নারী নির্যাতন বেড়েছে

নারী নির্যাতন বেড়েছে

নারী নির্যাতন বেড়েছে

হঠাৎ করেই বাংলাদেশে নারী নির্যাতন বেড়েছে। দেশের আটটি (ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর ও রংপুর) ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসে ৭২৪ জন নারী ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৮৭ জন, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫৩১ জন, পুড়িয়ে নির্যাতন ছয়জন। ২০১৪ সালের শেষ তিন মাসে ওসিসিতে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬৯৮ জন। এদের মধ্যে যৌন নির্যাতন ২০৫ জন, শারীরিক নির্যাতন ৪৬ জন ও আগুনে পুড়িয়ে নির্যাতন সাতজন।

আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং প্রশাসনের ব্যর্থতায় নির্যাতন বাড়ছে বলে মনে করেন শিক্ষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

গত পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে প্রকাশ্যে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশ কাউকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি। তবে ওই ঘটনাকে কিছু যুবকের ‍দুষ্টমি বলে মন্তব্য করেন পুলিশপ্রধান এ কে এম শহিদুল হক। এতে তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে তিনি অপরাধী শনাক্তে আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করেন।

এ ছাড়া গত ২১ মে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় ৫ দুর্বৃত্ত মাইক্রোবাসে তুলে এক গারো তরুণীকে গণধর্ষণ করে। ধর্ষণের ঘটনায় মামলা করতে গেলে ভিকটিম ও পরিবারের সদস্যরা হয়রানির শিকার হন। রাতে কয়েকটি থানা ‍ঘুরে পরদিন ভাটারা থানায় গিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পর বেলা ১২টার দিকে মামলা করেন তারা। ঘটনার ৫ দিনের মাথায় পুলিশ দুই অপরাধীকে আটক করে।

গত ৩১ মে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে এক শিক্ষার্থী গণধর্ষণের শিকার হয়। ওই শিক্ষার্থীর অভিযোগ, তার প্রেমিক হৃদয় ও তার দুই বন্ধু মিলে গণধর্ষণ করে। পরে ভিকটিমের বাবা কাশিয়ানী থানায় মামলা দায়ের করেন। ঘটনার ৬ দিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

নারী নির্যাতনের ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলেছে। কিন্তু এর প্রতিকারে নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সমাজবিজ্ঞানী ড. নেহাল করিমের মতে, দেশে আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। ফলে নারী নির্যাতনের মাত্রা বাড়ছে।

এদিকে, তরুণ সমাজের মধ্যে অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, বেকার সমস্যা, মাদক ও অপসংস্কৃতির প্রসারকে নারী নির্যাতনের অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী এবং মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের মহাপরিচালক সাহিন আহমেদ চৌধুরী।

পুলিশকে টাকা দিলে মুক্তি মেলে

ড. নেহাল করিম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘নারী নির্যাতন বাড়ার প্রধান কারণ হল, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া। দেশে আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ হচ্ছে না। এ কারণেই মূলত নারী নির্যাতনের মাত্রা বাড়ছে। এ ছাড়া দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। এটাও একটা বড় কারণ।’

তিনি বলেন, ‘যারা এ ধরনের অপরাধ করে থাকে, তাদের বিচার না হওয়ায় অন্যরা উৎসাহিত হয়। অপরাধীরা মনে করে বিচার ব্যবস্থা শক্ত নয়। আইনের শাসন নেই, কিছুই হবে না। পুলিশকে টাকা দিলে মুক্তি পাওয়া যাবে।’

তিনি বলেন, ‘দেশে যখন সামাজিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে, মূল্যবোধ কাজ করে না, ঠিক তখনই নারী নির্যাতনের মতো নোংরা ঘটনাগুলো হয়।’

উত্তরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তাহলেই নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের ঘটনা বন্ধ হবে।’

প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণে নারী নির্যাতনের প্রবণতা বাড়ছে এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, পয়লা বৈশাখের ঘটনায় অপরাধীদের ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে পরবর্তী সময়ে নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানির ঘটনা কম ঘটত।’

অপরাধী পায় রাজনৈতিক প্রশ্রয়

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘নারী নির্যাতন এখন খুব বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। আগে অনেক ঘটনা ঘটলেও দৃষ্টির অগোচরে রয়ে যেত। তারপরও আগে এতটা হতো বলে মনে হয় না।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে নারী নির্যাতন নিয়ে অনেক সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে। এ ছাড়া ভিকটিমরা নিজেও বিচার দাবি করছে। যেগুলো আগে হতো না। এখন নারী নির্যাতন আমাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

নারী নির্যাতন বাড়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘তরুণ সমাজের মধ্যে অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, বেকার সমস্যা এবং মাদকও একটি বড় কারণ। এ ছাড়া যে হারে অপসংস্কৃতির প্রসার হচ্ছে আমরা সেগুলোর লাগাম টানতে পারছি না। এ সব কারণেই ধর্ষণ, যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে।

তিনি বলেন, ‘নারী নির্যাতন বৃদ্ধি পাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হল, অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে। আমাদের এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা দরকার। অপরাধীদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়।’

তিনি বলেন, ‘অতীতের ঘ্টনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। এতে অন্যরা উৎসাহিত হয়। এ ছাড়া ভিকটিমরা অভিযোগ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নানা কারণে অভিযোগ নিতে চায় না, নিলেও দুর্বল মামলা তৈরি করা হয়। এতে বিচারকদের কিছুই করা থাকে না।’

তিনি বলেন, ‘অপরাধী অনেক সময় রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে পার পেয়ে যায়। গ্রামাঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে।’

দল বেঁধে ধর্ষণ

মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের মহাপরিচালক সাহিন আহমেদ চৌধুরী দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘সামাজিক অসচেতনার কারণেই দিন দিন নারী নির্যাতনের সংখ্যা বাড়ছে। এ ছাড়া সামাজিক অস্থিরতার কারণেও ধর্ষণ ও যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বাড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘দল বেঁধে ধর্ষণের ঘটনা আগে ঘটেনি। কিন্তু এখন ঘটছে, এটা সত্যিই আমাদের দেশের জন্য উদ্বেগের কারণ। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে অপরাধ কমবে।’

প্রশাসনের দুর্বলতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নারী নির্যাতন বাড়ার পেছনে প্রশাসনের দুর্বলতাও একটি বড় কারণ। অনেক ঘটনায় তারা দোষীদের আটক করে না। কিন্তু তারা চাইলে পারে। সে ক্ষমতা তাদের আছে। আমি মনে করি, নারী নির্যাতন ঠেকাতে পুলিশের একটি শক্ত ভূমিকা নিতে হবে।’

দোষ মানতে নারাজ পুলিশ

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘তারা (বিশেষজ্ঞরা) তাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কথা বলেন। এগুলোর সঙ্গে আমি তর্কে যাব না। কিন্তু একটা বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে বেশ কিছু পার্ট (অংশ) জড়িত। এর সঙ্গে পুলিশ, মেডিকেল, বিচার বিভাগ, আইনজীবীরা রয়েছেন। বিচারের কথাটি যত সহজে বলা হয়, আসলে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। মূলকথা, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটা ফলাফল আসে। সেখানে কোনো অংশের দুর্বলতা থাকলে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু আমাদের দেশের সবাই ঘুরে ফিরে পুলিশকে দোষ দেয়।’

তিনি বলেন, ‘টিএসসির ঘটনায় ফলপ্রসূ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি এটা সত্যি। তবে, গারো তরুণীর ক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে আমরা সবক্ষেত্রেই আন্তরিক।’

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কোনো ঘটনায় ফলাফলটা হয়তো খুব সহজে হয়ে যায়। আবার কোনোটায় হয়তো একটু সময় লাগছে। তবে আমাদের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। আমাদের বিশ্বাস ধারাবাহিকভাবে প্রতিটা ঘটনায় সফল হব। এক্ষেত্রে একটু সময় হয়তো লাগবে।’

জানুয়ারি-মার্চে ওসিসিতে ভর্তি ৭২৪ নারী

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টি-সেক্টরাল প্রোগ্রামের প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন দ্য রিপোর্টকে জানান, দেশের আটটি (ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর ও রংপুর) ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসে ৭২৪ জন নারী ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৮৭ জন, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫৩১ জন। পুড়িয়ে নির্যাতন ছয়জন।

তিনি জানান, ২০১৪ সালের শেষ তিন মাসে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে ওসিসিতে চিকিৎসা নিয়েছেন ২০৫ জন, শারীরিক নির্যাতন ৪৪৬ জন। আগুনে পুড়িয়ে নির্যাতন সাতজন।

তিনি আরও জানান, ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসে ঢাকায় চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫৮ জন। এদের মধ্যে যৌন নির্যাতন ৪৬ জন, শারীরিক নির্যাতন ১০৮ জন, পুড়িয়ে নির্যাতন করা হয় দুইজনকে।

বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রচারিত তথ্যের ভিত্তিতে ড. আবুল হোসেন জানান, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৮৬৭ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে শারীরিক নির্যাতন ৫৮২ জন। শারীরিক নির্যাতনে আহত হয়েছেন ১৫০ জন, আত্মহত্যা করেছেন ১৬০ জন। মৃত্যু হয়েছে ২৭২ জনের।

এ ছাড়া তিন মাসে যৌন নির্যাতনে শিকার হয়েছেন ২৪২ জন নারী। এদের মধ্যে আহত হয়েছেন ২১৫ জন, আত্মহত্যা করেছেন তিনজন এবং মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। এ ছাড়া দগ্ধ ও এসিড নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪৩ জনের। এদের মধ্যে আহত হয়েছেন ৩৬ জন, মৃত্যু হয়ে সাতজনের।

তিনি জানান, নারী নির্যাতনের অন্যান্য কারণের মধ্যে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, পূর্ব শত্রুতা অন্যতম কারণ। তবে বেশিরভাগই যৌন নির্যাতনের কারণগুলো সুস্পষ্ট হয় না।

ঢাকা মহানগর পুলিশ দ্বারা পরিচালিত ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার গত বছরে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, যৌতুক, নির্যাতন ও এসিড নিক্ষেপসহ বিভিন্ন কারণে ৪১৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আসমা আক্তার দ্য রিপোর্টকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, ২০১৪ সালে ৪১৬টি মামলার মধ্যে ধর্ষণ মামলা ৮৫টি, অপহরণ ১৩৪টি, শ্লীলতাহানি ৩৬, এসিড ও দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপ ছয়টি, যৌতুক সংক্রান্ত নির্যাতন ১৪৪টি। এ ছাড়া অন্যান্য ঘটনায় সাতটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে ২৩৬টি, চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে ১৭টি, বাকিগুলো তদন্তাধীন।

তিনি আরও জানান, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ১৩২টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণ ৩০টি, অপহরণ ৩৫, শ্লীলতাহানি নয়টি, এসিড ও দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপ দু’টি যৌতুক সংক্রান্ত ৫৪টি, অন্যান্য দু’টি মামলা করা হয়েছে।

নাজমুল সাঈদ | দ্য রিপোর্ট

(দ্য রিপোর্ট/জুন ০৬, ২০১৫)