দ্বিতীয় প্রজন্মের মাঝে বাংলা সংস্কৃতির বিকাশে হিউষ্টনে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা

হিউস্টনে সুরাঙ্গনের প্রাণোচ্ছল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং শিল্পী কাদেরী কিবরীয়া’র একক সঙ্গীতানুষ্ঠান:

গত ১২’ই আগষ্ট যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গ রাজ্যের হিউস্টন শহরে- আয়োজিত হল ‘সুরাঙ্গন মিউজিক স্কুলের’ উদ্যোগে ‘সুরাঙ্গন স্টূডেন্ট অ্যাপ্রিসিয়েশন ডে-২০১৮’। সুরাঙ্গনের কর্ণধার, স্বনামধন্যা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রূপা ঘোষের অপরিসীম উদ্যোগ এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা এবং শুভানুধ্যায়ী বন্ধুরা মিলে উপহার দিল এক মনোজ্ঞ সঙ্গীত সন্ধ্যা।

মুখবন্ধে প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন হিউস্টন শহরের বাঙালি সমাজের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্ব, উল্লেখ্যভাবে – বাংলাদেশ আমেরিকান সোসাইটি অফ গ্রেটার হিউস্টনের প্রেসিডেন্ট জনাব ডঃ হান্নান খান, বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অফ হিউস্টনের প্রেসিডেন্ট জনাব শাহ এম হালিম, হিউস্টন দুর্গাবাড়ী সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্ট শ্রী সুজিত সেনগুপ্ত, এবং টেগোর সোসাইটি অফ হিউস্টনের প্রেসিডেন্ট শ্রীমতি দেবলীনা ব্যানার্জী। এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন মীলা সেনগুপ্ত- তাঁর দক্ষ উপস্থাপনায় – অনুষ্ঠানটি এক মনোরম এবং আনন্দায়ক পরিবেশের সৃষ্টি হয় ।

অনুষ্ঠানের প্রথমার্ধের আকর্ষন ছিল এক অপূর্ব সঙ্গীতালেখ্য–“আলোর আনন্দলোকে পঞ্চকবি”। উপজীব্য ছিল বাঙ্গালির অনেক গর্বের পঞ্চকবি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, এবং অতুলপ্রসাদ সেন, এঁদের সৃষ্টি এবং সেই সৃষ্টির আলোকবার্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এক আনন্দলোকে পাড়ি দেওয়া। কখনো ভাষ্য, কখনো একক বা দলীয় সংগীত, আবার কখনো একক বা দলীয় নৃত্যে অনুষ্ঠানটি সত্যই আনন্দের বার্তা এনে দিয়েছিল। প্রখ্যাত তবলাবাদক রাজা বাঙ্গার সঙ্গত বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তবলায় নিরঞ্জন রায়, এবং বরুণ চৌধুরীও যথাযথ সঙ্গত করেছিলেন। বিদ্যুৎ ঘোষ এবং বিক্রম বাঙ্গা ছিলেন মন্দিরা এবং অন্যান্য তালবাদ্যের সঙ্গতে। প্রখ্যাত বেহালাবাদক বিপ্লব সমাদ্দার তাঁর বেহালা সঙ্গতের সাথে সাথে মন্দ্রমধুর কণ্ঠে আবৃত্তি এবং ভাষ্যপাঠের মধ্য দিয়ে আলেখ্যর সঞ্চালনা করে অনুষ্ঠানটিকে প্রতিটি শ্রোতার কাছে করে তুলেছিলেন অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী।

বিশেষভাবে প্রশংসনীয় এই যে, সুদূর প্রবাসে থেকেও রূপার মার্কিন দেশে জন্ম নেওয়া ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের একনিষ্ঠ অনুশীলনের মাধ্যমে গানগুলি শুধু সুন্দরভাবে পরিবেশন’ই করেননি, তাঁদের বাংলা উচ্চারণও ছিল চমৎকার। নৃত্যেও তেমনি একনিষ্ঠ প্রচেষ্টার প্রশংসনীয় প্রকাশ ছিল। নৃত্য পরিকল্পনায় ছিলেন প্রখ্যাত নৃত্যগুরু সুপ্রদীপ্তা দত্ত, সিল্ভিয়া ফারুক, এবং শাওন সরকার। অংশগ্রহণ করেছিলেন, তিথি, পলিন, নুসাইবা, শিঞ্জিনী, আনন্যা, শাওন, শান্তা, সঞ্চালি, এবং তরুণ প্রজন্মের আরো অনেকে।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয়ার্ধের আকর্ষন ছিল বাংলাদেশের গর্ব, এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী কাদেরী কিবরীয়া’র একক সঙ্গীতানুষ্ঠান। সুরাঙ্গনের পক্ষ থেকে শিল্পী কাদেরী কিবরীয়াকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। তিনি সাধুবাদ জানান স্কুলের অধ্যক্ষা ও পরিচালক রুপা ঘোষকে। তিনি বলেন, সুরাঙ্গন দ্বিতীয় প্রজন্মের মাঝে আমাদের বাংলা সংস্কৃতি বিশেষ করে রবীন্দ্র ও নজরুল সঙ্গীতকে জনপ্রিয় করে তুলতে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। প্রবাসে শত প্রতিকূলতার মাঝে ও বাংলা গানের চর্চা ও প্রসারে সুরাঙ্গন মিউজিক স্কুলের মহতী এ প্রয়াসের ভূয়সী প্রশংসা করেন ।

তিনি সুরাঙ্গনের সব ছাত্রছাত্রীদেরকে তার আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান এবং সনদপত্র বিতরণ করেন । সনদপত্রপ্রাপ্ত’দের মধ্যে ছিলেনঃ পুষ্পিতা, তিথি, পূর্নতা, স্মিতা, গ্রন্থি, হেরা, নুসাইবা, প্রিয়ন্তি, ফাইয়াদ, শিরিন, তিন্নি, শায়ন, নিকিতা, সারণি, আভিশ্রি, আভিনন্দ, ফারিয়া, পলিন, আদি, যশ, রোকসানা, অনুশ্রী, জারিয়া, নুবায়েদ, অর্পন, রাসমিয়া, পুর্নতা, স্নোভার, উম্মুল, রায়া, বিনীতা, অঙ্কিত, আকাশ, পূজা, এবং আরো অনেকে।

এর পর শুরু হয় কাদেরী কিবরীয়া’র গান। তাঁর ভরাট কন্ঠে শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন কখনো রবীন্দ্রসঙ্গীতে, আবার কখনো হারিয়ে যাওয়া পুরোন দিনের বাংলা গানে। আর গানের ফাঁকে ফাঁকে কখনো তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীতের দুই গুরু, দেবব্রত বিশ্বাস আর চিন্ময় চট্টপাধ্যায়’এর স্মৃতিচারণে, আবার কখনো তাঁর সঙ্গীত জীবনের মজাদার অন্য গল্পে শ্রোতৃবৃন্দকে তিনি মাতিয়ে তোলেন। ওনাকে কয়েকটি দ্বৈত গানে সহযোগিতা করেন রূপা। এই আনন্দের রেশ নিতে নিতে শ্রোতামণ্ডলী কখন যে অনুষ্ঠানের শেষ অঙ্কে পৌঁছেছিলেন সে খেয়াল কারো ছিল না। পরিশেষে সকল অংশগ্রহণকারীকে রুপার ধন্যবাদজ্ঞাপনের মাধ্যমে শেষ হয় এই অনুষ্ঠান।

শিক্ষার্থী, অতিথি শিল্পী, কলাকুশলী মিলে প্রায় বিরানব্বই জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে এমন একটি অপূর্ব বর্ণময় এবং সফল প্রচেষ্টার জন্য রুপা, তাঁর স্বামী প্রদীপ, এবং সুরাঙ্গন স্কুল পরিবার – এঁদের সকলের অনেক প্রশংসা, অভিনন্দন, এবং শুভেচ্ছা প্রাপ্য। ওঁদের এই নিরলস প্রচেষ্টার জন্য এই সুদূর প্রবাসেও বাংলা সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা জ্বলে চলেছে, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পদ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

[কুলসুম পারভীন, হিউস্টন, টেক্সাস]