স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকরে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে : টিআইবি

স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকরে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে : টিআইবি

সংসদ প্রতিবেদক:
সংসদীয় কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। এক্ষেত্রে দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থ কাজ করে। আর সরকার ও সংসদের মতো ‘এককেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ’ থাকায় সংসদীয় কমিটিগুলোও প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

গতকাল ধানমণ্ডির নিজস্ব কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোর সমস্যা ও সমাধানের উপায়’ নিয়ে এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। এতে বলা হয়, সংসদীয় কমিটিগুলো কার্যকর নয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকরে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। কমিটির কার্যক্রমও রাষ্ট্র-সংসদের সব কার্যক্রমের মতো ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনেকে বলেছে, সংসদ নেতার মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় কমিটি (সংসদীয় কমিটি)। তার ইচ্ছা ও নির্দেশে সব সিদ্ধান্ত হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজউদ্দিন খান এজন্য বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রচর্চার দুর্বলতাকে চিহ্নিত করে বলেন, বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রার পর থেকে এককেন্দ্রিক ক্ষমতারবলয় শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছেই সব ক্ষমতা। এখন ইলেকটেড ডিক্টেটরশিপ চলছে। দেশে একটা সময় নির্বাচনের গণতন্ত্র ছিল, এখন তাও শেষ হয়ে গেছে।

নানা সমালোচনা করলেও দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সবগুলো সংসদীয় কমিটি গঠন করাকে ইতিবাচক বলেছে টিআইবি। তবে কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য এটিই যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্যও এসেছে তাদের কাছ থেকে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নবম সংসদে ৫১টি কমিটির ছয়টিতে এবং দশম সংসদে ৫০টি কমিটির মধ্যে পাঁচটিতে এক বা একাধিক সদস্যের কমিটি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা রয়েছে। টিআইবি গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১১টি কমিটির ৩৮ জন সদস্যের মধ্যে ৯টিতে ১৯ জন সদস্যের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা রয়েছে। সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকরে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার যুক্তরাজ্য এবং বিশ্বের সর্ববৃহত্ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোরও পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, ওই দেশ দুটিতে আইন সভায় প্রতিনিধিত্বের সমানুপাতিক হারে কমিটিতে সদস্য ও সভাপতি করা হয় এবং মন্ত্রী কমিটির সভাপতি বা সদস্য হন না। আর্থিক কমিটিগুলোর সভাপতি বিরোধী দল থেকে নির্বাচন করা হয়।

টিআইবির গবেষণায় সময়কাল ছিল নবম সংসদের ২০০৯ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০১৩ এবং দশম সংসদের জানুয়ারি ২০১৪ থেকে এপ্রিল ২০১৫ পর্যন্ত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নবম সংসদে ১১ শতাংশ ও দশম সংসদে ১৭ শতাংশ বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব ছিল এবং সভাপতি হিসেবে যথাক্রমে তা ছিল ৪ শতাংশ ও ২ শতাংশ। নবম সংসদে ১১টি কমিটি মোট ৩১ বার এবং দশম সংসদে তিনটি কমিটি মোট তিনবার পুনর্গঠিত হলেও কমিটি পুনর্গঠনের কোনো কারণ প্রকাশিত হয়নি। টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান জানান, সংসদীয় কমিটিতে দুর্নীতি সম্পর্কিত বিষয়ে মাত্র ৪ শতাংশ আলোচনা হয়েছে। সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়েও কোনো অগ্রগতি নেই।

প্রতিবেদনে সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করতে ১১ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে সংবিধানের ৭৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইন প্রণয়ন করে কমিটির বৈঠকে সাক্ষী হাজিরা, সাক্ষ্য প্রদান ও দলিলপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক করা, সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধন করে সভাপতি ও সদস্যদের বাণিজ্যিক ও আর্থিক সম্পৃক্ততার তথ্য প্রতিবছর হালনাগাদ করে তা জনসম্মুখে প্রকাশের বিধান করা এবং আর্থিক কমিটিগুলোতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে সভাপতি নির্বাচন করা অন্যতম।