বিটিসিএলে ১৪৯৮ কোটি টাকা লোপাট

বিটিসিএলে ১৪৯৮ কোটি টাকা লোপাট

শামীমুল হক | ১০ জুন ২০১৫

বৈদেশিক ক্যারিয়ার এবং সিডিআর দুর্নীতি খাতে ১৪৯৮ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে বিটিসিএলে। এরমধ্যে বৈদেশিক ক্যারিয়ারের কাছে পাওনা ৯৮২ কোটি টাকা। আর সিডিআর দুর্নীতিতে লোপাট হয়েছে ৫১৬ কোটি টাকা। সিডিআর দুর্নীতিতে জড়িত বিটিসিএলের ৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। দীর্ঘদিনেও তাদের কাছ থেকে আদায় করা যায়নি সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হওয়া ৫১৬ কোটি টাকা। সরকারি মালিকানাধীন টেলিফোন কোম্পানি বিটিসিএলের দুটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রাঙ্ক এক্সচেঞ্জের (আইটিএক্স) কল ডি-টেইল রেকর্ডে (সিডিআর) কারসাজির মাধ্যমে শক্তিশালী এ চক্রটি বিপুল পরিমাণ বিদেশী মুদ্রা লুটপাট করেছে। তাদের লাগামহীন দুর্নীতিতে ২০১১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ৫১৬ কোটি ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮২৫ টাকা। এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি তদন্ত দল অনুসন্ধান চালায়। তারা ব্যাপক তদন্ত করে দুর্নীতির চিত্র উদঘাটন করে। শুধু তাই নয়, বৈদেশিক ক্যারিয়ারের কাছে বিটিসিএলের পাওনা ৯৮২ কোটি টাকাও আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। এ নিয়ে বিটিসিএলে চলছে ব্যাপক তোড়জোড়। কিভাবে কি করা যায় এ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে হচ্ছে দফায় দফায় বৈঠক। এ ব্যাপরে বিটিসিএলের পরিচালক (গণসংযোগ) মীর মোহাম্মদ মোরশেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বৈদেশিক ক্যারিয়ারগুলো বিটিসিএলের টাকা দিচ্ছে না। আর সিডিআর দুর্নীতি নিয়ে ব্যাপক হইচই হলেও এখন তা একেবারেই নীরব। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে জড়িতদের কাছ থেকে কিভাবে ওই টাকা আদায় করা যায় তা নিয়ে আমরা কর্ম-কৌশল ঠিক করছি। বৈদেশিক ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রেও একইভাবে এগিয়ে যাচ্ছি।

দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে সিডিআর দুর্নীতির জন্য বিটিসিএলের সাবেক ছয় কর্মকর্তাকে দায়ী করা হয়েছে। তারা হচ্ছেন দুই ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. আবু সাইদ খান ও আজিজুল ইসলাম, সদস্য (রক্ষণাবেক্ষণ ও চালনা) প্রকৌশলী  মোহাম্মদ তৌফিক, জিএম (ওটিআর) আনোয়ারুল মামুন, বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান প্রামাণিক এবং সহকারী বিভাগীয়  প্রকৗশলী রোনেল চাকমা ও বদিউল আলম। দুদক তদন্তে বিটিসিএলের বাইরে এ অপকর্মে সহায়তাকারী হিসেবে বেরিয়ে এসেছে এরকিসন বাংলাদেশ লিমিটেডের কন্টাক্ট ম্যানেজার আসিফ জাহিদ, রিলেশন ম্যানেজার নজরুল ইসলাম ও প্রকৌশলী মাসরুরুল হাকিম।

তদন্তদল বিস্তারিত তথ্য-উপাত্তসহ এই তদন্ত প্রতিবেদন দুদকের কাছে জমা দিয়ে ওই ৯ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪৭৭(ক)১০৯ এবং ১৯৭৪ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলার সুপারিশ করে। এ নিয়ে মামলাও হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিটিসিএলের কড়াইলে (বনানী) অবস্থিত আইটিএক্স-৫ ও আইটিএক্স-৭ (মহাখালী আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ নামে পরিচিত)-এর মাধ্যমে তিনটি ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) হয়ে বিভিন্ন অপারেটরের কাছে বিদেশ থেকে পৌঁছানো সর্বমোট কল ছিল ৪৫২ কোটি ৬৮ লাখ ৫৬ হাজার ৯৩৩.১৬ মিনিট। এর মধ্যে বিটিসিএলের আইসিএক্স এনজিএন ট্যাক্স-এ হয়ে যাওয়া কল ছিল ২৬১ কোটি ৩১ লাখ ৪১ হাজার ৭০৫.০৮ মিনিট, গেটকো আইসিএক্স হয়ে যাওয়া কলের পরিমাণ ছিল ৮১ কোটি ৮৯ লাখ ২১ হাজার ৯৫৪.০৮ মিনিট এবং এম অ্যান্ড এইচ আইসিএক্স হয়ে যাওয়া কল ছিল ১০৯ কোটি ৪৭ লাখ ৯৩ হাজার ২৭৪.০০ মিনিট। অথচ আইটিএক্স-৫ ও আইটিএক্স-৭-এ ওই সময় কলের পরিমাণ দেখানো হয়েছে মাত্র ২৪০ কোটি ৮৪ লাখ ৯০ হাজার ৮৬৪.৮৮ মিনিট। অর্থাৎ ২১১ কোটি ৮৩ লাখ ৬৬ হাজার ৬৮.২৮ মিনিট কল কম দেখানো হয়েছে। যার মূল্য সাত কোটি তিন লাখ ৯১ হাজার ৭৭২ আমেরিকান ডলার বা ৫১৬ কোটি ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮২৫ টাকা। কল ডাটা সঠিকভাবে রেকর্ডভুক্ত না করে, কল ডাটা বিশেষ প্রক্রিয়ায় মুছে ফেলে এবং অবৈধ রুটের মাধ্যমে কল বাইপাস করে সরকারের এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি করা হয়েছে। খোয়া যাওয়া এসব কল থেকে কোন টাকা না পেয়েও বিটিসিএলকে মোট কল মূল্যের ৮৬.৭৫% হিসেবে বিটিআরসি, আইসিএক্স ও বিভিন্ন এএনএস (এক্সসে নেটওয়ার্ক সার্ভিস) অপারেটরকে পরিশোধ করতে হয়েছে ৪৯৯  কোটি ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৭৩১.২৫ টাকা।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য, বিটিসিএলের বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, আইটিএক্স-৫ ও ৭-এর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে অবৈধ ভিওআইপি কারবার চালানো হয়েছে। প্রমাণ মিলেছে আইটিএক্স-৫-এর কল ডিভাইস সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হতো না। প্রায়ই ডিভাইস অকার্যকর বা বিকল রেখে বিদেশ থেকে আসা কল বাইপাস করা হয়েছে। আর আইটিএক্স-৭-এর সিডিআর সঠিকভাবে জেনারেট করা হয়নি, বিশেষ প্রক্রিয়ায় কল ডাটা মুছে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি এ দুটি আইসিএক্স-এ বিদেশ থেকে আসা কলের ক্ষেত্রে অবৈধভাবে অতিরিক্ত একটি বি-টেবিল তৈরি করে এবং দুটি আইটিএক্সের প্রতিটির জন্য দুটি করে অবৈধ রুট চালু রেখে কল বাইপাস করা হয়েছে। বিটিসিএলের বিভাগীয় তদন্ত এবং বিটিআরসি ও মন্ত্রণালয়ের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও এর প্রমাণ রয়েছে।

দুর্নীতির সঙ্গে বিটিসিএলের ওই ছয় কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৮-২০০৯ অর্থবছর পর্যন্ত বিটিসিএলের বৈদেশিক কল আদান-প্রদান করা হতো মাত্র ২৫টি ন্যাশনাল ক্যারিয়ারের মাধ্যমে। ওইসব ক্যারিয়ার যথাযথভাবে বিটিসিএলকে বৈদেশিক রেমিট্যান্স দিত। কিন্তু এরপর বৈদেশিক ক্যারিয়ারের নামে প্রায় ৬০/৭০টি প্রাইভেট ক্যারিয়ারকে সংযোগ দেয়া হয়। এসব ক্যারিয়ারের বেশির ভাগই ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে সংযোগ নিতে সক্ষম হয় এবং গত কয়েক বছরে বিটিসিএলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও একটি প্রভাবশালী চক্রের সহায়তায় বিদেশী কলের অর্থ আত্মসাতে লিপ্ত হয়। এর ফলে ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে বিটিসিএলের বৈদেশিক রাজস্ব আয়ের তুলনায় পরবর্তী অর্থবছরগুলোয় আয় অর্ধেকে নেমে আসে। এসব কর্মকর্তা অসৎ উদ্দেশ্যে সঠিকভাবে ওই দুটি আইটিএক্স রক্ষণাবেক্ষণ করেননি। অথচ তাদের বিরুদ্ধে কোন রকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমনকি বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে এরকিসন বাংলাদেশ লিমিটেডের তিন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, মহাখালী আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ দুটি বিশেষভাবে সংরক্ষিত এবং অতিস্পর্শকাতর স্থাপনা হিসেবে গণ্য। এখানে বাইরের কারও অনুপ্রবেশের সুযোগ নেই। এখানে শুধু কর্মরত এডিই, এসডিই ও ডিইদের কাছে এক্সচেঞ্জের পাসওয়ার্ড ও চাবি সংরক্ষিত থাকে। সাধারণভাবে বিটিসিএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এখানে প্রবেশাধিকার পান না। তবে এক্সচেঞ্জ দুটির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার কারণে জিম (ওটিআর), সদস্য (রক্ষণাবেক্ষণ ও চালনা) এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিশেষ কোন কারণে পরিদর্শন করতে পারেন। কিন্তু এরিকসনের ওই তিন কর্মকর্তা বিটিসিএলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহায়তায় ওই স্থানে প্রায়ই প্রবেশ করেছেন। আইটিএক্স দুটি বা এর যন্ত্রপাতি এরকিসন বাংলাদেশ লিমিটেড বসালেও এর রক্ষণাবেক্ষণে কোম্পানিটির সঙ্গে বিটিসিএলের কোন চুক্তি নেই। এতে স্পষ্ট, এরিকসনের ওই কর্মকর্তারা বিটিসিএলের সংরক্ষিত ও স্পর্শকাতর স্থাপনায় অবৈধভাবে প্রবেশ করে সিডিআর দুর্নীতিতে ভূমিকা রেখেছেন।

বৈদেশিক ক্যারিয়ারের কাছে বিটিসিএলের পাওনা ৯৮২ কোটি টাকা: একই সময়ে বৈদেশিক ক্যারিয়ারের কাছে বিটিসিএলের বকেয়া রয়েছে ৯৮২ কোটি ৫৮ লাখ ২৭ হাজার ৯১২ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী কম্পিউটার ডাটা সেন্টার থেকে বৈদেশিক কলের ডাটা পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) শাখায় পাঠানো এবং ওই ডাটা ই- মেইলের মাধ্যমে পরিচালক (আন্তর্জাতিক) শাখায়  পাঠানো হয়। পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) শাখা ডাটা পাওয়ার পরে সময়ক্ষেপণ করে ইনভয়েস/বিল জারি করেন। এভাবে সময়ক্ষেপণ করে ক্যারিয়ারের বকেয়ার পরিমাণ বেড়েছে। অন্যদিকে বকেয়ার কারণে পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) শাখা থেকে সার্কিট বন্ধ করার জন্য পরিচালক (আন্তর্জাতিক) শাখা ফাইলে সিদ্ধান্ত নিতে সময়ক্ষেপণ করে বকেয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এ টাকা এখনও আদায় করা যায়নি।