মদ্যপ-চালকের দেশভেদে শাস্তি

মদ্যপ-চালকের দেশভেদে শাস্তি

মদ্যপ-চালকের দেশভেদে শাস্তি

হাসানুল বান্না, দ্য রিপোর্ট : মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। এতে করে অন্যরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনই কখনো কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মদ্যপ-চালকও। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ। তাই দেশে দেশে মদ্যপ-চালকদের শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে দেশভেদে তা ভিন্নতর ও বৈচিত্র্যময়ও বটে। এমনকি কোনো কোনো দেশে এই অপরাধের চূড়ান্ত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

আসুন আমরা জেনে নিই মদ্যপ-চালকের দেশভেদে শাস্তির ভিন্নতা—
বাংলাদেশ : বাংলাদেশে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালালে প্রথমবার শাস্তি সর্বোচ্চ ৩ মাস জেল ও ১ হাজার টাকা জরিমানা— এই দু’টির যেকোনো একটি বা দু’টিই হতে পারে। এবং পরিবর্তীকালে যদি একই অপরাধ করে তবে তার সর্বোচ্চ ২ বছরের জেল ও ১ হাজার টাকা জরিমানা এবং সাময়িকভাবে ড্রাইভিং-লাইসেন্স স্থগিত করা হয়।

তুরস্ক : তুরস্কে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালালে চালক সমেত গাড়িটি শহর থেকে বিশ কিলোমিটার দূরে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং চালককে আবার পুলিশ প্রহরার মধ্য দিয়ে দশ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে ফিরে আসতে হয়।

রাশিয়া : রাশিয়াতে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অপরাধে সারাজীবনের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স হারাতে হয়।

কোস্টারিকা : উত্তর আমেরিকার দেশ কোস্টারিকায় মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে ধরা পড়লে পুলিশ তৎক্ষণাৎ সংশ্লিষ্ট গাড়ির নাম্বার প্লেট খুলে ফেলে।

অস্ট্রেলিয়া : অস্ট্রেলিয়ায় মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়লে সেই ব্যক্তির নাম ও ছবি ক্যাপশন সহকারে পত্রিকাতে প্রকাশ করা হয়। আর ক্যাপশনে উল্লেখ থাকে ‘এই ব্যক্তি মদ্যপ ও সে এখন জেলে’।

মালয়েশিয়া : মালয়েশিয়াতে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালালে ব্যক্তির তো জেল হবেই। মজার বিষয় হচ্ছে, চালক যদি বিবাহিত হয়, এক্ষেত্রে তার স্ত্রীকেও জেল খাটতে হয় বলে জানা গেছে।

সুইডেন : সুইডেনে কেউ মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে ধরা পড়লে এক বছরের জেল হয়।

নরওয়ে : শান্তির দেশ নরওয়েতে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অপরাধের সাজা হল তিন সপ্তাহের সশ্রম কারাদণ্ড ও এক বছরের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স হারানো। আর পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে কেউ এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি করলে সারাজীবনের জন্য তার লাইসেন্স বাতিল।

যুক্তরাষ্ট্র : যুক্তরাষ্ট্রের ৪২টি অঙ্গরাজ্যে, ডিস্ট্রিক অফ কলাম্বিয়া, উত্তর মেরিনা দ্বীপ ও ভার্জিনিয়া দ্বীপে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালালে ড্রাইভিং লাইসেন্স নির্ধারিত একটি সময়ের জন্য বাজেয়াপ্ত করা হয়— যদি চালক কেমিক্যাল টেস্ট উৎরাতে না পারেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অপরাধের সাজা হল ৯০ দিনের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল, ২ দিন থেকে ৬ মাস পর্যন্ত জেল ও ১০০০ ডলার জরিমানা করা হয়ে থাকে।

আর কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি একই অপরাধ চতুর্থবারের মতো প্রমাণিত হয় তাহলে তার সাজা হচ্ছে ২ বছরের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল, সর্বনিম্ন ৭৫ দিন থেকে সর্বোচ্চ ৩০ বছর পর্যন্ত জেল ও ৫০০০ ডলার জরিমানা।

যুক্তরাজ্য : যুক্তরাজ্যে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অপরাধের শাস্তি এক বছরের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স স্থগিত, এক বছরের জেল ও ২৫০ ডলার সমমূল্যের জরিমানা।

ফিনল্যান্ড : ফিনল্যান্ড কেউ মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে ধরা পড়লে এক বছরের জেল খাটার সাজা দেওয়া হয়।

পোল্যান্ড : পোল্যান্ডে জেল, জরিমানা তো আছেই, সাথে উটকো ঝামেলার মতো রয়েছে জোরপূর্বক রাজনৈতিক বক্তব্যে অংশগ্রহণ।

ফ্রান্স : এই অপরাধে ফ্রান্সে তিন বছরের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স হারাতে হয়। এক বছরের জেল খাটতে হয় এবং এক হাজার ডলার জরিমানা গুনতে হয়।

জাপান : মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অপরাধের ক্ষেত্রে এশিয়া উন্নত দেশ জাপান তার নাগরিকদের শাস্তির ব্যাপারে যথেষ্ট কঠোর। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, আর চালক যদি দুর্ঘটনা স্থল থেকে পালিয়ে যায়, সেক্ষেত্রে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স ১০ বছরের জন্য কেড়ে নেওয়া হয়। দেশটি শুধু চালককে শাস্তি দেয় না, পাশাপাশি ওই গাড়ির আরোহীদেরও সাজা ভোগ করতে হয়। আরোহীদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের ৩ হাজার ডলার সমমূল্যের জরিমানা গুনতে হয়। আর চালককে ১ বছরের জেল খাটতে হয় অথবা নিদেনপক্ষে আট হাজার ৭০০ ডলার সমমূল্যের জরিমানা গুনতে হয়। আর মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় যদি এক বা একাধিক পথচারীর প্রাণহানী ঘটে সেক্ষেত্রে চালক সারাজীবনের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স হারাতে পারেন।

দক্ষিণ আফ্রিকা : দক্ষিণ আফ্রিকাতে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অপরাধে সাজা হয় ১০ বছরের জেল এবং ১০ হাজার ডলার জরিমানা।

বুলগেরিয়া : বুলগেরিয়াতে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর চূড়ান্ত শাস্তি হিসেবে রয়েছে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত।

এল সালভাদর : এল সালভাদরে আপনার প্রথম অপরাধই শেষ অপরাধ। কারণ মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে ধরা পড়লে সরাসরি ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে রেখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্র্যাফিক সেফটি এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ২০১৩ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি ৫১ মিনিটে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর সময় সড়ক দুর্ঘটনায় একজন প্রাণ হারায়। জরিপ মতে, ২০১৩ সালেই মৃত্যুর সংখ্যা ছিল দশ হাজার ৭৬ জন। প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন। দেশটির মোট সড়ক দুর্ঘটনার শতকরা ৩১ ভাগ। তা ছাড়া মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো সড়ক দুর্ঘটনায় দেশটিতে প্রতি বছরে ক্ষতি হচ্ছে ৫৯ বিলিয়ন ডলার। যেটি পৃথকভাবে বিশ্বের ১২১টি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণের চেয়েও বেশী।

(দ্য রিপোর্ট/জুলাই ২৭, ২০১৫)