বজরঙ্গি ভাইজান কীভাবে শান্তি আনল

বজরঙ্গি ভাইজান কীভাবে শান্তি আনল:
ইপ্সিতা চক্রবর্তী

বজরঙ্গি ভাইজান সিনেমাটা দেখার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না। কেন? এ সিনেমার নায়ক মাতাল অবস্থায় ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা চারজনের ওপর গাড়ি উঠিয়ে দিয়েছিলেন এবং সেই দায় নেয়ার জন্য নিজের গাড়িচালককে টাকাও দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তার ১৩ বছরের সাজা হলে অর্ধেক বলিউড তাকে সমবেদনা জানিয়েছে। কারণ এ ট্রাজেডির ভুক্তভোগী হলেন বলিউড তারকা সালমান খান, ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা কোনো অজ্ঞাত ব্যক্তি নন।

কিন্তু সিনেমাটা আমি দেখেছি, কী করে সালমান খান একাই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার বিবাদ শেষ করে দিয়েছেন, সেটা জানার আগ্রহ থেকে।

সাধারণ কিন্তু মিষ্টি স্বভাবের মানুষ পবন। তাকে বজরঙ্গি নামেও ডাকা হয়। এ বজরঙ্গি এক পাকিস্তানি মূক বালিকাকে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে যান। এ যাত্রায় তিনি বিনা ভিসায় আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করেন, পাকিস্তানি সেনাদের মুগ্ধ করেন এবং লাইন অব কন্ট্রোল নিয়ে সবাইকে একটি বা দুইটি বিষয় শেখান। সিনেমায় হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় সমন্বয়ের সব চেষ্টাই হয়েছে। কিন্তু বজরঙ্গি ভাইজান সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হচ্ছে এর আন্তঃসীমান্তবিষয়ক শান্তির বার্তার জন্য। এটা ভালো সংবাদ। কারণ বলিউডের সিনেমায় সাধারণত আন্তঃসীমান্তবিষয়ক শান্তির বার্তা দেখা যায় না।

বলিউড এবং সীমান্ত যুদ্ধ

সীমান্ত নিয়ে বলিউডের সিনেমাগুলোতে নায়কদের সত্য ও মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে দেখা যায়। এসব সিনেমায় সানি দেওলের অভিনয়ের ধরন বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। সবশেষ তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে একাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করেছিলেন। (গদর : এক প্রেম কথা, ২০০১)। এছাড়া জেপি দত্ত ব্র্যান্ডের সিনেমাও আছে, যেমন- বর্ডার (১৯৯৭) এবং এলওসি কারগিল (২০০৩)। এসব সিনেমায় ভারতীয় সেনাকেন্দ্রিক সীমান্ত যুদ্ধের রঙিন বিবরণ দেখা যায়।

কাশ্মীরে সশস্ত্র বিদ্রোহ, কারগিল যুদ্ধ এবং পার্লামেন্ট ভবনে সন্ত্রাসী হামলার কারণে ১৯৯০-এর দশক এবং বর্তমান সহস্রাব্দের প্রথম দশকে উগ্র দেশপ্রেমমূলক বলিউডি সিনেমার আধিক্য দেখা গেছে। এসব সিনেমায় অবশ্যই পাকিস্তানকে শত্রু হিসেবে দেখানো হয়েছে, পাকিস্তানিদের তুলনায় ভারতীয়দের নৈতিক ও শারীরিক দিক থেকে শ্রেষ্ঠ দেখানো হয়েছে।

বজরঙ্গি ভাইজানের প্রশস্ত কাঁধ

এ সিনেমায় আছে আপস-মধ্যস্থতার নানা উপাদান। বিরোধপূর্ণ এ আঞ্চলিক সমস্যায় সরলতা নিয়ে এগিয়েছে বজরঙ্গি ভাইজান। সমঝোতা এঙ্প্রেস চেকপোস্ট পার হচ্ছে, সবাই হয়তো অপেক্ষা করছিলেন কখন ট্রেনটি বোমায় উড়ে যাবে। কিন্তু এরকম কিছুই হয়নি এ সিনেমায়।

বজরঙ্গি ভাইজান বলিউডের এলাকা শ্রীনগর ছেড়ে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে প্রবেশ করেছেন। সিনেমায় এটা নীরবে মেনে নেয়া হয়েছে যে, এ অংশ পাকিস্তানের প্রতি অনুগত। এখানকার মানুষ পশু চরায়, টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলা দেখেন। কোনো সশস্ত্র দল এ দৃশ্যে বিঘ্ন ঘটায় না। গুলি কিংবা শেলিংয়ের শব্দ নীরবতাকে ভঙ্গ করেনি।

যে চেকপয়েন্টে সিনেমার সমাপ্তি হয়েছে সে ধরনের সীমান্ত বাস্তবে দেখা যায় না। যখন-তখন অস্ত্রবিরতি ভাঙার খবর আসে। সংবাদপত্রে আমরা দেখি কাঁটাতারের বেড়া পাহারা দিচ্ছে সেনারা।

বজরঙ্গি ভাইজান সিনেমার শেষ দৃশ্যে এ সংঘাতের দৃশ্য মুছে দিয়ে সেখানে সমস্যা মিটমাটের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। শেষ দৃশ্যে সবাই যখন বজরঙ্গি ভাইজানের নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছে তখন ক্যামেরা চলে আসে তার ওপর, তখন তিনি সেই পাকিস্তানি মেয়েটিকে হাওয়ায় তুলে ধরছেন। এ শান্তির দৃশ্যটি গণতান্ত্রিক হওয়া উচিত ছিল যেখানে সীমান্তের দুই পাশের মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে। কিন্তু এখন আপনি বুঝতে পারছেন যে, এ সিনেমা আসলে শুধু নায়ককে কেন্দ্র করে নির্মিত। এমনকি সীমান্তে জড়ো হওয়া পাকিস্তানিরাও এটা মেনে নিয়েছেন। বজরঙ্গি ভাইজান পুরনো সিনেমার প্রতিহিংসাপরায়ণ সানি দেওল নন। কিন্তু পূর্বসূরিদের থেকে এ সিনেমা অনেকটা দূরত্ব তৈরি করতে পেরেছে এমনটাও নয়। পুরনো সিনেমার উগ্র দেশপ্রেম আর নেই; কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব আর সীমান্তে শান্তির দায়িত্ব এখনও ভালো মানুষ ভারতীয় নায়কের প্রশস্ত কাঁধেই।

স্ক্রল ইন থেকে ভাবানুবাদ : শানজিদ অর্ণব