পোশাকের দাম কম বলে শ্রমিকের সুবিধা কম কমপ্লায়েন্সের জন্যও পর্যাপ্ত ব্যয় করা সম্ভব হয় না

সিপিডি সংলাপে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ

পোশাকের দাম কম বলে শ্রমিকের সুবিধা কম কমপ্লায়েন্সের জন্যও পর্যাপ্ত ব্যয় করা সম্ভব হয় না
  • জিএসপিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বানানো উচিত নয় -ড. দেবপ্রিয়

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মপরিবেশ উন্নত না হওয়ার জন্য বিদেশী ক্রেতাদের কম দাম দেয়াকে চিহ্নিত করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। একই সাথে তারা বলেছে, পোশাকের দাম কম বলে শ্রমিকের সুবিধা কম। আর কম মূল্য (মার্জিন) পাওয়ায় এ দেশীয় উদ্যোক্তাদের পক্ষে কমপ্লায়েন্সের জন্যও পর্যাপ্ত ব্যয় করা সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশ নিয়ে বিদেশীদের অসন্তোষ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধা পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে বাদানুবাদের মধ্যে গতকাল বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ মন্তব্য করেছে সিপিডি। সকালে রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘বাংলাদেশ এপারেলস সেক্টর : ডাজ মার্জিন ম্যাটার ইন এনশিউরিং কমপ্লায়েন্স? (বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প : কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে প্রাপ্ত মূল্য কী পর্যাপ্ত?)’ শীর্ষক সংলাপে শিরোনামের প্রতিবেদন প্রকাশ করল প্রতিষ্ঠানটি, যাতে বিদেশী ক্রেতাদের দায়িত্বের বিষয়টি ফুটে উঠল। সিপিডি চেয়ারম্যান ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রম সচিব মিকাইল শিপার। অন্যান্যের মধ্যে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচাযর্, ওপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও গার্মেন্টস শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আনিসুর রহমান সিনহা, মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এই সংলাপ অনুষ্ঠানের সহযোগী আয়োজক ছিল ‘দ্য ফ্রেডরিচ-এবার্ট-স্টিফটাং (এফইএস)’ নামের একটি বিদেশী সংস্থা।

মূল উপস্থাপনায় সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অন্যান্য প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশের তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা তাদের পণ্য উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে কম মূল্যমান পেয়ে থাকেন। আর তা থেকে তারা সবচেয়ে কম ব্যয় করেন কমপ্লায়েন্সের জন্য। কম মূল্য (মার্জিন) পাওয়ায় তাদের পক্ষে কমপ্লায়েন্সের জন্য পর্যাপ্ত ব্যয় করা সম্ভব হয় না।

কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়নের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের পণ্য তৈরিতে পাওয়া মূল্যমানের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, গবেষণায় তা দেখার চেষ্টা করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা দেখাতে চেয়েছি যেভাবে আমাদের উদ্যোক্তাদের ক্রেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করে মূল্য নির্ধারণ করতে হয়, সেটির কারণে অনেক সময় কমপ্লায়েন্সের জন্য তাদের যে ব্যয়, তারা সেটি করতে পারেন না।

সিপিডি গবেষক মোয়াজ্জেম বলেন, আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্যোক্তাদের জন্য কমপ্লায়েন্সে বাড়তি ব্যায় করা খুব কঠিন। কমপ্লায়েন্সের জন্য ব্যয় করে তারা তাদের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে পারবেন না। এর জন্য আমাদের একটি প্রস্তাবনা ছিল, যে মার্জিন ক্রেতারা পাচ্ছেন সেখান থেকে কোনোভাবে কিছুটা কমপ্লায়েন্সের জন্য শেয়ার করা যায় কি না। তবে যেহেতু এটি একটি কমপিটিটিভ সিস্টেম এখানে জোর করে কিছু করবার সুযোগ নেই। রেসপনসিবিলিটি শেয়ার করার একটি সুযোগ এখানে আছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে বলে জানান মোয়াজ্জেম।

এর পাশাপাশি সরকারের রেগুলেটরি সিস্টেমের উন্নয়ন ও বাজারের দুর্বলতা দূর করার পেছনে জোর দেয়া হয়েছে সিপিডি’র প্রতিবেদনে।
জিএসপি প্রাপ্ত অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে মন্তব্য করে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, কী কারণে বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা দেয়া হয়নি তা স্বচ্ছতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে দেখাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধাপ্রাপ্ত ১২৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের থাকা উচিত ছিলো। বাংলাদেশ নিজের সক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন করে যাবে অথচ সুবিধা পাবে না। এভাবে কোনো অর্জনই ভালো হয় না। বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘গরু-ছাগল’ এদেরকেও জিএসপি সুবিধা দেয়া হয়েছে। অথচ বাংলাদেশেরটি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

জিএসপির বিষয়ে সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা না দেয়া খুবই খারাপ কাজ হয়েছে। তবে সম্পূর্ণটা রাজনৈতিক বানানো উচিত নয়। অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এমন কোন খারাপ অবস্থায় রয়েছে যে, তাদের প্রতি এই অবিচার করা হয়েছে। তবে এতে হতাশ হয়ে এটিকে (জিএসপি) ছেড়ে দেয়ার কোনো কারণ নেই। আন্তর্জাতিক বিশ্বে যেসব নিয়ম-নীতি আছে তার মধ্যে জিএসপি বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনার একটি।

পোশাক খাতের কমপ্লায়েন্সের বিষয়ে সিপিডির সাবেক নির্বাহী পরিচালক বলেন, জি ৭৭ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে অনেক দেশে ভাগ ভাগ হয়ে পণ্য উৎপাদন হয়ে উন্নত দেশের বাজারে যায়। এক্ষেত্রে প্রত্যেক দেশেই শ্রম ও পণ্যের মান, কার্যপরিবেশ  এবং জলবায়ু পরিবেশ- এগুলো মানা হলো কি না একটি নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। এই নজরদারি ব্যবস্থা কী হবে তা এখনো ঠিক হয়নি। তবে এটি একটি ইতিবাচক দিক।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ একটি ভাগ্যবান দেশ। রানাপ্লাজার মতো ঘটনার পর সকল উদ্যোক্তা বাংলাদেশ থেকে চলে যেতে পারতো। কিন্তু তারপরও তারা বাংলাদেশে রয়ে গেছেন। তবে শেষ বিচারে আমার কাছে কমপ্লায়েন্স হলো- উদ্যোক্তার মুনাফা টেকসই হতে হবে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রমিকের মজুরি বাড়াতে হবে।