আবারও ক্ষমতায় ক্যামেরন: বড় ব্যবধানে ফের বিজয়ী রুশনারা: টিউলিপ ব্রিটেনের এমপি নির্বাচিত: ব্রিটিশ এমপি হলেন রুপা হক

নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জয় নিয়ে আরও পাঁচ বছর ব্রিটেনের ক্ষমতায় থাকছেন ডেভিড ক্যামেরন। দ্বিতীয়বারের মতো কনজারভেটিভ পার্টিকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি চমকে দিয়েছেন পুরো বিশ্ব।

অন্যদিকে হতাশাজনক ফলাফলের পর ক্যামেরনের প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার নেতা এড মিলিব্যান্ড এবং লিব-ডেমসের প্রধান নিক ক্লেগ পদত্যাগ করছেন বলে জানা গেছে।

ব্রিটেনের পার্লামেন্টের ৬৫০ আসনের মধ্যে ৬৪১টি আসনের যে ফলাফল এসেছে, তাতে কনজারভেটিভ পার্টি ৩২৫টি-তে জয় পেয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী নিরঙ্কুশ জয়ের জন্য ৩২৬ আসন পেতে হলেও পার্লামেন্টে আয়ারল্যান্ডের সিন ফিনের চারটি আসন এবং স্পিকারের ভোট থাকে না বলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য কার্যত ৩২৩ আসনই যথেষ্ট।

এদিকে বৃহস্পতিবার ভোটের পর কঠিন একটি রাত কাটিয়েছে লেবার পার্টি, যেখানে শ্যাডো চ্যান্সেলর এড বলস নিজেও হেরে বসেছেন। বিরোধী দলে থাকা লেবার পার্টি এবার পেয়েছে ২২৯ আসন।

৫৬টি আসনে জয় পাওয়া স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) স্কটল্যান্ড থেকে লেবার পার্টিকে একপ্রকার নির্মূলই করে দিয়েছে। এছাড়া লিবারেল ডেমোক্রেটসরা ৮টি এবং ২৩টি আসনে অন্যান্য দল জিতেছে।

ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল সাতটা থেকে (বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা) ভোট নেওয়া শুরু হয়। শেষ হয় স্থানীয় সময় রাত ১০টায় (বাংলাদেশ সময় রাত তিনটা)। এবার কনজারভেটিভ পার্টি ৬৪৮ আসনে প্রার্থী দেয়। লেবার ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটস উভয় পার্টির প্রার্থীসংখ্যা ৬৩১ জন করে। নির্বাচনী সংস্কৃতি অনুযায়ী এই তিন দল স্পিকার জন বার্কোর আসনে প্রার্থী দেয়নি। অভিবাসনবিরোধী ইউকে ইনডিপেনডেন্ট পার্টি (ইউকিপ) ও গ্রিন পার্টির প্রার্থীসংখ্যা যথাক্রমে ৬২৪ ও ৫৭৩। প্রাদেশিক দল স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (এসএনপি) স্কটল্যান্ডে ও প্লেইড কামরি ওয়েলসের আসনগুলোতে লড়াই করেছে।

২০১০ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ ৩০৭, লেবার ২৫৮ ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটস পার্টি ৫৭ আসনে জয়ী হয়েছিল। ওই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন না পাওয়ায় লিবারেল ডেমোক্র্যাটসদের সঙ্গে জোট বেঁধে কনজারভেটিভ পার্টি যুক্তরাজ্যের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে প্রথম জোট সরকার গঠন করে।

নির্বাচনে ছিলেন পাঁচ কোটি নিবন্ধিত ভোটার। আর প্রার্থী ছিলেন ৩ হাজার ৯৭ জন। নির্বাচনে শতকরা ৬৯ ভাগ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন বলে জানা গেছে।

ব্রিটেনের পার্লামেন্ট হাউস অব কমন্সে রয়েছে ৬৫০ আসন। এর মধ্যে ৫৩৩টি আসনের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন ব্রিটেনের জনগণ। বাকি আসনগুলোর ৫৯টিতে স্কটল্যান্ড, ৪০টিতে ওয়েলস এবং ১৮টিতে নর্দান আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন।

টানা দ্বিতীয়বারের মতো ব্রিটেনের এমপি নির্বাচিত হলেন রুশনারা আলি। তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে ২৪ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।

যুক্তরাজ্যের ৫৬তম জাতীয় নির্বাচনে বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসন থেকে তিনি নির্বাচিত হন।

রুশনারা আলি লেবার পার্টির পক্ষে ৩২৮৮৭ ভোটে পেয়ে জয়ী হন। তার পক্ষে ভোট পড়েছে ৬১ শতাংশ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির ম্যাথিউ স্মিথ পেয়েছেন ৮ হাজার ৭০ ভোট।

গত নির্বাচনে সাড়ে ১১ হাজার ভোটে জয়ী রুশনারা এবার ব্যবধান দ্বিগুণ করলেন।

সিলেটের বিশ্বনাথে ১৯৭৫ সালে জন্ম নেওয়া রুশনারা মাত্র সাত বছর বয়সে বাবা-মার সঙ্গে লন্ডনে পাড়ি জমান। ২০১০ সালে প্রথম বাঙালি হিসেবে তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন।

৪০ বছর বয়সী এই পার্লামেন্টারিয়ান লেবার পার্টির হয়ে শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক শ্যাডো মিনিস্টারের দায়িত্বে ছিলেন। গত সেপ্টেম্বরে ইরাকে সামরিক হামলায় সংসদে লেবার পার্টি সমর্থন দেওয়ায় রুশনারা শ্যাডো মিনিস্টারের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

এছাড়া পার্লামেন্টারি ট্রেজারি সিলেক্ট কমিটির সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ডিগ্রিধারী রুশনারা পরামর্শক সংস্থা ইয়ং ফাউন্ডেশনের একজন সহযোগী পরিচালক। আপরাইজিং নামের একটি দাতব্য সংগঠনেরও নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।

টিউলিপ ব্রিটেনের এমপি নির্বাচিত

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি ও শেখ রেহানার মেযে টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটেনের এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।

শুক্রবার স্থানীয় সময় ভোর ৫টায় টিউলিপকে এমপি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। লন্ডনের কেমডেন ভোট গণনা কেন্দ্রের রিটার্নিং অফিসার তাকে জয়ী ঘোষণা করেন।

টিউলিপ লেবার পার্টি থেকে মোট ২৩ হাজার ৯৭৭  ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির সায়মন মার্কাস পেয়েছেন ২২ হাজার ৮৩৯ ভোট।

ফল ঘোষণার সময় উপস্থিত ছিলেন টিউলিপের মা শেখ রেহানা, স্বামী ক্রিস পার্সি, ভাই রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, বোন রূপন্তী, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ফারুক, যুগ্ম সম্পাদক ও টিউলিপের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী ক্যাম্পেইনার আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী প্রমুখ।

রিটার্নিং কর্মকর্তা ফল ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় টিউলিপ বলেন, আপনারা যারা আমাকে চেনেন, তারা জানেন যে কঠিন এ কাজের মাত্র শুরু হলো।

সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে টিউলিপ বলেন, মা, ভাইয়া, রূপী, আম্মুজি, আনোয়ার মামা আর আমার স্বামী গত পাঁচ মাস অনেক খেঁটেছেন।

ফলাফল ঘোষণার পর টিউলিপের মা শেখ রেহানা বলেন, আমি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে, শেখ হাসিনার বোন, টিউলিপের মা। আমি গর্বিত।

২০১০ সালের নির্বাচনে এ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে লেবার পার্টিকে ৪২ ভোটের জয় এনে দিয়েছিলেন অভিনেত্রী গ্লেন্ডা জ্যাকসন। তিনি অবসরে যাওয়ায় এবার দলের মনোনয়ন পান তরুণ রাজনীতিবিদ টিউলিপ সিদ্দিক।

শেখ রেহানা ও শফিক সিদ্দিকীর মেয়ে টিউলিপ লন্ডনের মিচামে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব কেটেছে বাংলাদেশ, ভারত এবং সিঙ্গাপুরে। ১৫ বছর বয়স থেকে তিনি হ্যাম্পস্ট্যাড অ্যান্ড কিলবার্নে বসবাস করছেন। এই এলাকায় স্কুলে পড়েছেন ও কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে পলিটিক্স, পলিসি ও গভর্মেন্ট বিষয়ে তার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে লেবার পার্টির সদস্য হওয়া টিউলিপ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গ্রেটার লন্ডন অথরিটি এবং সেইভ দ্য চিলড্রেনের সঙ্গেও কাজ করেছেন।

২০১০ সালে ক্যামডেন কাউন্সিলে প্রথম বাঙালি নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি।

ব্রিটিশ এমপি হলেন রুপা হক

হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ২৭৪ ভোটের ব্যবধানে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশি বাংশোদ্ভূত রুপা হক।
৪৩ বছর বয়সী রুপা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসনের প্রতিনিধিত্ব করবেন। বৃহস্পতিবার এই নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী রুপা পেয়েছেন ২২ হাজার ২ ভোট। আর ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী এনজি ব্রে পেয়েছেন ২১ হাজার ৭০১ ভোট। এ আসনে এবার ভোট পড়েছে ৭১ শতাংশ। লেবার পার্টির জন্য এ আসনটি পুনরুদ্ধার করার পথে রুপা হক পেয়েছেন ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। প্রায় ৭০ হাজার ভোটারের এই আসনে ২০১০ সালের নির্বাচনে লেবার প্রার্থীকে হারতে হয়েছিল ৩ হাজার ৭১৬ ভোটের ব্যবধানে। সেই ফল উল্টে দেওয়ার কঠিন কাজটিই করেছেন ড. রুপা।
রুপা হক কেমব্রিজে পড়েছেন রাজনীতি, সামাজিক বিজ্ঞান ও আইন। আর কিংস্টন ইউনিভার্সিটিতে এতোদিন পড়িয়েছেন সমাজ বিজ্ঞান, অপরাধ বিজ্ঞান, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি অধ্যায়নের মতো বিষয়। এর আগে ডেপুটি মেয়র হিসাবে স্থানীয় সরকারেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৭২ সালে ইলিংয়ে জন্ম নেওয়া রুপা হক ১৯৯১ সালে লেবার পার্টির সদস্য হন। তিনি একাধারে লেখক, মিউজিক ডিজে, কলামনিস্ট হিসাবে পরিচিত। আর তার ছোট বোন কনি হক বিবিসির ব্লু পিটার শো উপস্থাপনার কল্যাণে ব্রিটিশদের কাছে খুবই পরিচিত মুখ। এর আগে ২০০৫ সালের নির্বাচনে চেশাম ও এমারশাম আসন থেকে লেবার পার্টির মনোনয়ন পেলেও নির্বাচিত হতে পারেননি রুপা। এছাড়া ২০০৪ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নির্বাচনেও প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি। সূত্র : দেশে বিদেশে পত্রিকা

– See more at: http://www.alokitobangladesh.com/online/special/2015/05/08/1622#sthash.sBbVmuYI.dpuf