সংলাপ, সমঝোতা চাইলেন উদ্বিগ্ন কূটনীতিকেরা

দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকেরা। তাঁরা এ সমস্যার দ্রুত সমাধান চেয়েছেন। এ জন্য তাঁরা সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে চলমান সংকট সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন। কূটনীতিকেরা আরও বলেছেন, বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সহিংসতাও বন্ধ করতে হবে।
কূটনীতিকেরা সহিংসতাকে প্রশ্রয় না দিতে সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন। দেশের প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপদে ব্যবসা করার পরিবেশ নিশ্চিত করা যে সরকারেরই দায়িত্ব, তা-ও মনে করিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দেওয়ার ওপরও জোর দিয়েছেন কূটনীতিকেরা।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতিগুলোর ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) গতকাল বুধবার এ দেশে নিযুক্ত কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্থনীতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরতে রাজধানীর একটি হোটেলে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে বক্তব্য দিতে আহ্বান জানানো হলে পাঁচজন কূটনীতিক এমন মত তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে নবনিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট বলেন, ‘বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে অন্যান্য দেশের মতো আমরাও উদ্বিগ্ন। সহিংসতায় এ পর্যন্ত যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। আমরা আশাবাদী যে দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষের কাছেই এই সমস্যার সমাধান আছে। এ দেশে বিদ্যমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, কার্যকর গণমাধ্যম, তৎপর সুশীল সমাজ ও ব্যবসায়ী সমাজকে নিয়েই এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।’
বৈঠকে কানাডার হাইকমিশনার বেনওয়া পিয়ের লাঘোমে বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমরা বাণিজ্য এবং এ দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে চাই। কিন্তু এ জন্য গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। তবে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’
চলমান সহিংসতা প্রসঙ্গে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার এ নিকোলায়েভ বলেন, ‘কে এসবের জন্য দায়ী, এটা কার ভুল, সে নিয়ে আমি কথা বলব না। সরকারের দায়িত্ব দেশের প্রত্যেক মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপদে ব্যবসা করার পরিবেশ নিশ্চিত করা। এখন যেসব সহিংসতা হচ্ছে, রাজনৈতিক কারণে মানুষ হত্যা চলছে, সরকারের সেগুলোও বরদাশত করা গ্রহণযোগ্য হবে না।’ দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যেকোনো সরকারের অবশ্য কর্তব্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাপানের রাষ্ট্রদূত শিরো সাদোশিমা বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক কিছু অর্জন করেছে। জাপানের বিনিয়োগকারীরা এ দেশে বিনিয়োগ করতে চান। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা গ্যাসের স্বল্পতা। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন করতে হলে বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালের মতো ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বন্ধ করতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত ই ইউ ইয়াং বলেন, এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। সংলাপের মাধ্যমে দেশের মধ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশের মানুষ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজ যে সংলাপের কথা বলছে, সেটাকে তিনি সমর্থন করেন বলে জানান।
কোরিয়ার এই কূটনীতিক আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের ৪০ বছরের বন্ধুত্ব। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৫-৬ শতাংশ যায় কোরিয়ায়। কোরিয়ার ২০০-এর বেশি রপ্তানিকারক বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানি করেন। এ ধরনের সহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে এসব কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’ শিগগিরই রাজনৈতিক অস্থিরতা কমে আসবে বলেও আশা করেন তিনি।
বৈঠকে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, হল্যান্ড, সুইডেন, ভারতসহ প্রায় ৩০টি দেশের কূটনীতিকেরা উপস্থিত ছিলেন। তবে আর কেউ বক্তব্য দেননি।
বৈঠকের শুরুতে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহ্মদ দেশের অর্থনীতির একটি চিত্র তুলে ধরেন। এর বড় অংশজুড়েই ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতায় অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ। তিনি বলেন, গত মাসের শুরু থেকেই চলা হরতাল-অবরোধ দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে দিচ্ছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে গেছে, নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। দেশের অর্থনীতি হরতাল-অবরোধের মতো মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে পড়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এমন পরিবেশ চান না, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ব্যবসা করতে চান।
এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি জানান, এক দিনের হরতাল-অবরোধে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। টানা ৪৪ দিনের অবরোধ-হরতালে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এ হরতাল-অবরোধের মতো নেতিবাচক রাজনৈতিক কর্মসূচি বন্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে তাঁরা কাজ করছেন। তবে অবশ্যই তা প্রচলিত আইনের মধ্যে থেকে করা হবে।
অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক দুই সভাপতি আনিসুল হক, এ কে আজাদ এবং বর্তমান দুই সহসভাপতি মনোয়ারা হাকিম আলী, হেলাল উদ্দিনসহ ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এফবিসিসিআই এই প্রথম কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করল। এর আগের বেশ কয়েকজন সভাপতি অতীতে বিভিন্ন সময়ে কূটনীতিকদের নিজের বাসায় ডেকে বৈঠক করেছিলেন। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে এফবিসিসিআই বিদেশি কূটনীতিকদের অবহিত করার প্রয়োজন বোধ করল কেন সে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন সরাসারি কোনো
উত্তর দেননি। তবে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই আমরা কূটনীতিকদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ করতে চাইছিলাম। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে তা হয়নি। এখন যেহেতু নির্বাচন বোর্ড গঠিত হতে যাচ্ছে, তাই আমরা আজকে (বুধবার) তাঁদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ সভার আয়োজন করি।’
সূত্র: প্রথম আলো অনলাইন