সংবাদ মাধ্যম কিনে ফেলছে।
সাপ্তাহিক : পারভেজকে না পেলে পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। করলেন না কেন? নাকি পেয়ে গেছেন?
শামীম ওসমান : অসহায় নেতাকর্মীদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে বাধ্য হয়েছি। আর কত সহ্য করবে তারা? কোর্ট থেকে মামলা গেলেও থানা মামলা নিচ্ছে না। যাদের প্রভাবে মামলা নিচ্ছে না তারাই পারভেজকে গুম করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জবাব চাইতে পারছি না দলে থাকার কারণে। বাধ্য হয়ে বলেছিলাম। পারভেজকে এখনো পাইনি। তাকে প্রশাসন থেকেও খোঁজা হচ্ছে। আসল অপরাধীদের ধরা হলে পারভেজকে পাওয়া যাবে।
সাপ্তাহিক : এখন কি করতে চাচ্ছেন?
শামীম ওসমান : সরকার এবং দলের ভাবমূর্তি বিবেচনা করেই চুপ করে আছি। জননেত্রীর হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় আছি আমি।

Rafiur Rabbi -Ekush.info‘আরও জবানবন্দী বাকি আছে’
রফিউর রাব্বি
আহ্বায়ক, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ
সাপ্তাহিক : শামীম ওসমান তো বলছেন লিটনের জবানবন্দীতে তার নাম আসেনি। এতদিন তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছে?
রফিউর রাব্বি : একটা জবানবন্দী থেকেই সবকিছু উদ্ধার হয় না। আমরা শুনেছি স্বীকারোক্তিতে সে সবার নামই স্বীকার করেছিল। কিন্তু আদালতে জবানবন্দী দেয়ার সময় সে এটা স্বীকার করেনি। তবে এ থেকেও অনেক কিছু বেরিয়ে এসেছে। যাদের নাম এসেছে এরা কারা? এরা কার পালিত সন্ত্রাসী? এদের কে নির্দেশ দেয়? লিটনকে আবারও জবানবন্দী দিতে বলা হলে আরও তথ্য বের হবে। অন্য আসামিদের জবানবন্দী এলে আরও কিছু জানা যাবে। আরও জবানবন্দী বাকি আছে তো। সব একত্র হলে আসল বড় ভাইদের চেহারা স্পষ্ট হবে। খুনের মূল পরিকল্পনাকারীদের ধরা যাবে তখন। আরও তদন্ত দরকার।
সাপ্তাহিক : অভিযোগ করা হচ্ছে, আপনি নাকি ক্যাঙ্গারু পারভেজের গুমের সঙ্গে জড়িত?
রফিউর রাব্বি : ত্বকীর হত্যায় অভিযুক্ত যুবলীগ ক্যাডার পারভেজ অপহরণের পর থেকে এসব কথা শামীম ওসমান বলে আসছেন। নিজের সন্ত্রাসী চেহারা আমাদের ওপর মিথ্যে অপবাদ দিয়েও ঘোচাতে পারেননি। বলছেন, নারায়ণগঞ্জের অনেকের বাড়িঘরের ইট-সুরকি খুলে নেবেন। বাড়িঘর থেকে মা বোনদের তুলে নিয়ে আসবেন। কথার মধ্যদিয়েই তার সন্ত্রাসী চেহারাটা বেরিয়ে আসছে।
তার এ ধরনের হুমকি-ধমকি মিথ্যাচার নতুন কিছু নয়। বিরোধীদের ফাঁসাতে এ ধরনের কথা আগেও বলেছেন তিনি। ৩ বছর আগে শামীম ওসমানের ক্যাডার নুরুল আমিন মাকসুদকে একই রকমভাবে রাস্তা থেকে তুলে নেয়া হয়। পরে তার লাশ পাওয়া যায়। অনেকের মুখে শোনা যায়, মাকসুদকে অপহরণ করিয়ে শামীম ওসমানই হত্যা করিয়েছে। মাকসুদের মৃত্যুর পর তার স্ত্রীকে দিয়ে শামীম ওসমান বলিয়েছিল মেয়র আইভী নাকি মাকসুদকে হত্যা করিয়েছে। পরে মাকসুদের স্ত্রী মেয়র আইভীর সঙ্গে দেখা করে এ কথার জন্য মাফ চেয়েছে। একই ভাবে পারভেজের স্ত্রীকে দিয়েও শামীম ওসমান বলিয়েছে যে পারভেজের ঘটনার জন্য আমি ও মেয়র দায়ী।
সাপ্তাহিক : পারভেজের ক্ষেত্রে আসলে কি ঘটেছে বলে আপনার মনে হয়?
রফিউর রাব্বি : কি আর হবে? শামীম ওসমানের সঙ্গে যারাই যাক তাদের একই পরিণতি হবে। সারোয়ার ও মাকসুদ নারায়ণগঞ্জের সম্ভাবনাময় তরুণ ছিল। কিন্তু শামীম ওসমান হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে তাদের জীবনকে শেষ করে দিয়েছে। মাকসুদ অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছে আর সারোয়ার এখন রোগে ভুগে মৃত্যুপথযাত্রী। একই ভাবে আরও অনেক তরুণের জীবন শামীম ওসমান নষ্ট করেছে। এসব তরুণকে বিপথগামী করে শামীম ওসমান তার নিজের উপরে উঠার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে। এর পর যখনই মনে হয়েছে এরা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে তখনই এদের ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে।
পারভেজ তার মতোই একজন। তার আদলে গড়া। পারভেজকে প্রয়োজন ফুরোলে ছুড়ে ফেলতে তিনি দ্বিধা করবেন না। আর যদি প্রয়োজন এখনো থাকে তাহলে যা হচ্ছে পুরোটাই সাজানো নাটক। অথবা হতে পারে সেও প্রশাসনের হাতে আছে।
সাপ্তাহিক : এই অবস্থার শেষ কোথায়? আপনারা কি করতে চাচ্ছেন?
রফিউর রাব্বি : প্রশাসন যদি ত্বকীসহ অন্যসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্তদের ব্যাপারে ব্যবস্থা না নেয় তাহলে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা আন্দোলনে নামব। সরকারকে আহ্বান জানাই দ্রুতই এই সন্ত্রাসীদের বিচারের আওতায় আনার।