সড়ক দুর্ঘটনা :: মৃত্যু সংখ্যা চলমান যুদ্ধের চেয়েও বেশি

সড়ক দুর্ঘটনা :: মৃত্যু সংখ্যা চলমান যুদ্ধের চেয়েও বেশি

দুনিয়ার এক একটি দেশে চলমান যুদ্ধ বা গৃহ যুদ্ধে প্রতিদিন যত না মানুষের মৃত্যু হয়, তার চেয়ে আনুপাতিক হারে বেশি মানুষের মৃত্যু হয় আমাদের দেশে শুধুমাত্র সড়ক দুর্ঘটনায়

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis 2সিরাজগঞ্জ, মাদারীপুর, কুমিল্লা ও ফরিদপুরে ঝুঁকিপূর্ণ ২৭১ কিলোমিটার সড়কে গত এক বছরে দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৪৬ জন নিহত হয়েছেন। ছোট-বড় দুর্ঘটনায় এসব এলাকায় আহতের সংখ্যা প্রায় এক হাজার। মহাসড়কগুলো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এসব সড়ক পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীদের জন্য আতংকের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, রাস্তা দখল করে হাটবাজার,সরু রাস্তা, মহাসড়কে ধীরগতির ছোট যানবাহন চলাচলসহ আরও কিছু কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া সড়কের ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা ও চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ীই গত ২৫ দিনে সারাদেশে অন্তত ৩ শ’ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে না থাকায় সড়কে মানুষের মৃত্যুর মিছিল প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা দাউদকান্দি টোল প্লাজা থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত ১০৪ কিলোমিটার সড়কের বাইপাস ক্রসিংগুলো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। একইভাবে সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড় সংযোগ মহাসড়কের ২২ কিলোমিটার এলাকা, মাদারীপুরের কাওড়াকান্দি ফেরিঘাট থেকে ভূরঘাটা পর্যন্ত ৭৫ কিলোমিটার মহাসড়ক এবং ফরিদপুরের ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ৭০ কিলোমিটার এলাকায় দুর্ঘটনার হার বেশি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দি টোল প্লাজা থেকে চৌদ্দগ্রাম মোহাম্মদ আলী পর্যন্ত ১০৪ কিলোমিটার এলাকায় গত এক বছরে ২৯১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৫৯ জন লোক নিহত হন। এসব সড়ক দুর্ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে ১০০টি মামলা করা হয়েছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন নির্মিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে ১০৪ কিলোমিটার এলাকার অধিকাংশ স্থানেই ডিভাইডার অথবা কোনো সাংকেতিক চিহ্ন না থাকায় এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া মহাসড়কের ওপর হাটবাজার, ইট, বালু, পাথর ও গাছ ফেলে রাখা হয়েছে। মাঝে মধ্যে বসে গরুর হাট। এ অবস্থায় মৃত্যুঝুঁঁকি নিয়েই মহাসড়কে চলাচল করছেন লাখ লাখ যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নিমসার দৈনিক বাজার, চান্দিনা বাজার, ইলিয়টগঞ্জ, গৌরীপুরসহ বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে জানা গেছে, কুমিল্লা হয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ময়নামতি ক্যান্টমেন্ট গিয়ে সিলেট-কুমিল্লা মহাসড়কের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এ রুট দিয়ে প্রতিদিন সিলেট-কুমিল্লা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ২১ জেলার হাজার হাজার যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন যাতায়াত করে। কিন্তু মহাসড়ক দুটিতে দীর্ঘদিন ধরেই অব্যাহতভাবে বেড়ে চলছে নসিমন, করিমন, ইজিবাইকসহ কয়েক হাজার অবৈধ যানবাহন চলাচল।

ঢাকা-চট্টগ্রাম, কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে দুর্ঘটনায় গত ৫ বছরে শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। এত হতাহতের পরও দুর্ঘটনা রোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড় সংযোগ মহাসড়কের ২২ কিলোমিটার এলাকা যেন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। এ মহাসড়কে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। গত এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৭ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন শতাধিক। এদের মধ্যে অনেকেই পগুত্ব বরণ করেছেন।

মহাসড়কের পাশাপাশি ঘনবসতি ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার সংলগ্ন এলাকায় গতিরোধক না থাকায় পথচারী চাপা পড়ার ঘটনা বেড়ে গেছে। সেতু সংযোগ মহাসড়কের নিকটবর্তী স্থানে কোনো হাসপাতাল না থাকায় দুর্ঘটনায় আহত যাত্রীদের দ্রুত চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। যে কারণে সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নেয়ার পথে অনেকেই মারা যান। সিরাজগঞ্জ, কড্ডা-শাহজাদপুর জোনের ট্রাফিক পুলিশ ইন্সপেক্টর গোলাম কিবরিয়া জানান, কোনাবাড়ি ও সীমান্ত বাজার এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ হচ্ছে এ সড়কের একাধিক স্থানে বাঁক রয়েছে।

ঢাকা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায় যাতায়াতের প্রবেশদ্বার ফরিদপুর জেলা। এ জেলার মধ্য দিয়ে ঢাকা-খুলনা ও ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। এ মহাসড়কের ফরিদপুর জেলার অংশে অন্তত ৭০ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব সড়কে গত এক বছরে দুর্ঘটনায় অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ৪০ কিলোমিটার এবং ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ৩০ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা রয়েছে। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মালিগ্রাম চৌরাস্তা, পুলিয়া স্ট্যান্ড, কৌডুবি সদরদি, বাবনা তলা, তাড়াইল এবং ভাঙ্গা চৌরাস্তাসহ কমপক্ষে ২০টি স্পটে দুর্ঘটনা ঘটছে। আর ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের বাহিরদিয়া ব্রিজ, বাহিরদিয়া লেভেল ক্রসিং, ডোমরাকান্দি কৃষি কলেজ সংলগ্ন এলাকা,কানাইপুর তেঁতুলতলা, কানাইপুর বাজার, মাঝকান্দি মোড়, মধুখালী বাজার ও লেভেল ক্রসিং সংলগ্ন এলাকাসহ কমপক্ষে ১৫টি স্পট রয়েছে।

কাওড়াকান্দি ফেরিঘাট থেকে ভূরঘাটা পর্যন্ত মহাসড়কের ৭৫ কিলোমিটারে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ ৩২টি বাঁক। প্রতিটি বাঁক যেন এক একটি মরণফাঁদ। বিপজ্জনক এসব বাঁকে প্রায়ই ঘটছে কোনো না কোনো দুর্ঘটনা। গত এক বছরে এসব মহাসড়কে দুর্ঘটনায় ৭০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এসব বাঁকের ৪টি স্পটকে ব্ল্যাক স্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া মাদারীপুরের দুটি আঞ্চলিক ও জাতীয় মহাসড়কে নসিমন-করিমন ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা-ভ্যান, ভটভটির মতো ধীরগতির যান চলাচল বন্ধ করার সিদ্ধান্তের কথা বলা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে মাদারীপুর সড়ক পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের।

বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা গেছে, এই সড়কগুলোতে ১০ বছর আগে যে পরিমাণ যানবাহন চলাচল করত বর্তমানে অন্তত তার ১০ গুণ বেশি যানবাহন চলাচল করছে। বাড়তি যানবাহনের চলাচল উপযোগী সড়ক উন্নয়ন হয়নি। প্রশস্ত হয়নি ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল এ মহাসড়কে এক দুর্ঘটনায় ২৬ যাত্রী মারা যান, আহত হন ২০ জন। সর্বশেষ ২৪ জুলাই কালকিনির ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে বাস-মাইক্রোবাস মুখোমুখি সংঘর্ষে ৫ জন মারা যান। মাদারীপুর সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান দাবি করেছেন, মহাসড়ক অপ্রশস্ত ও নসিমন-করিমন-ভটভটি এবং ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক-ভ্যান-রিকশাজাতীয় ধীরগতির অবৈধ যান চলাচলের কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা।

এদিকে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দু’মাস অন্তর সভা হওয়ার কথা থাকলেও গত তিন বছরে মাত্র দুটি বৈঠক হয়েছে। এসব সভায় নেয়া সিদ্ধান্তের অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কোনো পদক্ষেপই কার্যকর হচ্ছে না। ফলে চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ ৪৪ সদস্যের জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে কাউন্সিলের হাতে অগাধ ক্ষমতা আছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে যথাযথভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে না।

সড়ক নিরাপত্তায় নেয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় দুর্ঘটনার হার বেড়েই চলছে। ঈদের আগে ও পরে সড়ক দুর্ঘটনার হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। গত দশ দিনে শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২৫০ জনের বেশি প্রাণহানি হয়েছে। এদের প্রায় সবাই নিরীহ যাত্রী ও পথচারী। পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অসংখ্য মানুষ। নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার।

জানা গেছে, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সর্বশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর। এটি ছিল ২২তম সভা। এর আগে ২০১২ সালের জুন মাসে কাউন্সিলের ২১তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি দুই মাস পরপর কাউন্সিলের বৈঠক করার বিষয়ে সর্বশেষ মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। গত সাত মাসে একটি বৈঠকও হয়নি। শেষ বৈঠকে সড়কের ১৪৪টি দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁক (ব্ল্যাক স্পট) দ্রুত সারানোর সিদ্ধান্ত হয়। এ কাজে ১৬৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে সব স্পটের দরপত্র আহবান এবং কাজ শুরুর কথা ছিল। গত জুনে অর্থবছর শেষ হলেও ব্ল্যাক স্পট সারানোর লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ের কাজ এখনও শুরু হয়নি। ফলে সিরাজগঞ্জসহ দেশের অন্যান্য ব্ল্যাক স্পটগুলোতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া সড়ক-মহাসড়ক থেকে হাটবাজার সরানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। রেলওয়ের এক হাজার একশ’ অবৈধ রেলগেট বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও ঝুলে আছে। আশির দশকের শেষদিকে যাত্রা শুরু করে এই কাউন্সিল। কিন্তু কখনোই এই ফোরামের সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। মালিক শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাধার মুখে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি সভায় আগের বৈঠকে নেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করার কথা। একই সঙ্গে নতুন সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং তা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন সভা না হওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। এছাড়া সর্বশেষ সভায় সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক কার্যক্রম সমন্বয় ও বাস্তবায়নে প্রতি মাসের শেষ শনিবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, নৌমন্ত্রী শাজাহান খান, রেল মন্ত্রী মো. মুজিবুল হক,স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী) আসাদুজ্জামান খান কামাল ও এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গার বৈঠকে বসার কথা। কিন্তু গত সাত মাসে একটি বৈঠকও হয়নি বলে কাউন্সিলের এক সদস্য জানান। এছাড়া নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিআরটিএ গঠিত ‘সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক উপকমিটি’র স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশগুলো আলোর মুখ দেখেনি।

নিরাপদ গাড়ি চলাচলের সুবিধার্থে সড়ক-মহাসড়ক থেকে হাট-বাজার সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠকে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিনিয়ত সড়ক দখল করে হাট-বাজার, বাস-ট্রাক স্ট্যান্ড, টিকিট কাউন্টারসহ অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বেশিরভাগ এলাকায় সড়কের ওপর বাস, ট্রাক ও টেম্পো স্ট্যান্ড, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান,কাঁচাবাজার, ময়লা ফেলার ভাগাড়, পাশাপাশি বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। একইভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঢাকার অংশে যাত্রাবাড়ী, শিমরাইল, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ, কুমিল্লার গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লার বিশ্বরোড, শাহরাস্তি, ফেনী ও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন অংশ বেদখল হয়ে আছে। উত্তরবঙ্গ যাওয়ার পথে বাইপাল, চন্দ্রা, টাঙ্গাইলের গোড়াই,নাটিয়াপাড়া, বাইপাস, এলেঙ্গা, সিরাজগঞ্জের কড্ডার, বগুড়ার শেরপুর এবং ঢাকা-বরিশাল-খুলনা মহাসড়কের ঢাকার আমিনবাজার, হেমায়েতপুর, সাভার, নবীনগর, নয়ারহাট, ধামরাই, মানিকগঞ্জের ট্রাফিক মোড়, পাটুরিয়া, দৌলতদিয়া ফেরিঘাট, রাজবাড়ী মোড়, ভাঙা, ফরিদপুর মোড়, মাগুরা, যশোরের রাজমনি সিনেমা হল, নোয়াপাড়া, রেল গেট,ঝিকরগাছা, বেনাপোল এবং বরিশাল মহাসড়কের টরকী, গৌরনদী, বাবুবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় মহাসড়ক বেদখল অবস্থায় রয়েছে। পরিবহন মালিক ও চালকরা জানান, সড়ক দখল হয়ে থাকা এলাকায় দুর্ঘটনার হার বেশি। এসব স্থানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।

সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে রেলওয়ের অবৈধ ১ হাজার ১০০ রেল গেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ায় গত এক বছরে ২ হাজার ২০০ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২৪ জুলাই গাজীপুরের হায়দরাবাদ এলাকায় অবৈধ ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় টেম্পোর ৮ যাত্রী প্রাণ হারান। ঢাকা মহানগরীতে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী উঠানামা বন্ধে ২০ ‘বাস বে’ গত মার্চের মধ্যে নির্মাণ এবং গত জানুয়ারি মাসের মধ্যে মহানগরীর সড়কগুলোতে সাইন ও সিগন্যাল স্থাপন এবং জেব্রা ক্রসিং চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত হয়। এ পর্যন্ত নতুন কোনো ‘বাস বে’ নির্মাণ করা হয়নি। মাঝপথে থামিয়ে ঢাকার বাসগুলো যাত্রী উঠানামা করাচ্ছে। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ ২৩ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় সড়কের মাঝপথে সুপ্রভাত নামের একটি গাড়িতে যাত্রী তোলার সময়ে পেছন থেকে অপর গাড়ি ধাক্কা দিলে হতাহতের ঘটনা ঘটে। এছাড়া হাইওয়ে ও আঞ্চলিক হাইওয়েতে নসিমন, করিমন, ভটভটিসহ ছোট যান চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এসব ছোট গাড়ির কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।

দুনিয়ার এক একটি দেশে চলমান যুদ্ধ বা গৃহ যুদ্ধে প্রতিদিন যত না মানুষের মৃত্যু হয়, তার চেয়ে আনুপাতিক হারে বেশি মানুষের মৃত্যু হয় আমাদের বাংলাদেশে শুধু মাত্র সড়ক দুর্ঘটনায়। যুদ্ধ চলা ইরাক,আফগানিস্থান, লেবানন, সিরিয়া, লিবিয়া,ও ইউক্রেন মৃত্যু হারের চেয়েও বেশি । এমন একটি দিন নেই যেখানে বাংলাদেশে গড়ে ১৫-২০ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়।

সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। ২০০০ সালে নিহতের সংখ্যা ৩৪৩০জন এবং আহত/পঙ্গু ৩১৭২জন, ২০০১ সালে নিহত ৩১০৯জন এবং আহত/পঙ্গু ৩৬০৭জন, ২০০২ সালে নিহত ৩৩৯৮জন এবং আহত/পঙ্গু ৩০৭০জন, ২০০৩ সালে নিহত ৩৩৮৯জন এবং আহত/পঙ্গু ৩৮১৮জন, ২০০৪ সালে নিহত ২৯৬৮জন এবং আহত/পঙ্গু ২৭৫২জন, ২০০৫ সালে নিহত ৩১৮৭জন এবং আহত/পঙ্গু ৩৭৫৫জন, ২০০৬ সালে নিহত ৩১৯৩ জন এবং আহত/পঙ্গু ২৪০৯ জন, ২০০৭ সালে নিহত ৩৭৪৯ জন এবং আহত/পঙ্গু ৩২৭৩জন, ২০০৮ সালে নিহত ৩৭৬৫জন এবং আহত/পঙ্গু ৩২৮৪জন, ২০০৯ সালে নিহত ২৯৫৮ জন এবং আহত/পঙ্গু ২৬৮৬জন, ২০১০ সালে নিহত ৪০৬৭জন এবং আহত/পঙ্গু ৪৯৭৫ জন।

সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব সিদ্ধান্তের কথা বলা হচ্ছে, তার বেশির ভাগ ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে। আঞ্চলিক ও জাতীয় মহাসড়কে অটোরিকশা, নছিমন, করিমন, ভটভটি ও ইজিবাইকের মতো ধীরগতির যান চলাচল বন্ধ করার সিদ্ধান্তের কথা বলা হচ্ছে প্রায় এক দশক ধরে। এক্ষেত্রে গত দুই বছরে দেওয়া বিশেষজ্ঞ পরামর্শ এবং একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বশেষ এক সভায় মহাসড়কে অটোরিকশাসহ ছোট যান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কিন্তু এখনো সড়ক ও মহাসড়কে এসব ছোট যান চলেছে। ২০০৬ সালে সড়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাউন্সিলের বৈঠকে এসব ধীরগতির যানবাহন সড়ক থেকে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এরপর ২০১২ সালে একই বৈঠকে তা সিদ্ধান্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর প্রতিটি বৈঠকেই এই সিদ্ধান্ত আলোচিত হয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের ঘোষণা এসেছে। কিন্তু সুফল মেলেনি।

২০১২ সালের মাঝামাঝি কমিটির সদস্যরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মিলিয়ে প্রায় ৭৮টি সুপারিশ করেন। এর মধ্যে ৫২টিই স্বল্পমেয়াদি। কিন্তু এর বেশির ভাগই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

কমিটির স্বল্পমেয়াদি সুপারিশের মধ্যে ছিল, দুর্ঘটনার জন্য দোষী ব্যক্তি চালক-মালিক-প্রকৌশলী-ফিটনেস অথরিটিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এই সুপারিশ দেওয়ার পর নাটোরের বড়াইগ্রামে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৬ জন মারা যান। পরে তদন্ত কমিটি জানতে পারে, দুর্ঘটনায় পড়া দুটি বাসেরই চলাচলের অনুমতি (রুট পারমিট ও ফিটনেস) সনদ ছিল না। কমিটি বাস ও ট্রাকচালক এবং দুই বাসের মালিককে দায়ী করে প্রতিবেদন দেয়। এ ছাড়া দুর্ঘটনার পর হানিফ পরিবহনের একটি বাস হতাহত ব্যক্তিদের মাড়িয়ে যায় বলে তদন্ত কমিটি জানতে পারে এবং দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিলেও আর কিছুই হয়নি।

দুর্ঘটনার হিসাবও রাখতে পারছে না সরকার

২০১২ সালের সড়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাউন্সিলের এক সভায় সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও পুলিশের মাধ্যমে যুগপৎভাবে তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি।

পুলিশ সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার পর ৬৮টি ঘর পূরণ করে তথ্য সংরক্ষণ করতে হয়। এতে পুলিশ খুব একটা আগ্রহ পায় না। জেলা প্রশাসনেরও প্রয়োজনীয় লোকবল নেই। ফলে সিদ্ধান্ত আর বাস্তবায়ন হয় না। এতে সরকারি হিসাবের সঙ্গে বেসরকারি হিসাবের বড় ধরনের গরমিল হচ্ছে। জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, দুর্ঘটনার সংখ্যা ও হতাহতের যে সংখ্যা তাঁরা পেয়েছেন, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি। দুর্ঘটনা রোধে পরিকল্পনা করতে হলে তো সঠিক তথ্য প্রয়োজন। সরকারি তথ্যই যদি ভুল হয়, তাহলে পরিকল্পনা তো সঠিক হবে না।

প্রকাশক: আমাদের বুধবার