বড় হলে দুরারোগ্য রোগের কারণ হবে ক্ষুধামান্দ্য | রাজধানীর শিশুপার্ক ও শিশুদের বিনোদন

বড় হলে দুরারোগ্য রোগের কারণ হবে ক্ষুধামান্দ্য

নগর শিশু
Nogor Sishu নগর শিশু

নগর শিশুর প্রতিদিন- ৪

০০ আসিফুর রহমান সাগর

ব্যস্ত শহর জীবনে মা-বাবার সবচেয়ে বড় সমস্যা কি? সবাই একবাক্যে বলবেন, ‘আমার সন্তান কিছুই খেতে চায় না। ডাক্তার দেখিয়েও কোন লাভ হয় না। কি যে করি?’

শিশু খেতে চায় না,- এ অভিযোগ বোধকরি শহরের প্রতিটি মা-বাবার। আলাপকালে এ প্রসঙ্গে ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মনজুর হোসেন বললেন, ‘শিশুরা খেতে চায় না পিতা-মাতার এ অভিযোগের অন্ত নেই। কিন্তু কেন শিশু খেতে চায় না সেটা কি তারা ভাবেন? খেলাধুলা করলে, ছুটোছুটি করলে শিশুদের খাওয়ার চাহিদা বাড়ে, কিন্তু শহরের শিশুদের খেলাধুলা আর ছুটোছুটি করার সে সুযোগ কই? শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন-যাপনের অভাবে শিশুরাও অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। প্রতিদিন দৌড়াদৌড়ি, হুটোপুটি না করলে শরীরের কোন পরিশ্রম হয় না। ফলে তাদের খিদেও পায় না। খিদে না পাওয়া, কম খাওয়া আর খেলাধুলার অভাবে এই শিশুদের মধ্যে ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয়। ফলে মায়েরা দিনরাত দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এ সমস্যা বড়দের তৈরি করে দেয়া তার জীবন-যাপন পদ্ধতির। বেশিরভাগ বাবা-মাই জানেন না যে, শারীরিক পরিশ্রম না করার কারণেই শিশুর মধ্যে এ ধরনের ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয়। শিশু বয়সের এই সমস্যা বড় হওয়ার পর গুরুতর অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সুতরাং যারা একটি শিশুর বৃদ্ধির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত অর্থাৎ মা-বাবা, স্কুল কতর্ৃপক্ষ তাদের আরো বেশি দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে। একটি শিশুকে লেখাপড়ায় ‘ফার্স্ট’ করানোর পেছনে না ছুটে তাকে সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী, বুদ্ধিমান মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার পেছনে সবার দৃষ্টি দেয়া উচিত বলে মত দেন শিশু বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন বলেন, ক্ষুধামান্দ্যর পাশাপাশি স্কুলে যাওয়া শিশুদের মধ্যে ‘ওবেসিটি’ বা ওজন বেড়ে যাওয়া সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করছে। শিশুদের মধ্যে স্বাভাবিক খাবার না খেয়ে ‘ফাস্ট ফুড’ আসক্তির ফলেই ‘ওবেসিটি’ হচ্ছে। তিনি জানান, এর ফলে শিশুদের মাঝে দেখা দিচ্ছে পুষ্টিহীনতা। তারা দিন দিন নির্জীব হয়ে পড়ছে। যেকোন কাজে বা খেলাধুলায় আগ্রহ হারাচ্ছে তারা। এর ফলে শিশুদের শ্বাসকষ্ট, এজমার সমস্যা দেখা দেবে। এই শিশুরা বড় হলে তাদের মাঝে রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি হবে। যার কারণে উচ্চ রক্তচাপসহ হার্টের নানা রোগ দেখা দেয়ার আশঙ্কা থাকে।

শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের ভবিষ্যৎকে এই রোগভোগের দিকে ঠেলে না দিয়ে এখন থেকেই সচেতন হতে হবে। একটি শিশু তার স্কুলেই দিনের সবচেয়ে বেশি সময় কাটায়। ফলে স্কুলে শিশুটির জন্য প্রতিদিন শারীরিক পরিশ্রম হয় এ ধরনের খেলার ব্যবস্থা রাখতে হবে। খোলা মাঠ না থাকলে ইনডোর খেলা যেমন টেবিল টেনিস, বাস্কেটবল প্রভৃতি খেলার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এতে তাদের শারীরিক পরিশ্রম হবে।

ডা. মনজুর বলেন, স্কুল কর্তৃপক্ষের উচিত স্কুলে খেলাধুলার পাশাপাশি ক্যাম্পিং ও আউটিং-এর ব্যবস্থা রাখা। এতে শুধু নির্দিষ্ট সময় নয়, একটা দীর্ঘ সময় ধরে কাজের অভিজ্ঞতা হবে শিশুদের। এটা তার মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধির সহায়ক। এতে শিশু আত্মবিশ্বাসী হয়ে বেড়ে উঠবে।
——————————————————————————————————————————

Nogor Sishu নগর শিশু
Nogor Sishu নগর শিশু

রাজধানীর শিশুপার্ক ও শিশুদের বিনোদন

পবিত্র দুই ঈদ ও জাতীয় উৎসব উদযাপনের সময় রাজধানীর শিশুপার্কগুলিতে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের উপচেপড়া ভিড় পরিলক্ষিত হয়। এই পার্কগুলিই তাহাদের চিত্ত-বিনোদনের প্রধান ভরসা হইয়া ওঠে। এক রিপোর্টে দেখা যায় যে, শাহবাগস্থ শহীদ জিয়া শিশুপার্কে সাধারণ কর্মদিবসে নিম্নে ১০ হাজার এবং ছুটি বা উৎসবের দিনগুলিতে দুই লক্ষ টাকারও বেশি আয় হয়। কিন্তু আয় অনুযায়ী বিনোদনের সুযোগ-সুবিধা তো বাড়েই না, বরং দিন দিন তাহা আরও সংকুচিত হয়। অভিভাবকদের এ সংক্রান্ত অভিযোগের অন্ত নাই। আলোচ্য শিশুপার্কটি অত্যন্ত সুপরিচিত হইলেও জরাজীর্ণ রাইডগুলির কারণে এখন অনেকের কণ্ঠে ধ্বনিত হইতেছে হতাশার সুর। অধিকাংশ রাইড মেয়াদোত্তীর্ণ, অনাকর্ষণীয় ও বিপজ্জনক। মেরামত বা জোড়াতালি দিয়া আর কতদিনই বা চালানো যায়! টগবগ টগবগ ঘোড়ার ভাঙ্গা হাতল, লম্ফঝম্পের ছিঁড়িয়া যাওয়া ক্যানভাস, রেলগাড়ির শতচ্ছিন্ন আসন, সন্ধ্যায় অপর্যাপ্ত আলো ইত্যাদি সমস্যা যেন দেখার কেহ নাই। নূতন রাইড সংযোজন দূরের কথা, বেবিসাইকেল চালনা ও চাকা পায়ে চলা খেলা দুইটির কোন অস্তিত্বই এখন নাই। অন্যান্য রাইডেও আছে পর্যাপ্ত খেলনার অভাব। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরিয়া শিশুপার্কের প্রকৃত সংস্কার ও উন্নয়ন না থাকায় আসলে অনেক সমস্যারই সমাধান হইতেছে না।

শুধু শহীদ জিয়া শিশুপার্কই নহে, অপরাপর শিশুপার্কের অবস্থাও তথৈবচ। অনেক শিশুপার্ক খাতা-কলমে থাকিলেও বাস্তবে তাহার অস্তিত্ব নাই বা থাকিলেও দুর্দশাগ্রস্ত। অযত্ন ও অবহেলায় প্রায় পরিত্যক্ত। রাজধানীর বিলুপ্ত শিশুপার্কগুলির একটা ছোট্ট তালিকা দেওয়া যাইতে পারে। যেমন- লালমাটিয়া নিউ কলোনি শিশুপার্ক, বকশীবাজার শিশুপার্ক, মতিঝিল বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন শিশুপার্ক, সায়েদাবাদ শিশুপার্ক, টিকাটুলি শিশুপার্ক, আজিমপুর শিশুপার্ক, উত্তরা ১ নং সেক্টরের শিশুপার্ক এবং মিরপুর ২ ও ৬ নং সেক্টরের শিশুপার্ক। এসব শিশুপার্ক রক্ষায় সংশিস্নষ্ট কতর্ৃপক্ষের পাশাপাশি স্থানীয় নাগরিকদেরও ব্যর্থতা সীমাহীন। ঈদ আসিলেই শিশুপার্কের প্রয়োজনীয়তা অধিক হারে অনুভূত হয়। ঈদ চলিয়া গেলে সারা বৎসর ইহা লইয়া কেহ তেমন আর উচ্চবাচ্য করেন না। তবে আশার কথা এই যে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ঢাকা শহরে অনেক চিত্তাকর্ষক ও মনোরম শিশুপার্ক বা বিনোদন কেন্দ গড়িয়া উঠিয়াছে। কিন্তু সেইসব স্থানে শিশু-কিশোরদের লইয়া আনন্দ-উৎসব করা ব্যয়বহুল বলিয়া বিশেষত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য তাহা সাধ্যাতীত। এমতাবস্থায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছড়াইয়া-ছিটাইয়া থাকা সরকারি পার্কগুলিকে শিশু-কিশোরদের জন্য অধিকতর বিনোদন উপযোগী করিয়া গড়িয়া তোলা একান্ত প্রয়োজন।

এই উপলক্ষে সর্বাগ্রে পার্কগুলিকে বেদখলমুক্ত করিতে হইবে। অতঃপর তাহা সুরক্ষায় সীমানা প্রাচীর নির্মাণপূর্বক সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তুলিতে হইবে। ঢাকা শহরে ৯০টিরও বেশি পার্ক রহিয়াছে। ইহার তত্ত্বাবধায়ক সিটি করপোরেশন, রাজউক, গণপূর্ত অধিদপ্তরসহ একেক সংস্থা। পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত পার্ক বা মাঠ-ঘাটের অভাবে রাজধানীর শিশু-কিশোররা দিন দিন ইট-পাথরের এই শহরে গৃহবন্দী হইয়া পড়িতেছে। ইহাতে তাহাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হইতেছে মারাত্মকভাবে যাহা দেশের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দুঃসংবাদবহ। গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিলে ইহা জাতীয় উন্নয়নেরও প্রতিবন্ধক। তাই এ ব্যাপারে সরকার ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের সঠিক উপলব্ধি ও পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত দরকার। সেই সঙ্গে সর্বসাধারণের সচেতনতা ও নাগরিক আন্দোলনও জরুরি।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য Jahan Hassan Ekush bangla desh Share Market