ধৈর্যশীলতাই সফলতার চাবিকাঠি

ধৈর্যশীলতাই সফলতার চাবিকাঠি

চাকরি খোঁজার ঝক্কি একটা সময়ে কম ছিল না। অফিসে অফিসে ঘুরে ঘুরে খুঁজতে হতো কোথায় ‘কর্ম খালি’ রয়েছে। খবরের কাগজের বিজ্ঞপ্তি সেই ঝক্কি থেকে মুক্তি দেয় চাকরিপ্রার্থীদের। আর প্রযুক্তির আবির্ভাবে এখন জব পোর্টাল দখল করে নিয়েছে চাকরিপ্রার্থীদের মনোযোগ। ঘরে বসেই এখন জব পোর্টালে ক্রমাগত মিলছে চাকরির সন্ধান। আমাদের দেশে চাকরি খোঁজার এমন প্রথম জব পোর্টালের নাম বিডিজবস ডটকম (http://bdjobs.com)। আজ থেকে ১৫ বছর আগে কিছু উদ্যমী তরুণের অক্লান্ত পরিশ্রম আর সফল পরিকল্পনার মাধ্যমে শুরু হয় এর যাত্রা। সময়ের সাথে সাথে এটি পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় জব পোর্টালে। চাকরিদাতা আর চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর পাশাপাশি চাকরিপ্রার্থীদের যোগ্য করে তুলতে প্রশিক্ষণও দিচ্ছে বিডিজবস। সময়োপযোগী এই পোর্টালটির স্বপ্নদ্রষ্টা একেএম ফাহিম মাশরুর।
bdjobs
বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত ক্যারিয়ারকে ছেড়ে জব পোর্টাল গড়ে তোলার চিন্তা মাথায় কীভাবে এলো, সেই প্রসঙ্গে ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘আমি আগে থেকেই স্বপ্ন দেখতাম নতুন কিছু করার। সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও তখন ইন্টারনেটের আবির্ভাব ঘটে। ভবিষ্যতকে উন্নত করতে একে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায় বলে মনে করতাম। ইন্টারনেটকে ব্যবহার করেই ব্যতিক্রমধর্মী কিছু করার চিন্তা করি আমি। সেই সাথে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার গুণগত মানে পরিবর্তন আনতে পারে, এমন কিছু করার চিন্তা করি। বেকারদের কাছে চাকরির খবর খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই চিন্তা থেকেই ২০০০ সালে আমরা ৬ বন্ধু মিলে শুরু করি বিডিজবসের কার্যক্রম। সেই সময়ে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের সাথে সংশ্লিষ্ট সবকিছুই ছিল নতুন। ইন্টারনেট নিয়ে তরুণদের আগ্রহটাও ছিল বেশি। তাই তরুণদের আকৃষ্ট করতে এবং তাদের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েই চাকরি খোঁজার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আমরা বিডিজবস প্রতিষ্ঠা করি। কারণ তখন চাকরি খোঁজার কাজটা তরুণদের জন্য বেশ কঠিন ছিল। ইন্টারনেট এক্ষেত্রে সমাধান হয়ে আসতে পারে বলেই আমরা জব পোর্টালের দিকে ঝুঁকে পড়ি।’

ব্যাবসা মানেই বিপদজনক। অনেকেই নতুন কিছু শুরু করেও ব্যর্থ হয়ে পিছিয়ে গিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে বিডিজবসের ক্ষেত্রে প্রথম দিকে কী ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘খুব বড় ধরনের কোনো প্রতিকূলতার মুখে আমাদের পড়তে হয়নি। তবে প্রথমদিকেই কিন্তু মুনাফা আসেনি। বিনিয়োগ করে দীর্ঘদিন লেগে থাকার পরেই মুনাফা আসতে শুরু করেছে। কেউ টাকা দিয়ে চাকরির খবর নেবে বা টাকা খরচ করে সাইটে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রার্থী খুঁজবে, এমন চিন্তায় শুরুর দিকে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম না। চাকরিদাতারা পেমেন্ট করবেন—এমন পরিকল্পনা ছিল আমাদের। শুরুর দিকে আমাদের পরিচিতি ছিল না, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীও কম ছিল। এতে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকতে হয়েছে অনেকদিন।’

বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশের অস্থিতিশীলতার মাঝে কী কী সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে সে প্রসঙ্গে ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘যেহেতু আমাদের সব কাজ ইন্টারনেটের মাধ্যমে হয়, তাই তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে গত বছরের তুলনায় আমাদের এখানে বিজ্ঞপ্তি এবং প্রার্থীর উপস্থিতি কম দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কোম্পানিগুলোর নিয়োগে স্থবিরতা চলে এসেছে। চাকরিপ্রার্থীর উপস্থিতিও তাই আগের তুলনায় বেশ কম।’

শুরুর দিকে সকলের কাছ থেকে কেমন সাড়া পেয়েছেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আসলে নতুন কোনোকিছুই শুরুর দিকে তেমন সাড়া পায় না।আমাদের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ছিল। এই বিষয়ে মানুষের সচেতনতাও ছিল কম। তবে আমরা দ্রুতই সাড়া পেয়েছি। যার কারণে আজ আমরা এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছি।’
বিডিজবস চাকরির বিজ্ঞপ্তির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। তার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথমে শুরু করেছিলাম চাকরির খবর দিয়ে। এক সময় মনে হলো—যারা চাকরি করছে বা চাকরি খুঁজছে, তাদের প্রধান সমস্যা দক্ষতার অভাব। এই সমস্যার কারণে অনেকে ভালো ক্যারিয়ার গড়তে পারে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সিলেবাস এবং সার্টিফিকেট-নির্ভর হয়ে গেছে। ফলে ব্যবহারিক কাজে অনেকেই পিছিয়ে থাকে। এসব বিবেচনা করেই আমরা ‘বিডিজবস ট্রেনিং উইং’ চালু করেছি, যেখানে আমরা দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ, শর্ট কোর্স, ওয়ার্কশপ প্রভৃতির মাধ্যমে প্রার্থীকে দক্ষ করে তুলি।’

বিডিজবসের মাধ্যমে প্রায় ৮ লাখেরও বেশি প্রার্থি চাকরি পেয়েছে বলে জানান ফাহিম মাশরুর। তিনি জানান, প্রতিদিন প্রায় লাখখানেক ভিজিটর রয়েছে বিডিজবসের। প্রতিদিনই বিডিজবসে যুক্ত হয় দুই হাজার নতুন সিভি, প্রতিদিনই যুক্ত হয় ৬০০ চাকরির বিজ্ঞপ্তি। আর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করতে বিডিজবসে এখন কর্মরত রয়েছেন শতাধিক কর্মী। বিডিজবস এখন পরিণত হয়েছে চাকরিদাতা ও চাকরিপ্রার্থীদের শীর্ষস্থানীয় পোর্টালে। আর তার নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন ফাহিম মাশরুর। এমন একটি জায়গা থেকে দেশকে নিয়ে তার স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে ফাহিম বলেন, ‘দেশের জন্য সত্ এবং সুন্দরভাবে কিছু করতে চাই। বিডিজবসের মাধ্যমে আমরা বেকারত্ব দূর করতে চাই। যারা চাকরি পাচ্ছে তাদের কাছ থেকে কোনো অনুদান আমরা নেই না। প্রার্থীরা যাতে কোনো খরচ ছাড়াই চাকরির সন্ধান করতে পারেন, সেটাই নিশ্চিত করছি আমরা। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রযুক্তি খাতে অনেকটাই এগিয়েছে। এই প্রযুক্তিকেই কাজে লাগিয়ে তরুণ প্রজন্মের মাধ্যমে সমৃদ্ধ একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই আমরা।’

অনেক তরুণ এবং নতুন উদ্যোক্তারা এখন ইন্টারনেট-নির্ভর ক্যারিয়ার গড়তে চান। তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘সফল ক্যারিয়ার গড়তে হলে প্রথমেই আমাদের সত্ হতে হবে। ধৈর্যও থাকতে হবে। আমরা অনেকেই শর্টকাটে সাফল্য খুঁজি। কিন্তু শর্টকাট রাস্তায় সাফল্য পাওয়া যায় না, সাফল্য আসলেও সেটা ক্ষণস্থায়ী। তাই ধৈর্য সহকারে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। অল্পতেই ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। অপেক্ষা করুন, সাফল্য ধরা দেবেই। ধৈর্যশীলতাই সফলতার চাবিকাঠি।’

Posted by: কর্পোরেট ম্যাগাজিন