চলছে বিচারহীনতা- সুলতানা কামাল, আদিলুর বললেন- আইনের শাসন নেই

চলছে বিচারহীনতা- সুলতানা কামাল, আদিলুর বললেন- আইনের শাসন নেই

image

দেশে দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণে শিশু নির্যাতন হত্যাসহ অপরাধ বেড়ে গেছে। অপরাধীরা যে কোনো অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। আইনের শাসন নেই। এমন মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান।

প্রায় একই ধরণের মন্তব্য করলেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। তিনি বলেন, সমাজে এখন এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যে অপরাধীরা অপরাধ করে মনে করছে যে সরকার তাদেরকে কিছুই করতে পারবে না। সমাজে চলছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। কোনো জবাবদিহীতা নেই। সমাজে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের সাংঘাতিক রকমের অনাস্থা চলে এসেছে। আর সেজন্যই সমাজে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।

রেডিও তেহরানের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে দুই বিশিষ্ট সমাজকর্মী এসব মন্তব্য করেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো।

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকটি শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। হঠাৎ কেন শিশু হত্যার ঘটনা বেড়ে গেল?

অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান: দেখুন, এটা অত্যন্ত মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। দেশের মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকছে না। আর এরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কারণ হচ্ছে আসলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি। অপরাধীরা যে কোনো অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। তাদের কোনো শাস্তি হচ্ছে না বিভিন্ন কারণে। অপরাধীদের হয়তো শক্তিশালী কারো সাথে যোগাযোগ আছে অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বহীনতা রয়েছে। কখনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যোগসাজশের খবর দেখতে পাই।

দেশে বর্তমানে দায়মুক্তির সংস্কৃতি চলছে এবং আইনের শাসনের অভাব রয়েছে। আমরা আইনের শাসন দেখতে পাচ্ছি না। আমরা দেখছি যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিরোধী দলের নেতাকর্মী এবং মানবাধিকার কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চালাতে ব্যস্ত। যারা সত্যিকারের অপরাধী তাদেরকে দমন করার চেয়ে তারা বিরোধী মতের লোক এবং মানবাধিকার কর্মীদের দমনে ব্যস্ত। আর এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া মারাত্মকভাবে সামাজিক অবক্ষয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আর এই সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে একটা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। সেটাও বিভিন্ন দমন-পীড়ন এবং বাধা বিপত্তির কারণে গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।

রেডিও তেহরান: কয়েকটি শিশু হত্যার ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়-শিশুশ্রমজনিত কারণ এর পেছনে রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- দেশ যখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে এবং শিশুশ্রম যখন আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ তখন কেন এই শিশুশ্রম এখনো দেশে বিদ্যমান?

আদিলুর রহমান: খুব ভালো একটি প্রশ্ন করেছেন। আসলে বলা হচ্ছে যে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। আসলে এটি একটি গড় হিসেবের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের একটা বিরাট জনগোষ্ঠী কিন্তু অতি দরিদ্র। অন্যাদিকে খুব স্বল্পসংখ্যক মানুষ ব্যাপক ধনী। আর এ কারণে সামাজিক বৈষম্য কিন্তু দিনে দিনে আরো তীব্র হচ্ছে। ফলে অতি দরিদ্র শ্রেণির লোকেরা তাদের সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে কাজের জন্যা পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন তিন বেলা খাবারের জন্য।

তাছাড়া আপনারা জানেন অনেকে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। আপনারা জানেন সম্প্রতি বহু বাংলাদেশিকে সাগরে পাওয়া গেছে। এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে দেশ চলছে। আর গড়ে বলা হচ্ছে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে শ্রেণি বৈষম্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

রেডিও তেহরান: সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে কিন্তু মানবতাবোধ প্রশ্নবিদ্ধ। আপনি কী মনে করেন দেশে মানবতবোধ আসলেই খানিকটা লোপ পেয়েছে?

আদিলুর রহমান: আমি মনে করি যে মানুষের মধ্যে তখনই মানবতাবোধ জেগে ওঠে, প্রতিরোধের শক্তি জেগে ওঠে যখন দেশে তার সহায়ক পরিস্থিতি থাকে। দেশে যারা অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলতেন, যারা দায়মুক্তির বিরুদ্ধে কথা বলতেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন রকম অপরাধের সাথে যোগসাজশের ব্যাপারে কথা বলতেন তারাই যখন আক্রমণের শিকারে পরিণত হন, তারা নিজেরাই যখন বিভিন্ন সময় চাপের মধ্যে পড়েন তখন কিন্তু মানবতাবোধ জাগিয়ে তোলার কাজটা আর করা সম্ভব হয় না। আর বিভিন্ন ধরণের চাপের মুখে থাকার কারণে সাধারণ মানুষও সংগঠিত হয়ে অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শক্তি প্রকাশ করার সুযোগ পায় না।

রেডিও তেহরান: শিশু নির্যাতন ও হত্যার বিরুদ্ধে সরকারের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এগুলো বন্ধে সরকারের ভূমিকাই বা কী হওয়া উচিত?

অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান: সরকার বলছেন তারা ভূমিকা পালন করছেন। আর আমরা অপেক্ষায় আছি সরকারের যথাযথ ভূমিকা দেখার জন্য।

রেডিও তেহরান: আচ্ছা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল আপনি এ বিষয়ে কি বলবেন?

সুলতানা কামাল: দেখুন এই সমস্যা দেখার মূল দায়িত্ব সরকারের। এ ধরণের ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য একটা পরিবেশগত আবহ তৈরি করা দরকার আইনের শাসনের মাধ্যমে। আর যদি সেরকম ঘটনা ঘটে যায়; আমি বলতে চাইছি কোনো সমাজই অপরাধমুক্ত নয়। তো যদি অপরাধ সংঘটিত হয় তাহলে তার যেন আইনের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়।

সরকার যদি এরকম পদক্ষেপ নেয় তাহলে অপরাধীরা বুঝতে পারবে যে অপরাধ করে তারা পার পাবে না। কিন্তু সমাজে এখন এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যে অপরাধীরা অপরাধ করে মনে করছে যে সরকার তাদেরকে কিছুই করতে পারবে না। বর্তমানে বিচারালয়কে চরমভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সংস্কৃতি চলছে এবং এর পুরোপুরি সুযোগ নিচ্ছে তারা।

রেডিও তেহরান: আচ্ছা এর আগে কিন্তু শিশু নির্যাতন এবং হত্যার ঘটনা এত বেশি ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে এত বেশি বেড়ে যাওয়ার কারণ কি?

অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল: এর আসলে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। মোটামুটিভাবে আমাদের পর্যালোচনায় যে বিষয়টি আসে সেটি হচ্ছে সমাজে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের সাংঘাতিক রকমের অনাস্থা এসেছে। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার, দরিদ্র মানুষের ওপর ধনীদের অত্যাচার, শিশুদের ওপর বয়স্কদের অত্যাচার এসবই একই সুতোঁয় গাঁথা। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে অপরাধীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যায়। তাদের কোনো জবাবদিহীতা বা বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না। যে যার ব্যক্তিগত স্বার্থ, দলগত স্বার্থ ও সাম্প্রদায়িক স্বার্থে সবকিছুই করছে। সমাজে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি চলছে তার কারণেই এসব হচ্ছে।

যদি এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করা না যায়, যদি মানুষের জবাবদিহীতার জায়গা তৈরি না হয়, যদি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না যায় তাহলে নানা দিকে নানাভাবে অপরাধ আমরা দেখতে পাব। বর্তমানে নারী নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক হামলা এবং শিশু হত্যার হার মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। আর অত্যাচারের চিত্রও পাল্টে গেছে। একটি শিশুকে তিন বা চারজন মিলে আঘাত করছে এ ধরণের ঘটনা কিন্তু আগে কখনও আমরা দেখিনি। আর এগুলোর কোনো সামাজিক প্রতিরোধও আমরা দেখছি না।

রেডিও তেহরান: শিশুশ্রম, শিশু নির্যাতন ও শিশুহত্যা বন্ধের বিষয়ে দেশের সরকারি মানবাধিকার সংস্থার ভূমিকা কতটা সন্তোষজনক?

আদিলুর রহমান: শিশুশ্রম, শিশু নির্যাতন ও শিশুহত্যা বন্ধের বিষয়ে সরকার এবং তারা বলতে পারবেন। তবে আমরা তাদের কর্মকাণ্ডকে মানবাধিকার রক্ষার ব্যাপারে সহায়ক হিসেবে দেখতে পাই না। আর আমাদের ভূমিকার কথা বলছেন; আমরাতো বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা। আমরা নিজেরাই নিপীড়নের শিকার। আমাদের মানবাধিকার কর্মীরা প্রতিনিয়ত নজরদারির মধ্যে আছে। এরকম একটা অবস্থায় আমাদের পক্ষে কাজ করা তো কঠিন।#

রেডিও তেহরান/