ডলারের মান ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চে

বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা

১১ বছরে সর্বোচ্চে পৌঁছল ডলারের মান

বণিক বার্তা ডেস্ক |

১১ বছরে সর্বোচ্চে পৌঁছল ডলারের মান

মার্কিন অর্থনীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশাবাদে ডলারের মান ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চে উঠেছে। তবে যেসব দেশের মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান শক্তিশালী হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক অংশীদার। ফলে দেশটির ম্যানুফ্যাকচারিং, পর্যটন ও আর্থিক খাত এবং প্রবৃদ্ধি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এরই মধ্যে মার্কিন ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের প্রবৃদ্ধি গত ডিসেম্বরে ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। খবর ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও রয়টার্স।

বিশ্বের প্রথম সারির ১৬টি মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান পর্যবেক্ষণ করে থাকে দ্য ওয়াল স্ট্রিট ডলার ইনডেক্স। গত শুক্রবার সূচকটি দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ে। এর মধ্যে ইউরোর বিপরীতে ডলারের মান বাড়ে দশমিক ৮ শতাংশ, যা গত সাড়ে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া ইয়েনের বিপরীতে ডলার দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে যায়, প্রায় সাত বছরের মধ্যে এর সবচেয়ে মান বৃদ্ধি। পাউন্ড ও সুইস ফ্রাঁর বিপরীতে ডলারের মান যথাক্রমে অর্ধবছর ও চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে উঠেছে।

চলতি বছর বিশ্বের মধ্যে মার্কিন অর্থনীতিই সবচেয়ে ভালো অবস্থায় থাকবে, এ আশাবাদের প্রেক্ষিতেই ডলারের মান বেড়ে যায়। এছাড়া প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) সুদের হার বাড়াতে যাচ্ছে, এমন পূর্বাভাসও ডলারের মান শক্তিশালী করার পেছনে কাজ করছে। উল্লেখ্য, এর আগে ফেড জানিয়েছিল অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি শ্রমবাজার উন্নত হলে সুদের হার বাড়ানো হবে। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের পর এ দুটি ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হওয়ায় ফেড এখন শূন্য সুদের হার বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। শুধু সুদের হার বৃদ্ধি নয়, অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো ঋণ সরবরাহেও লাগাম টানার কথা ভাবছে তারা।

নিউইয়র্কে ডয়েচে ব্যাংকের জি-১০ ফরেন এক্সচেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রধান অ্যালান রাসকিন বলেন, ‘মার্কিন অর্থনীতির ভালো পারফরম্যান্সই ডলারের মান বৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে। সুদের হার বাড়ানোর পর আমরা চূড়ান্তভাবে বুঝতে পারব বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে এবার পুরোপুরি ভিন্ন অবস্থানে থাকছে যুক্তরাষ্ট্র।’

তবে অনেক বিশ্লেষকই ডলারের এ মান বৃদ্ধিকে পুরোপুরি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন না। তারা বলছেন, এ অবস্থায় বিদেশী ক্রেতাদের আরো বেশি দামে মার্কিন পণ্য কিনতে হবে। এতে আমেরিকার ব্যবসায়িক অংশীদারদের তুলনায় আন্তর্জাতিক অন্যান্য প্রতিযোগীরা পণ্যের দামের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সুবিধা নিতে পারবে। সেক্ষেত্রে তা যুক্তরাষ্ট্রের গতিশীল রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ১৯৮০ সালে জিডিপির অনুপাতে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি বেড়েছিল ৪ শতাংশের কিছুটা বেশি, ২০১৩ সালে তা ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু গত বছর পর্যন্ত রফতানি দ্বিগুণ করার পাঁচ বছর মেয়াদি লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ডলারের শক্তিশালী অবস্থান তাদের লক্ষ্য ও বাস্তবায়নের পাথর্ক্য আরো বাড়িয়ে দেবে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা বিদেশী পর্যটকরা বছরে ২০ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করে থাকে বলে বিশ্বব্যাংকের দেয়া এক হিসাবে দেখা গেছে। ডলারের মান বৃদ্ধির ফলে হোটেলে অবস্থান থেকে শুরু করে খাবার ও কেনাকাটা, সবকিছুতেই অন্য দেশের তুলনায় বেশি অর্থ গুনতে হবে পর্যটকদের।

বোস্টনে ডিসিশন ইকোনমিস্টের প্রধান বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদ অ্যালেন সিনাই বলেন, ডলারের মান বৃদ্ধি মানে মার্কিন বাণিজ্যের জন্য দুঃসংবাদ। এ অবস্থায় রফতানি নির্ভরশীল ম্যানুফ্যাকচারাররা তাদের উত্পাদন খরচ কমাতে বাধ্য হবেন।

ফোসিওন ইকোনমিকসের প্রধান নির্বাহী বিল কোর্টেলইউ বলেন, চলতি বছর রফতানি লক্ষ্য পূরণ বেশ কঠিন হবে। এশিয়া ও ইউরোপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ডলারের ভিত্তিতে দাম কমাতে বাধ্য হতে পারে কোম্পানিগুলো, যাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর আয়ের একটি বড় অংশই হারিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে লোকসান পুষিয়ে নিতে উত্পাদন ব্যয় কমানো ছাড়া পথ থাকবে না।

ফলে দেখা যাচ্ছে ডলারের মান বৃদ্ধিতে বিদেশে মার্কিন নাগরিকদের ভ্রমণ ব্যয় হ্রাস এবং শেয়ার ও বন্ড বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়লেও পরোক্ষভাবে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এর মধ্যে ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের পিএমআই কমে ৫৩ দশমিক ৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
সূত্রঃ বনিক বার্তা