অক্টোখান দুদকের অক্টোপাস!

অক্টোখান দুদকের অক্টোপাস!

এম এ রহমান :রাইজিংবিডি ডট কম
অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার

অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার

এম এ রহমান : কাজ না করেও বিদেশ থেকে তথ্য আনার পরামর্শক ফি হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে ফের সাড়ে ৩ কোটি টাকা কমিশন বাগিয়ে নিল কনসালটেন্সি ফার্ম অক্টোখান।

অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যায়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৩৫টি এমএলএআর (মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট) পাঠায় দুদক। এর পারিশ্রমিক হিসেবে দুদক থেকে ওই টাকা বাগিয়ে নেন অক্টোখানের স্বত্বাধিকারী ফেরদৌস আহমেদ খান।

এর আগে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর সিঙ্গাপুরে পাচার করা সাড়ে ২১ কোটি টাকা ফেরত আনার পর সেখান থেকে ১০ শতাংশ কমিশন হিসেবে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা নিয়েছিল অক্টোখান।

এ বিষয়ে দুদক সূত্রে জানা যায়, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের স্বার্থে ২০০৭ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৩৫টি এমএলএআর পাঠিয়েছে দুদক। আরো একটি এমএলএআর পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর মধ্যে ২২টি এমএলএআরের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তথ্য আদায় করতে পেরেছে দুদক। আর বাকি ১৩টি এমএলএআরের আংশিক তথ্য পায় দুদক।

আর এর কনসালটেন্সি ফি হিসেবে অক্টোখান ২২ এমএলএআরের জন্য (প্রতিটি এমএলএআরে ১৫ লাখ করে) মোট ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং বাকি এমএলএআরের কমিশনসহ মোট সাড়ে ৩ কোটি টাকা দুদক থেকে আদায় করে নেয়। আর ওই বিলের চেক গত ১০ জুন দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামানের কাছ থেকে গ্রহণ করেন অক্টোখানের স্বত্বাধিকারী ফেরদৌস আহমেদ খান।

এ বিষয়ে দুদকের পরিচালক (অনুঃ ও তদন্ত) মো. নূর আহম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে রাইজিংবিডিকে বলেন। তবে অক্টোখানকে কমিশন প্রদানের বিষয়টি স্বীকার করেন দুদক কমিশনার (তদন্ত) মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।

এ বিষয়ে রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, কনসালটেন্সি ফার্ম হিসেবে প্রতিটি এমএলএআরের জন্য ১৫ লাখ টাকা করে গত বুধবার পেমেন্ট করা হয়েছে। পুরো টাকাই একসঙ্গে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এমএলএআর প্রশ্নে দুদকের সঙ্গে কোনো চুক্তি ছিল কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, ‘চুক্তি না থাকলে দেব কেন? অক্টোখান দুদকের লবিস্ট হিসেবে কাজ করেছে। সে জন্যই ওই প্রতিষ্ঠানকে কমিশন দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ওই টাকা ‍দিতে দুদক চুক্তিবদ্ধ।’

তবে অন্য একটি সূত্র বলছে ভিন্ন কথা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রাইজিংবিডিকে বলেন, এমএলএআর প্রশ্নে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অক্টোখানের সঙ্গে কোনো চুক্তি ছিল না। ২০০৭-০৮ সাল থেকে এমএলএআরের কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু অক্টোখানের সঙ্গে পাচার করা অর্থ দেশে ফেরত আনার বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি হয় ২০০৯ সালের ৮ জুন।

তিনি আরো বলেন, তা ছাড়া চুক্তিতে এমএলএআরপ্রতি কোনো অর্থের বিনিময় হওয়ার বিষয় ছিল কি না, তা পরিষ্কার নয়। আর চুক্তি হয়ে থাকলেও তা নিয়ে রয়েছে অনেক প্রশ্ন। আর এ বিষয়টি নিয়ে কমিশন থেকে কর্মকর্তা- প্রতিটি পর্যায়ে অনেক ক্ষোভ বিরাজ করছে বলেও দুদক সূত্রে জানা গেছে।

এমএলএআর পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে দুদক সূত্রে জানা যায়, অনুসন্ধান ও তদন্ত প্রশ্নে বিদেশে এমএলএআর পাঠাতে দুদকের কর্মকর্তাকেই সাধারণত প্রয়োজনীয় তথ্যসহকারে ওই ফরমেটটি তৈরি করতে হয়। এরপর তা কমিশন থেকে সরাসরি অ্যাটর্নি জেনারেল বরাবর প্রেরণ করা হয়। সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে ওই এমএলএআর পাঠানো হয়। কিন্তু এখানে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কী সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, সে বিষয়টি পরিষ্কার নয়।

দুদক সূত্র আরো জানায়, অর্থ আদায় করার আগে অক্টোখানের মালিক ফেরদৌস আহমেদ খান দাবি করেছেন এমএলএআরের মাধ্যমে দুদক যে তথ্য পেয়েছে, তা অক্টোখানের তৎপরতার কারণেই সম্ভব হয়েছে। তাই এই অর্থ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির প্রাপ্য।

শুধু কি তাই, যদি প্রতিটি এমএলএআরের জন্য ১৫ লাখ করে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয় তাহলে শুধু এই খাতেই ভবিষ্যতে দুদককে কোটি কোটি টাকা প্রদান করতে হবে। যেখানে দুদকের বার্ষিক বাজেট (২০১৫-১৬ অর্থবছর) ৬৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

বিগত জোট সরকারের আমলে আরাফাত রহমান কোকো ঘুষ হিসেবে মোট ২১ কোটি ৫৫ হাজার ৩৯৪ টাকা গ্রহণ করে সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংকে জমা রেখেছিলেন। বিষয়টি সিঙ্গাপুরের আদালতে প্রমাণিত হওয়ার পর সিঙ্গাপুর ওভারসিস ব্যাংক থেকে তিন দফায় টাকাগুলো দুদকের অ্যাকাউন্টে ফেরত আনা হয়।

২০১৩ সালের আগস্টে কিস্তির মাধ্যমে পুরো টাকা দুদকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে ১০ শতাংশ কনসালটেন্সি ফি হিসেবে মোট ২ কোটি ১০ লাখ ৫ হাজার ৫৩৯ টাকা ফেরদৌস আহমেদ খানের মালিকানাধীন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অক্টোখান পায়।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অক্টোখানকে ২০০৯ সালের ৪ জানুয়ারি বিদেশ থেকে দেশে টাকা ফেরত আনার ক্ষেত্রে পরামর্শক হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় কমিশন। যার মেয়াদ ২০১২ সালের ৪ জানুয়ারি শেষ হয়। পরবর্তী সময়ে আবারো তিন বছরের জন্য চুক্তি নবায়ন করার আবেদন করে অক্টোখান। চুক্তি নবায়ন করার বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তবে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এ এরকম কোনো কনসালটেন্ট নিয়োগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেওয়া নেই। এ আইনের ১৭ এর (ট)’তে কমিশনের কার্যাবলি হিসেবে বলা হয়েছে- ‘দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচিত অন্য যেকোনো কার্য সম্পাদন করা’ এবং এ আইনের ১৯ এর (চ)’তে অনুসন্ধান বা তদন্তকার্যে কমিশনের বিশেষ ক্ষমতার বিষয়ে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে দুদক সূত্র জানায়, অক্টোখানকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ কেবিনেটে জানানো হয়। তারা এ বিষয়ে কোনো উত্তর দেয়নি। দুদক স্বাধীন সংস্থা বিধায় এ বিষয়ে কমিশনকে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছিল।