অর্থ পাচারের আশঙ্কা

শূন্য শুল্কের পণ্যের অস্বাভাবিক আমদানি বৃদ্ধি

অর্থ পাচারের আশঙ্কা

ইসমাইল আলী ও খান এ মামুন |

অর্থ পাচারের আশঙ্কা

চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) দেশের আমদানি ব্যয় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এর মধ্যে শূন্য শুল্কে বিভিন্ন যন্ত্রপাতির আমদানি বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। তৈরি পোশাক খাতের বিভিন্ন মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বেড়েছে কয়েক হাজার শতাংশ পর্যন্ত। টেক্সটাইল খাতও পিছিয়ে নেই এক্ষেত্রে। যদিও গত পাঁচ মাসে তৈরি পোশাক খাতের রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল খুবই কম। ফলে আমদানির নামে ব্যবসায়ীরা বিদেশে অর্থ পাচার করছেন কিনা সেই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

সূত্র জানায়, আমদানিকারকদের একটি বড় সিন্ডিকেট কয়েক বছর ধরে আমদানির নামে অর্থ পাচার করছে। কিন্তু  তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। অল্প কিছু জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন তারা। অর্থ পাচারে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যমূল্য বেশি দেখাচ্ছে, অন্যদিকে ঘোষণার সঙ্গে আমদানিকৃত পণ্যের পরিমাণের মিল নেই বলে প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক বিভাগ।

জানা গেছে, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হলেও চট্টগ্রাম, বেনাপোল ও মংলা শুল্ক গোয়েন্দার কায়িক পরীক্ষায় মিলেছে খালি কনটেইনার। কিছু কনটেইনারে কাঁচামাল আমদানির বদলে আনা হয়েছে ছাই, ইট, বালি, পাথর ও সিমেন্টের ব্লক। এর মাধ্যমে শিল্পঋণের বড় অংশই পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি ১০টি প্রতিষ্ঠান আমদানি দলিলাদিতেও মূল্যবান বৈধ পণ্য আমদানির ঘোষণা দিয়ে পাথরের খণ্ড, সিমেন্টের ব্লক, লোহার গুঁড়া ও খালি কনটেইনার এনেছে বলে প্রমাণ পেয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— এবিঅ্যান্ডডি করপোরেশন, আরামিট থাই অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেড, দাদা ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ইয়াসির এন্টারপ্রাইজ, এসআর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ, ইয়ং ওয়ান গ্রুপ, এসএল স্টিল, এলএসআই ইন্ডাস্ট্রিজ, মিলন এন্টারপ্রাইজ ও সেবা এন্টারপ্রাইজ।

এনবিআরের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে উইভিং ফ্যাব্রিকসের পাওয়ার লুপ (এইচএস কোড ৮৪৪৬২১০০) আমদানি বেড়েছে ২১ হাজার ৯৩১ শতাংশ। নিটিং কাজে ব্যবহূত সাধারণ সেলাই মেশিন (এইচএস কোড ৮৪৪৭২০০০) আমদানি বেড়েছে ৯ হাজার ৩০৩ শতাংশ। আর অটোমেটিক সেলাই মেশিন (এইচএস কোড ৮৪৫২২১০০) আমদানি বেড়েছে ৯ হাজার ২৫২ শতাংশ।

টেক্সটাইল খাতে ওয়্যারিং ড্রেসিং অ্যান্ড ফিনিশিং যন্ত্রপাতি (এইচএস কোড ৮৪৫১৮০০০) আমদানি বেড়েছে ৬ হাজার ৩৩২ শতাংশ। আর টেক্সটাইল স্পিনিং মেশিন আমদানি বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ শতাংশ। এছাড়া ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ওয়াশিং, ব্লিচিং অর ডায়িং মেশিন (এইচএস কোড ৮৪৫১৪০০০) আমদানি বেড়েছিল ৩১ হাজার ৫১২ শতাংশ।

পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, টিকে থাকার তাগিদে ব্যাপকভাবে অটোমেশন ও হাইটেক প্রযুক্তিতে যেতে হচ্ছে পোশাক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের। আগে যে কাজে ১২ জন প্রয়োজন হতো, সে কাজ এখন তিনজনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। পোশাক খাতের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এমন পরিবর্তন হচ্ছে। এসব দিক বিবেচনায় সামগ্রিকভাবে পোশাক খাতের জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরো কিছু যন্ত্রপাতির আমদানিও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছর বিশেষ কাজের জন্য ব্যবহূত যন্ত্রের (এইচএস কোড ৮৪৭৯৮৯০০) আমদানি বাড়ে ২ হাজার ৮২ শতাংশ এবং গত অর্থবছরে হিটিং/কুলিং ইকুইপমেন্ট (এইচএস কোড ৮৪১৯৮৯০০) আমদানি বাড়ে ১ হাজার ১০০ শতাংশ। আর শিল্পে ব্যবহারের জন্য জেনারেটর সেট (এইচএস কোড ৮৫০২৩৯০০) আমদানি ২৭ হাজার শতাংশ, জেনারেটর-সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি (এইচএস কোড ৮৫০২২০০০) ২ হাজার ৪৮২ শতাংশ ও গ্যাস টারবাইনের অন্যান্য যন্ত্রপাতি ১ হাজার ৪৬৭ শতাংশ বেড়েছে।

এনবিআরের জ্যেষ্ঠ সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবসময়ই কিছু দুষ্ট প্রকৃতির লোক সুযোগ নিয়ে থাকে। এ বিষয়ে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

উল্লেখ্য, সম্প্রতি ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত ‘ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোস ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ: ২০০৩-১২’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখানো হয়, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার বাড়ছে। সর্বশেষ হিসাবে এ অর্থ পাচার বেড়ে তিন গুণ হয়েছে। পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণের ক্রমানুসারে ১৫১টি উন্নয়নশীল দেশের একটি তালিকাও তৈরি করেছে জিএফআই। এতে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম। আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থ পাচারের যেসব পন্থা রয়েছে, তারই একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিস ইনভয়েসিং বা অস্বচ্ছ লেনদেন। ২০১২ সালে মিস ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আর হট মানি আউটফ্লো বা ব্যালান্স অব পেমেন্টের মাধ্যমে পাচার হয়েছে ১০২ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চলতি অর্থবছর বেশকিছু মূলধনি যন্ত্রপাতির অস্বাভাবিক আমদানি বেড়েছে। এগুলো সবই শূন্য শুল্কের। এছাড়া দেশ থেকে অর্থ পাচার বাড়ছে বলেও সম্প্রতি জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাই মূলধনি যন্ত্র কেনার নামে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে বিদেশে টাকা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কিনা, তা সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের খতিয়ে দেখা উচিত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের উপপ্রধান ও নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমদানির নামে অনেক সময় অর্থ পাচার হয়ে থাকে। তবে আমাদের হিসাব অনুযায়ী সেটির পরিমাণ খুবই কম। আবার কিছু টাকা পাচার হলেও তা আবার ফিরে আসে। যারা পাচার করে, তারাই অন্য পণ্য আমদানির জন্য সে অর্থ ব্যবহার করে। এটি বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে আমরা সবসময়ই সর্তক আছি।’
সূত্রঃ বনিক বার্তা