হেরে ‘ভুত’ হয়ে গেছে জনগণ

হেরে ‘ভুত’ হয়ে গেছে জনগণ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

dis 2সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জিতলো আওয়ামী লীগ, বর্জন করল বিএনপি, হেরে ভুত হয়ে গেল তিন সিটির জনগণ। গত দু’দশক ধরে একটি ইতিবাচক নির্বাচন ব্যবস্থা অনেক সংকট স্বত্বেও এদেশে গড়ে উঠতে শুরু করেছিল। যার মাধ্যমে প্রতি পাঁচ বছরে একবার অন্তত: জনগণ বিজয়ের স্বাদ পাচ্ছিল, তা একেবারেই গোল্লায় ঠেলে দেয়া হচ্ছে। গত ৫ জানুয়ারি একক ও প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচন অনানুষ্ঠানিক অপমৃত্যু ঘটিয়েছে অবাধ, সুষ্ঠ ও অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন ব্যবস্থার। এর পর উপজেলা নির্বাচন ও সবশেষ সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সুষ্ঠ নির্বাচন পদ্ধতির কফিনে একটির পর একটি পেরেক ঠোকা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ বাদে মিডিয়া, সুশীল সমাজ ও অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলি এক্ষেত্রে খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে।

সিটি নির্বাচন ও বিএনপির বর্জন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য যুগপৎ হতাশা ব্যক্ত করেছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত তো বলেই দিয়েছেন, ‘যে কোনভাবে জিতলেই তাকে জয় বলা যায় না’। নির্বাচনের অনিয়মের তদন্ত চান তারা। জাতিসংঘ ও ইউরেপিয়ান ইউনিয়ন নির্বাচনে সংঘটিত সব অভিযোগ তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। এটিকে জালিয়াতির নির্বাচন আখ্যা দিয়েছে এশিয়ার হিউম্যান রাইটস কমিশন। এর মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, দেশের রাজনীতি ও নির্বাচন এমন অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে যে,একটি সিটি নির্বাচন নিয়েও তাদের মতামত দিচ্ছেন কূটনীতিকরা। সুতরাং দেশের জনগণও এখন জানছে, রাজনীতির নিয়ন্ত্রক শুধু দলগুলিই নয়, এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিশী দুনিয়া, এমনকি ভারতও কি ভাবছে – সেটিই অনেকটা নিয়ামক হয়ে উঠছে। অপরদিকে জাতিসংঘ, ইউরোপিয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়াসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলির প্রভাব এখানে রাজনীতি ও জনগণের মনোজমিনে প্রভাব সৃষ্টি করছে।

এবার দেখা যাক সিটি নির্বাচন নিয়ে কিভাবে মিডিয়ায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। গত ২৯ ও ৩০ এপ্রিল, মাত্র দু’দিনে বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত খবরের শিরোনামগুলো অনুসরন করলে একটি চিত্র পাওয়া যাবে। এগুলো হচ্ছে – জিতল আওয়ামী লীগ হারল গণতন্ত্র, জাল ভোটের সহযোগী পুলিশ, বিএনপির নির্বাচন বর্জন, সরকারের মরিয়া উদ্যোগে হতবাক বিএনপি, ভোটের বাড়াবাড়িতে আওয়ামী লীগের একাংশের হতাশা, ভোটকেন্দ্র ছিল আওয়ামী লীগের দখলে, সকালে লম্বা সারি দুপুরে গণসিল,কেন্দ্রের ভেতরে সরকার সমর্থকদের অবাধ চলাচল, প্রশ্নবিদ্ধ বিএনপি, নির্বাচন কমিশনই খলনায়ক, উপস্থিতি কম তবু ৪৫% ভোট,ইত্যাদি। এর বিপক্ষে সিইসি’র দাবি, নির্বাচন সুষ্ঠ হয়েছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা কবুল করে আরো দাবি করেছেন, ভোটার উপস্থিতি ছিল ব্যাপক ।

এবার আসা যাক সুশীলদের কথায়। সাবেক সিইসি এটিএম শামসুল হুদা বলেছেন, যা ঘটল তা কারো জন্য মঙ্গলজনক নয়। সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, রাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হলো। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, বলি হলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। বেসরকারি সংস্থা ব্র্রতী’র নির্বাহী পরিচালক শারমীন মুরশিদ বলেছেন, এই নির্বাচন বিজয়ীর গৌরব ম্লান করেছে। ইলেকশন ওর্য়াকিং গ্রুপের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হয়নি, অনিয়ম ও সহিংসতা হয়েছে। এর বিপরীতে গত ২৮ এপ্রিল সিটি নির্বাচনের ভোট দেয়ার পরপরই সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে কাকে ভোট দিয়েছেন, তা খুব রগড় করেই বললেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের শীর্ষ নির্বাহী রসিকতা করে কাকে ভোট দিয়েছেন সেটি প্রকাশ করলে নির্বাচনী আচরনবিধি ভঙ্গ হয় কিনা, বর্তমান নির্বাচন কমিশন সেটি আমাদের কোনদিন জানাতে পারবে না।

প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষ কখনই বিএনপির মত কুৎসিত দলকে ভোট দেবে না। তিনি দাবি করেছেন, দেশব্যাপী বিএনপিকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের মত প্রত্যাখ্যান করবে জনগণ। তিনিই আবার বলেছেন, ভোট দিতে বাধা দিলে বিএনপি প্রার্থীরা এত ভোট পেল কিভাবে! সকাল ১ থেকে ১২ টার মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিলেও ঢাকা,চট্টগ্রাম মিলিয়ে মেয়র পদে বিএনপির ভোট প্রাপ্তির সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। মাত্র ক’দিন আগে পেট্রোল বোমা হামলা ও মানুষ পোড়ানোর জন্য দায়ী এই দলটিকে ভোট না দেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এরপরেও এদের যারা ভোট দেবে তাদের তিনি অমানুষ বলতেও কসুর করেননি।

তাঁর বক্তব্যকে নিয়ে বলতে হবে তিন সিটিতে প্রায় ১০ লাখ অমানুষ রয়েছে, কারণ তারা পেট্রোল বোমা হমলাকারী ও মানুষ পোড়ানো দলটিকে সমর্থন করেছে, ভোট দিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিনীত প্রশ্ন, কেন? কেন এতকিছুর পরেও বিএনপির ভোট ব্যাংকে তিনি বা তাঁর দল হানা দিতে পারেননি, ফাটল ধরাতে পারেননি অথবা ক্ষমতার শীর্ষে একটানা গত দুই মেয়াদে গত ছয় বছর অবস্থান করে এখন আর তিনি দেয়ালের লিখন পড়তে পারছেন না। যেমনটি পারেননি বা পারছেন না অতীত ও বর্তমানে তাঁর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি চেয়ারপার্সন।

সিটি নির্বাচন ঘোষণার পেছনে উদ্দেশ্যে যাই থাকুক, এটি একটি বড় সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। সেটি হচ্ছে, বিশ্বাসযোগ্য একটি নির্বাচন, এর মধ্য দিয়ে জনমতের সঠিক প্রতিফলন ও রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা – যাতে দেশের জনগণের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে। এই নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, সেটি ক্ষমতা কাঠামোতে কোন প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু অহমিকা,অবহেলা আর প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দুর্বলতার কারনে এ সুযোগটিও ভেস্তে গেল। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির ভবিষ্যত লড়াইয়ে এই নির্বাচন নতুন উপাদান যোগ করতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আবার সেই রক্তাক্ত ও সহিংস পরিস্থিতিতে দেশ পড়বে কিনা, সে আশঙ্কাই উঁকি-ঝুঁকি মারতে শুরু করেছে। নির্বাচনের মাত্র দু’দিন আগে ইউরোপিয় ইউনিয়ন এক বিবৃতিতে আশঙ্কাটি প্রকাশই করে ফেলেছিল। তারা বলেছিল, “In the run up to the vote for the mayoral election in Dhaka & Chittagong, all sides must refrain from any actions that could spark further violence in Bangladesh.”

রাজনেতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে একটি সুষ্ঠ, অবাধ সিটি নির্বাচন হতে পারত রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট । কিন্তু সরকারের প্রভাবশালী অংশের মনোভাব ও দলভাবাপন্ন, অনিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন সেটি হতে দেয়নি। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই দেশে স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন আজতক গড়ে উঠতে পারল না, কল্পনার বিষয় হয়ে থাকল। দু’একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে মাজা সোজা করে দাঁড়ানোর বদলে সকল কমিশন দলদাস প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অব্যাহত রাখছে। এজন্য একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা সূদুর পরাহতই থেকে গেল। সে কারনে বর্তমান কমিশনও আগামীতে তুলনীয় হতে থাকবে, সুলতান, মসউদ বা আজিজ কমিশনের সাথে – আসলে কোনটি সবচেয়ে বেশি নিকৃষ্ট!

প্রকাশক: আমাদের বুধবার, তারিখ: