ভারত নয়, চীনই বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় বন্ধু

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

ভারত নয়, চীনই বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় বন্ধু

গোলাম মওলা | বাংলা ট্রিবিউন

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে বড় বন্ধু চীন বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশে যে পরিমাণ অর্থ দিয়ে চীন সহযোগিতা করতে যাচ্ছে, এর আশপাশেও নেই প্রতিবেশী ভারত। চীন এমন সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে, যখন জঙ্গি ইস্যুসহ নানা অজুহাতে অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। শুক্রবার বাংলাদেশ ও চীনের সরকার ও দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যেসব চুক্তি হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে চীন

এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ শনিবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চীন সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ বাংলাদেশে করতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তারা সরকারি-বেসরকারি অনেকগুলো চুক্তি করেছে। শুধু বেসরকারি খাতেই তারা বিনিয়োগ করবে ১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ। এছাড়া সরকারি পর্যায়ে আরও কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার জন্য তারা চুক্তি করেছে।’ তিনি বলেন, ‘চীন প্রমাণ করে দিলো যে, বাংলাদেশ বিনিয়োগের নিরাপদ স্থান।’

এফবিসিসিআই সভাপতি আরও বলেন, ‘যে সব দেশ জঙ্গি ইস্যুসহ নানা অজুহাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করা থেকে বিরত রয়েছে, তাদের চোখ খুলে দিলো চীন। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য ভারতও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের বিশাল বিশাল কোম্পানি আমাদের দেশে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু ভারতের ক্যাপাসিটি চীনের মতো নয়। এ কারণে চীনের মতো ভারত এদেশে বিনিয়োগ করতে পারবে না।’ তিনি বলেন, শুক্রবার চীনের ১৫টি কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই হয়েছে। চীনের ১৫টি কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের ১৫টি কোম্পানির মধ্যে ১৯টি চুক্তি হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চীন সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গেও চুক্তি করেছে। এই সব চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দেশে সরাসরি বিনিয়োগ বাড়বে। চীনের অন্য যেসব বিনিয়োগকারী দেশ এখনও আসেনি, সেসব দেশও এই দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। চীনের বাইরে ভারতসহ অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীও আসবে। এর ফলে দেশে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশে যদি চীন বিনিয়োগ করতে পারে, তাহলে অন্যরা কেন পারবে না? চীনের এই উদাহরণ অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারী উৎসাহিত করবে। তবে এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো—এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের জন্য যে ধরনের অবকাঠামো দরকার, তা আমাদের নেই। এ কারণে দ্রুত অবকাঠামো প্রস্তুত করা জরুরি। বিশেষ করে যে অর্থনৈতিক অঞ্চলটি চীনের বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে, সেটি দ্রুত রেডি করা, অন্যান্য অঞ্চলেও অবকাঠামো প্রস্তুত রাখা।’ তিনি বলেন, ‘দেশের অবকাঠামো পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি করা গেলে ভারতও এদেশে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসবে।’ ভারতের জন্য আমাদের যে দু’টি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা হয়েছে সে ‍দু’টিতে দ্রুত অবকাঠামো রেডি করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘ভারত অতি সম্প্রতি যে ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি করেছে, সে সব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি উদ্যোক্তারাও দেশে বিনিয়োগ করতে শুরু করবেন।’

প্রসঙ্গত, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ঢাকা এসেছিল চীনের ৮৬ সদস্যের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে উভয় দেশের প্রতিনিধি দলের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে উপকূলীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণসহ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বাংলাদেশ ও চীন। এর মধ্যে ১২টি ঋণ ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং উভয় দেশের সরকারের মধ্যে ১৫টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক।

এর মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা চুক্তি, যার আওতায় ২৮টি উন্নয়ন প্রকল্পে ২১.৫ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি সাহায্যের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া আট কোটি ৩০ লাখ ডলার অনুদানের জন্য অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা চুক্তি, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে ৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি, দাশের কান্দি পয়ঃনিষ্কাশন ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট প্রকল্পের জন্য ২৮ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি এবং ছয়টি জাহাজ সম্পর্কিত মোট চারটি ঋণচুক্তি। কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ ও দাশেরকান্দিতে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণেও দুটি কাঠামো চুক্তি হয়েছে দুই দেশের মধ্যে। এর বাইরে চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ্যোগে সহযোগিতা, মেরিটাইম কো-অপারেশন, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠনের সম্ভাব্যতা যাচাই, আইসিটিতে নতুন ফ্রেমওয়ার্ক, সন্ত্রাস দমনে সহযোগিতা, ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ও তথ্য আদান-প্রদান, জলবায়ু পরিবতর্নের ঝুঁকি মোকাবিলা, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতার লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যাবে, এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। চীন এই এলাকার অর্থনৈতিক বৃহৎ শক্তি। এছাড়া এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রেও চীন খুবই গুরুত্ব পূর্ণ।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অন্য যেকোনও দেশের চেয়ে ভালো।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ণে চীন যে ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে, তাতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। চীনের মতো ভারতও বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে পারে।’

জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামজনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বেশ নিবিড়। সেই সঙ্গে অবকাঠামোসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। চীন যে  বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিধর সেটা মানতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

তিনি বলেছেন, ‌‘চীন এখন সুপার পাওয়ার। এটা আমাদের মেনে নিতে হবে। আমরা এখন পর্যন্ত তাদেরকে গঠনমূলক কাজ করেতে দেখেছি। চীনকে নিয়ে আতঙ্কের কোনও কারণ নেই।’ যুক্তরাষ্ট্রের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলা চীন নিজেদের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক উন্নয়নেও সহযোগিতা করতে চায় বলে মনে করেন তিনি।

শনিবার দুই দিনের সফর শেষে ভারতের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন চীনের প্রেসিডেন্ট। তাকে বিদায় জানিয়ে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মন্ত্রী। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা যেমন চীনের সঙ্গে কাজ করছি তেমনি ভারতের সঙ্গেও কাজ করছি। আমাদের সবার সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে হবে। আমাদের পক্ষে একা কোনও কিছুই করা সম্ভব না।’

চীনের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরতে গিয়ে আশরাফ বলেন, ‘আমরা চীনের সঙ্গে গত পাঁচ-সাত বছর ধরে নিবিড়ভাবে কাজ করছি। পশ্চিমা বিশ্ব বলে, তবে বাস্তবায়নে খুবই কম। কিন্তু, চীন বাস্তবায়নে খুব তৎপর। কোনও সময়েই ফাঁকি দেয় না।’

চীনের প্রেসিডেন্টের সফরকে সফল দাবি করে এই মন্ত্রী বলেন, ‘কত টাকা দিল? কত চাল দিল? কত ডাল দিল? এটা নিয়ে খোঁচাখুঁচি করতে পারেন। বিষয়টা হলো কানেকটিভিটি। চীন আমাদের সঙ্গে আছে। এটাই একটা পরিপূর্ণ বিষয়।’

কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে জনপ্রশাসনমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিল্প-সাহিত্য, নিরাপত্তা সব কিছু জড়িত। শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, চীনের সঙ্গে আমাদের অনেক কিছু আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, আমাদের এই অঞ্চলের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা। এটা আমাদের অগ্রাধিকার।’

৩০ বছর পর চীনের কোনও প্রেসিডেন্টের সফর বাংলাদেশের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা এক সিস্টেমে চলে। আমরা এক সিস্টেমে চলি। আমরাও তাদের সিস্টেম নিয়ে সমালোচনা করি না। তারাও আমাদের সিস্টেম নিয়ে সমালোচনা করে না।’

চীনের প্রেসিডেন্টের সফর

বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার সুফল দক্ষিণ এশিয়াও পাবে
এম হুমায়ুন কবির |
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংচীন ভৌগোলিকভাবে আমাদের নিকট প্রতিবেশী। অর্থনৈতিকভাবে আরও নিকটতর এক দেশ। এর পরিপ্রেক্ষিত থেকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বাংলাদেশ সফর নানা কারণেই উল্লেখযোগ্য বলে চিহ্নিত হবে। কূটনীতির ভাষায় আমরা যাকে বলি পারস্পরিকতা, এই সফরের পটভূমিতে সেটি ছিল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ২০১০ সালে একবার এবং ২০১৪ সালে আরেকবার চীন সফর করেন। তারপর থেকেই আমরা আশা করে আসছি যাতে চীনের দিক থেকে উচ্চপর্যায়ের ফিরতি সফর হয়। সেই প্রত্যাশাই এই দফায় বাস্তবায়িত হলো। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একে ইতিবাচক ঘটনা হিসেবেই দেখতে হবে।
চমৎকার একটা বিষয়ও আমরা দেখলাম। চীনের প্রেসিডেন্ট ঢাকায় আসার আগেই বাংলাদেশের জনগণের কাছে তাঁর বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন গণমাধ্যম মারফত। এর মাধ্যমে তিনি চীনের জনকূটনীতি চমৎকারভাবে তুলে ধরলেন। এতে তিনি চীনের প্রত্যাশা ও আগ্রহের সারাংশ তুলে ধরেছেন। এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যাশার সাযুজ্যও আমরা দেখতে পেয়েছি। সি বলেছেন, তিনি রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন। আমাদের দিক থেকেও আমরা এটাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছি। দুই দেশের সম্পর্কের গতি, গভীরতা, ব্যাপ্তি—সবকিছুর ক্ষেত্রে উঁচু রাজনৈতিক পর্যায়ের আলাপ-আলোচনা সহায়ক। চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এবার দেশটির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সরকারি ও ব্যবসায়িক নেতৃত্বও ছিলেন। এর মাধ্যমে দুই দেশের সকল পর্যায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ মিলল, উঁচু পর্যায়ের আলাপ ও বোঝাপড়ার পরিসর তৈরি হলো। সুতরাং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে এই সফর যেকোনো বিচারেই খুবই সার্থক।

চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট নিজ সরকার ও দলের মধ্যে খুবই প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি। চার বছর ধরে তিনি দুটি কাজ করেছেন, যা চীনের সঙ্গে বাইরের দুনিয়ার সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। চীনের আগের নেতৃত্বের উন্নয়ন প্রক্রিয়া ছিল মোটা দাগে অন্তর্মুখী। সি চিন পিং একদিকে নিজেদের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে টেকসই করায় সক্রিয় আছেন। অন্যদিকে বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বলিষ্ঠ করায়ও নিরন্তর কাজ করছেন। গত বছর তিনি ‘এক অঞ্চল, এক পথ’ নীতির কথা পৃথিবীর সামনে উপস্থাপন করলেন। এর মাধ্যমে চীন তার উন্নয়নের সঙ্গে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের উন্নয়নের যোগসূত্র রচনা করতে চাইছে। ৭০টি দেশ এই প্রক্রিয়ায় জড়িত। এ ছাড়া চীন ৪ হাজার কোটি ডলারের সিল্ক রোড তহবিল গঠন করেছে। এশীয় বিনিয়োগ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে। এটা সি চিন পিংয়ের বলিষ্ঠ অর্থনৈতিক দর্শনেরই পরিচায়ক।

অর্থনীতির যে বলিষ্ঠতা তারা প্রদর্শন করেছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে চীন বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে বাণিজ্য শক্তিশালী করতে চায়। দেশের বাইরে বিনিয়োগ করতে চায়। এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে হয়তো তারা তাদের প্রভাবও বাড়াতে চায়। এ লক্ষ্য পূরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বলয় সৃষ্টি করা জরুরি। বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডর নির্মাণেও চীন আগ্রহী। বাংলাদেশও আগ্রহী। বাংলাদেশ আশা করে, ভারত ও মিয়ানমারও ইতস্তত ভাব কাটিয়ে এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে কাজ করবে। এতে সবারই লাভ। কেননা, এটি কেবল এ অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নকেই বেগবান করবে না, নিরাপত্তা প্রশ্নেও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

আমরা ইতিমধ্যে নিম্নমধ্য আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি, আমরা উন্নত দেশে পরিণত হতে চাইছি। আমাদের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে আরও সংশ্লিষ্ট হওয়া দরকার। আমরা বাণিজ্য, প্রযুক্তি আমদানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সহযোগিতায় অর্থনীতিকে আধুনিকায়ন করতে চাই। আমাদের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলো সমুদ্রসীমা। সামুদ্রিক অর্থনীতি তথা ব্লু ইকোনমিকে সজীব করার মধ্য দিয়ে সে লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাতে পারি। এর জন্য অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের আদান-প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করা দরকার। চীন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। চীনের বিশাল বাজারে আমাদের জন্য সুযোগ রয়েছে। আমাদের বড় আকারের বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। কৃষি, জ্বালানি, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ, কাঠামো ও পরিকাঠামো, সমুদ্র, আঞ্চলিক সংযোগ, সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণসহ বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে আমাদের যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশের এসব আকাঙ্ক্ষা যে চীন মনোযোগের সঙ্গে দেখতে আগ্রহী, চীনের প্রেসিডেন্টের সফরের মাধ্যমে তা প্রদর্শিত হলো। যে ২৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, আশা করা যায় তার ভিত্তিতে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের চীনা বিনিয়োগ আসবে। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার করে আসার সম্ভাবনা। একে কাজে লাগাতে হলে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতাকে ঢেলে সাজাতে হবে। অভ্যন্তরীণ সামর্থ্যের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে আমাদের হতাশ হতে হয়। এসব ঘাটতি বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারব কোন কোন ক্ষেত্রে আমাদের যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। সেটা মানবসম্পদে যেমন তেমনি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দক্ষতায় আমাদের গভীরভাবে এগোতে হবে। বঙ্গোপসাগরের নীল অর্থনীতিতে চীনের সহযোগিতার সম্ভাবনা আছে। এসব লক্ষ্য যথাযথভাবে এগিয়ে নেওয়ায় খুবই দক্ষ ও পেশাদারি কূটনীতি এবং জাতীয় ঐকমত্য দরকার হবে। চীনের প্রশ্নে ইতিমধ্যে যে ঐকমত্য আছে, তা আগামী দিনে জোরালো কূটনীতি পরিচালনায় পথ দেখাতে পারে। এই সফর তার জন্য উত্তম সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

আমাদের যা প্রয়োজন তা মেটানোর সামর্থ্য চীনের আছে। এটা উভয় দেশের অর্থনৈতিক সাযুজ্যের কারণেই। তবে বড় অঙ্গীকার পেলাম বলে খুশি হওয়ার কিছু নেই। অঙ্গীকার বাস্তবায়নে যা করণীয় তা করতে বিফল হলে বিনিয়োগ থমকে যেতে পারে। তাই সম্ভাবনাকে নিজেদের পক্ষে টেনে বাস্তবায়নে নিয়ে যাওয়া হলো বড় কাজ। সেখানে খানিকটা চ্যালেঞ্জ থেকে যাচ্ছে। দেশীয় সামর্থ্যের কথা বলেছি। পাশাপাশি কী ধরনের শর্তে এই সহযোগিতা, তা দেখতে হবে। তার জন্য দক্ষিণ এশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগের ধরন খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কী শর্তে বিনিয়োগ নেব, তার নীতিগত কাঠামো আমাদের থাকা উচিত। সেই কাঠামোর ভেতরেই সহযোগিতা বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই সে পথে এগোনো সম্ভব।

প্রশ্ন হলো ভূরাজনৈতিক সমীকরণের বেলায় চীনের এই উপস্থিতি কী প্রভাব ফেলতে পারে? এটি গত ৪৫ বছরে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হলেও চীনের জন্য এটা বড় ঘটনা নয়। চীন ইতিমধ্যে ভারতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। ২০১৪ সালে সি চিন পিং যখন ভারত সফর করেছিলেন, তখন ২ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছিলেন। পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের বিনিয়োগের অঙ্গীকার ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের। শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও এমন। কাজেই বাংলাদেশে বিনিয়োগ দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। এতে অতি উচ্ছ্বসিত হওয়ার ব্যাপার নেই।

কেউ কেউ হয়তো ভাবতে পারেন, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক কৌশলগত মৈত্রীর পর্যায়ে উন্নীত হচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্টও অনুরূপ কথা বলেছেন। বাংলাদেশ বিষয়ে আগ্রহী আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর একে নেতিবাচকভাবে দেখা অযৌক্তিক। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নত হলে, বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বাড়লে, সেই সুবিধা ভারতও পাবে। ভারতের এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের যোগাযোগ সুগম করায়ও ভূমিকা রাখবে এ দেশের অবকাঠামোর উন্নয়ন। এটা সবার জন্যই সমান সুযোগ বয়ে আনবে। চীনের সঙ্গে এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নত করায় উপযোগী বা অনুকূল হবে। ভারত-বাংলাদেশ-চীন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সন্ত্রাসবাদসহ ‘নন ট্র্যাডিশনাল থ্রেট’ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করতে পারবে। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির পক্ষের বাতাবরণ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ-চীন জোরদার সম্পর্ক কারও জন্যই উদ্বেগের কারণ হতে পারে না। সি চিন পিং বলেছেন, চীন পরস্পরের সুবিধাজনক ক্ষেত্রগুলোতে একসঙ্গে কাজ করায় আগ্রহী। চীনারা সূক্ষ্ম কূটনীতির পথে চলে। মিয়ানমারের আকিয়াব থেকে গ্যাস পাইপলাইন চীনের ইউনানে নিয়ে যাওয়া নিয়ে জটিলতা হয়েছিল। ভারত যখন এ ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করল তখন চীন কিন্তু তাদের অংশীদার করে নিল। শ্রীলঙ্কায় চীনের বড় বিনিয়োগ নিয়েও ভারতের উদ্বেগ ছিল। সেই সূত্র ধরেই রাজাপক্ষে গত নির্বাচনে হেরে গেলেন। এখন চীন সেই প্রকল্পে ভারতকে জড়িত করে নিয়ে বিরোধিতার প্রশমন ঘটাল। চীনারা যে সূক্ষ্ম কূটনীতি করে, তাতে আমার মনে হয় না ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সংঘাতের দিকে যাবে। চীন বরং ভারতকে সঙ্গে নিয়েই বাংলাদেশে কাজ করতে চাইবে। এখানে বাংলাদেশের উচিত দক্ষ কূটনীতি ও জাতীয় স্বার্থের বিবেচনা নিয়ে বহুপক্ষীয় ভারসাম্য বজায় রাখায় কাজ করা।

বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখছে, চীনের সঙ্গেও রাখছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও অনুরূপ কথা গতকাল বলেছেন। আগামী দিনেও এই বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও বাড়ার ইঙ্গিতই আমরা পাচ্ছি। বাংলাদেশ এভাবে দক্ষিণ এশিয়ার সহযোগিতার সম্পর্কের যোগসূত্র হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

এম হুমায়ুন কবির: সাবেক রাষ্ট্রদূত। ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট।
সূত্রঃ প্রথম আলো

চীন : পরাশক্তির বিবর্তন-৫০ : বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের অবস্থান

আনু মুহাম্মদ ::

বার্ষিক জিডিপির সরল হিসাবে চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, এর পরিমাণ প্রায় ১১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, মাথাপিছু আয় এই হিসাবে প্রায় ৮ হাজার মার্কিন ডলার। আর যদি অর্থনীতির তুলনামূলক ক্রয়ক্ষমতা দিয়ে বিচার করা যায় তাহলে দেখা যাবে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করে এখন বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি, এর আকার এই হিসেবে প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, মাথাপিছু আয় প্রায় ১৩ হাজার মার্কিন ডলার। এগুলো সবই চীনা সরকার ও আইএমএফ-এর  হিসাব। (http://www.tradingeconomics.com/china/gdp)

মোট আয়ে সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকলেও মাথাপিছু আয়ে চীন প্রায় ৮০টি দেশের পেছনে, পিপিপি-র হিসেবে ৭২টি দেশের পেছনে। সর্বোচ্চ জনসংখ্যা এর একটি কারণ। বিশ্ব বাণিজ্যে চীন এখন বৃহত্তম। এর পরিমাণ প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে বাজার দখলের জন্য দুর্নীতি, নিম্নমানের পণ্য এবং দাম কমিয়ে বাজার ছেয়ে ফেলার বদনাম চীনের প্রায় সবদেশেই।

বৈদেশিক মুদ্রার মজুদে চীন এখন বৃহত্তম, ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। বিদেশি বিনিয়োগ অন্ত:প্রবাহেও চীন বৃহত্তম, ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বিদেশেও চীনের বিনিয়োগ ক্রমেই বাড়ছে, প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। বিভিন্ন বিদেশি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কিনে ফেলার ঘটনাও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করলে সেদেশের বৃহৎ তেল কোম্পানিসহ বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি এতোদিনে চীনের মালিকানায় চলে যেতো। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ২ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের সিকিউরিটি এখন চীনের মালিকানায়। একইসঙ্গে সমমূল্যের ট্রেজারী বন্ডের মালিকও চীন। সেই হিসেবে চীনই এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ঋণদাতা। অবশ্য গত এক দশকে চীনের নিজের ঋণের পরিমাণও অনেক বেড়েছে। ২০০৭ সাল থেকে চারগুণ বেড়ে এখন তা ২৮ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, যা তার জিডিপির দ্বিগুণেরও বেশি।

২০১৬ সালের ২০ জুলাই ফরচুন পত্রিকা যে বৈশ্বিক বৃহত্তম ৫০০ কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করেছিলো তার মধ্যে সবচাইতে বেশি সংখ্যক কোম্পানি ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের, ১৩৪টি। এরপরই ছিলো চীনের অবস্থান ১০৩টি। বার্ষিক আয়ের দিক থেকে একেবারে শীর্ষস্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ালমার্ট। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে আছে চীনা কোম্পানি। এগুলো হলো যথাক্রমে বিদ্যুৎ কোম্পানি স্টেট গ্রীড এবং তেল কোম্পানি চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম ও সিনোপেক। পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তম দশটি ব্যাংকের তালিকায় প্রথম তিনটিই চীনের। এগুলো হল যথাক্রমে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না, চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাংক এবং এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না। (http://www.forbes.com/sites/antoinegara/2016/05/25/the-worlds-largest-banks-in-2016-china-keeps-top-three-spots-but-jpmorgan-rises/#3e45a0666230)

পুঁজিবাদী  বিশ্ব অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ইত্যাদিতে তাই চীনের অবস্থান ও প্রভাব দ্রুত নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে যাচ্ছে। ২০০৮ এর বিশ্ব আর্থিক সংকটের পর থেকে চীনা মুদ্রা দ্রুত আন্তর্জাতিক মুদ্রায় পরিণত হচ্ছে। ২০১০ সালে রাশিয়া চীনের সাথে তার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে চীনা মুদ্রা ব্যবহার শুরু করে। এরপর জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য এবং কানাডাও একইপথ অনুসরণ করে।  ব্রিকস জোট, জোট থেকে বিশ্বব্যাংকের পর্যায়ের একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ চীনের বৈশ্বিক ভূমিকার পথ প্রশস্ত করছে। সম্প্রতি চীনের উদ্যোগে ও কর্তৃত্বে যাত্রা শুরু করেছে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)। এটি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করবে এবং এশীয় অঞ্চলে বিনিয়োগে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি করবে।

তবে প্রবৃদ্ধির গতি গত কয়েক বছরে কমেছে। সরকারি হিসাবেই দেখা যাচ্ছে ২০১১ সাল পর্যন্ত এক দশকেরও বেশি সময় শতকরা ১০ ভাগের বেশি প্রবৃদ্ধি হার বজায় ছিলো। ২০১২ থেকে এই হারে নিম্নমুখি প্রবণতা দেখা দেয়। ২০১৫ সালে এই হার দাঁড়ায় ৭.৪। এরপর এই হার আরও কমে এখন ৭ এর নীচে নেমে গেছে। এছাড়া বহু খাতে বিনিয়োগ আটকে গেছে, অচলাবস্থা দেখা দিচ্ছে অতিরিক্ত বিনিয়োগের কারণে।[i]

গত তিন দশকে চীনের সমাজের অভ্যন্তরে পরিবর্তন হয়েছে ব্যাপক। কোটি কোটিপতিদের সংখ্যার দিক থেকে এখন চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। মধ্যবিত্তের আকারও বেড়েছে। তারফলে আভ্যন্তরীণ বাজারও বেড়েছে অনেক। প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ভোগ্যপণ্যের বাজার এখন চীন। বৈষম্যের বিভিন্ন দিক থেকে চীনের পরিস্থতির অবনতি হচ্ছে দ্রুত। চীনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলে বিনিয়োগের বড় অংশ যাবার ফলে আঞ্চলিক বৈষম্যও প্রকট হচ্ছে। সরকারি হিসাবেই দেখা যাচ্ছে শহরে মাথাপিছু বার্ষিক আয় যেখানে বেড়েছে শতকরা ৮.৫ হারে, সেখানে গ্রামে তা বেড়েছে শতকরা ৪.২ হারে। আসলে ধনী ও গরীব বৈষম্য এখন ১৯৪৯ সালে বিপ্লবপূর্ব চীনের বৈষম্য থেকেও বেশি। বেকারত্বের হারও বেড়েছে। প্রায় ১২ কোটি মানুষ এখন গ্রাম থেকে উপকূলীয় এলাকায় কাজের সন্ধান করছেন। ১৯৯৮ থেকে ১০ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকেই ছাঁটাই হয়েছেন প্রায় ৪ কোটি মানুষ। শহরাঞ্চলে এখন বেকারত্বের হার শতকরা ১০ পার হয়েছে।

বেকারত্ব আর বৈষম্য ছাড়াও চীনের উন্নয়ন ধারায় পরিবেশ দূষণ এখন বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। _________________________________________________________

[i] National Bureau of Statistics of China, February 29, 2016
সূত্রঃ আমাদের বুধবার অনলাইন

   www.ekush.info