বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আমাদের ক্ষোভের আয়ু

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আমাদের ক্ষোভের আয়ু
-হাসান শফি
গত সপ্তাহে সিলেটে সামিউল আলম ওরফে রাজন নামে তের বছর বয়সী একজন কিশোরকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে সেখানকার কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডে, অর্থাৎ প্রকাশ্য একটি স্থানে। মৃত্যুর আগে একটি দোকানঘরের বাইরে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে তাকে রোলার দিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত প্রহার ও অন্যান্যভাবে নির্যাতন করা হয়। হত্যাকারীরা কেবল রাজনের ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালিয়েই খুশি হয় নি। নিজেরাই তাদের সেই বীরপনার দৃশ্য ভিডিও করেছে। প্রায় তিরিশ মিনিটের সেই ভিডিও চিত্রটির কিছু কিছু অংশ আমরা ইতিমধ্যে টেলিভিশনে দেখেছি। মৃত্যুর আগে রাজন তার হত্যাকারীদের কাছে পানি খেতে চেয়েছিল। তখন তার চোখমুখ বেয়ে অঝোরে ঘাম ঝরে পড়ছিল। হত্যাকারীরা পানির বদলে তাকে সেই ঘাম খেতে বলে। গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রাজনের এই হত্যাকা-টি নিয়ে প্রবল আলোড়ন চলছে। একজন আরেকজনের চেয়ে কঠোরতর ভাষায় এ ব্যাপারে তাঁদের মনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। ধিক্কার ও ক্ষোভ জানাচ্ছেন। এই নৃশংসতার ‘তীব্র নিন্দা’ করে অনেক বিশিষ্টজন এর মধ্যে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছেন। যেমনটি তাঁরা সব সময় দিয়ে থাকেন। বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে এমনকি স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগেও ঘটনার প্রতিবাদ এবং অপরাধীদের কঠোর বা ‘দৃষ্টান্তমূলক’ শাস্তির দাবিতে ইতিমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেকগুলো সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সামনে ঈদের ছুটি পড়ে যাওয়ায়, মাঝে কয়েকদিন বিরতি দিয়ে, হয়তো আরও কিছুদিন এ ধরনের কর্মসূচি চলতে থাকবে। হ্যাঁ, কিছুদিন, আরও কিছুদিন। কিন্তু তারপর? আবার হয়তো একইভাবে আরও কোনো রাজন দেশের অন্য কোথাও অন্য কোনো মানবরূপী পশুদের হাতে একইভাবে নির্যাতিত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। আমরা আবার বিবৃতি দেব, আবার মানববন্ধন করব। পত্রিকায় এ নিয়ে কলাম লিখব, টিভিতে টকশো করব। তারপর কর্তব্য বা ‘বিবেকী দায়িত্ব’ পালনের স্বস্তি নিয়ে ঘুমোতে যাব। বিশ্বজিৎ, ত্বকির হত্যাকা- এবং তার প্রতিবাদে দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত অজস্র মানববন্ধন, মিছিল, সমাবেশ কি রাজনের হত্যকা- ঠেকাতে পেরেছে?

মার খেতে খেতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ছেলেটি নাকি বারবার আর্তনাদ করে বলেছিল, ‘আমি মরি যাইয়ার! কেউ আমারে বাঁচাও রে বা!’ কিন্তু না, কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যায় নি। একই রকম একটি ঘটনা যদি আজ সিলেটের কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডের পরিবর্তে ঢাকার ফার্মগেট কি গুলিস্তানে ঘটত, তাহলেও কেউ কি কারো আর্তচিৎকার শুনে তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যেত? কেন যায় না, কখন যায় না? আমরা সবাই কি তবে আমাদের মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছি? এই লেখাটিতেই অল্প আগে আমি একবার ‘মানুষরূপী পশু’ কথাটা ব্যবহার করেছি। গৎবাঁধা এই কথাটি লিখে আমি নিঃসন্দেহে সমগ্র পশু সমাজের প্রতি অন্যায় করেছি। মানুষের নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা বোঝাতে আমরা সব সময় ‘পাশবিকতা’, ‘পশুপ্রবৃত্তি’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করি। মানুষই এই শব্দগুলো তৈরি করেছে। পশুরা কি কখনো নিজেদের কারো প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ করে? বরং যতদূর জানি, পশু ও পাখিদের মধ্যে অনেকেই আপন সম্প্রদায়ের কেউ আক্রান্ত হলে তাকে উদ্ধারে দল বেঁধে এগিয়ে যায়। পাখিদের মধ্যে কাক আর পশুদের মধ্যে হাতির কথা তো আমরা বিশেষভাবেই জানি। মানুষ হয়ে আমরা তা করি না কেন? কখনো কি করতাম না? আবারও প্রশ্নটা তুলি, কখন করে না, কেন করে না? করে না যে তা তো দেখা গেল রাজন হত্যার ক’দিন আগেই মিরপুরে এক কলেজছাত্রীকে হত্যার ঘটনায়। বাইরে থেকে এসে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা বাসায় ঢুকে তাকে হত্যা করে যায়। আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় মেয়েটি নাকি বারবার বারান্দায় ছুটে এসে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করেছিল। কিন্তু তার চিৎকার শুনেও প্রতিবেশী বা পথচারী কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে নি। প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে মেয়েটি হয়তো বেঁচে যেত। কথাটি আমাদের নয়, খোদ পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার একথা বলেছেন। তাঁর সে কথার পরিপ্রেক্ষিতে আবারও আমাদের প্রশ্ন, মানুষ কেন বা কখন এগিয়ে যায় না? এমন তো নয় যে, মেয়েটির প্রতিবেশী কিংবা পথচারীদের মধ্যে যাঁরা তার চিৎকার শুনেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্তত দু-একজনও সংবেদনশীল মানুষ ছিলেন না? তাঁদের সবাই কি ভীরু বা কাপুরুষ ছিলেন? নিকট অতীতে শুধু মিরপুর এলাকাতেই সংঘটিত এমন দু-একটি ঘটনা কি আমাদের স্মরণে নেই, যেখানে ছিনতাইকারী, ইভটিজার বা অন্য দুষ্কৃতকারীদের হাত থেকে আক্রান্তকে বাঁচাতে গিয়ে সাহসী মানুষটিকে নিজেকেই লাশ হয়ে মর্গে যেতে হয়েছে? পুলিশ সে সব ঘটনায় জড়িত ক’জনকে আজ পর্যন্ত শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পেরেছে? রাষ্ট্রই কি আসলে আমাদের ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ নীতিতে বিশ্বাসী করে তুলছে না? বিদ্যমান ব্যবস্থা বা বাস্তবতাই কি আমাদেরকে স্বার্থপরের মতো বাঁচতে অভ্যস্ত করে তুলছে না?

একটি দেশ যেখানে মোটামুটি আইনের শাসন চালু আছে, সেখানে নাগরিকের প্রাথমিক কর্তব্য হবে কোথাও কোনো অপরাধ ঘটলে কিংবা তার আশঙ্কা দেখা দিলে, সে ব্যাপারে পুলিশকে অবহিত করা। পুলিশের সাহায্য প্রার্থনা করা। আইন হাতে তুলে নেওয়া বা অপরাধের শাস্তি দেওয়া নাগরিকের কাজ নয়। এমনকি পুলিশের কাজও তা নয়। পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ধরে আইনের হাতে সোপর্দ করবে, তাকে বিচারের আওতায় আনবে। কিন্তু আমাদের দেশে পুলিশ, র‌্যাব ও অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকদের আমরা কোন ভূমিকায় দেখি? অপরাধ সংঘটনের পর বা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় পুলিশের সাহায্য চাইতে গিয়ে কেউ কি সহজে তা পায়? থানায় জিডি করতে গেলে পুলিশকে ‘কিছু দিতে’ হয়, না হলে নানা অজুহাতে তারা ডায়রি লিখতে অস্বীকার বা গড়িমসি করে, এ তো আমাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। পুলিশ কোনো ঘটনা বা অভিযোগের ব্যাপারে তদন্তে যাবে, এজন্য আড়মোড়া ভাঙিয়ে তাদের সক্রিয় করতে ভিকটিম বা তার স্বজনদের ‘কিছু ছাড়তে’ হয়। থানার লোকজন অভিযোগ টেবিলে রেখে অপেক্ষা করে অভিযোগকারীরা কখন তদ্বিরে আসবে। ইতিমধ্যে গোপন চ্যানেলে তারা অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজনদের খবর পেঁৗছে দেয় সরে পড়তে বা অন্তত কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে। এ বাবদেও চিহ্নিত দুষ্কৃতকারী বা তাদের চক্রের কাছ থেকে থানার নিয়মিত অর্থাগম হয়। তা না হলে পুলিশের অনেক এসআইও ঢাকা শহরে ফ্ল্যাট বা বাড়ির মালিক হন কীভাবে? ছেলেমেয়েদের নামিদামি স্কুলে বা নিজ খরচে বিদেশে পড়তে পাঠাবার সঙ্গতিই বা তাঁদের কীভাবে হয়? এর মানে কিন্তু এই নয় যে, পুলিশ বা অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিচের স্তরের সদস্যরাই কেবল ঘুষ-রেশওয়াতের ওপর জীবনধারণ করেন। থানায় বসে বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে তোলা সব অর্থেরই বিলিবণ্টনের নাকি একটা নিয়ম আছে। আর সে নিয়ম অনুযায়ী সংগৃহীত সকল অর্থের ভাগ একেবারে উচ্চস্তর অবধি পেঁৗছায়। ওপরের চাপ বা নির্দেশ পালন করতে কিংবা অন্যকথায় নিজেদের কর্মতৎপরতা দেখাতে, অনেক সময় নাজিমের বদলে নিজামকে ধরে এনে হাজতে পোরা হয়। তারপর নির্যাতনের মুখে তাকে নিজের নাম নাজিম বলে স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়। নাজিম নামেই তাকে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে হাজির করা হয়। আদালতে মামলা চলাকালে পাছে জেরার মুখে তার আসল পরিচয় বেরিয়ে যায়, সেজন্য বছরের পর বছর তাকে বিনা বিচারে জেলেই পচে মরতে হয়। পুলিশি তদন্ত রিপোর্টের অভাবে আদালতে মামলা ওঠে না। নানা সূত্রে খবর পেয়ে মানবাধিকার কর্মীরা বিভিন্ন সময় বিনা বিচারে জেল খাটা এমন কিছু ব্যক্তির সন্ধান পেয়েছেন, যারা তাদের জীবনের মূল্যবান বছরগুলো কারাগারেই কাটিয়ে দিয়েছে। যাদের সন্ধান পাওয়া গেছে, তাদের বাইরেও নিশ্চয় এমন আরও অনেক বন্দি আমাদের জেলখানাগুলোতে রয়ে গেছে। এদেশের মানুষ কবে পুলিশকে বন্ধু ভাবতো আমাদের জানা নেই। ‘বাঘে ছুঁলে আঠার ঘা, পুলিশ ছুঁলে ছত্রিশ’ কথাটা তো সতর্কবাণী হিসেবে অনেক আগে থেকেই এদেশে চালু আছে। ইদানীং অনেকের মুখে যে শোনা যায়, পুলিশই সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী বা চাঁদাবাজ, তারও যে ভিত্তি নেই এমন বলা যাবে না। টাকা খরচ করে তারা ‘মালে’র জায়গায় পোস্টিং বা বদলি নেন, তারপর পরমোৎসাহে ‘মাল’ কামাতে শুরু করেন। সকাল বেলায় ঢাকা শহরের প্রবেশ পথগুলোতে কি অন্য সময় শহরের রাস্তায় প্রকাশ্যে পুলিশের এই সংগ্রহ অভিযান একটি পরিচিত দৃশ্য। বলা বাহুল্য, সব পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্যই এরকম নন। সৎ ও দায়িত্বশীল লোকজন পুলিশেও আছে, যেমন সমাজের অন্যান্য পেশায়ও আছে। তবে তাঁরা সর্বত্র ও সব অবস্থায়ই কোণঠাসা। পাঠক ভাবতে পারেন, রাজনের হত্যাকা- নিয়ে লিখতে বসে পুলিশ নিয়ে এই সাতকাহন কেন? কারণ আমরা মনে করি, ওই কিশোরের হত্যাকা-ের ব্যাপারে পুলিশ তার দায়দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে না। হ্যাঁ, পুলিশ কারো বেডরুম পাহারা দিতে পারে না সত্যি। সাগর-রুনির হত্যাকা- রাতের বেলায় তাঁদের বেডরুমে ঘটেছিল বলে আজও তার বিচার করা গেল না। হত্যাকা-ের পেছনে প্রকৃত রহস্য উদ্ধার হল না। কিন্তু রাজনকে হত্যা করা হয়েছে প্রকাশ্য দিবালোকে, বাসস্ট্যান্ডের কাছে। হত্যাকা-ের মূল নায়ক কে, অন্য কারা কারা এতে অংশ নিয়েছে, এলাকাবাসী নিশ্চয় তা জানে। যদি তারা পুলিশকে সরাসরি তা বলতে না চায়, বুঝতে হবে, পুলিশের ওপর তাদের বিশ্বাস বা আস্থার অভাব রয়েছে। সাম্প্রতিককালে সারা দেশে গুম, খুন, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো অজস্র অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে পুলিশ-র‌্যাব প্রভৃতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততার ঘটনা, পুলিশ বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতা এবং বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্মাধিকারীদের রাজনীতিকদের মতো বক্তৃতা-বিবৃতি বাহিনীর ভাবমূর্তির অনেকখানি ক্ষতি করেছে। মানুষ পুলিশকে আগেও ভয় পেত, তবে সে ভয়ের ধরন ছিল অন্য রকম। ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের ওপর কিছুটা আস্থাও যেন মানুষের ছিল। আজ তার ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট আছে কি না সন্দেহ।

আমাদের রাজনীতিকরা, যাঁরা যখন ক্ষমতায় থাকেন, পুলিশকে রাষ্ট্র বা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ভাবার বদলে দলীয় পেটোয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করতে চান। ফলে তাঁরা যখন ক্ষমতার বাইরে নিক্ষিপ্ত হন, তখন তাঁদেরকেই আবার পুলিশ বাহিনীর নির্যাতন ও বাড়াবাড়ির শিকার হতে হয়। বর্তমানে যাঁরা ক্ষমতায় আছেন তাঁদেরকে অতীতে এই অভিজ্ঞতার স্বাদ নিতে হয়েছে। আর তখন যাঁরা ক্ষমতায় থেকে ধরাকে সরা জ্ঞান করেছিলেন, তাঁদেরকে আজ একইভাবে পুলিশি নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে। কিন্তু একটা কথা আছে না, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল এই যে, ইতিহাসের শিক্ষা কেউ মনে রাখে না? আর ক্ষমতা মানুষকে প্রায়শ অন্ধ করে দেয়।

রাজন হত্যকা-ের মূল আসামি কামরুল নাকি এর মধ্যে সৌদি আরবে পালিয়ে গেছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী সেখানে সৌদি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে। আটক কামরুলের একটি ছবিও কোনো সূত্রে সংগৃহীত হয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হল এত বড় অপরাধ ঘটিয়ে লোকটি নির্বিঘ্নে দেশ ছেড়ে যেতে পারল কীভাবে? কোন পথে? নিশ্চয় বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশন পেরিয়েই তাকে যেতে হয়েছে? এ ব্যাপারে জনৈক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে তার লেনদেনের যে কথা শোনা যাচ্ছে, তা যদি মিথ্যা না হয়, তবে ওই পুলিশ কর্মকর্তার ‘সাহসে’র উৎস কী বা কোথায়? তিনি কি একাই কয়েক লক্ষ টাকা গাপ করেছেন? তাঁর পাশে বা পেছনে আর কেউ বা কেউ-কেউ কি ছিল না, কিংবা নেই? তাঁকে বা তাঁদের খুঁজে বের করা কি কোনোদিনই সম্ভব হবে? সে খুঁজে বের করার দায়িত্বটাই বা কার?

বিচারহীনতার সংস্কৃতি যদি কোনো দেশে একবার তার আসন গেড়ে বসে, তা যদি অব্যাহত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেতে থাকে, ক্ষমতার উচ্চতম শিখর থেকে প্রশ্রয় পায়, তবে সে দেশের মানুষের কাছে দুর্বৃত্তদের থেকে শত হাত দূরে থাকার, নিজেকে নিরাপদ রাখার তাগিদটাই বড় হয়ে দেখা দেয়। সেখানে ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা, অপরের বিপদে এগিয়ে যাওয়ার কর্তব্যবোধ স্রেফ বোকামি হিসেবে গণ্য হয়। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন ও দুবর্ৃৃত্তপনার রাজনীতিকীকরণ এই উভয় পথে আমরা আজ তেমন এক সর্বনাশা বাস্তবতার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি। এক নারায়ণগঞ্জ নয়, বলা যায় সমগ্র বাংলাদেশই আজ দুর্বৃত্তদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জত্বকি হত্যাকা-ের মূল নায়কদের আজও শনাক্ত করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় নি। বরং সে হত্যাকা-ের ধারাবাহিকতায় মনে হয় একই ব্যক্তি বা ব্যক্তিচক্রের উদ্যোগে পরবর্তী সময়ে আরও সাত সাতটি গুমখুনের ঘটনা সেখানে ঘটেছে। আর শেষোক্ত ঘটনাগুলোতে রাষ্ট্রের এলিট ফোর্স বলে পরিচিত র‌্যাব কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ত্বকির এবং পরবর্তী সাত খুনের ঘটনায় এবং অপরাধীদের একজনকে নিরাপদে ভারতে পাড়ি জমাবার সুযোগ করে দেওয়ার ব্যাপারে স্থানীয় প্রভাবশালী একজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল উঠেছে। অভিযোগকারীদের মধ্যে তাঁর নিজ দল থেকেই নির্বাচিত পৌর মেয়রও রয়েছেন। গুমখুনের মতো ফৌজদারি মামলাযোগ্য অভিযোগ কারো বিরুদ্ধে থাকলে, তিনি দোষী বা নির্দোষ সেটা প্রমাণিত হওয়া পরের কথা, পুলিশের কর্তব্য তাকে গ্রেপ্তার ও জেরা করা। কিন্তু তার বেলায় সেটা তো করা হয়ই নি, যাঁরা এসব হত্যাকা-ের বিচার চেয়ে আন্দোলন করছেন, দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দাবি করছেন, ওই ব্যক্তিটি প্রকাশ্যে তাঁদের হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন। ত্বকির বাবা রফিউর রাবি্ব ও মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী সম্পর্কে সভা-সমাবেশে অশালীন উক্তি তো বটেই, পদে পদে তাঁদেরকে বিপদগ্রস্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। দেশের সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষ হতভম্ব ও হতাশ হয়, বিভ্রান্ত বোধ করে, যখন তারা দেখে খোদ সরকার প্রধান সংসদে দাঁড়িয়ে অভিযুক্ত সে ব্যক্তিটির পক্ষে কথা বলেন। তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যের বয়ান দেন। কে কোন পরিবারের সদস্য, তাঁর পূর্ব পুরুষরা দলের বা দেশের জন্য কী ভূমিকা রেখেছেন, তা ভেবে কি আইন চলবে? ‘আইন অন্ধ’ কথাটির প্রাসঙ্গিকতা তো এখানেই।

রাজন হত্যার মতো এমন নৃশংস ঘটনা যে পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে একেবারেই কখনো ঘটে না, তা নয়। ঘটে, এবং সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে তেমন খবর আমরা ঠিক ঠিক জানতেও পারি। জেনে কখনো বিমর্ষ হই, কখনো শিউরে উঠি। কখনো কোনো ঘটনায় আপন মানবজন্মের কথা ভেবে হয়তো ধিক্কারও জন্মে। কিন্তু ভিনদেশে ঘটে যাওয়া সে সব ঘটনার ব্যাপারে বড়জোর নিন্দা-প্রতিবাদ জানাতে পারি আমরা। বেশি কিছু করার থাকে না আমাদের। ভরসা রাখি, দেশটি যদি হয় সভ্য, গণতান্ত্রিক, আইন দ্বারা শাসিত, তবে এ ধরনের অন্যায় বা নৃশংসতার বিচার সেখানে হবেই। ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি, তা তিনি যত ক্ষমতাধর বা প্রভাবশালীই হন, বংশগৌরব বা সামাজিক সম্পর্কের দিক দিয়ে যত উঁচুতেই তাঁর অবস্থান হোক, রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন বা বিরোধী যে পক্ষেই তিনি থাকুন, শাস্তি তাঁকে শেষ পর্যন্ত পেতেই হবে। আর দেশটি সম্পর্কে আমাদের ধারণা যদি হয় বিপরীত, তবে সেক্ষেত্রে অনুরূপ কোনো আশা আমাদের মধ্যে কাজ করে না। বরং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই সে দেশটির জন্য স্বাভাবিক বলে মনে করি। প্রায় প্রতিদিন দেশের নানা স্থানে ঘটে যাওয়া গুম, খুন ও সন্ত্রাসের ঘটনা বিশ্ববাসীর চোখে বাংলাদেশ নামক দেশটির ভাবমূর্তি কোন জায়গায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে, আমরা কি একবারের জন্যও ভেবে দেখছি? মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা, নোবেল জয়ের গর্ব, ক্রিকেটের সাফল্য কিংবা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার উল্লাস দিয়ে কি এই গ্লানিকে আমরা আড়াল করতে পারব?

সরকার বা প্রশাসনে যাঁরা আছেন তাঁরা অবশ্য জানেন, খুব ভালো করেই জানেন, রাজন হত্যা নিয়ে এই নিন্দা-প্রতিবাদ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়ু কয়েকদিন মাত্র। আপাতত তাঁদের করণীয় কয়েকদিন শুধু ‘তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে’, ‘দোষীদের অবশ্যই বিচার ও শাস্তি হবে’, ‘কাউকে ছাড়া হবে না’ এই গতানুগতিক বক্তব্যের রেকর্ডটা বাজিয়ে যাওয়া। আমরা যারা দেশের নাগরিক, তারা ঘটনার বিবরণ পড়ে শিহরিত হব, ‘আহা-উহু’ করব। সাধারণজন যারা তারা বাসে ও অফিসে আর বিশিষ্টজনরা টিভি টকশোতে এ নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা-বিতর্ক করবেন। অনেকের মনে হয়তো সত্যিকার ক্ষোভ-প্রতিবাদ গুমরে উঠবে। অধিকতর সংবেদনশীল ও তৎপর কেউ কেউ মানববন্ধনে গিয়ে দাঁড়াবো। প্লাকার্ড হাতে বিক্ষোভ মিছিলে শরিক হব। অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে সেস্নাগানে গলা মেলাব। তারপর সব আবার আগের মতোই চলতে থাকবে। আরেকটি বা হয়তো আরও বড় কোনো ঘটনা বা অঘটন এই মৃত্যুর স্মৃতিকে আড়াল করে দাঁড়াবে। আমরা আবার অন্য কারো হত্যা, নির্যাতন বা ধর্ষণের প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দেব, মানববন্ধনে দাঁড়াবো, মিছিল করব। বিশ্বজিৎ, ত্বকি, রাজনদের স্মৃতি নিয়ে তাদের বাবা-মা ও পরিবারের লোকজন বেঁচে থাকবে। ঈদে-পুজোয় তাদের কথা ভেবে নীরবে অশ্রু ফেলবে। প্রতিদিন পানি খেতে গিয়ে রাজনের বাবা-মার মনে পড়বে, তাদের ছেলেটি মারা যাবার আগে পিপাসায় ছটফট করেছে, এক ফোঁটা পানি কেউ তার মুখে তুলে দেয় নি। হ্যাঁ, কেবল তাদেরই তা মনে পড়বে। আমাদের ইফতার পার্টির শরবতের স্বাদকে তা কিছুমাত্র বিস্বাদ করবে না। ভোর রাতে গাড়ি হাঁকিয়ে হোটেলে সাহরি খেতে যাওয়ার শৌখিনতায় তা ছেদ টানবে না। রাজনের বা তার কাছাকাছি বয়সী নিজ সন্তানটির জন্য ঈদের বাড়তি আরেক সেট কাপড় কিনতে গিয়ে আমাদের কজনের সিলেটের সবজি বিক্রেতা ওই গরিব ছেলেটির কথা মনে পড়বে? যার অভাবে এবারের ঈদের দিনটি তার বাবা-মা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা কেবল কেঁদেই পার করবে। আসলে রাজনরা তো গুরুত্বপূর্ণ কেউ নয়, তাদের নিয়ে কে আর কতদিন শোক প্রকাশ করতে পারে? আর তাদের স্বজনদের শোক, তারই বা মূল্য কী?

হাসান শফি : লেখক ও চিন্তক
morshedshasan@gmail.com