নিরাপদ সড়ক চাই এবং আমাদের জীবনের সুরক্ষা

সম্প্রতি সপ্তাহজুড়ে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের রাস্তায় নামতে দেখা গিয়েছে। তাদের দুই সহপাঠীকে ঘাতক বাস নির্মমভাবে মেরে ফেলেছে, সেজন্য তারা নিজেদের আর নিরাপদ মনে করছে না। ঘটনার পরপর ওই বিষয়ে অনেকেই প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

তারপরও শিশু-কিশোররা রাস্তায় নেমে পড়ে। তাদের স্লোগান ছিল- নিরাপদ সড়ক চাই এবং আমাদের জীবনের সুরক্ষা চাই। আন্দোলন চলাকালে তারা নয় দফা দাবি পেশ করে। সরকার এসব বিষয়ে এখন কাজ করছে।

যে কোনো যৌক্তিক ইস্যুতে বাংলার আমজনতাকে জাগিয়ে তুলেছে শিক্ষার্থীরাই। পৃথিবীর বহু উন্নত ও সভ্য দেশের ইতিহাস আমরা জানি, কিন্তু বাংলার শিক্ষার্থীদের গৌরবময় অবদানের তুলনা খুঁজে পাওয়া যাবে না।

গত শতকের ত্রিশের দশকের শুরুর সময়টা লক্ষ করলেই দেখা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রীতিলতা জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বিনয়, বাদল, দীনেশ- এদের দৃষ্টান্তও উল্লেখ করা যায়।

সূর্য সেনের কথা না-হয় বাদই দিলাম, কারণ তিনি তখন শিক্ষার্থী নন, অঙ্কের শিক্ষক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন শিক্ষাজীবনেই।

১৯৪৭ সালের আগস্টে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ দু’ভাগ হল। হিন্দুদের ভারত আর মুসলমানের পাকিস্তান। পাকিস্তান ছিল পূর্ব ও পশ্চিমে ভাগ। পূর্ব পাকিস্তানের সব নাগরিকই বাঙালি আর পশ্চিম পাকিস্তানে অবাঙালি।

ভাগাভাগির মাত্র সাত মাস পর বাঙালি শিক্ষার্থীরা বুঝে গেল যে আসলে ধর্মের ভিত্তিতে জাতি হয় না, জাতির জন্য ভাষা ও সংস্কৃতিটা আবশ্যক। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা কী হবে এ ব্যাপারে তার স্পষ্ট বক্তব্য ছিল- একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জিন্নাহর মুখের ওপর বলে দিয়েছিল- উর্দু নয়, বাংলাই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। পাকিস্তানে উর্দু ভাষাভাষির সংখ্যা তখন ৭ শতাংশের বেশি হবে না অথচ আমরা বাংলা ভাষায় বলতাম-পড়তাম-লিখতাম ৫৬ শতাংশ মানুষ।

এটা বাংলার দামাল ছেলেরা মানবে কেন? মানেওনি। যে ’৫২’র একুশে তারা তৈরি করেছিলেন তা আজ জাতিসংঘ স্বীকৃত ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। সে সময়ে সংবাদমাধ্যমের এত প্রসার ছিল না, আমজনতা ছাত্রদের মুখে দেশ সম্পর্কে কিছু শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকত।

এই শিক্ষার্থীরাই তৈরি করেছে ’৬৯’র গণঅভ্যুত্থান। একথা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী খুব ভালো করেই জানত। সে জন্য ’৭১’র ২৫ মার্চ তারা যে পাশবিক হামলা চালায় তার শুরুটাই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে। স্বাধীন দেশের পতাকা প্রথম এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই উত্তোলিত হয়েছিল।

স্বাধীনতার পরেও বাদ-প্রতিবাদের ঘটনা শিক্ষার্থীরাই ঘটিয়েছে বেশি। এর মধ্যে সফল আন্দোলনের ঘটনাও আছে। জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষাজীবন ছিল ১৯৮২ থেকে ১৯৮৭।

প্রথম বর্ষ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। ১৯৮৩ সালের মধ্য-ফেব্র“য়ারিতে এক শিক্ষকের নেতৃত্বে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেছিলাম। আবেগ প্রকাশের পরিণতিটা জানতাম। তবুও উৎসাহের কোনো ঘাটতি ছিল না। একেই বলে বুঝি তারুণ্য – যা কোনো কিছু পরোয়া করে না। এখন এ বয়সে কোটি টাকা দিলেও ওই ধরনের মিছিলে কেউ আমাকে নিতে পারবে না। কোনো ঘটনার প্রতিবাদে যা বলতে চাই তা পত্রিকায় প্রকাশিত বিবৃতি বা কলামেই সীমিত থাকে।

কিন্তু যাদের রাস্তায় দেখছি তারা তো যুবক নয়, কোমলমতি শিশু-কিশোর! আগের শিক্ষার্থীরা শারীরিক-মানসিকভাবে পরিপক্ব ছিল, ছিল যোগ্যতা ও সঠিক নেতৃত্ব, আরও ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য- এদের তো কোনোটিই নেই! তাপরও লাখ-লাখ শিশু-কিশোর রাস্তা দখল করে অবস্থান করেছিল।

তাদের একটি স্লোগান ছিল-‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। সরলতা, সততা ও ক্ষোভের মিশ্রণে এমন বিস্ফোরণ হতে পারে তা আমরা কোনোদিন ভাবতেও পারিনি। দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এক মন্ত্রীর তাচ্ছিল্যের ঘটনা যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল। শুধু কি বিক্ষোভ? সারা দেশের ঘুণেধরা সড়ক ব্যবস্থাটাই যেন পাল্টে দেবে তারা। আন্দোলন চলাকালে পুলিশের সহযোগী হয়ে তারা সড়কে গাড়ি আটকে দিয়ে বলেছে- লাইসেন্স দেখান, নইলে সাইড করুন।

যেসব চালকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল না তাদের বিষয়ে পুলিশকে অনুরোধ করেছে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। চোখে-মুখে কী অসাধারণ অভিব্যক্তি আর আত্মপ্রত্যয়! শিক্ষার্থীদের স্লোগান ছিল – তুমি যেই হও না কেন লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাতে পারবে না। ফিটনেসবিহীন মোটরসাইকেল আটকে দিয়েছে; এরপর তা পুলিশের কাছেই জমা দিয়েছে; তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। আজকে যেন সময় এসেছে সব মলিন তাড়িয়ে নতুন কিছু প্রতিষ্ঠার।

সম্প্রতি বিমানবন্দর সড়কে যে দুর্ঘটনা ঘটে গেল, এটা কি নিছক দুর্ঘটনা? আমরা এতদিনেও আমাদের সন্তানদের নিরাপদ সড়ক উপহার দিতে পারলাম না। এ দেশে কোনো কোনো দুর্নীতিবাজ অল্প সময়ে অনেক টাকার মালিক হয়েছেন। অথচ কোমলমতি শিশুদের প্রাণটাকে হাতে নিয়ে রাস্তায় বেরোতে হয়। এ অবস্থা আর কতদিন চলবে?

জানা গেছে, আলোচিত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য কাজ করছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা শুনে মনে হল, তিনি শিক্ষার্থীদের নয় দফা দাবির সঙ্গে নীতিগতভাবে সহমত পোষণ করেছেন। এটা আশার কথা।

কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হল আমাদের রাজনীতিকদের ‘মাইন্ডসেট’। সরকারি দলের কোনো কোনো নেতা বলতে শুরু করেছেন আন্দোলনের সঙ্গে কারও কারও ইন্ধনের কথা। রাজনীতির খেলাটাই এমন যে আপনার যদি কোনো দুর্বলতা থাকে তাহলে তার সুযোগ প্রতিপক্ষ নেবেই। আপনার কাজ হল নিজের দুর্বলতা দূর করে প্রতিপক্ষের সুযোগ নেয়ার পথ বন্ধ করা। শিশু-কিশোররা যে বার্তা দিয়েছে, আমাদের তা মনে রাখা দরকার।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়