ইমিগ্রেশনে অন্তহীন হয়রানি

ইমিগ্রেশনে অন্তহীন হয়রানি
* ঘুষ-দুর্নীতির দৌরাত্দ্য থামছেই না * যাত্রীদের প্রতি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য চলছেই:
-সাঈদুর রহমান রিমন

image

দেশের নৌ, বিমান ও স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগে যাত্রী হয়রানি চরমে পৌঁছেছে। ইমিগ্রেশন পুলিশের একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার অনৈতিক কর্মকাণ্ড, যাত্রীদের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, যে কোনো ছুতায় হয়রানির প্রবণতায় বিদেশগামী ও দেশে ফেরত মানুষ দুঃসহ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ইমিগ্রেশনের একশ্রেণির কর্মকর্তা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না তুলেই যাত্রীদের পাসপোর্ট আটক করে পাঠিয়ে দেন এসবির প্রধান কার্যালয়ে। এ ক্ষেত্রে যাত্রীর পাসপোর্ট বা ভিসায় কী ধরনের গলদ রয়েছে সে কথাটিও উল্লেখ করা হচ্ছে না নোটিসের ফরমটিতে। এ জন্য কোনো রকম কৈফিয়ত ও জবাবদিহিতা ছাড়াই যে কারও পাসপোর্ট আটক করে তার বিদেশযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন তারা। অন্যদিকে কোনোভাবে বিরোধী কোনো দলের যাত্রীর নাম আছে জানতে পারলে তার যেন আর রেহাই নেই। রীতিমতো অফিসারের কক্ষে ডেকে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের হয়রানি চালাতেও দ্বিধা করছে না।এদিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশ ও বিভিন্ন এয়ালাইনস এজেন্টের সমন্বয়ে অভিনব প্রতারণা শুরু হয়েছে। সেখানে এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে দায়িত্বে থাকা প্রতিনিধিরা টিকিটধারী যাত্রীকেও বোর্ডিং পাস দেওয়ার ক্ষেত্রে নানারকম টালবাহানা করেন। তারা নিজেদের বিক্রি করা এয়ারলাইনস টিকিট নিয়েও অযৌক্তিক সন্দেহ পোষণ করাসহ পাসপোর্ট, ভিসা ও যাত্রীদের ফেরত আসা না আসা প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলে বোর্ডিং পাস আটকে রাখে। এ সময় বিদেশগামী যাত্রীরা বিমানযাত্রা বাতিলের আশঙ্কায় চাহিদা-মাফিক টাকা পরিশোধের মাধ্যমে বোর্ডিং পাস সংগ্রহে বাধ্য হন। কিন্তু যেসব যাত্রী উৎকোচের দাবি পূরণ করেন না, তাদের ওইদিন আর বিমানে ওঠা ভাগ্যে জোটে না। এয়ারলাইনস কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও অযৌক্তিকভাবে বোর্ডিং পাস আটকে রাখার কারণে যাত্রা বাতিল হওয়া যাত্রীদের টিকিটের টাকা ফেরতও দেওয়া হয় না। এমনকি পুনরায় টিকিট সংগ্রহের ক্ষেত্রেও তাদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার কোনো নজির নেই। দুর্ভোগক্লান্ত যাত্রীরা অভিযোগ করেন, বিমানবন্দরের বাইরের তুলনায় ভিতরের ঘাটে ঘাটে হয়রানি ও ভোগান্তির মাত্রা কয়েকগুণ বেশি। যাত্রী সেবায় নিয়োজিত ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা, বিমানবন্দর পুলিশ, কাস্টমস, কেবিন ক্রুসহ বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্বরতদের একটা বড় অংশই নিয়মিত যাত্রী হয়রানি করছে। বিমানবন্দর অভ্যন্তরের অন্তত ১০টি ধাপে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা হাতানোর ধান্ধায় নানারকম হয়রানি চালানো হয়। যাত্রীরা বিদেশ গমনের সময় বহিরাগমন লাউঞ্জের প্রবেশমুখে কর্তব্যরত একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর খপ্পরে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। টার্গেটকৃত যাত্রীদের পাসপোর্ট, টিকিট ইত্যাদি চেক করার সময় জানানো হয়, তার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা রিপোর্ট রয়েছে। তাই তিনি দেশ ছেড়ে যেতে পারবেন না। বিমানে ওঠার চূড়ান্ত মুহূর্তে এমন অভিযোগের কথা শুনে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। দিশাহারা যাত্রী আকুতি-মিনতি করতে থাকেন। এ অবস্থায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করার নামে যাত্রীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এদিকে দেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসে ঘুষ বাণিজ্য আর লাঞ্ছনার শিকার হতে হচ্ছে যাত্রীদের। একদিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের পেট্রাপোল চেকপোস্টে ‘মে আই হেল্প ইউ’ অফিস বসিয়ে, অন্যদিকে বেনাপোল চেকপোস্টে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস ভবনে যাত্রী সেবার দোহাই দিয়ে ঘুষবাণিজ্য ও হয়রানির উৎসবে মেতে উঠেছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি ঘুষ দিতে না পারলে যাত্রীদের মারধর করার মতো গুরুতর অসদাচরণ করতেও দ্বিধা করছে না ইমিগ্রেশন, কাস্টমস ও থানা পুলিশের সদস্যরা। তাদের মধ্যে অঘোষিত দুর্নীতির সমঝোতায় যাত্রীদের রীতিমতো নাভিশ্বাস উঠেছে। কিছুদিন আগে বেনাপোল ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস ভবনে যাত্রী হয়রানি বন্ধে ১৭টি সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এরপর থেকে যেন যাত্রী হয়রানি বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সব বিভাগে আধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে, কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় যাবতীয় কর্মকাণ্ড। কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হলেও যথেষ্ট দক্ষ নন। সেখানে আইটি অদক্ষতাতেই সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ধীরলয়ে কোনোমতে কাজকর্ম চালিয়ে নেন শুধু। এতে যাত্রীদের প্রতীক্ষার প্রহর হয় দীর্ঘ। মেশিন রিডেবল পাসপোর্টসহ অন্যান্য কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সময় লাগে প্রচুর। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিল্লি, পাকিস্তানের করাচি ও মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে একেকজন যাত্রীর সমুদয় কাগজপত্রাদি পরীক্ষা করতে জনপ্রতি ৫/৭ মিনিট সময় লাগে। অথচ হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে একেকজন যাত্রীকে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে ২০/২৫ মিনিট ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, অদক্ষ কর্মী দিয়ে কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থাপনা চালাতে গিয়ে ইমিগ্রেশন ছাড়পত্র শেষ করতে বেশির ভাগ সময়ই ফ্লাইট বিলম্বিত হয়। ইমিগ্রেশনের পুরনো সার্ভারটির কর্মক্ষমতা হারানোর উপক্রম। বিদ্যুতের ভোল্টেজ ওঠানামাতেও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে সার্ভার। এ অবস্থায় একই সঙ্গে কয়েকটি ফ্লাইট উড্ডয়ন বা অবতরণ করলে বিমানবন্দরের গোটা ব্যবস্থাপনাই যেন ভেঙে পড়তে চায়। তখন যাত্রীদের দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। এ ব্যাপারে সিভিল এভিয়েশন অথরিটির এটিএস অ্যান্ড অ্যারোডম বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মক্ষম ৪০টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার রয়েছে। কিন্তু লোকবলের অভাবে ১৪টি কাউন্টার বরাবরই বন্ধ থাকে। তাই অতিরিক্ত যাত্রীর ভিড় সামাল দিতে প্রায়ই ইমিগ্রেশন বিভাগকে হিমশিম খেতে হয়। এই বিমানবন্দরে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত ও নাজেহালের শিকার হচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে কর্মরত বাংলাদেশিরা। তারা দেশে ফেরা ও কর্মস্থলের উদ্দেশে দেশত্যাগ- উভয় ক্ষেত্রেই চরম হয়রানির শিকার হন।ইমিগ্রেশন বিভাগে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা এসব প্রবাসী কর্মজীবীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে থাকেন।হাজারো অভিযোগ, একের পর এক বৈঠক, মন্ত্রী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সিভিল এভিয়েশনের কড়া তদারকি, প্রশাসনিক নজরদারিসহ গোয়েন্দা বিভাগগুলোর নানামুখী তৎপরতায়ও হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি বন্ধ হচ্ছে না। যারা যাত্রীদের হয়রানিমুক্ত করার দায়িত্বে নিয়োজিত তারাই উল্টো যাত্রী হয়রানির কর্মকাণ্ডে মেতে উঠেছেন। কনকর্স হল, মূল ভবন, ইমিগ্রেশন পুলিশ, কাস্টমস পোস্টসহ ঘাটে ঘাটে চলে হয়রানির মচ্ছব। তুই তুকারি থেকে শুরু করে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ আর হুমকি-ধমকিতে যাত্রীদের অস্থির-উদ্বিগ্ন করে তোলা হচ্ছে।