পৃথিবীর যত দামি জিনিস:

পৃথিবীর যত দামি জিনিস:
সুরাইয়া নাজনীন
পৃথিবীর যত দামি জিনিসদামি জিনিসের প্রতি অনেকেরই আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। দাম শুনে রীতিমতো অবাক হয়ে যেতে হয় এমন জিনিসের তালিকার শেষ নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি খাবারটি পরিবেশন করা হয় সোনার প্লেটে, আছে কোটি টাকা মূল্যের কবুতরও। এমনই দামি কিছু জিনিসের কথা নিয়ে এ আয়োজন।

দামি কবুতর: বিশ্বের সবচেয়ে দামি কবুতরের নাম বোল্ট। এক চীনা ব্যবসায়ী কবুতরটি তিন কোটি টাকায় কিনে নিয়ে সবাইকে চমকে দেন। প্রায় চার লাখ ডলারে বিক্রি হওয়া ‘বোল্ট’ একটি দ্রুতগতিসম্পন্ন কবুতর। চীনা এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা বেলজিয়াম এই কবুতর সবচেয়ে দামি কবুতর। পিপার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিকোলাস গাইসেলব্রেখট বলেন, কবুতরটির দাম দেখে আমি হতবাক। এটি অসম্ভব দ্রুতগতির এক রেসিং কবুতর। তার ওড়ার গতির সঙ্গে বিজলির চমকের তুলনা করা হয়। এ জন্য খ্যাতনামা দৌড়বিদ উসাইন বোল্টের নামানুসারে এর নাম রাখা হয়েছে ‘বোল্ট’। বেলজিয়ামের রেসিং কবুতর বোল্ট নিলামে রেকর্ড দামে কিনে নিয়ে নিজেকে নতুন করে জানান দেয়। নিলামে বোল্টের সাবেক মালিক বেলজিয়ামের কবুতরপ্রেমী লিও হেরেমান্স তার সব কবুতর বিক্রি করে দিয়েছেন। তার ৫৩০টি কবুতর বিক্রি হয়েছে ৪৩ লাখ ইউরোতে। কবুতর নিলামকারী প্রতিষ্ঠান ‘পিপার’ মুখপাত্র নিকোলাস গাইসেলব্রেখট বলেন, ‘পিকাসোর একটি ছবি যেমন অপরিচিত কোনো চিত্রকরের আঁকা ছবির তুলনায় অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়, এই কবুতরটির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে।’ উল্লেখ্য, ২০১১ সালে যুক্তরাজ্যে ১৬ হাজার ইউরোতে একটি কবুতর বিক্রি হয়েছিল। বোল্টের ব্যাপারে বলা হয় দুর্লভ কবুতর। কারণ বোল্টের গতি শুধু অবিশ্বাস্যই নয়, সাধারণ কবুতরের চেয়ে অনেক বেশি।

দামি গাড়ি: বিলাসবহুল গাড়িগুলোতে সর্বশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়ে থাকে। গাড়ির ভেতরে বসার সব সুব্যবস্থায়ই থাকে সে সব গাড়িতে। সবচেয়ে বিলাসবহুল গাড়ি বাজারে নিয়ে আসে দুবাইয়ের এক শো-রুমে। সোনার পাত দিয়ে মোড়ানো এই গাড়ির দাম নির্ধারণ করা হয় ২০ লাখ পাউন্ড বা ৩১ লাখ ৮১ হাজার ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ২৪  কোটি ৯১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। সোনায় মোড়ানো এ গাড়ির নাম ‘দ্য স্পেস-এজ এলে এমএমেন্ট পালাজ্জো’। এ গাড়িতে একটি পুরো বাড়ির সব সুবিধাই আছে। ডাবল বেডের শোবার রুম, বিলাসবহুল বাথরুম, ৪০ ইঞ্চি টেলিভিশনসহ বসার রুম, বার, ফায়ারপ্লেস, চা খাওয়ার রুম। এ ছাড়া নিরাপত্তা রক্ষার সার্বিক ব্যবস্থাও রয়েছে এমএমেন্ট পালাজ্জোয়। এ গাড়ি তৈরি করেছে মার্চি মোবাইল কোম্পানি। একটি বাড়ির সব সুযোগ-সুবিধা থাকার ফলে কাজের প্রয়োজনে বাড়ি থেকে দূরে থাকলে তাড়াহুড়া করে আর বাড়ি ফিরতে হবে না। বেশ কয়েকদিন চাইলে গাড়িতেই কাটিয়ে দেয়া যাবে।

দামি পোশাক: পৃথিবীর সবচেয়ে দামি পোশাকটি দেখলে যে কারও চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। বিশ্বের সবচেয়ে দামি পোশাকের একটি সম্প্রতি ইউকের এক ফ্যাশন শোতে প্রদর্শিত হয়। চোখ ধাঁধানো এ পোশাকটির নির্মাতা এক ব্রিটিশ ডিজাইনার। দীর্ঘদিনের নিরলস পরিশ্রম আর একাগ্রতা দিয়ে ডেবিই উইংহাম নামের ব্রিটিশ নকশাকার পোশাকটি তৈরি করেছেন। সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে উইংহাম ব্যবহার করেছেন ৫০ টুকরো দুই ক্যারেট মানের ব্ল্যাক ডায়মন্ড। এতে করে পোশাকটি ওজনেও বেশ হয়েছে। নকশাকার উইংহাম জানান, পোশাকটির ওজন ২৯ পাউন্ড অর্থাৎ প্রায় ১৩ কিলোগ্রাম। ফ্যাশন শোতে প্রদর্শনের পর পোশাকটির দামও উঠেছে আকাশছোঁয়া। সাড়ে তিন মিলিয়ন পাউন্ড অর্থাৎ প্রায় ৪২০ কোটি টাকা। ধারণা করা হচ্ছে, এ পোশাকটিই বিশ্বের সবচেয়ে দামি পোশাক। তবে দাম নিয়ে অনেকের রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। পোশাকটির বুননশৈলী ও উপাদান নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই। এখন অনেকেই অপেক্ষায় আছে কোনো নারী পোশাকটি গায়ে পরাতে পারে। এই পোশাকটির ক্রেতাদের জন্য গোপনীয় শর্ত আছে বলে দাবি করেছেন অনেকে। কারণ এর বুননশৈলী গোপন রাখা।

দামি শহর: বিশ্বের সবচেয়ে দামি শহর আরব আমিরাত। লন্ডনের হাইড পার্কের চেয়েও অনেক বড় একটি পার্ক নির্মাণের ঘোষণা আসার পরই এটিই হতে যাচ্ছে বিশ্বের সেরা শহর। আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবকাশযাপন ও বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে এই শহরকে। মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন শহর বিশ্বের নতুন বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে ধীরে ধীরে। তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত সবসময়ই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের জন্য প্রশংসিত। বুর্জ আল খলিফা নামে বিশ্বের উচ্চতম ভবনটি গড়ে উঠেছে এখানে। তেলনির্ভর অর্থনীতির পরিবর্তে সিঙ্গাপুরের মতো বাণিজ্যকেন্দ্র ও বিশ্বখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দুবাই, আবুধাবির খ্যাতি এনে দিয়েছে। বাণিজ্য, পরিবহন ও পর্যটন খাতের উন্নয়নের জন্যই তাদের এই অর্থনৈতিক অগ্রগতি। ২০১২ সালের প্রথমার্ধ্বে আরব আমিরাতের খাদ্য ও পরিবহন আমদানি ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। দুবাইয়ের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান আল ইমার ৬৩তলার একটি ভবন নির্মাণ করে। উদ্বোধনের প্রথম দিনই এ ভবনের ৫৪২টি ফ্ল্যাটের সবই বিক্রি হয়ে যায়। আরব আমিরাতের বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা বিপুল সম্পদ বৃদ্ধি করছেন। এটা একটি সেফ হেভেন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের জন্য।

দামি মোবাইল: মোবাইল ফোন এখন শখের বিষয় নয়, প্রয়োজন। কিন্তু দামি মোবাইলের কথা উঠলে বেশ কয়েকটি মোবাইলের নাম ওঠে আসে। বিশ্বের সবচেয়ে দামি মোবাইল ফোনটি তৈরি করেছে সুইস ইন্টারনেট ফোন কোম্পানি ভিআইপিএন। দশমিক ২৫ ক্যারাটের ডায়মন্ডের কন্ট্রোল বাটনসহ ‘দি ব্ল্যাক ডায়মন্ড’ নামের এ মোবাইলটির দাম ২ লাখ পাউন্ড, যা বাংলাদেশি টাকায় ২ কোটি ৫৬ লাখ। এই মোবাইল সেটটির ডিজাইন করেছেন বিখ্যাত সেট ডিজাইনার জ্যারেন গুহ। সেটটির বডি তৈরি করা হয়েছে মূল্যবান টাইটানিয়াম ধাতু দিয়ে। এতে সেনসেটিভ টাচ কি-প্যাড, ক্যামেরা ও মেমোরি কার্ড সøট, মিরর ফিনিস সেল প্রভৃতি বিদ্যমান। এই মোবাইল ফোন সেটটির শুধু কন্ট্রোল বাটনেই নয়, আরো অনেক স্থানে ডায়মন্ডের প্রলেপ রয়েছে। মজার ঘটনা হলো এটি নিমিষেই রং বদলাতে পারে। এর রং রুপালি কিন্তু চালু অবস্থায় নিমিষেই নিকষ কালো রং ধারণ করতে পারে। ভিআইপিএন আপাতত ৫টি এ ধরনের দামি মোবাইল ফোন তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে এ সেটটি কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি। তবে কয়টি সেট বিক্রি হয়েছে সে তথ্য জানাননি নির্মাতারা।

দামি টাওয়ার: পৃথিবীর সবচেয়ে দামি স্থাপনা ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ার। আইফেল টাওয়ার শুধু প্যারিসের সবচেয়ে মূল্যবান স্থাপনাই নয়, এটি এখন গোটা ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান স্থাপনা। ইতালির মঞ্জা অ্যান্ড ব্রিয়াঞ্জা চেম্বার অব কমার্স পরিচালিত নতুন গবেষণায় জানানো হয়, আইফেল টাওয়ারের বর্তমান মূল্য ৫৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। ইউরোপের অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনার চেয়ে এর মূল্য বেশি। এদিকে ঐতিহ্যগত দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও রোমের কলিসিয়ামের দাম ৯ হাজার কোটি ডলার, মিলানের ডুয়োমের দাম ৮ হাজার ১০০ কোটি ডলার, দ্য টাওয়ার অব লন্ডনের দাম ৭ হাজার কোটি ডলার, মাদ্রিদের প্রাডো জাদুঘরের দাম ৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলার এবং ব্রিটেনের স্টোনহেঞ্জের দাম ১ হাজার কোটি ডলার। এসব স্থাপনার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে নিজ দেশে স্থাপনাগুলোর অন্তর্নিহিত মূল্য কত, বছরে কত পর্যটক এসব স্থাপনা পরিদর্শন করেন এবং পর্যটনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশ কত আয় করে তার ওপর ভিত্তি করে। ১৮৮৯ সালে যখন ১০৬৩ ফুট উঁচু আইফেল টাওয়ার নির্মাণ করা হয় তখন হয়তো কেউ ভাবেনি এটি বিশ্বের সবচেয়ে দামি স্থাপনা হতে যাচ্ছে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত আইফেল টাওয়ার পুরো ইউরোপের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপনাও বটে। ১ হাজার ৬৩ ফুট উচ্চতার আইফেল টাওয়ার দেখতে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক প্যারিস ভ্রমণ করেন। বিশ্ববাসীর কাছে ফ্রান্সকে আরো পরিচিত করে তুলেছে এই বিখ্যাত স্মৃতিস্তম্ভ। ফ্রান্সের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রাখছে আইফেল টাওয়ার।
ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দায় ফ্রান্সও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এই বিশেষ স্থাপনাটি না থাকলে সে ক্ষতির পরিমাণ যে আরো বড় অঙ্কের হতে পারত বলেই মনে করেন অনেকে। শুধু আইফেল টাওয়ার দেখতে যাওয়ার কারণে পর্যটন খাত থেকে ফ্রান্সের অতিরিক্ত প্রায় ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলার আয় হয়। এখনো অসংখ্য পর্যটক নিয়মিতই এই টাওয়ারটি দেখতে ভিড় করেন। আইফেল টাওয়ার একই সঙ্গে ফ্রান্স এবং পুরো ইউরোপের একটি দর্শনীয় স্থান। এই টাওয়ারের রাতের বেলা সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করে।

মানবকণ্ঠ/