ক্রীড়া জুয়া : ‘বেট ৩৬৫’ গ্রাস করছে বাংলাদেশকে

ক্রীড়া জুয়া : ‘বেট ৩৬৫’ গ্রাস করছে বাংলাদেশকে
image
ক্রীড়া জুয়া : ‘বেট ৩৬৫’ গ্রাস করছে বাংলাদেশকে
জামান তৌহিদ, দ্য রিপোর্ট : খেলাপ্রেমী মানুষ ফকরুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। পেশায় তিনি ব্যাংকার। পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও খেলাধুলার খবরগুলো নিয়মিতই রাখেন। টেলিভিশন পর্দায় সম্ভব না হলে অনলাইনে ফুটবল-ক্রিকেটের লাইভ খেলাগুলো দেখার চেষ্টা করেন। তেমনটা করতে গিয়ে এক সময় জানতে পেরেছিলেন বেট ৩৬৫ ডটকম নামক এক সাইটের কথা। যেখানে যেকোনো খেলার লাইভ স্ট্রিমিং দেখা যায়, নিয়মিতই পাওয়া যায় আপগ্রেড খবর; এমনকি তা বাংলাদেশের বিপিএলের মতো জমকালো টি২০ আসর কিংবা মৃতপ্রায় ঘরোয়া ফুটবলের ম্যাচ হলেও। কৌতূহলের বশেই সেই সাইট ব্রাউজ করতে শুরু করেছিলেন ফকরুল। এক সময় সেখানেই তিনি জড়িয়ে পড়েন খেলাধুলাবিষয়ক বাজি ধরা বা ক্রীড়া জুয়ায়। কেননা, বেট ৩৬৫ মূলত ক্রীড়াবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক বেটিং (বাজি ধরার) সাইট; যেখানে বিশ্বের যেকোনো স্থানের ১৮ বছর বা এর বেশি বয়সের যে কেউ যেকোনো খেলা নিয়ে অন্যদের সঙ্গে বাজি ধরতে পারেন, কামিয়ে নিতে পারেন বাড়তি অর্থ। এমনকি ভাগ্য সহায়তা করলে রাতারাতি ধনীও হয়ে যেতে পারেন! সহজ পথে বড়লোক হতে কে না চায়? ফকরুলও চেয়েছিলেন। আর তা করতে গিয়ে এক সময় এই ক্রীড়া বাজি কিংবা জুয়া নেশার মতো হয়ে গেছে তার কাছে। সেই নেশার টানে এখন তিনি ঋণগ্রস্ত।

ফকরুল ইসলামের মতোই বর্তমানে বাংলাদেশে অগণিত মানুষের ভাগ্যে একই অবস্থা ঘটেছে, ঘটে চলেছে। খেলাধুলার নেশাকে ছাপিয়ে খেলাধুলাবিষয়ক জুয়ার নেশায় সর্বস্বান্ত হয়েছেন অনেকে। কেউ সর্বস্বান্ত হতে চলেছেন। কেউ আবার সর্বস্ব হারিয়ে হয়েছেন আত্মহননকারী। আর এমন পরিস্থিতির পেছনে নীরবে ভূমিকা রেখে চলেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ক্রীড়া বাজির সাইট বেট ৩৬৫ ডটকম। দিনকে দিন বাংলাদেশে আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে এই সাইট।
বেট ৩৬৫-এ আইপিএল
ভারতের মাটিতে চলছে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল)। টি২০ ক্রিকেটের এই আসর নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমী বাংলাদেশেও মাতামাতি কম নেই। বিশেষ করে দেশের দুই তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ও মুস্তাফিজুর রহমান সেখানে খেলছেন বলে বাংলাদেশেও আইপিএল জনপ্রিয়তা বর্তমানে আকাশচুম্বী। তবে কেবল ক্রিকেটপ্রেমীরাই নয়, ক্রিকেট ভালো করে বোঝেন না দেশের এমন ব্যক্তিরাও আইপিএল নিয়ে মশগুল। তাদের উৎসাহ আইপিএল জুয়ায়!
দেশজুড়ে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার জুয়া চলছে এই ‘আইপিএল’কে কেন্দ্র করে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলছে এই আইপিএল জুয়ার রমরমা আসর। বিগত কয়েক দিনে যার বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমসহ দেশের বিভিন্ন মিডিয়ায়। কিন্তু তাতে করে আইপিএল জুয়ায় কোনো ছন্দপতন ঘটেনি! বহাল তবিয়তেই তা চলছে! আর তার বদৌলতে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ যেমন নিঃস্ব হচ্ছেন, তেমনি লাভের অঙ্কে ফুলে ফেঁপে উঠছে বেট ৩৬৫ ডটকম নামক যুক্তারাজ্যভিত্তিক বেটিং সাইটটি; সঙ্গে লাভবান হচ্ছেন এই সাইট ব্যবহারকারী দেশি ও ভিনদেশি কিছু অভিজ্ঞ জুয়াড়িও। তবে এ নিয়ে যেন বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের। সরবেই চলছে আইপিএল জুয়া, বাড়ছে বেট ৩৬৫ সাইটের রাহুর গ্রাস।

যুক্তরাজ্যের স্টোক সিটির কোটস পরিবার ২০০১ সালে চালু করে ক্রীড়াবিষয়ক বেটিং সাইট বেট ৩৬৫ ডটকম। গত ১৬ বছরের পথ চলায় বিশ্বের বৃহৎ স্পোর্টস গেম্বলিং সাইট বা ক্রীড়াবিষয়ক বাজির (জুয়া) সাইটে পরিণত হয়েছে তা। বিশ্বের ২০০টি দেশের ১৯ মিলিয়নেরও (১৯০ কোটি) বেশি কাস্টমার রয়েছে বেট ৩৬৫ সাইটের। প্রতিদিন এই কাস্টমাররা বিভিন্ন খেলাধুলা নিয়ে বাজি বা জুয়ায় অংশ নেন। তাতে কেউ লাভবান হোন, কেউ বা সর্বস্বান্ত; তবে বেট ৩৬৫ সাইটের মালিকেরা কিন্তু লাভবান হোন প্রতিনিয়তই। চলতি বছর এপ্রিলে সানডে টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বেট ৩৬৫ সাইটের মালিকেরা বর্তমানে যুক্তরাজ্যের শীর্ষ ধনীর তালিকায় ২৪তম স্থানে রয়েছেন। তাদের আর্থিক সম্পদের নেট মূল্যমান প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন পাউন্ড।
শুধু তাই-ই নয়, টাইমস ম্যাগাজিনের গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বিশ্বের ডিজিটাল বিজনেস বা ইন্টারভিত্তিক ব্যবসার ক্ষেত্রে বেট ৩৬৫ হলো শীর্ষ র‌্যাঙ্কপ্রাপ্ত সাইট।

এই সাইটের মালিক কোটস পরিবারের সদস্যরা হলেন―পিটার কোটস, তার কন্যা ডেনাইজ কোটস ও ছেলে জন কোটস। পিটার কোটস আবার ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলের দল স্টোক সিটিরও মালিক। অন্যদিকে, ডেনাইজ কোটসকে বলা হয় ব্রিটেনের সর্বোচ্চ ধনী মহিলা; যিনি নিজ প্রচেষ্টায় ভাগ্য গড়ে নিয়েছেন। মূলত ২০০০ সালে ডেনাইজ কোটসই বেট ৩৬৫ সাইটের চিন্তা করেন এবং তার চেষ্টাতেই ২০০১ সালে ইন্টারনেট জগতে আত্মপ্রকাশ করে এই ক্রীড়া বাজির সাইট।

বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার কর্মী কাজ করছে ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস প্রদানকারী এই সাইটটিতে। যা নিয়ন্ত্রণ করছে বেট ৩৬৫ গ্রুপ নামক কোম্পানি। যুক্তরাজ্যের আইন অনুসারে বৈধভাবেই কাজ করছে কোম্পানিটি। জিব্রাল্টার সরকারের কাছ থেকে বৈধ লাইসেন্স (লাইসেন্স নম্বর : আরজিএল ০৭৫) নিয়েছে বেট ৩৬৫ এবং জিব্রাল্টার গেম্বলিং কমিশনার দ্বারা তা নিয়ন্ত্রিত হয়। যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বৈধভাবেই শাখা অফিস রয়েছে এই কোম্পানি বা সাইটের। যদিও সমাজে এর প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন দেশেই তীব্র সমালোচনা রয়েছে। সম্প্রতি বেশ কিছু কারণে নিজ দেশে এই সাইটের লাইসেন্স বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বুলগেরিয়া সরকার। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবশ্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বেট ৩৬৫ কর্তৃপক্ষ।
বিশ্বের ১৭টি বিভিন্ন ভাষায় (বাংলা ভাষা নেই) পরিচালিত হয় এই সাইট। এখানে আর্থিক লেনদেন হয় ২৮টি বৈদেশিক মুদ্রার মাধ্যমে (ভারতের রুপি গ্রহণযোগ্য হলেও বাংলাদেশি টাকা গৃহীত হয় না)। পেমেন্ট মেথড বিভিন্ন ধরনের। ব্যাংকিং লেদদেন থেকে শুরু করে পেপল, মাস্টার কার্ড, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড সবই রয়েছে।
ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিস, গলফ, ঘোড়দৌড়সহ আন্তর্জাতিক সব ধরনের ক্রীড়াই স্থান পায় বেট ৩৬৫ সাইটে। সেই সঙ্গে থাকে বিভিন্ন দেশের নানা ঘরোয়া খেলাধুলার খবর ও লাইভ সম্প্রচার ও আপগ্রেড। থাকে ক্যাসিনো, পোকারের মতো আইটেমগুলোও। ব্যবহারকারীরা তাদের পছন্দমতো যেকোনো খেলায় বাজি ধরতে পারেন। জিতলে অর্থের মালিক হয়ে যান তারা। হারলে খোয়াতে হয় বাজির জন্য গচ্ছিত অর্থ। অবশ্য কাস্টমারকে কখনোই ঠকানোর অভিযোগ নেই সাইটের বিরুদ্ধে। যারা সর্বস্বান্ত হন তারা জেনেশুনেই বাজি ধরে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনেন।
কাস্টমারদের সহায়তার জন্য ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস দেয় বেট ৩৬৫ সাইটের কাস্টমার কেয়ার ইউনিট। সাইটেই তাদের সঙ্গে লাইভ চ্যাট করা যায়।
ব্যবহারের নিয়ম-কানুন
বেট ৩৬৫ সাইটে লাইভ খেলা দেখতে চাইলে, খেলার আপগ্রেড জানতে চাইলে, খেলাধুলার জন্য বাজি ধরতে চাইলে সেখানে অবশ্যই একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে এবং সেই অ্যাকাউন্টে কোনো মিথ্যে তথ্য দেওয়া চলবে না। বেট ৩৬৫ থেকে সেই অ্যাকাউন্ট ভেরিফাইড করা হয়। সঠিক নাম,ঠিকানা,জন্ম তারিখসহ যেসব তথ্য চাওয়া হবে,তা পূরণ করতে হবে,কোনো ভুল তথ্য দেওয়া যাবে না। অ্যাকাউন্ট ভেরিফাই করার ক্ষেত্রে পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্সের যেকোনো একটির স্ক্যান কপি সাবমিট করতে হয়।
আকউন্টধারীর বয়স অবশ্যই ১৮ বা এর বেশি হতে হবে। অ্যাকাউন্ট খোলার সময় সিক্রেট কোয়েশ্চেন বা গোপন প্রশ্ন ও এর উত্তর মনে রাখতে হবে। সঙ্গে ব্যক্তিগত সিকিউরিটি কোডও মনে রাখতে হবে। সব মিলিয়ে বিশ্বাস্যযোগ্য ও নির্ভরযোগ্যভাবেই পরিচালিত হয় বেট ৩৬৫ সাইটের কার্যাবলি।
এখানে বেট বা বাজি ধরার বিষয়টি সাধারণ বাজি ধরার মতোই বিষয়। সাধারণত কোনো বিষয়ে এক বন্ধু যেমন আরেক বন্ধুর সঙ্গে বাজি ধরে এখানেও বিষয়টি তেমনই। কোন দল জিতবে, কোন দল হারবে, কে ভালো খেলবেন―ইত্যাদি নানা বিষয়ে বেট ৩৬৫ সাইটে বাজি ধরা যায়। অ্যাকাউন্ট ভেরিফাইড হতে ২-৩ দিন সময় লাগে। এরপর সেই অ্যাকাউন্টধারী সাইটে ঢুকে নিজের পছন্দমতো দল বা খেলোয়াড়ের নামে বাজি ধরতে পারবে। সাধারণ ম্যাচের শক্তিশালী দলের নামে বাজি ধরলে প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ কম থাকে। অন্যদিকে, দুর্বল দলের পক্ষে বাজির দর বেশি থাকে।

বিষয়টি উদাহরণ দিয়ে বলতে গেলে ধরা যাক, আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্স ও সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের মধ্যে খেলা চলছে। এখানে সানরাইজার্স তুলনামূলক শক্তিশালী দল। তাহলে কলকাতা-সাইরাইজার্সের বেটিং রেশিও দেওয়া হলো ১: ৫। কলকাতার পক্ষে যিনি বাজি ধরবেন তিনি দল জিতলে ১০০% লাভ পাবেন, অন্যদিকে সানরাইজার্স জিতলে এর পক্ষে বাজি ধরা ব্যক্তি পাবেন ৫০০% লাভ। এর মানে হলো কলকাতা জিতলে সেই বাজিকর ১ ডলার দিলে আরও ১ ডলার লাভসহ ২ ডলার পাবেন। অর্থ প্রদান করবে এই সাইট। অন্যদিকে, দল না জিতলে কিন্তু যে পরিমাণ অর্থ বাজি ধরেছেন তা খোয়াতে হবে। চলে যাবে সাইটের অ্যাকাউন্টে।
বাংলাদেশে যেভাবে ব্যবহৃত হয় এই সাইট
কোন দেশে কোন সাইট কতটা জনপ্রিয় তার পরিমাপ সাধারণত করা হয় অ্যালেক্সা র‌্যাঙ্কিংয়ের মানদণ্ডে। সেই হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সেরা ২০ সাইটের একটি হলো বেট ৩৬৫। বর্তমানে এটি ১৯তম অবস্থানে রয়েছে। যার মানে দাঁড়ায় দৈনিক অন্তত লক্ষাধিক (আনুমানিক হিসাব) মানুষ এই সাইট ব্রাউজ করছেন বাংলাদেশে। বর্তমানে আইপিএলের কারণেই বেড়েছে এই সাইটের ব্যবহার। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জুয়াড়িরা সাইটটি ব্যবহার করছেন। আইপিএলের মাঝপর্যায়ে বাংলাদেশে এই সাইটের অ্যালেক্সা র‌্যাঙ্কিং ছিল ১২।

কেবল আইপিএল নয়, যেকোনো বড় ক্রীড়া আসরের সময়টায় বাংলাদেশে বেড়ে যায় এই সাইটের ব্যবহার। বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৪ বা গত বছর বিশ্বকাপ ক্রিকেটে যেমন, তেমনি আবার বাংলাদেশের বিপিএল, টি২০ বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপ, বিভিন্ন দেশের লিগ ফুটবলের সময়ও বাংলাদেশি জুয়াড়িরা এই সাইট ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন। সামনে ইউরো ফুটবলে কিংবা কোপা আমেরিকা ফুটবলেও এর ব্যত্যয় ঘটবে না।

কেবল নিজেই অ্যাকাউন্ট খুলে জুয়ায় অংশ নেওয়া বা বাজি ধরা হচ্ছে এমনটা নয়। বেট ৩৬৫ সাইটের অ্যাকাউন্ট কেনাবেচার ব্যবসাও জমে উঠছে দিনকে দিন। যে ব্যবসায় প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা (মূলত ছাত্ররা) অংশ নিচ্ছে। যেহেতু ১৮ বছরের নিচে কেউ এখানে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন না, তাই অন্যের অ্যাকাউন্ট কিনেই জুয়ায় বা বাজিতে অংশ নিচ্ছে তারা।
অ্যাকাউন্ট কেনা-বেচা ও কমিউনিটি পেজ
বেট ৩৬৫ বাংলাদেশ নামক ফেসবুকে একটি কমিউনিটি পেজও রয়েছে। সেখানে অনেকেই এই অ্যাকাউন্ট কেনা-বেচার উন্মুক্ত বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকেন। যদিও পেজের অ্যাডমিনের পক্ষ থেকে এই ধরনের অ্যাকাউন্ট কেনা-বেচা না করার জন্য সম্প্রতি সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে। এরপরও প্রকাশ্যে বা গোপনে চলছে সেই অ্যাকাউন্ট কেনা-বেচার কাজ। কেউ কেউ ছদ্মনাম ধারণ করে এই কাজ চালাচ্ছেন। এমনি একটি অ্যাকাউন্ট বিডি টিপার (Bd Tipper)। এই অ্যাকাউন্টধারী নিজেকে চট্টগ্রামবাসী হিসেবে দাবি করেন। বেট ৩৬৫ অ্যাকাউন্ট স্বল্পমূল্যে বিক্রি করেন তিনি। বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই অ্যাকাউন্ট কেনাবেচার ক্ষেত্রে ফুটপাত মার্কেটের মতোই ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে দরদাম চলে। কখনো ১ হাজার টাকায় অ্যাকাউন্ট বিক্রি হয়, কখনো আবার তা ৫-৭ হাজার টাকা বা এর বেশি দামেও কেনা-বেচা হয়।

ল্যাপটপ, ডেস্কটপ বা মোবাইল সবকিছু দিয়েই এই সাইটে ব্রাইজ করা সম্ভব। আর আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় নেটেলার (Neteller.com) এবং স্ক্রিল (skrill.com) নামক দুটি সাইট।

আইপিএল জুয়া কীভাবে বাংলাদেশকে ইয়াবার নেশার মতো গ্রাস করেছে তা সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন মিডিয়ার প্রতিবেদনে সুষ্পষ্ট। ঢাকা, আশুলিয়া, যশোর, রাজশাহী, নীলফামারী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ দেশের এমন কোনো স্থান নেই যেখানে আইপিএলকেন্দ্রিক এই জুয়া বা বাজির প্রভাব বিস্তার করেনি। সাধারণত দুইভাবে এই জুয়া বা বাজির ঘটনা ঘটছে। একটি হলো―সাধারণ বা সরাসরি বাজি। এখানে আইপিএল ম্যাচকেন্দ্রিক বিভিন্ন বিষয়ে এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তির সঙ্গে বাজি ধরেন। সেই বাজির দর ১০০ টাকা থেকে ১-২ হাজার টাকাও হয়ে থাকে। সেখানে ইন্টারনেটের কোনো স্থান নেই। সাধারণত সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষকে এমন বাজি অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। যা সন্ধ্যার পর অলি-গলির বিভিন্ন চায়ের স্টলে বসলেই চোখে পড়তে পারে।

অন্য যে উপায়ে বাজির কাজটি চলছে তাই মূলত ভয়াবহ আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে রীতিমতো সিন্ডিকেট গড়ে বাজি বা জুয়ার কাজ চলাচ্ছে বিভিন্ন গ্রুপ। সমাজের কোটিপতি মানুষেরাও। যাদের মধ্যে ব্যবসায়ীর সংখ্যাই বেশি। তারা আবার প্রতিবেশী দেশ ভারতের মাড়োওয়ারি ব্যবসায়ীদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সিন্ডিকেট মূলত বেট ৩৬৫ সাইটের মাধ্যমেই বাজি বা জুয়ার এই ঘটনা চালাচ্ছে। যার শিকার সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। এই বাজির ঘটনায় ইতিমধ্যে মর্মান্তিক সব কাহিনিরও জন্ম হয়েছে।

সিন্ডিকেটের এই জুয়ায় প্রতিদিন দেশে কয়েক শ’ কোটি টাকার লেনদেন ঘটছে বলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া প্রতিবেদনে জানা যায়। একটা সময় শেয়ার বাজারের পেছনে যেভাবে বিচার-বিবেচনা ছাড়াই মানুষ ছুটেছে; আইপিএল জুয়াতেও যেন তেমনটাই ঘটছে। সহজেই ধনী হওয়ার লোভে ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করে, চড়া সুদে টাকা ধার নিয়ে মানুষ অর্থ লগ্নী করছে এই জুয়ায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের সর্বস্বান্ত হতে হচ্ছে। এমন জুয়ার ঘটনা এবারই যে প্রথম তেমনটা নয়।

গত বছরও এমন আইপিএল জুয়ার খপ্পরে পড়ে এক রাতে ২০ লাখ টাকা হারিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন রাজশাহী শহরের এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেই খবর প্রকাশও হয়েছিল গণমাধ্যমে। এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আবারও ঘটলে তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।
ক্রীড়া জুয়ার এই নেশা এতটাই আগ্রাসী যে দেশের বিভিন্ন ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের মধ্যেও এর প্রভাব রয়েছে। ঢাকার মতিঝিল ক্লাব পাড়ায় জুয়া-হাউজির বিষয়গুলো নতুন নয়। বহু আগে থেকেই সেখানকার বিভিন্ন ক্লাবে সন্ধ্যার পর থেকে বাজি-জুয়ার-হাউজির আসর বসে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেটের মাধ্যমেও সেই জুয়ার বিষয়টি গতিশীলতা পেয়েছে। এদিকে, গত বছর অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিকেটে বিশ্বকাপ চলাকালে বাংলাদেশের এক সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমানে ক্রিকেট বোর্ডের সদস্যকে ক্যাসিনোতে দেখা গিয়েছিল। যা নিয়ে দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছিল বেশ হই চই। বিষয়টি প্রমাণ করে দিয়েছেন, ক্রীড়াঙ্গনে প্রচলিত বিভিন্ন জুয়ার নেশা থেকে মুক্ত নন আমাদের দেশের আইকন ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদেরও অনেকেই। বেট ৩৬৫ সাইট তাদের কাছে অপরিচিত নয়।
এদিকে, ক্রীড়াঙ্গনে ম্যাচ ফিক্সিং বা স্পট ফিক্সিং বলে যে বিষয়গুলো রয়েছে সেগুলো কিন্তু এই ক্রীড়া জুয়ারই কুফল। বিভিন্ন ম্যাচ নিয়ে যারা মোটা অঙ্কের অর্থ বাজি ধরেন, তারা সেই বাজি জিততে সুকৌশলে খেলোয়াড়-কর্মকর্তাদের অর্থের লোভ দেখিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। তাদের চেষ্টা সফল হলে ওই খেলোয়াড়-কর্মকর্তারাও সুকৌশলে ম্যাচের ফল বা বিশেষ কোনো অংশ ওই বাজিকর বা জুয়াড়ির অনুকূলে এনে দেন। তাতে করে সেই জুয়াড়িরা লাভবান হন, তেমনি খেলোয়াড়-কর্মকর্তাদের ব্যাংক অ্যাকউন্টও ফুলে ফেঁপে ওঠে। তবে বিষয়টি কখনো প্রকাশ হয়ে পড়লে চরম মূল্য গুনতে হয় তাদের।

বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল ক্রিকেট তারকা কিংবা ভারতের সাবেক অধিনায়ক আজহারউদ্দিন, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রয়াত অধিনায়ক হ্যানসি ক্রনিয়ে কিংবা পাকিস্তানের মোহাম্মদ আসিফ, মোহাম্মদ আমির ও সালমাট বাটদের ভাগ্যে যেমনটা জুটেছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, তথ্য-প্রযুক্তির বর্তমান চরম উৎকর্ষতার যুগে আন্তর্জাতিক জুয়াড়িরা বা তাদের সিন্ডিকেট অনলাইন বেটিং সাইটগুলোকেই বেছে নিচ্ছেন লক্ষ্য হাসিল করতে। সে ক্ষেত্রে বেট ৩৬৫ তাদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে।
আইপিএল জুয়া ও বেট ৩৬৫ কি বাংলাদেশে বৈধ?
আইপিএল জুয়া-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঘুরে ফিরেই আসছে বেট ৩৬৫ সাইটের নামও। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে―আইপিএল নিয়ে এমন জুয়ার কারবার ও বেট ৩৬৫ সাইটের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশে বৈধ কি না! বিশেষত এ ক্ষেত্রে যখন মানি লন্ডারিং-এর মতো ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, যদি অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে দিয়ে লেনদেন হয় তাহলে তা মানি লন্ডারিং আইনের (মুদ্রা পাচার) মধ্যে পড়বে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের অনৈতিক কার্যাবলি সম্পর্কে কার্যকরী ব্যবস্থা নেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রে আরও জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ও নীতি বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশের কোনো গ্রাহক সর্বোচ্চ ৭ হাজার ডলার আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডে বা ট্রাভেলার চেকের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারবে। এই লেনদেনের হিসাব তফসিলি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। যদি এই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে জুয়ায় টাকা খরচ করা হয় তা তফসিলি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। অনেক সময় তফসিলি ব্যাংকগুলো এসব লেনদেনের হিসাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে গোপন করে। এটি দুটি কারণে হতে পারে। এক―অসৎ উদ্দেশ্য থেকে। দুই―ব্যাংকগুলোর উদাসীনতা।
বঙ্গীয় প্রকাশ্য জুয়া আইন
এদিকে, বঙ্গীয় প্রকাশ্য জুয়া আইন (১৮৬৭ সালে প্রণীত) অনুযায়ী, যেকোনো ঘর, স্থান বা তাঁবু জুয়ার আসর হিসেবে ব্যবহৃত হলে তার মালিক বা রক্ষণাবেক্ষণকারী, জুয়ার ব্যবস্থাপক বা এতে কোনো সাহায্যকারী তিন মাসের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। এ রকম কোনো ঘরে তাস, পাশা, কাউন্টার বা যেকোনো সরঞ্জামসহ কোনো ব্যক্তিকে ক্রীড়ারত (জুয়ারত) বা উপস্থিত দেখতে পাওয়া গেলে তিনি এক মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ১০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। পুলিশ জুয়ার সামগ্রীর খোঁজে যেকোনো সময় (বল প্রয়োগ করে হলেও) তল্লাশি চালাতে পারবে বলেও আইনে উল্লেখ রয়েছে। সেই অর্থ আইপিএলকেন্দ্রিক এই জুয়া অবশ্যই আইনত দণ্ডনীয় এবং বেট ৩৬৫ সাইটের কার্যক্রমও এ দেশে বৈধ হতে পারে না।
পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ নেই
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে পুলিশের কাছে লিখিত কোনো অভিযোগ নেই। এই বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘সাধারাণত গোয়েন্দারা সব বিষয়েই ছায়া তদন্ত করে থাকেন। তবে এই বিষয়ে সুষ্পষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ কেউ যদি লিখিত অভিযোগ করে তাহলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আইপিএল প্রতিবেশী দেশ ভারতের খেলা। সেই দেশেই এই আসর কেন্দ্র করে জুয়ার ক্ষেত্রে কড়া ভূমিকায় দেখতে পাওয়া যায় সেখানকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। প্রায় প্রতিনিয়তই এই নিয়ে গ্রেফতার-দণ্ডের খবর আসে সেখানকার মিডিয়াগুলোতে। তবে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন এই বিষয়ে এখন অব্দি নির্বিকার। দেশের প্রায় সব জায়গাতেই পুলিশের পক্ষে থেকে বলা হয়েছে, সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
(সূত্র: দ্য রিপোর্ট/মে ২২, ২০১৬)