দেশীদের অবহেলা, অতিমাত্রায় গুরুত্ব বিদেশী বিনিয়োগকারীদের

দেশীদের অবহেলা, অতিমাত্রায় গুরুত্ব বিদেশী বিনিয়োগকারীদের

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

DIS 4বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহ দিতে কর অবকাশসহ নানামুখী পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়া হয়েছে আসন্ন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। তবে সরকারের এসব ঘোষণায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি বেসরকারি খাতের উৎপাদন ও রফতানিমুখী শিল্পের উদ্যোক্তারা। এর কারণ হিসেবে উৎসে কর ও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধির কথা বলেছেন তারা।

রফতানি খাতের উৎপাদনমুখী শিল্পের মধ্যে আছে তৈরি পোশাক, কার্টন,টেরিটাওয়েল, পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ প্রভৃতি। চলতি অর্থবছরের এ পণ্যগুলোর উপর দশমিক ৩ শতাংশ হারে উৎসে কর আরোপিত আছে। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে এ উৎসে কর ১ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে শিল্পোদ্যোক্তাদের উৎসে করহার বাড়বে ২৩৩ শতাংশ।

এ বিষয়ে পোশাক শিল্প মালিক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘উৎসে করহার বৃদ্ধি পোশাক উৎপাদনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মারাত্মক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে। কারখানা মূল্যায়ন ও সংশোধন কার্যক্রমের ব্যয় সংকুলান করতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। এ ব্যয় সংকুলানে সরকারের কোনো দিকনির্দেশনা তো আমরা পেলামই না, তার উপর আবার উৎসে কর বৃদ্ধি করে আমাদের উৎপাদন খরচ বাড়ানো হচ্ছে। এমনিতেই আমাদের মুনাফা ২-৩ শতাংশের বেশি হয় না। এখন উৎসে করের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় নিশ্চিতভাবেই ক্ষতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’

দেশে উৎপাদনমুখী শিল্পের অন্যতম হলো সিমেন্ট শিল্প। সিমেন্ট উৎপাদনের মূল কাঁচামাল ক্লিংকার, এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল জিপসাম। এখন পর্যন্ত জিপসাম আমদানিতে কোনো শুল্ক দিতে হয় না। তবে প্রস্তাবিত বাজেট পাস হলে আগামী অর্থবছর থেকে জিপসাম আমদানিতে ৫ শতাংশ হারে শুল্ক দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, এ সিদ্ধান্তের ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে তাদের। সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালিক পারভেজ বলেন, সিমেন্ট উৎপাদনে যেসব কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়, তার মধ্যে ক্লিংকারের পরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো জিপসাম। পণ্যটি আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি নিশ্চিতভাবেই আমাদের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করবে।

পোশাকের নিট পণ্যের ডায়িংয়ের (রঙ) কাজে ব্যবহার হয় অ্যাজো ডায়িজ। এখন পর্যন্ত পণ্যটি আমদানিতে ৫ শতাংশ হারে শুল্ক দিতে হয়। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এ পণ্য আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হয়েছে। এতে নিট পণ্য উৎপাদকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। নিট পোশাক প্রস্তুতকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেইএমএ) সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমরা বিস্মিত। মনে হচ্ছে সরকার উৎপাদনমুখী শিল্প বিশেষ করে পোশাক খাতের উপর ক্ষুব্ধ। তা না হলে একদিকে উৎসে কর, অন্যদিকে অ্যাজো ডায়িজের মতো পণ্যগুলোর শুল্ক বৃদ্ধি করা হতো না। উৎসে কর বৃদ্ধিতে এমনিতেই আমরা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। পাশাপাশি অ্যাজো ডায়িজের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের শুল্ক বৃদ্ধি আমাদের খরচ অনেক বাড়িয়ে দেবে।’

উৎপাদনমুখী শিল্পের আরেক গুরুত্বপূর্ণ খাত আবাসন। প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ফ্ল্যাটের আয়তন অনুযায়ী তিন ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে এবারের বাজেটে। এতে ছোট ও মাঝারি আকারের ফ্লাটে মূল্য সংযোজন কর কমছে। তবে বড় আকারের ফ্ল্যাটে মূল্য সংযোজন কর বাড়ছে। গত অর্থবছরে ভবন নির্মাণ খাতে মূল্য সংযোজন কর ৩ শতাংশ ছিল। প্রস্তাবিত বাজেটে ১ হাজার ৬০০ বর্গফুট আয়তনের বেশি ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন কর ৪ দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে অসন্তোষ বিরাজ করছে আবাসন ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

এদিকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে কম দামি ও বেশি দামি সিগারেটের উপর সম্পূরক শুল্কহার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ১০ শলাকার প্যাকেট সিগারেটের দাম ১৯ টাকা অথবা তার চেয়ে কম হলে তার সম্পূরক শুল্ক ৪৩ থেকে ৪৮ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। ১০টির প্যাকেটের দাম ৭০ টাকা ও তার উপর হলে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ঘোষণায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।

এদিকে বেশকিছু প্লাস্টিক পণ্য আমদানিতে শুল্ক কমে যাওয়ায় দেশীয় প্রস্তুতকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। যেসব প্লাস্টিক পণ্য আমদানি শুল্ক কমেছে তার মধ্যে আছে, প্লাস্টিকের টেবিলওয়্যার বা কিচেনওয়্যার, প্লাস্টিকের তৈরি দরজা ও জানালা। এ পণ্যগুলো আমদানিতে শুল্ক কমেছে ৬০ থেকে ৪৫ শতাংশ। একই হারে শুল্ক কমেছে এমন পণ্যের মধ্যে আছে প্লাস্টিকের তৈরি বক্স, কেইস, ক্রেট।

টয়লেট পেপার, টিস্যু পেপার, টাওয়েল বা ন্যাপকিন পেপার বা সমজাতীয় পণ্য, গৃহস্থালি, স্যানিটারি বা অনুরূপ কাজে ব্যবহূত এ পণ্যে আমদানি শুল্ক চলতি অর্থবছরের বাজেটে ছিল ৪৫ শতাংশ। তবে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৩০ শতাংশ হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন এ খাতের দেশীয় উৎপাদকরা। শিল্প বিশ্লেষকদের মতে,সরকার বিনিয়োগবান্ধব বাজেট করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে এ বিষয় পরিষ্কার। পাশাপাশি অনেক শিল্প খাতের গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের শুল্ক ও কর বৃদ্ধি করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার প্রবণতা দেখা গেলেও কিছু কিছু শিল্পে সরকারের অমনোযোগ বিস্ময়কর মনে হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে শিল্প খাতে বৈষম্য বেড়েছে। সরকারের কাছ থেকে নগদ সহায়তা ছাড়াও বিভিন্ন প্রণোদনা পাওয়ার পরও আগামী অর্থবছরে ঘোষিত বাজেটে পোশাক খাতের উৎসে কর ০ দশমিক ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাকি সব শিল্পে এই করহার ধরা হয়েছে ০ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে রপ্তানিমুখী শিল্পের সব খাতে উৎসে করহার ০ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। রানা প্লাজা ধসের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে দিলে এ খাতের উদ্যোক্তারা প্রণোদনার জন্য সরকারের কাছে ধরনা দেন। পোশাক খাতের সংকট উত্তরণে বাজেট ঘোষণার আগেই ওই করহার কমিয়ে ০ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনে সরকার। নতুন বাজেটে নতুন করারোপের ক্ষেত্রে পোশাক খাতের ওই সুবিধা বহাল রাখা হলেও একই ধরনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে অন্য রফতানি খাতগুলো। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রপ্তানি শিল্পের একটি খাত উৎসে কর কম দেবে আরেকটি খাত বেশি দেবে, করারোপের এমন প্রস্তাব প্রকৃত অর্থে এক ধরনের বৈষম্য। প্রণোদনার জন্য আরও কিছু খাত রয়েছে যেটি সরকারের বিবেচনা করা উচিত ছিল।

শুধু করারোপের ক্ষেত্রে নয়, ঢালাওভাবে আমদানি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক কমানোর প্রস্তাবে দেশীয় শিল্প বৈষম্যের মুখে পড়েছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ঘোষিত বাজেটে টয়লেট্রিজ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্যসহ বিভিন্ন এইচ এস কোড সংযুক্ত ৭৭০টি আমদানি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ওই পণ্যগুলো এখন দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তারাও তৈরি করে অভ্যন্তরীণ চাহিদার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছেন। কিন্তু আমদানি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক কমানোর ফলে দেশীয় শিল্প খাত এক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাজেট বরাদ্দ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের মুখে পড়েছে শিল্প খাত। সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিল্প খাতে যে উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেটি ২০১৩-১৪ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে প্রায় ২১ শতাংশ এবং মোট সরকারি ব্যয়ের ০ দশমিক ৬ শতাংশ কম। বাজেট পর্যালোচনায় ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শিল্প খাতের জন্য বেশকিছু প্রণোদনা রয়েছে। তবে কিছু অসঙ্গতিও রয়ে গেছে। রপ্তানিমুখী খাতে দুই ধরনের উৎসে করারোপের প্রস্তাব ছাড়াও ঢালাওভাবে আমদানি পণ্যের শুল্ক কমানোর ফলে দেশীয় শিল্পে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ ছাড়া শিল্প খাত সংশ্লিষ্ট যেসব উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলোর বরাদ্দ অপ্রতুল। এ কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না। এর ফলে উৎপাদনে যে প্রত্যাশা করা হচ্ছে সেটি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

পিপিআরসি চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘শিল্পায়নের কৌশলগত ধারণাগুলো খুবই দুর্বল। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের চিন্তা বিবেচনায় রেখে স্পেশাল ইকোনমিক জোন (এসইজেড) তৈরির উপর বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবারের বাজেটে। চীন, ভারত, জাপানের বিনিয়োগকারীদের কথা বলা হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের যেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, সেভাবে দেশী উদ্যোক্তাদের বিবেচনায় রেখে নীতি পরিবর্তন বা জোরালো সহায়তা জোগানোর কথা ছিল, সেটির অনুপস্থিতি রয়েছে বাজেটে। তিনি বলেন, দেশী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিতকরণে আরো বলিষ্ঠ পদক্ষেপ কাম্য ছিল। বাজেটের এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ফলে প্রবৃদ্ধির হারকে ত্বরান্বিত করতে বিনিয়োগের হার বাড়ানোর উদ্যোগে সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে বাজেটে। প্রকৃত অর্থে বিনিয়োগের ১০ শতাংশ উল্লম্ফনের মতো কোনো পদক্ষেপ বাজেটে নেই। ধরে নেয়া হয়েছে, বিদেশী বিনিয়োগ আসবে এবং তাদের আকর্ষণের জন্য নেয়া ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু বিদেশী বিনিয়োগ আসবে কিনা বা প্রকল্পগুলো আদৌ বাস্তবায়ন হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। এসইজেড বাস্তবায়ন বর্তমান সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কৌশল বলেই মনে হচ্ছে। এর ভিত্তিতে তারা এগোচ্ছেও। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে জাতীয় আলোচনা অত্যন্ত সীমিত। এর সঙ্গে জমি অধিগ্রহণের একটি বড় ইস্যু জড়িত। স্থানীয় উদ্যোক্তারা যেখানে জমিস্বল্পতার কারণে বিনিয়োগ করতে পারছেন না, সেখানে বিদেশীদের জন্য এসইজেড বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। কৌশল হিসেবে বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আরো আলোচনা হওয়া প্রয়োজন’।।

প্রকাশক: আমাদের বুধবার, তারিখ: