বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর ওপর করপোরেট কর হার তুলনামূলক অনেক বেশি

করপোরেট কর তুলনামূলক বেশি বাংলাদেশে 

বাংলাদেশে করপোরেট কর হার তুলনামূলক বেশি। করপোরেট কর হার বেশি হলে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা কঠিন হয়। উদ্যোক্তাদের আয়ের বিপুল অংশ কর হিসেবে দিতে হয়। তাই উদ্যোক্তারা করপোরেট কর হার কম হলেই বেশি খুশি হন। বাংলাদেশেও করপোরেট কর কমানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাজেট পরামর্শক সভায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেই এই বিষয়ে একমত হয়েছেন এবং করপোরেট কর কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে তুলনা করার ক্ষেত্রে সাধারণত ওই সব দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট হারের সঙ্গেই সাধারণত তুলনা করা হয়। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের করপোরেট কর হার ২৫ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এ দেশের কোম্পানিগুলোর খুব বেশি নেই। মাত্র ২৯৬টি কোম্পানি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত আছে।

অন্যদিকে এই পর্যন্ত দেড় লাখের বেশি কোম্পানি যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয়ে নিবন্ধিত হয়েছে বলে জানা গেছে। কোম্পানি আইনে গঠিত যেকোনো কোম্পানির বার্ষিক রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক। অথচ চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) ২৬ হাজার কোম্পানি বার্ষিক রিটার্ন জমা দিয়েছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ছাড়া ওই সব কোম্পানিকে ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। তবে লোকসানি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর দিতে হয়। এ কারণে বাংলাদেশের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ওপর করের বোঝা অনেক বেশি পড়ে।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির ক্ষেত্রে কর হার ৩৫ শতাংশ। এর মানে বেশির ভাগ কোম্পানির করপোরেট কর হার বেশি। আবার ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মুঠোফোন অপারেটর কোম্পানি, সিগারেট কোম্পানির করপোরেট কর হার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর ওপর করপোরেট কর হার তুলনামূলক অনেক বেশি। এসব কোম্পানির প্রায় শতভাগই বেসরকারি উদ্যোক্তারা তৈরি করেছেন। যেকোনো দেশে ব্যক্তি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের আগে ওই দেশের করপোরেট কর হার বিবেচনায় নিয়েই বিনিয়োগ চিন্তা করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রুপালী চৌধুরী বলেন, ‘আমরা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন বেসরকারি কোম্পানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ হারে করপোরেট কর কমানোর দাবি করছি। সে ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ ও অন্য কোম্পানির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ করপোরেট করার কথা বলছি। এ দেশে করপোরেট কর তুলনামূলক বেশি। করপোরেট কর বেশি হলে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে যায়।

বহুজাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজির এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে করপোরেট কর সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে। আগামী ১ জুলাই থেকে ব্যাংকের ক্ষেত্রে তা ৩৫ শতাংশ এবং ছোট কোম্পানির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ করা হচ্ছে।

ভারতে করপোরেট কর হার ৩০ শতাংশ। এই হার ভারতীয় কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে বছরে ১ কোটি রুপির বেশি আয় হলে ভারতীয় কোম্পানিকে বাড়তি ৭ শতাংশ সারচার্জ দিতে হয়। ১০ কোটি রুপির বেশি আয় হলে তাদের ১২ শতাংশ সারচার্জ দিতে হয়। অন্যদিকে ভারতে ব্যবসা করে এমন বিদেশি কোম্পানির ক্ষেত্রে করপোরেট কর কিছুটা বেশি; ৪০ শতাংশ। আর বিদেশি কোম্পানির বছরে ১ কোটি রুপির বেশি আয় হলে ২ শতাংশ এবং ১০ কোটি রুপির বেশি আয় হলে ৫ শতাংশ সারচার্জ দিতে হয়।

শ্রীলঙ্কায় করপোরেট কর হার ২৮ শতাংশ। তবে সিগারেট ও মদ আমদানি ও উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই হার ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে বিদেশি কোম্পানিকে নিজেদের দেশে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে বাড়তি ১০ শতাংশ রেমিট্যান্স কর দিতে হয়।

আফগানিস্তানের করপোরেট কর হার বাংলাদেশের চেয়ে কম; ২০ শতাংশ। কেপিএমজির ওই গবেষণা প্রতিবেদনে নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের করপোরেট কর হারের কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

কেপিএমজির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ৫৫ শতাংশ করপোরেট কর সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এরপরের স্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ৪০ শতাংশ। উন্নত দেশগুলোতে করপোরেট তুলনামূলক বেশি। কিন্তু সুশাসনের নিশ্চয়তা থাকায় এবং ব্যবসায় করার সুবিধা বেশি; ওই সব দেশে বিনিয়োগ বেশি যায়।

বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনামের কোম্পানি পর্যায়ে কর হার ২০ শতাংশ। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম কর্তৃপক্ষ করপোরেট করে ছাড় দেয়। তবে তেল, গ্যাস খাতে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ৩২ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়।

এ ছাড়া মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ায় ২৫ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ২৪ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ১৭ শতাংশ করপোরেট কর বিদ্যমান আছে।