রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিনিয়োগে আপত্তি বাড়ছে বিদেশীদের ॥ এবার তিন ফরাসি ব্যাংক

0
6

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিনিয়োগে আপত্তি বাড়ছে বিদেশীদের ॥ এবার তিন ফরাসি ব্যাংক

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

dis 5ফ্রান্সের তিনটি বড় ব্যাংক বাংলাদেশের রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। ব্যাংক তিনটি হচ্ছে ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল, সোসিয়েতে জেনেরাল ও বিএনপি পারিবাস। আর তিন মাস আগে নরওয়ের দুটি পেনশন তহবিল এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ব্যাংকের প্রকল্পটি থেকে সরে দাঁড়ানোর ফলে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মারাত্মক জটিলতায় পড়লো এবং এতদিন ধরে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ যে যৌক্তিক তাও কিছুটা প্রমানিত হলো। এর আগে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছিল, তারা গরিব দেশগুলোতে আর কয়লা-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে তহবিল যোগান দেবে না। বিশ্বব্যাংকের নতুন জ্বালানি পরিকল্পনায় এ কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, যেখানে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের কোনো বিকল্প নেই সেখানেই কেবল তারা বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। গত মাসে প্রকাশিত জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সবশেষ প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম তাপমাত্রা অব্যাহতাভাবে বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়লে যে পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি হবে, তাতে করে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়ে যাবে।

গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, ফরাসি ব্যাংক তিনটি আলোচিত রামপাল প্রকল্পে বিনিয়োগ না করার ব্যাপারে গত মাসেই সিদ্ধান্ত নেয়। ফ্রান্সের ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল ব্যাংকের টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান স্তানিস্লাস পোতিয়ে বলেন, বাংলাদেশের রামপাল প্রকল্পে এ গ্রুপের আর্থিক বিনিয়োগ করার কোনো পরিকল্পনা নেই। তাদের মধ্যবর্তিতা আইন এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কিছু ঝুঁকির কারণেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আরেক ফরাসি ব্যাংক সোসিয়েতে জেনেরালের টেকসই উন্নয়ন এবং সামাজিক ও পরিবেশগত দায়িত্ব বিভাগের পরিচালক জ্যঁ-মিশেল মেপুইস বলেন, খুলনার রামপাল কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পে তারা কোনো আর্থিক বিনিয়োগ বা পরামর্শ দেবেন না। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্যারিসে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনের অন্যতম করপোরেট স্পন্সর বিএনপি পারিবাসও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে।

১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রামপাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগের। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ সফরকালে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশের আইন-কানুন অনুসরণ করেই প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আমরা এখানে ও ভারতে একত্রে বিদ্যুৎ খাতে আরো কিছু করতে পারি।’

পরিবেশবাদী কর্মী ও বিশেষজ্ঞগন রামপাল প্রকল্পটি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁদের আশঙ্কার কারণ, এটির অবস্থান ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবন থেকে ১০ মাইলেরও কম দূরত্বে। এই প্লান্টটি ক্রমবর্ধমান জাহাজ চলাচল, ড্রেজিং এবং বাতাস ও পানি দূষণের মাধ্যমে পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ হবে। কয়লা-চালিত তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র যে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত করে তা বন্য প্রাণি ও মানব স্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ হয়, আশপাশের এলাকার বন ধ্বংস করে। এসব কারণেই পরিবেশবাদী কর্মীরা এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছে। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন,বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন প্রকল্পটি বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে।

দেড়শ কোটি মার্কিন ডলারের এ প্রকল্পের ৭০ শতাংশ তহবিলই বিদেশি বিনিয়োগ থেকে আসবে বলে আশা করা হচ্ছিল। বাকি ৩০ শতাংশ ব্যয় বাংলাদেশ ও ভারত সমানভাবে বহন করবে বলে প্রস্তাব রয়েছে।

এর আগে খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, প্রকল্পের অংশীদার ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি)পরিবেশগত উদ্বেগের কারণেই নরওয়ের কাছ থেকে প্রত্যাশিত তহবিল না-ও পেতে পারে।

২০১২ সালের সই হওয়া চুক্তির অধীনে ভারতের বৃহত্তম কয়লা বিদ্যুৎ কোম্পানি রাষ্ট্রয়াত্ত ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাথে যৌথ উদ্যোগে খুলনা বিভাগে একটি প্লান্ট নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

ঢাকায় মোদির আগমনের আগে পরিবেশবাদীরা এই প্লান্টটির নির্মাণ বন্ধের জন্য উভয় দেশের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানায়। ২১ মে তেল, গ্যাস খনিজসম্পদ, বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ করে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রকল্পটি বন্ধ না করা হলে তারা আন্দোলন বেগবান করবে। সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন এবং আরো কয়েকটি সংগঠন ৫ জুন ওই প্লান্টটি বাতিলের দাবি নতুন করে করে।

তাদের আশঙ্কা অমূলক নয়। ভারতের প্রথম কয়লা-চালিত তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশগত রেটিং প্রকাশিত হয়েছিল দিল্লির গ্রিন রেটিং প্রজেক্ট অব দ্য সেন্টার ফর সায়েন্সস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট। তারপর থেকে এনটিপিসি সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে রেটিং করা হচ্ছিল প্রাথমিক তথ্য ও সাধারণভাবে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে। ভারতে কোম্পানিটি ২৫টি তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা করে। এছাড়া আরো ৯টি কেন্দ্র যৌথ উদ্যোগে রয়েছে। এগুলোর ছয়টি পরিবেশগত মাত্রায় খুবই বাজে করেছে। সর্বোত্তম রেটিং যেখানে হতে পারে ৮০ ভাগ, সেখানে এগুলো করেছে মাত্র ১৬ থেকে ২৮ ভাগ।।

প্রকাশক: আমাদের বুধবার, তারিখ: