সমুদ্র পেরিয়ে যাবে ছেলের নাম: বিনম্র শ্রদ্ধায় কালামকে গ্রহণ করলো দিল্লি

বিনম্র শ্রদ্ধায় কালামকে গ্রহণ করলো দিল্লি

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের মরদেহ দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়েছে। সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দিল্লির রাজজি মার্গ বাংলোয় রাখা হবে তার মরদেহ। আগামীকাল তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমের মাটিতে চির নিদ্রায় শায়িত হবেন তিনি।

দুপুরে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিশেষ একটি বিমানে আসামের গোয়াহাটি থেকে সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের মরদেহ নিয়ে দিল্লি পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে তাঁর সম্মানে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।

এর আগে মঙ্গলবার সকালে ভারতের জাতীয় পতাকায় ঢেকে দিল্লির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে বিমানটি।
বিমানবন্দরে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তিন বাহিনীর প্রধানসহ সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা আব্দুল কালামকে শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন।
এরপর সেখান থেকে মরদেহ নেওয়া হয় তার অফিসিয়াল বাসভবনে। স্থানীয় সময় বিকাল ৪টা থেকে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সেখানেই রাখা হবে মরদেহ।
সোমবার শিলংয়ের আইআইএমে বক্তৃতা করার সময় হঠাৎই বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন ভারতের মিসাইল ম্যান। পরে দ্রুত তাকে পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে, সেখানেই মারা যান তিনি।
সকালে শিলং-এর মিলিটারি হাসপাতালের হিমঘর থেকে তার মরদেহ আসামের গোয়াহাটিতে নিয়ে যাওয়া হয়।
আসামের মূখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ আব্দুল কালামের কফিনে মালা দিয়ে সম্মান প্রদর্শণ করেন।তিনি বলেন ‘অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেলো দেশের। তিনি শিশু ও দেশকে ভালোবাসতেন। তার সঙ্গে অনেকবার দেখা হয়েছে। আমি তাকে আসামের প্রান্তিক এলাকাতেও নিয়ে গেছি। অনেক সাধারণ ও সৎ মানুষ ছিলেন তিনি।’

সমুদ্র পেরিয়ে যাবে ছেলের নাম

আর সাত ভাইবোনের জন্য মা শুধু ভাত রাঁধতেন। কিন্তু ছোট ছেলেটার জন্য করতেন বাড়তি কয়েকটা রুটি। ভোর চারটেয় উঠে পড়তে বসবে ছেলেটা। তখন খিদে পাবে তো। শুধু তা-ই নয়। দিন-আনি-দিন-খাইয়ের সংসারে নামমাত্র পুঁজি থেকে কিনতেন বাড়তি কেরোসিন। কত রাত পর্যন্ত ছেলে পড়াশোনা করবে কে জানে! লেখাপড়া শিখেই যে এই ছেলে অনেক দূর যাবে, ঠিক জানতেন মা। স্বপ্ন দেখতেন,তাঁদের বাড়ির খুব কাছেই যে বঙ্গোপসাগর, সেই বিশাল সমুদ্রও ছাড়িয়ে যাবে তাঁর ছেলের নাম-ডাক। কলকাতাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার এমনই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আজ।

মায়ের সেই স্বপ্ন সত্যি করেছিলেন আব্দুল। তবে রাস্তাটা নেহাত সোজা ছিল না। ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর। ভারতের তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে এক অতি দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবুল পকির জয়নুল আবদিন আব্দুল কালাম। বাবা জয়নুল আবদিন ছিলেন এক সাধারণ মৎস্যজীবী। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই রোজগারের তাগিদে খবরের কাগজ বিক্রি করতে হতো আব্দুলকে। স্কুল পাশ করে কলেজে পড়ার জন্য একটা বৃত্তি পান তিনি। ভর্তি হন তিরুচিরাপল্লির সেন্ট জোসেফ কলেজে। ১৯৫৪ সালে সেখান থেকেই পদার্থবিদ্যায় স্নাতক। তার পর ফের স্কলারশিপ নিয়ে চেন্নাইয়ে। পড়তে শুরু করেন এয়ারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং। তাঁর স্বপ্ন ছিল ভারতীয় বায়ুসেনায় বিমানচালক হবেন। তাঁর ক্লাসের প্রথম আট জনকে বায়ুসেনায় যোগ দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল। কালাম হয়েছিলেন নবম। সে-যাত্রায় তাই আর যুদ্ধবিমানের চালক হয়ে ওঠা হয়নি কালামের।

বিমানচালক হয়ে ওঠা হল না। তবে নিজের অদম্য চেষ্টায় তিনি হয়ে উঠলেন দেশের ‘মিসাইল ম্যান’। ১৯৯৮ সালে পোখরান বিস্ফোরণ পরীক্ষার অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। পড়াশোনার জন্য এক বারই শুধু গিয়েছিলেন বিদেশে, ১৯৬৩-৬৪ সালে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র ‘নাসা’য়। যে বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নের জাল বুনতেন মা আসিম্মা, সেই সমুদ্রসৈকতেই দু’দশক ধরে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণ করে গিয়েছেন ছেলে। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ছিলেন ডিআরডিও, ইসরোয়। মহাকাশপরমাণু গবেষণায় তাঁর অবদানের জন্য পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ ও ভারতরতেœ সম্মানিত হয়েছিলেন আব্দুল কালাম।

২০০২ সালে ভারতের একাদশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন এপিজে। রাষ্ট্রপতি ভবনে ছিলেন ২০০৭ সাল পর্যন্ত। তাঁর সময়ে রাষ্ট্রপতি ভবনের দরজা সর্বসাধারণ, বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। ছেলে-বুড়ো,বিজ্ঞানী-শিক্ষক সকলের কাছেই তিনি ছিলেন ‘সর্বসাধারণের রাষ্ট্রপতি’।

রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর তিনি আবার ফিরে যান পড়াশোনার জগতে। শিলং, ইনদওর ও আমদাবাদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট, তিরুঅনন্তপুরমের ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে নিয়মিত পড়াতেন। এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মঞ্চেই বক্তৃতা দিতে দিতে তাঁর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়া তাই এক আশ্চর্য সমাপতন!

ধর্মের গোঁড়ামি এড়িয়ে চলতেন বাবা-মা। ছোটবেলা থেকে মুক্তমনা ছিলেন আব্দুলও। গড়গড় করে মুখস্থ বলতে পারতেন ভগবদ্গীতা। কোরান শরিফও। তবে শুধু বইয়েই ডুবে থাকতেন না তিনি। তাঁর ঘনিষ্ঠরা জানাচ্ছেন, কোথাও যাওয়ার আগেই পকেট থেকে বার করে ফেলতেন ছোট্ট চিরুনি। নামাজাদা হেয়ার স্টাইলিস্টের কল্যাণে তৈরি হয়েছিল তাঁর নিজস্ব চুলের ছাঁট। আর সব সময় বলতেন, লেখাপড়ার কোনও বিকল্প হয় না। স্কুলপড়ুয়াদেরও বারবার অনুপ্রাণিত করে বলেছেন, নিজের ভবিষ্যতের কারিগর হতে গেলে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। আর কখনও কাজে ফাঁকি দেবে না। নিজের জীবনেও এ কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গিয়েছেন। কর্মজীবনে ঠিক দু’দিন ছুটি নিয়েছিলেন, মায়ের আর বাবার মৃত্যুদিনে। বলে গিয়েছিলেন, ‘‘আমার মৃত্যুতে ছুটি ঘোষণা কোরো না। আমায় যদি ভালবাসো, মন দিয়ে কাজ করো সে দিন।’

আব্দুল কালামের বিখ্যাত কিছু উক্তি

আব্দুল কালামের বিখ্যাত কিছু উক্তিভারতের মিসাইলম্যান, শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী, ভারতরত্ন; এসব খেতাব আব্দুল কালামের পরিচয় যথাযথভাবে তুলে ধরার জন্য একেবারেই যথেষ্ট নয়।তামিলনাড়ুর অতিদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে ভারতের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত এই অসামান্য প্রতিভাধর ব্যক্তির কিছু উক্তি আমাদের আজও প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করে।

চ্যানেল আই অনলাইনের পাঠকদের জন্য তার এমনই কিছু উক্তি দেয়া হলো:

‘সূর্যের মতো দীপ্তিমান হতে হলে প্রথমে তোমাকে সূর্যের মতোই পুড়তে হবে।’

‘স্বপ্নকে সত্যি করতে হলে প্রথমে তোমাকে স্বপ্ন দেখতে হবে।’

‘ঘুমের মধ্যে যা তুমি দেখো, সেটা স্বপ্ন না। যা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না, সেটাই স্বপ্ন।’

‘শ্রেষ্ঠত্ব একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়।’

‘জীবন একটি কঠিন খেলা। ব্যক্তি হিসেবে মৌলিক অধিকার ধরে রাখার মাধ্যমেই শুধুমাত্র তুমি সেখানে জয়ী হতে পারবে।’

‘সাফল্যকে উপভোগ করার জন্যই জীবনে প্রতিবন্ধকতা প্রয়োজন।’

‘আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সমৃদ্ধ এবং নিরাপদ ভারত প্রদান করতে পারলেই তারা আমাদের মনে রাখবে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সভ্যতার ঐতিহ্যকে ধরে রাখার মাধ্যমে তা সম্ভব।’

‘যারা হৃদয় দিয়ে কাজ করতে পারে না; তাদের অর্জন অন্তঃসারশূন্য, উৎসাহহীন সাফল্য চারদিকে তিক্ততার উদ্ভব ঘটায়।’

‘শিক্ষার্থীদের মাঝে অনুসন্ধানের প্রেরণা, সৃষ্টিশীলতা, উদ্যোগী মনোভাব এবং নৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টি করার মাধমে তাদের আদর্শ হয়ে উঠা একজন শিক্ষাবিদের দায়িত্ব।’

‘আকাশের দিকে তাকাও। আমরা একা নই। পুরো মহাবিশ্ব আমাদের প্রতি বন্ধুত্বসুলভ। যারা স্বপ্ন দেখে এবং কাজ করে শুধুমাত্র তাদেরকেই শ্রেষ্ঠটা দেয়ার জন্য চক্রান্তে লিপ্ত এই বিশ্ব।’

‘যদি একটি দেশকে দুর্নীতিমুক্ত এবং সুন্দর মনের মানুষের জাতি হতে হয়, তাহলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এক্ষেত্রে তিনজন সামাজিক সদস্য পার্থক্য এনে দিতে পারে। তারা হলেন বাবা, মা এবং শিক্ষক।’

‘ভিন্নভাবে চিন্তা করার ও উদ্ভাবনের সাহস থাকতে হবে, অপরিচিত পথে চলার ও অসম্ভব জিনিস আবিষ্কারের সাহস থাকতে হবে এবং সমস্যাকে জয় করে সফল হতে হবে। এ সকল মহানগুণের দ্বারা তরুণদের চালিত হতে হবে। তরুণ প্রজন্মের প্রতি এই আমার বার্তা।’

সূত্র: আনন্দবাজার / চ্যানেল আই অনলাইন