শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭ শিক্ষকের

শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭ শিক্ষকেরঃ

কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে ও আন্দোলনের পরে গ্রেফতার শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭ জন শিক্ষক। এক বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘আমাদের সন্তানতুল্য এই শিক্ষার্থীদের প্রতি আইনের সঠিক প্রয়োগ চাই এবং অন্ততপক্ষে ঈদের আগে জামিনে তাদের মুক্তি চাই। এসব শিক্ষার্থীর বাবা-মা আত্মীয়-স্বজনের হাহাকার আমরা প্রতিদিনই সংবাদ মাধ্যমে জানছি ও পড়ছি। এগুলো আমাদের তীব্রভাবে ব্যথিত করছে। তাই আমরা অবিলম্বে আমাদের ছাত্রদের ওপর এই অমানবিক নিপীড়নের সমাপ্তির জন্য সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আহ্বান জানাচ্ছি।’

বৃহস্পতিবার (১৬ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনকে ‘রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন’ বলে আখ্যায়িত করে তারা বলেন, ‘গত ২৯ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে সংবাদ সম্মেলনকে উপলক্ষ করে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্র নেতাদের ওপর নির্মম আক্রমণ চালানোর মধ্যে দিয়ে এই নিপীড়নের সূত্রপাত হয়। শুধু আক্রমণ নয়, এই আক্রমণে আহত ছাত্রদের গ্রেফতার করার চেষ্টা করা হয়। এদেরকে গোপনে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যেতে হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্রীয় রোষানলের হাত থেকে বাঁচার জন্য কিছু প্রাইভেট হাসপাতাল পর্যন্ত এদের চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। শিক্ষার্থীদের ওপর এধরনের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বাংলাদেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব।’

কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে ভিসির বাড়িতে ভাঙচুর, আইসিটি আইন লঙ্ঘনের মামলায় গ্রেফতার শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে— তাতে তারা জড়িত কীনা সে বিষয়টি অস্পষ্ট বলে মন্তব্য করেন বিবৃতিদাতা শিক্ষকরা।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়,‘বিভিন্ন পর্যায়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ১১ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে সাতজন এখনও কারাগারে। বাকিরা একরকম পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো— কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালীন সময় ভিসির বাড়ি ভাঙচুর, আইসিটি আইন লঙ্ঘন ইত্যাদি। কিন্তু এসব অপরাধের সঙ্গে গ্রেফতার এই ছাত্ররা কীভাবে সম্পৃক্ত, সেটি একেবারেই অস্পষ্ট রয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, যে প্রক্রিয়ায় তাদের কাউকে কাউকে গ্রেফতার এবং রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো আইনজীবী এবং মানবাধিকার কর্মীদের মতে— সুস্পষ্ট মানবধিকার লঙ্ঘন। গ্রেফতার ছাত্রদের মধ্যে আহতরা এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি এবং কেউ কেউ পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও অনেক কম।’

কোটা সংস্কার আন্দোলনে গ্রেফতার শিক্ষার্থীদের মতো নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় গ্রেফতার ছাত্রদের বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ সাধারণ জনগণের কাছে প্রকাশ করা হয়নি, মন্তব্য করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তারা বলেন, ‘‘সংবাদপত্র থেকে বুধবার (১৫ আগস্ট) আমরা জানতে পেরেছি, ‘আন্দোলনে উসকানি’র অভিযোগে ৫১টি মামলায় ৯৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা সংবাদপত্রের চিত্রে দেখেছি— গ্রেফতার ছাত্রছাত্রীদের কোমড়ে দড়ি বেঁধে দাগী আসামিদের মতো আদালতে নিয়ে আসা হচ্ছে। এসব অত্যন্ত গর্হিত মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং একটি ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করার প্রয়াস। এই ছাত্রদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো— এরা লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল দিয়ে রাস্তার গাড়ি ভাঙচুর এবং পুলিশের ওপর আক্রমণ করে। কিন্তু গ্রেফতার ছাত্ররা কীভাবে এই গুরুতর অপরাধগুলোর সঙ্গে জড়িত, তার প্রমাণ এখনও নিরাপত্তা বাহিনী গণমাধ্যমকে সরবরাহ করেনি। অথচ অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি— নিরাপত্তা বাহিনীকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অপরাধী এবং অপরাধের প্রমাণ গণমাধ্যমে সম্প্রচার করতে। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনে গ্রেফতার ছাত্রদের মতো নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সময় গ্রেফতার ছাত্রদের বিরুদ্ধেও ওই ধরনের কোনও প্রমাণ সাধারণ জনগণের কাছে প্রকাশিত হয়নি।’’

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারীদের পরিচয় প্রকাশ হলেও তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে না বলে দাবি করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষকরা। তারা বলেন, ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় কিছু সংবাদকর্মী, বিশেষ করে ফটো সাংবাদিকরাও নির্মমভাবে আক্রমণের শিকার হন। এই আক্রমণকারীদের ছবি, পরিচয় জাতীয় দৈনিকগুলোতে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হলেও এখনও কাউকেই আইনি প্রক্রিয়ায় আনা হয়নি। শুধু তাই নয়, কোটা সংস্কার এবং নিরাপদ সড়ক— এই দুই আন্দোলনেই আমরা দেখছি যে, যেসব ছাত্ররা পুলিশ এবং দুর্বৃত্তদের হাতে অত্যাচারিত,আহত নিগৃহীত হয়েছে, তাদেরকেই সম্পূর্ণ বেআইনি প্রক্রিয়ায় গ্রেফতার ও নাজেহাল করা হয়েছে এবং হচ্ছে। পক্ষান্তরে, যারা এই ভয়ঙ্কর নিপীড়ন সংঘটিত করেছে, তাদের বিস্তারিত পরিচয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরেও এখনও একজনের বিরুদ্ধেও কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ধরনের নির্লজ্জ পক্ষপাতমূলক আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং গর্হিত অপরাধ। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এবং শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের ওপর ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত এই হামলা ও নিপীড়নে আমরা ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী শিক্ষকরা হলেন—জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, সহযোগী অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক খান, হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা, মনোবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক আশিক মোহাম্মদ শিমুল, মো. সেলিম হোসেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সায়মা আলম, আর রাজী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক সাদাফ নূর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক মাহমুদুল সুমন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক গৌতম রায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক গোলাম হোসেন হাবীব (জি এইচ হাবীব), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাসরীন খোন্দকার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক স্বাধীন সেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো.মাইদুল ইসলাম, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুবর্ণা মজুমদার, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজীব বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অভিনু কিবরিয়া ইসলাম, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক মাহবুবুল হক ভূঁইয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাহমিনা খানম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী মামুন হায়দার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আইনুন নাহার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুদীপ্ত শর্মা,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আ-আল মামুন,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খাদিজা মিতু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক নাসির আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আব্দুল মান্নান ও বুয়েটের ইলেক্ট্রিকাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রোনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হাসিবুর রহমান।